আবার একটা পুরনো লেখা। মনে হয় এখনও প্রাসঙ্গিক।
আমাদের বেড়ে ওঠার কাল
একজন সৃজনশীল মানুষ যে সময়টিতে বেড়ে ওঠেন, যে পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর কৈশোর ও তারুণ্য কাটে_ তাঁর সারাজীবনের কাজে সেই সময় ও পরিপ্রেক্ষিতের অভিঘাত পড়ে। আল মাহমুদ যেমন লিখেছিলেন_
কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাই-বোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি_
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
কবিতা তো ছেচলি্লশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।
(কবিতা এমন/ সোনালী কাবিন)
অর্থাৎ কৈশোরের নানা অনুষঙ্গ, সেই সময়, প্রেক্ষাপট আর তার পরিপ্রেক্ষিতই তাঁর কাছে কবিতা। তেমনি একজন গল্পকারের কাছে তাঁর গল্প, একজন চলচ্চিত্রকারের কাছে তাঁর চলচ্চিত্রও ওইরকমই। সব মহান শিল্পীই আসলে তাঁদের শিল্পকর্মে সমকালকেই আঁকেন, তার কোনো কোনোটি মহাকালে গৃহিত হয় মাত্র_ পেরিয়ে যায় সমকালের সীমানা। কিন্তু এ কি শুধু সৃজনশীল-সৃষ্টিশীল মানুষের জন্যই সত্যি, যে কোনো মানুষের জন্যই কি শৈশব-কৈশোর একটি সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়? যে কোনো মানুষেরই মানসগঠনটি কি হয়ে যায় না সেই ছোটবেলাতেই? যায়। যায় বলেই বেড়ে ওঠার সময়টিকে একটু চিনে নেয়ার চেষ্টা করা দরকার।
তা আমাদের সমকালের চেহারাটি কেমন? কেমন কাটছে আমাদের সোনালী তারুণ্য? তার আগে জেনে নেয়া দরকার, কেমন সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা বড় হয়ে উঠেছি। আমরা, মানে, মুক্তিযুদ্ধের দু-চার বছর আগে-পরে জন্ম নেয়া এই সময়ের তরুণেরা? কেমন ছিলো আমাদের শৈশব-কৈশোর? ওই কবিতার মতো করে সম্ভবত বলা যায়, আমরা হচ্ছি_ আশির দশকে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর। কৈশোরেই আমরা দেখেছি, আমাদের সময়টি বড় বদ্ধ, যেন কিছুতেই আর এগুনো যাচ্ছে না সামনে। মনে আছে, কৈশোরের কোনো এক সুন্দর সকালে ঘুম ভেঙেই শুনেছিলাম_ এই দুর্ভাগ্যপীড়িত জাতিটিকে উদ্ধার করার মহান উদ্দেশ্য নিয়ে এক মহামানব নাজেল হয়েছেন। নাজেল হয়েই তিনি আদেশ জারি করেছেন_ 'তাঁর' এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের কাজকর্মের কোনো সমালোচনা করা যাবে না, করলে এই শাস্তি ওই শাস্তি ইত্যাদি। শুধু তাই নয়_ একসঙ্গে পাঁচজনের বেশি জমায়েতও করা যাবে না, করলে দেখামাত্র গুলি করা হবে! সামরিক শাসনের নামে এমনই এক বীভৎস, ভয়ংকর, পৈচাশিক শাসন চেপে বসেছিলো সারা জাতির বুকের ওপর। এমনিতেই আমাদের পারিবারিক ও সমাজিক কাঠামোটি এমন যে, নানারকম বাধা-নিষেধের মধ্যে দিয়ে আমাদেরকে বড় হয়ে উঠতে হয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও কেবল নিষেধই করে যায়। এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না, এটা বলা যাবে না, ওটা বলা যাবে না_ কী যে করা যাবে, আর কী যে বলা যাবে সেটা আর বলে না কেউ। নাগরিক জীবনে এই বিধি-নিষেধ আরো ভয়ংকর_ শৈশব-কৈশোর এখানে বন্দি