এটি কোনো কবিতার আলোচনা নয়। কী কারণে জানি না, আজকে আবুল হাসান দখল করে আছেন আমাকে। তাঁর সম্বন্ধে দু-এক ছত্র।
'আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি'- এই কথা বলেছিলেন আমার প্রিয় কবি আবুল হাসান।
কি হবে না? কি-ই বা হতে পারতো? তিনি বলছেন,
ক্লাসভরতি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেপ সমস্ত কাগজ!
আমি বাজে ছেলে, আমি লাস্ট বেঞ্চি, আমি পারবো না।
বোঝা গেলো- তিনি বাজে ছেলে, তাই পারবেন না।
কি পারবেন না?
ক্ষমা করবেন বৃক্ষ, আপনার শাখায় আমি সত্য পাখি বসাতে পারবো
না!
বানান ভীষণ ভুল হবে, আর প্রুফ সংশোধন যেহেতু শিখিনি
ভাষায় গলদঃ আমি কি সাহসে লিখবো তবে সত্য পাখি, সচ্চরিত ফুল?
মনে হয়, সত্যিই তিনি বাজে ছেলে। বানান ভুল, ভাষার গলদ- এসব তো কোনো 'উজ্জ্বল সন্তানের' বৈশিষ্ট্য নয়! কিন্তু প্রশ্ন সেটা নয়, প্রশ্ন হলো- এমন একজন 'বাজে ছেলের' বৃক্ষের শাখায় সত্য পাখি আর সচ্চরিত্র ফুল লেখার মহৎ আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেবে কেন? তাকে কে বলেছে বৃক্ষের শাখায় শাখায় এসব লিখে দিতে? বাজে ছেলে, তো বাজে ছেলেদের মতো বাজে বাজে কাজ করলেই হয়! না, হয় না।
কিছু কিছু কবি থাকেন এমন, যারা জীবনের শুরুতেই মহান হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেন।
'পাখি হয়ে যায় এই প্রাণ' কবিতার প্রথম দুটো লাইন তিনি লিখেছিলেন এরকম:
অবশেষে জেনেছি মানুষ একা
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা।
'অবশেষে!' মনে হচ্ছে না, যে, কোনো বৃদ্ধ কবি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বলছেন- 'অবশেষে' তিনি জেনে গেলেন! অথচ কবিতাটি আবুল হাসান লিখেছিলেন ২২/২৩ বছর বয়সে! (তাঁর মৃত্যু ঘটে ২৭ বছর বয়সে, এর ৪/৫ বছর আগে এই কবিতা লেখেন তিনি।) আর কী অসাধারণ পঙক্তি- 'জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা।' নিঃসঙ্গতার, একাকীত্বের এমন অসামান্য বর্ণনা মাত্র এক লাইনে আর কজন কবি দিতে পেরেছেন পৃথিবীতে?
জীবনের সারসত্য বা চূড়ান্ত সত্য যিনি এত অল্প বয়সেই জেনে/বুঝে যান, তিনি তো বলবেনই- 'অবশেষে!' তিনিই তো চাইবেন বৃক্ষের শাখায় শাখায় 'সত্য পাখি' আর 'সচ্চরিত্র ফুল' লিখে দিতে!
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। এত তাড়াতাড়ি যারা জীবনের চূড়ান্ত সত্য, মহার্ঘ সত্য বুঝে যায়, তারা বড় তাড়াতাড়ি চলে যায়, যেমন গেছেন আবুল হাসান।
যারা একটু দেরিতে বোঝে, তারা একটু দেরি করে যায়।
আর যারা বোঝেই না, তারা যেতেই চায় না!
আবুল হাসান, আমিও বুঝে গেছি- আমার হবে না কিছুই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


