[শহীদুল জহিরকে নিয়ে সামান্য একটি লেখা। হয়তো অনেককিছু লেখার আছে তাঁকে নিয়ে, আপাতত এটুকুই।]
শহীদুল জহিরের লেখা যারা লেখা পছন্দ করেন তাদের অনেককেই আমি জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর লেখা কেন তাদের ভালো লাগে? এবং দেখেছি, প্রশ্নটি বরাবরই তাঁর পাঠকদের জন্য বিব্রতকর। সত্যি কথা বলতে কি, আমার জন্যও। আমি নিজেও সবসময় তাঁর লেখা বুঝে উঠতে পারিনি। মুগ্ধ হয়েছি অথচ নিজের কাছেই এই মুগ্ধতার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারিনি। বিশেষ করে, তাঁর চরিত্রগুলোর অদ্ভুত-প্রায় উদ্ভট-রহস্যময় কাণ্ড-কীর্তি এক ধরনের বিমূঢ় অনুভূতি সৃষ্টি করতো আমার মধ্যে, এখনও করে। এই লেখায় তারই একটা উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করবো।
'কোথায় পাব তারে' গল্পের আব্দুল করিম বলে বেড়ায় যে, সে ময়মনসিং যাচ্ছে। তার এই ঘোষণা মহল্লাবাসীর মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে, কারণ এই 'আইএ পাশ বেকার' যুবকটি 'জীবনে কোথাও যাই নাই এবং যাবে না'। কেন সে ময়মনসিং যেতে চায়? কারণ সেখানে 'আমার বন্দু আছে, বেড়াইবার যামু।' নানা কৌতুককর ঘটনায় গল্প এগিয়ে চলে, এবং এক পর্যায়ে এসে আমরা জানতে পারি তার এই 'বন্দু'র নাম 'শেপালি'। এই নামটি শোনার পর-
'ভুতের গলির লোকদের কাছে তখন আব্দুল করিম এবং তার ময়মনসিং যাওয়ার প্রসঙ্গের চাইতে শেফালি প্রসঙ্গ বড় হয়ে ওঠে, দক্ষিণ মৈশুন্দি এবং ভুতের গলির এই মহল্লার লোকদের দিন উত্তেজনায় ভরে যায়, হালায় প্রেম করে নিহি, তারা বলে। তাদের মনে হয় যে, আব্দুল করিম বেকার বলেই তার পক্ষে এইসব করা সম্ভব; তখন মহল্লার লোকেরা বেকার থেকে প্রেম করাকে ঘৃণা করতে শেখে; তারা ভুলতে পারে না যে, শেফালি একটা মেয়ে এবং আব্দুল করিম বলে যে সে তার বন্ধু! ফলে মহল্লার লোকদের রাতের ঘুম বিঘ্নিত হয়, সারা দিনের কর্মক্লান্ত দেহ নিয়ে তারা বিছানায় জেগে থাকে, জীবনের ব্যর্থতা এবং অপচয় বোধ তাদেরকে গ্রাস করেত উদ্যত হয় এবং তারা কেমন বিষণ্ন হয়ে পড়ে; তাদের মনে হয় যে, বেকার থাকাই তো ভাল আব্দুল করিমের মতো!'
আব্দুল করিম এইসব বলে বটে, কিন্তু তার ময়মনসিং যাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না, নানা কারণ দেখিয়ে বিরত থাকে, কিন্তু যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে মরতে দেয় না সে। কেন?