হয়ে থাকে চারদেয়ালের মধ্যে, কোনো আকাশ নেই যেখানে চোখ মেলে তাকানো যায়, কোনো মাঠ নেই যে খেলা করবে কিশোররা। বাসার সামনে গলিতে? না, তোমার বড় হয়ে ওঠার চেয়ে প্রতিবেশির জানালার কাঁচ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ_ খেলতে গিয়ে যদি সেটা ভেঙে ফেলো! তাহলে বাসার একচিলতে বারান্দায় বা করিডোরে? না ওখানে দৌড়াদৌড়ি করো না_ নিচতলা থেকে, পাশের ফ্ল্যাট থেকে কমপ্লেইন আসবে_ তাদের শান্তি বিঘি্নত করো না। 'তাহলে কি করবো?' গল্পের সেই বুড়োর মতো উত্তর দেয় সবাই _ 'কী' তো করাই যাবে না! তো আমাদের কৈশোরে এইসব নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা। রাষ্ট্রযন্ত্রই বলে দিচ্ছিলো কী কী বলা যাবে না, কী কী করা যাবে না_ ওই যে_ 'তঁাঁর' কোনো সমালোচনা করা যাবে না, একসঙ্গে পাঁচজনের বেশি জমায়েতও করা যাবে না, মিছিল মিটিঙ করা যাবে না, 'তঁাঁর' বিরুদ্ধে কিছু লেখা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি_ কিন্তু কী কী বলা বা করা যাবে, তা আর বলেনি কোনোদিন। মাঝে মাঝে সো কলড গণতন্ত্রের ছদ্মবেশ ধারণ করলেও ওই মহামানবের কল্যাণে আমাদের কৈশোর কেটেছে এমনি সব বিচিত্র নিষেধাজ্ঞায়। শুধু তো তাই নয়, ওই পবিত্র বয়সেই আমরা দেখেছিলাম_ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে অবিশ্বাস-দ্বন্দ্ব-সন্দেহ। কেউ কারো ওপরে আস্থা রাখতে পারছে না, কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না, দেয়ালেরও কান আছে_ ভেবে কথা বলছে ফিসফিসিয়ে। দুজন মানুষের ফিসফিসানি কথা প্রেমময় হতে পারে, কিন্তু আমাদের সময়টি ছিলো এমন যে, ওই ফিসফিসানির মানেই পাল্টে গিয়েছিলো। দুজন ফিসফিস করছে মানে হচ্ছে_ তাদের মধ্যে তৃতীয় কেউ শুনে ফেলার ভয় বা শংকা কাজ করছে। তা তৃতীয় কেউ শুনে ফেললে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো_ তাকে যে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, যদি সে বলে দেয় কাউকে, যদি নেমে আসে পাশবিক (সামরিক) নিপীড়ন! সামরিক শাসনের প্রভাব শুধু রাষ্ট্রীয় জীবনেই নয়, ব্যক্তিজীবনেও এমনভাবে পড়েছিলো। রাষ্ট্রের অবস্থাই বা কেমন ছিলো? আমরা দেখেছি_ কেমন করে আলোর ইশারাবিহীন অতল অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে স্বদেশ, কোথাও কোনো সম্ভাবনা থাকছে না, চারদিকে কেবল গভীর অন্ধকার, কেবল অনিশ্চয়তা, কেবল হতাশা। দেখেছি_ প্রতিবাদী মিছিলে উঠে যাচ্ছে সামরিক ট্রাক, দেখেছি প্রাচীন রাজনীতিবিদরা তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ-তিতিক্ষা বিসর্জন দিয়ে লুটিয়ে পড়ছেন সামরিক প্রভুর কদর্য পায়ে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রকম্পিত হচ্ছে অস্ত্রের ঝনঝনানিতে, ছাত্রনেতাদের চারপাশে উড়ছে টাকা আর ক্ষমতা_ আর তার লোভে পড়ে আজকের বিপ্লবী কালকেই হয়ে যাচ্ছে প্রভুর চামচা, টাকা এবং টাকাই হয়ে উঠছে সবকিছুর একমাত্র নিয়ামক শক্তি, কোনো নীতিবোধ বা মূল্যবোধ আর চালকের আসনে থাকছে না, রাষ্ট্রই