'আব্দুল আজিজ ব্যাপারির মনে হয় যে, এটা আব্দুল করিমের একটা খেলাই, এবং সে হয়তো নিজের সঙ্গেই খেলে, শেফালি এবং ময়মনসিং বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে সে হয়তো তার জীবনের কর্মহীনতার ভেতর এই এক অবলম্বন গড়ে তোলে।'
অবশেষে সে মহল্লার দুলালকে সঙ্গে নিয়ে রওয়ানা হয়, কিন্তু অচিরেই আমরা বুঝতে পারি, সে ওই মেয়েটির নাম ছাড়া আর কিছুই জানে না। না তার গ্রামের নাম, বা বাবার নাম। যদিও শেফালিদের বাড়িতে যাবার একটা পথনির্দেশ সেখানে দেয়া আছে। সেটি এরকম:
মোছাঃ শেপালি বেগম
ফুলবাইড়া
মৈমনসিং
ঢাকা মহাখালি বাসস্ট্যান
মৈমনসিং শহর, গাঙ্গিনার পাড়
গাঙ্গিনার পাড়- আকুয়া হয়া ফুলবাইড়া বাজার, থানার সামনে
উল্টা দিকে হাঁটলে বড় এড়াইচ গাছের (কড়ই গাছ) সামনে টিএনউ আপিস
টিএনউ আপিস সামনে রাইখা খাড়াইলে, বামদিকের রাস্তা_ নাক বরাবর
হাই স্কুল ছাড়ায়া বরবর সুজা, ধান ক্ষেত, কাঁটা গাছ, লাল মাটি,
বামে মোচর খায়া নদী
আহাইলা/আখাইলা/আখালিয়া নদী
নদী পার হয়া ব্রিজ পিছন দিয়া খাড়াইলে
দুপুর বেলা যেদিকে ছেওয়া পড়ে তার উল্টা দিকে,
ছেওয়া না থাকলে, যেদিকে হাঁটলে পায়ের তলায় আরাম লাগে সেইদিকে
নদীর পাড় বরাবর এক মাইল হাঁটলে দুইটা নাইরকল গাছ
দুই নাইরকল গাছের মইদ্দে খাড়ায়া গ্রামের দিকে তাকাইলে
তিনটা টিনের ঘর দেখা যাইব
তিনটা ঘরের একদম বাম দিকের ঘরের পাশ দিয়া যে রাস্তা গেছে
সেই রাস্তা ধইরা
আগাইলে চাইর দিকে ধান ক্ষেত, পায়ে হাঁটা আইলের রাস্তা
দূরে চাইর দিকে আরো গ্রাম
ক্ষেতে পাকা ধান যেদিকে কাইত হয়া আছে, সেই দিকে,
অথবা, যুদি ধানের দিন না হয়,
যেদিকে বাতাস বয় সেই দিকে গেলে পাঁচটা বাড়ির ভিটা দেখা যাইব,
তিনটা ভিটা সামনে দুইটা পিছনে,
পিছনের দুইটা বাড়ির ডালিম গাছওয়ালা বাড়ি।
এই পথনির্দেশ যত সহজ মনে হয়, আসলে তা নয়। বিশেষ করে 'দুপুর বেলা যেদিকে ছেওয়া পড়ে তার উল্টা দিকে, ছেওয়া না থাকলে, যেদিকে হাঁটলে পায়ের তলায় আরাম লাগে সেইদিকে' অথবা 'ক্ষেতে পাকা ধান যেদিকে কাইত হয়া আছে, সেই দিকে, অথবা, যুদি ধানের দিন না হয়, যেদিকে বাতাস বয় সেই দিকে গেলে'- এইরকম বিভ্রান্তিকর, অদ্ভুত, বিচিত্র পথনির্দেশনা মেনে কিভাবে কাঙ্ক্ষিত নারীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব! বাতাস কি একদিকে বয়? পাকা ধান কি কেবল একদিকেই কাত হয়ে থাকে? কোনদিকে হাঁটলে পায়ের তলায় আরাম লাগে সেটা নির্ণয় করা কি সহজ কাজ? সহজ নয় বলেই বিষয়টি ঝামেলা পাকায়। তারা দিনের এমন এক সময় ওই সাঁকোর ওপর দিয়ে পাড় হয়, যখন 'ছায়া দেহের মায়া ত্যাগ করে দূরে যেতে চায় না' অর্থাৎ মধ্যদুপুর, তখন তার সামনে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি খতিয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। অর্থাৎ কোনদিকে গেলে পায়ের তলায় আরাম লাগবে সেটিই তাকে নির্ণয় করতে হবে এখন! কিন্তু সেটি টের পেতে হলে তো জুতো খুলতে হবে, আর জুতো খুলতে গিয়ে আব্দুল করিম ফিতের উল্টো দিকে দিয়ে টান দিয়ে একটা বিষ গেরো পাকিয়ে ফেলে। অনেক চেষ্টা চরিত্রের পর বিষ গেরো খুলে জুতো খুলতে সক্ষম হলেও, সে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ফিরে আসে।
প্রিয় পাঠক, আপনার কি মনে হয়, এই অদ্ভুত পথনির্দেশ অনুসরণ করে কেউ কোনোদিন কোথাও পৌঁছাতে পারবে? কিন্তু তারচেয়ে বড় প্রশ্ন, একটি প্রায় অসম্ভব পথনির্দেশ অনুসরণ করে এত দূর পর্যন্ত গিয়েও সে অকস্মাৎ ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় কেন? তার এই আচরণের অর্থ কি? আর ফিরেই যদি আসবে তাহলে এতদিন ধরে সে শেফালির কাছে যাওয়ার এই তীব্র আকুলতা প্রকাশ করেছিলো কেন? কেনই বা সত্যি সত্যি শেফালির সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলো? এই গল্পের প্রায় পুরোটা জুড়ে 'ময়মনসিং' বা 'শেপালির' কাছে যাবার জন্যে আব্দুল করিমের যে তীব্র আকুলতা প্রকাশিত হয়েছে, তা আসলে প্রেমের কাছে যাবার জন্য তার আকুলতা। এই প্রেমই তার বেকার-গঞ্জনামুখর জীবনের জন্য এক অবলম্বন। সেই ইঙ্গিতও আছে গল্পে- এটা আব্দুল করিমের একটা খেলাই, এবং সে হয়তো নিজের সঙ্গেই খেলে, শেফালি এবং ময়মনসিং বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে সে হয়তো তার জীবনের কর্মহীনতার ভেতর এই এক অবলম্বন গড়ে তোলে।' শুধু তাই নয়, তার এই প্রেম মহল্লাবাসীর মধ্যেও ঈর্ষার জন্ম দেয়- 'মহল্লার লোকদের রাতের ঘুম বিঘ্নিত হয়, সারা দিনের কর্মক্লান্ত দেহ নিয়ে তারা বিছানায় জেগে থাকে, জীবনের ব্যর্থতা এবং অপচয় বোধ তাদেরকে গ্রাস করেত উদ্যত হয় এবং তারা কেমন বিষণ্ন হয়ে পড়ে; তাদের মনে হয় যে, বেকার থাকাই তো ভাল আব্দুল করিমের মতো!' এ হচ্ছে প্রেমহীন মানুষের বেদনা ও হাহাকারের গল্প। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়- আব্দুল করিম এতদূর পর্যন্ত গিয়েও ফিরে আসে কেন? কারণ, আমার মনে হয়, সে একসময় বুঝে যায়- আসলে ওখানে পৌঁছানো যাবে না। প্রেম তার জন্য নয়। সে হয়তো কোনো এক অনির্ণেয় কারণে সেটা পেতেও চায় না। প্রেম পাওয়া নয়, প্রেমের সন্ধান করাটাই তার কাছে জীবন। শুধু তার কাছেই নয়, হয়তো সবার কাছেই। আমরা সবাই হয়তো একটি প্রেমের সন্ধান করতে করতেই জীবন কাটিয়ে দিই। কেউ হয়তো পায়, কেউ কখনোই পায় না। আব্দুল করিম না পাওয়ার দলে। হয়তো আমিও!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