উৎসাহিত করছে অসৎ হতে, আদর্শহীন হতে, নীতিহীন হতে, তাই রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রতিটি অফিসের পিওন-দারোয়ান পর্যন্ত অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করাটাকে প্রায় বৈধ কাজ বলে ধরে নিয়েছে, আর এভাবেই দুর্নীতিকে দেয়া হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে যখন-তখন, লেখক-শিল্পী-সংবাদকর্মীরা নিগৃহিত হচ্ছেন অহরহ, আর এসবকিছুর মধ্যে দিয়ে ধূমায়িত হচ্ছে ক্ষোভ। যে বয়সে তরুণদের মুখে থাকবে প্রেমের মধুর বাক্য _ সেই বয়সে নিজেকে জাগিয়ে তুলতে হচ্ছে ক্ষোভ ও বিদ্রোহের তীব্র-তীক্ষ্ন বাক্য দিয়ে। শুধু জাতীয় জীবনেই নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বেও তখন ঘটছে এক বিপুল বিপর্যয়_ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে দখল করে নিচ্ছে বীভৎস পুঁজিবাদ। একসময় তরুণদের এক বিরাট অংশ ওইসব রাষ্ট্রের আদলে নিজের দেশেও একটি বিপ্লবী পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতো (সেই স্বপ্ন ভুল ছিলো কি শুদ্ধ ছিলো সেটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তরুণদের সামনে ওরকম একটি স্বপ্ন ছিলো, ছিলো আদর্শ)_ আমাদের সময়ে সেই স্বপ্নও ভেঙে যেতে থাকে, পায়ের নিচ থেকে সরে যেতে থাকে দাঁড়াবার মাটি।
এমনি একটি লক্ষ্যহীন-আদর্শহীন-নীতিহীন-স্বপ্নবিহীন সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা বেড়ে উঠেছি। কোথাও ছিলো না কিছু আশাবাদী হবার মতো, কোথাও এমন কিছু ছিলো না যাকে অবলম্বন করে একজন তরুণ জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার স্বপ্ন দেখতে পারে। এমন একটি সময়ের মধ্যে দিয়ে যাদের কৈশোর ও তারুণ্য কাটে, তারা ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, কোথাও কোনোকিছুর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তৈরি হয় না। আমাদের সময়টি আসলে সম্পর্কহীনতার সময়। এই সময়ের মানুষগুলো কোথাও সম্পর্কিত নয়, আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে থাকে অবিশ্বাস, আমাদের প্রেমগুলো তুচ্ছ কারণে ভেঙে যায়, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে_ এমনকি পরিবার থেকেও_ আমরা একটি নিরাপদ দূরত্ব রচনা করে চলি। যেন পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একটি কার্যকর ভাষা নির্মাণের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি আমরা। কি করে প্রেম হবে আমাদের, হবে বন্ধুত্ব? প্রেম তো মানুষের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্তের নাম, আমাদের জীবনে শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত কোথায়? সবই তো অন্ধকার। যে বয়সটিতে মানুষের সর্বোচ্চ মানসিক বিকাশ ঘটে সেই বয়সটি যদি কাটে এমন একটি আবদ্ধ সময়ে, আবদ্ধ পরিবেশে তাহলে সে হয়ে ওঠে অসম্পূূর্ণ মানুষ। আমাদের সময়টি তাই অসম্পূর্ণ মানুষে ভরতি, আমাদের সময়টি, আগেই বলেছি, তাই স্বপ্নহীনতা ও সম্পর্কহীনতার সময়।
২.
এই সময়টিকে যদি একটু বিশ্লেষণ করে দেখতে চাই তাহলে কথা বলতে হবে অনেক বিষয় নিয়ে। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, এবং যেহেতু ব্যক্তিগতভাবে আমি এই সময়ে লেখালেখির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছি তাই সমকালীন লেখালেখি এবং তার আনুষাঙ্গিক প্রসঙ্গ নিয়েও। কিন্তু আমি শুরু করতে চাই এই সময়ে ঘটে যাওয়া দুটো রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয় নি, সত্তর দশকের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিটিও আমরা তখন অনুভব করে উঠতে পারিনি বয়সের কারণেই। কারো কারো হয়তো আবছাভাবে '৭৪-এর দুর্ভিক্ষের দু-একটা টুকরো স্মৃতি মনে থাকতে পারে, তা-ও কেবল পারিবারিক টানাপোড়েনের কথাই_ সারাদেশে কী ঘটেছিলো সেগুলো নয়; কারো হয়তো মনে পড়বে স্বাধীনতার প্রধান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা _ যদিও সেটা কেবলই খবর আকারে এসেছিলো আমাদের কাছে, এর মর্মার্থ উপলব্ধি করার মতো বোধ-বুদ্ধি তখনও হয়ে ওঠে নি। কিন্তু যেহেতু আশির দশকে আমাদের কৈশোর কেটেছে এবং তারুণ্যে উপনীত হয়েছি এই সময়েই তাই এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বেশ ভালোভাবেই মনে থাকার কথা। মনে দাগ কাটার মতো বেশ কিছু ঘটনা ঘটে এই দশকের শুরুতেই, এবং তার ধারাবাহিকতা চলতে থাকে দশক জুড়েই। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, ৮১-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন (এখন মনে হয়, এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো। ড. কামাল হোসেনকে পরাজিত করে বিচারপতি সাত্তার নির্বাচিত হয়েছিলেন, এ কথা তো সবারই জানা। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো জাসদ সমর্থিত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিলকে টপকে হাফেজ্জি হুজুরের তৃতীয় স্থান লাভ। একটি ইসলামপন্থী দলের প্রার্থী হয়ে তিনি কিভাবে তৃতীয় হলেন, তা-ও মেজর জলিলের মতো একজন বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদকে টপকে, যারা তাকে ভোট দিয়েছিলেন তারা সাত্তারের বদলে তাকে বেছে নিয়েছিলেন কেন, এগুলো ভাবার মতো বিষয়। এ কথা ভাবা কঠিন যে, তার ভোটাররা সকলেই তার অনুসারী ছিলো, আমার মনে হয় এই সময় থেকেই ইসলামপন্থীরা নিজস্ব অবস্থান নিতে শুরু করে _ আর হাফেজ্জি হুজুরের এই ফলাফল সেটাই বুঝিয়ে দেয়।), ৮২-তে এরশাদের ক্ষমতা দখল, ৮৩-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দেয়া এবং কয়েকজনের শাহাদত বরণ (হায়, এই দিনটিতে এখন তরুণরা 'ভ্যালেন্টাইনস ডে' উদযাপন করে! শফিক রেহমানরা নতুন প্রজন্মকে এই ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন!), ৮৬-এর নির্বাচনে আকস্মিকভাবে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ (এর কয়েকদিন আগেই শেখ হাসিনা বলেছিলেন _ এই নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করবে তারা জাতীয় বেঈমান_ এরকম কঠিন অবস্থান পরিবর্তন করে তিনি সেদিন নির্বাচন করেছিলেন কেন, সেটা এখনও পর্যন্ত রহস্যময় রয়ে গেছে।), সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনকে জায়েজ করে নেয়া, কিংবা আবার সংশোধন করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা ইত্যাদি এই সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে মনে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লাগাতার আন্দোলনের কথা। সে আন্দোলনে জোয়ার ভাটা ছিলো কিন্তু একেবারে থেমে যায় নি কখনো এবং তরুণরা আপোস করে নি কখনো।
আমি এই সময়ের তরুণদের দুটো সাফল্যকে বড় করে দেখি। প্রথমটি হলো_ আপোসহীন অবস্থান নিয়ে একটি সফল আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটানো, আরেকটি হলো_ জাহানারা ইমামের মতো একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক-দালাল বিরোধী একটি গুরুত্বপূর্ণ-অর্থপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তোলা। যে কোনো আন্দোলনেরই_ তা যত ক্ষুদ্রই হোক, এমনকি সেটা যদি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থও হয় তবু _ একটা তাৎপর্য থাকে, থাকে অর্জন। এই দুটো আন্দোলনেরও তেমন কিছু গভীর তাৎপর্য আছে।
একথা অনস্বীকার্য যে, এরশাদের পতন ঘটেছিলো মূলত তার বিরুদ্ধে তরুণদের অনমনীয় অবস্থান গ্রহণের কারণেই। আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-অবিশ্বাস-সন্দেহ-ভুল বোঝাবুঝি এসব লেগেই ছিলো (এমন কি আন্দোলনের দুই প্রধান নেত্রীকে একবারের জন্যও এক মঞ্চে আনা যায় নি হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও), কে যে কখন সামরিক প্রভুর পদতলে ভূ-লুণ্ঠিত হয়ে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করে ফেলে তার কোনো ঠিকঠিকানা ছিলো না এবং এ ধরনের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে, কিন্তু তরুণদের মধ্যে এসব ঘটনার প্রভাব পড়েছে সামান্যই। আমি সেই সব তরুণদের কথা বলছি যারা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল বা এর কোনো অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলো না অথচ আন্দোলনে তাদের ছিলো নিয়মিত অংশগ্রহণ। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের বিপুল অবদানের কথাও অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করা উচিত। তারাও যে কোনো মূল্যে ঐক্য টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিলো। কিন্তু আমার মনে হয়_ তারা এটা করতে বাধ্য হচ্ছিলো মূলত নির্দলীয় তরুণদের প্রত্যাশার চাপেই, ব্যাপারটা আর তাদের দলীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিলো না, থাকলে মূল দলগুলোর অন্তর্বিরোধের ছাপ পড়তোই। যাহোক, আমার বলার কথাটি হচ্ছে_ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত তরুণরা ছাড়াও মূলত নির্দলীয় তরুণদের প্রবল অংশগ্রহণই ৯০-এর আন্দোলনকে সফল করে তোলে। আর এখানেই এই গণ-আন্দোলনের বিশেষত্ব। দলমতের ঊধের্্ব উঠে তরুণরা এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এবং জাতির বুকের ওপর চেপে বসা যে ব্যক্তিটিকে ক্ষমতাচু্যত করাটা ছিলো আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব ব্যাপার, সেটিকেই এই তরুণরা সম্ভবপর করে তুলেছিলো। ৭১-এর পর ৯০-এ আগ পর্যন্ত আর কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে এমন স্বতঃস্ফূর্ত তুমুল অংশগ্রহণ আর দেখা যায় নি। যদিও একাত্তরের সঙ্গে এ আন্দোলনের কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। একাত্তরে ছিলো আপামর জনতার অংশগ্রহণ এবং তাদের সামনে ছিলো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন, এবং বুঝে হোক না বুঝে হোক তারা যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতো তা হবার কথা ছিলো উদার, মানবিক, প্রগতিশীল, অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক_ যার অর্থণীতি পরিচালিত হবে সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। অন্যদিকে ৯০-এর আন্দোলন ছিলো মূলত শহুরে মধ্যবিত্তদের আন্দোলন এবং এর কোনো সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিলো না, ছিলো না কোনো স্বপ্নও, এরশাদের পতন হলে কোন ধরনের সরকার ব্যবস্থা আমাদের কাম্য তা নিয়েও ছিলো না কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য। ফলে সত্যি সত্যি যখন এরশাদ সরকারের পতন ঘটলো তখন একটি সুস্থ প্রগতিশীল মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার বিষয়টি চলে গেলো পেছনে, একটি 'সুষ্ঠু' 'অবাধ' নির্বাচন অনুষ্ঠানই ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠলো। দলীয় তরুণরা ঝাঁপিয়ে পড়লো নির্বাচন-যজ্ঞে, আর নির্দলীয় তরুণরা সুবোধ বালকের মতো ঘরে চলে গেলো। তাদের এই ঘরে চলে যাওয়াই পরবর্তীকালের নির্বাচিত 'গণতান্ত্রিক' সরকারগুলোকে খেয়াল-খুশি মাফিক রাষ্ট্র পরিচালনার সাহস জুগিয়েছে। অবশ্য স্বীকার করে নেয়া উচিত যে অনেক নেতিবাচকতা সত্ত্বেও কিংবা অনেক স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ করা সত্ত্বেও ৯০-এর পরবর্তী সরকারগুলো এরশাদের মতো বীভৎস পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনা করে নি। এরশাদের শাসনামলের কথা যাদের মনে আছে তারা সম্ভবত আমার এই কথার সঙ্গে সহমত পোষন করবেন। আমার এই বক্তব্যের পক্ষে একটা ছোট উদাহরণ দেয়া যায়। ৯০-এর পর থেকে এই সময় পর্যন্ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো (বিটিভি ছাড়া) যেটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে, এরশাদের শাসনামলে তার কণামাত্রও ভোগ করতো না। প্রতি রাতে খবর সেন্সর করার জন্য সরকারের তরফ থেকে ফোন আসা এবং অহরহ পত্র-পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া ছিলো তখন এক নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। এখন অন্তত মিডিয়াগুলোকে সেই যন্ত্রণা পোহাতে হয় না। অবশ্য এখনও যে সেন্সরশিপের ঘটনা ঘটেনা তা নয়, কিন্তু তা যতটা না সরকারী নির্দেশে তারচেয়ে বেশি সেল্ফ-সেন্সরশিপের কারণে। ঐ সময় সরকারের মন যুগিয়ে চলতে চলতে মিডিয়াকর্মীদের মানসিক গঠনটাই এমন হয়ে গেছে যে, সরকার রুষ্ঠ হতে পারে এমন কোনো সংবাদ পরিবেশনের আগে মিডিয়াগুলো বিশেষ 'সাবধানতা' অবলম্বন করে। মিডিয়াগুলোও যেহেতু ধোয়া তুলসিপাতা নয়, নানাবিধ অপকর্মের সঙ্গে এদেরও যেহেতু যোগসুত্র আছে _ তাই ক্ষমতাসীনদের তারা সহসা রাগাতে চায় না। বলাই বাহুল্য এখনও, এই 'গণতান্ত্রিক' সময়েও সংবাদকর্মীদের নানাভাবে নিগৃহীত হতে হচ্ছে। এটা ঘটছে ক্ষমতাসীনদের অসহনশীলতার জন্য। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনা করতে হলে যে সহনশীলতার প্রয়োজন হয়, এদের বেশিরভাগেরই তা নেই। থাকবে কি করে? এদের শৈশব-কৈশোর-যৌবনও তো কেটেছে সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। গণতন্ত্র কী জিনিস এরা তো চোখেই দেখে নি। বয়সে বৃদ্ধ হলেও গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে এরা হচ্ছে প্রথম প্রজন্ম। এদের কাছে তাই বিশুদ্ধ গণতন্ত্র আশা করাও হাস্যকর। আর এই অসহিষ্ণুতার জন্যই তাদের সমালোচনা করে কোনো রিপোর্ট হলে এরা দৃষ্টিকটুভাবে ক্ষিপ্ত হন, সংবাদপত্র ও সংবাদকর্মীদের ওপর চোটপাট করেন, এমনকি নির্যাতনটি কখনও কখনও শারীরিক পর্যায়েও পেঁৗছায়।
যাই হোক, আগেই বলেছি, ৯০-এর আন্দোলনের কোনো সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিলো না, ছিলো না তেমন কোনো স্বপ্ন_ যেমন ছিলো মুক্তিযুদ্ধের_ তাই স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় জর্জরিত হয়েছিলো দেশের মানুষ, ৯০-এর পর সেটা ঘটে নি। আমার ধারণা, যে তরুণরা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলো বা একে সমর্থন করেছিলো তারা জানতো_ এরশাদের পতন হলেও ক্ষমতায় আসবে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি এবং এ দু-দলের কাছেই যে বিশেষ কিছু আশা করার নেই এটাও তাদের অজানা ছিলো না। যে দলগুলো কখনোই গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে দিয়ে যায় নি, তাদের কাছ থেকে কোন ধরনের গণতান্ত্রিক আচরণই বা আশা করা যায়, যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মেনিফেস্টো নেই তারা দেশের অর্থনীতিতে কী-ই বা মৌলিক পরিবর্তন ঘটাবে? এমনকি কোনো বিষয়েই এদের কোনো কমিটমেন্ট লক্ষ করা যায় নি। অতএব ৯০-এর আন্দোলনের ফল হিসেবে পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন ঘটবে_ এই পরিবর্তনটুকু ছাড়া আর কোনো মৌলিক পরিবর্তন বিশেষভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না। তবু এ আন্দোলনের একটি বিশেষ অর্জন আছে বলে মনে করি আমি। পাকিস্তান আমল থেকে যে সামরিক শাসন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো এই দেশের মানুষের ললাট লিখন, ৯০-এ পর সে সম্ভাবনা সুদূরপরাহত হয়ে গেছে। আমার ধারণা, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের চিন্তাভাবনায়ও পরিবর্তন এসেছে, আগে তাদের অন্তত একটি অংশ ক্ষমতা দখলের স্বপ্নে বিভোর থাকতো_ এখন সেই প্রবণতা কমেছে বলে মনে হচ্ছে; মানুষও আগে আতংকে ভুগতো যে, কোনো এক সুন্দর সকালে তারা শুনবে_ কোনো এক মহামানব জাতিকে উদ্ধার মহান ব্রত নিয়ে নাজিল হয়েছেন, এখন সেই আতংকও বেশ অনেকটাই কেটে গেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এই প্রথম আমরা একটানা ১৫ বছর সামরিক শাসনের বাইরে আছি, আরও বছর বিশেক এভাবে কাটাতে পারলে এদেশে আর কোনোদিন ঐ পাশবিক শাসন আর ফিরে আসবেনা বলে বিশ্বাস করি আমি, গণতন্ত্রও ততদিনে একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে বলে আশা করা যায়।
একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনটিও ছিলো নব্বই দশকের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ আন্দোলন, যদিও কোনো সাফল্য পাবার আগেই এই তুমুল আন্দোলনটি কতিপয় রাজনৈতিক দলের হঠকারিতার জন্য হীমাগারে চলে যায়। সাফল্য না পেলেও এই আন্দোলনে যে দলমতের ঊধের্্ব উঠে তরুণরা পথে নেমে এসেছিলো সে কথা অনস্বীকার্য। এমনকি ঘাতকদের প্রত্যক্ষ সহমর্মী ও আশ্রয়দাতা দল বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের অনেক কর্মীকেও এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখেছি, যদিও দলীয়ভাবে তারা এর পক্ষে ছিলো না। আর কর্মীদের এই অংশগ্রহণে ছাত্রনেতাদের সায় ছিলো না সেটাও বলা যায় না, কারণ ওই সময় ছাত্রদলের একজন প্রভাবশালী ডাকসাইটে নেতা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন_ সাতদিনের গোলাম আযমকে দেশছাড়া করা হবে! ছাত্রদলের একজন নেতার মুখে এ ধরনের হুমকি বেমানান শোনায় বৈকি, যেহেতু তাদেরই আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে-আদরে-আহ্লাদে ঘাতক-দালালরা এতদূর পর্যন্ত এসেছে (এখন ক্ষমতার অংশীদারও তারা), এমনকি ইসলামী জঙ্গিবাদও বিস্তার লাভ করেছে তাদেরই জন্য। কিন্তু ওই সময় হুমকিটিকে অস্বাভাবিক মনে হয় নি, বরং মনে হয়েছিলো_ যে দলই করুন না কেন, তিনি তো তরুণদেরই প্রতিনিধিত্ব করেন, তরুণদের আবেগকে তিনি অস্বীকার করবেন কিভাবে? যাহোক, কেন এই আন্দোলন বিপুল আকার ধারণ করার পরও সাফল্যের মুখ দেখে নি, সে কথা সবারই কমবেশি জানা। 'মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি'র লাইলেন্সধারী দলটি এই আন্দোলনের স্পিরিট ও সাফল্যকে পকেটে পুরে, আন্দোলনকে দলীয় রূপ দান করে, নিজেরাই ঘাতক দালালদের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেমেছিলো। ওই দলের ধামাধরা বুদ্ধিজীবীরা ঘটনাটিকে 'ক্ষমাসুন্দর' দৃষ্টিতে দেখলেও, এবং একে একটি রাজনৈতিক 'কৌশল' বলে চালানোর চেষ্টা করলেও এই কৌশলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হয়েছে ঘাতকরাই। ৭৫-এর পর থেকেই ঘাতকরা সংগঠিত হতে শুরু করে, জামায়াত প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে, এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে তারা মাঠেও নামে এবং নির্বাচনে অংশ নেয় কিন্তু তারা ছিলো জোট-বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ। রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বা স্বীকৃতি বলতে যা বোঝায় তা তাদের ছিলো না। আওয়ামী লীগের ওই আত্নঘাতি কৌশল তাদেরকে ক্ষমতায় নিয়ে গেলেও জামায়াতকে দেয় সেই সোনার হরিণ_ রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতি। ৯৬-এর সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ভরাডুবি ঘটলে জামায়াতের দলীয় ফোরামে এর জন্য দায়ী করা হয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধার ঘটনাটিকে এবং গোলাম আযমকে এর জন্য প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। দলীয় সমালোচনার জবাবে গোলাম আযম তখন বলেছিলেন_ 'আমাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি বা অন্য কোনো দল নয়_ আওয়ামী লীগ। এ দেশে শেষ পর্যন্ত দুটো দল থাকবে_ একটি আওয়ামী লীগ আরেকটি জামায়াত। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত আমাদের কোনো রাজনৈতিক স্বীকৃতি ছিলো না, কারণ আওয়ামী লীগ আমাদের স্বীকৃতি দেয় নি। তাদের সঙ্গে জোট বেঁধে আমি সেই স্বীকৃতি আদায় করে দিয়েছি, আমার দায়িত্ব শেষ, এরপরের কাজগুলো আপনারা করে নেবেন।' তখনকার পত্রপত্রিকায় এই খবরটি বেরিয়েছিলো_ কিন্তু আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা আবারও তা এড়িয়ে গেছেন, অথচ গোলাম আযমের এই বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষিত হওয়া উচিত ছিলো। জামায়াত যে সুদুরপ্রসারী চিন্তা থেকেই তখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধেছিলো তা বোঝা গেলো কয়েক বছরের মধ্যেই_ এখন তারা ক্ষমতার অংশীদার। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ছিলো অদূরদর্শী, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এবং বিএনপিকে বন্ধুহীন করার জন্য তারা এটা করেছিলো। তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন। এমনকি জামায়াতের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয়াটাকেও তারা আর কঠোর ভাষায় সমালোচনা করতে পারছে না, নৈতিক ভাবে তারা ভেঙে পড়েছে বলেই।
যাহোক, ঘাতক-দালাল বিরোধী আন্দোলন ব্যর্থ হলেও এর একটি ইতিবাচক গুরুত্ব আছে। এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের সমর্থন, আবেগ ও ভালোবাসা এবং ঘাতকদের প্রতি তাদের ঘৃণা প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছিলো। বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পেরেছিলো _ তরুণদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়, এই বিষয়টি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কারো জন্যই শুভ হবে না। আমাদের ভরসার জায়গা এই তরুণরাই। দেশে যতই মৌলবাদী-প্রতিক্রিয়াশীল-জঙ্গিবাদী তৎপরতা বিস্তার লাভ করুক না কেন, এই তরুণরা শেষ পর্যন্ত তা ঠেকিয়ে দেবেই। যে দেশ অর্জিত হয়েছে একটি রক্তাক্ত যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে, যে যুদ্ধের কেন্দ্রে ছিলো একটি অসামপ্রদায়িক প্রগতিশীল রাষ্ট্রের স্বপ্ন, সে দেশটিকে কিছুতেই মৌলবাদের দিকে ঠেলে দিতে দেবে না তারা_ আমি অন্তত সে বিশ্বাস রাখি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


