চারদিকে মৃত্যুর মিছিল। এত এত মৃত্যু দেখতে দেখতে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। নানাবিধ চিন্তার মধ্যে মৃত্যুচিন্তাটিও নিয়মিতভাবে দখল করে রাখছে আমাকে। মৃত্যুর পর কী হয়, মৃত্যুতেই কী মানব-জীবনের সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটে, সমস্ত অর্জন শেষ হয়ে যায়, সব আয়োজন অর্থহীন হয়ে পড়ে-- এইসব চিন্তা।
মৃত্যুতেই শেষ নয়, মৃত্যুর পর আছে আরেক জীবন-- এক অনন্তকালীন জীবন; সেই জীবনের সব কিছু নির্ধারিত হবে এই জীবনের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে-- এ কথা বলে প্রায় সব ধর্মই তার অনুসারীদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেছে, জীবনের সমস্ত কাজকর্মকে পরবর্তী জীবনের পাথেয় হিসেবে বর্ণনা করে এসবের ওপর অর্থ আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও এই আশ্বাসবাণীতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। নানাভাবে চলেছে জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের চেষ্টা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে-- তেমন কোনো অর্থই খুঁজে পাওয়া যায়নি এসবকিছুর। সবার মনের মতো কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি ওইসব প্রশ্নের। তবু চেষ্টা থেমে থাকেনি, হাজার বছর ধরে মানুষ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছে, এখনও খুঁজছে, ভবিষ্যতেও খুঁজবে।
জীবনানন্দ দাশও হয়তো খুঁজেছিলেন এ প্রশ্নের উত্তর এবং বলেছিলেন 'মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়' -- তাঁর মানুষের মৃত্যু হলে কবিতায়। এবং এ কথা বলে মানুষকে তার ব্যক্তিগত জীবন যাপনের দায় থেকে মুক্তি দিয়ে একে একটি মহাজীবনের অংশ করে দিলেন, জীবনের মহত্তর একটি রূপ প্রত্যক্ষ করালেন, অর্থহীন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থও দান করলেন। কথাগুলো হয়তো ঠিক পরিষ্কার হলো না। মহাজীবন! সেটি আবার কি জিনিস? 'ব্যক্তিগত জীবন যাপনের দায়' ব্যাপারটাই বা কি? প্রশ্ন আরও আছে, কবিতাটির পরের দু-তিনটি পংক্তি পড়লেই প্রশ্নগুলো উঠে আসে --
'মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে'
এসবের অর্থ কি? যে মানুষের মৃত্যু ঘটে গেছে, সে আবার 'চেতনার পরিমাপ নিতে আসে' কীভাবে? তার মানে কি এই যে, তার শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও সে থেকে যায় এক প্রবহমান সত্ত্বা?
উত্তর মিলছে না।
বরং আরেকটু এগোনো যাক কবিতাটি নিয়ে--
'আজকের আগে যেই জীবনের ভিড় জমেছিলো
তা'রা ম'রে গেছে;
প্রতিটি মানুষ তার নিজের স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে
অন্ধকারে হারায়েছে;
তবু তা'রা আজকের আলোর ভিতরে
সঞ্চারিত হ'য়ে উঠে আজকের মানুষের সুরে
যখন প্রেমের কথা বলে
অথবা জ্ঞানের কথা বলে--
অনন্ত যাত্রার কথা মনে হয় সে-সময়
দীপংকর শ্রীজ্ঞানের;
চলেছে-- চলেছে--'
এই পংক্তিগুলোই বলে দেয় যে, মরে যাওয়া মানে তিনি ধ্বংস বোঝান না, অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানে চিরতরে হারিয়ে যাওয়াও বোঝান না। সেটা হলে সেইসব মরে যাওয়া হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা আজকের আলোর ভিতরে সঞ্চারিত হয়ে আজকের মানুষের সুরে প্রেম অথবা জ্ঞানের কথা বলতো না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে এই যে, যাদের শারীরিক মৃত্যু ঘটে গেছে তারাও বর্তমানে প্রবহমান জীবনেরই অংশ রয়ে গেছে, কিংবা আজকে যারা জীবন যাপন করছে তারা যখন শারীরিক মৃত্যুকে বরণ করবে তখনও তারা প্রবহমান জীবনেরই অংশ রয়ে যাবে। অর্থাৎ জীবনের শেষ নেই, শেষ হয় না, মৃত্যু মানেই জীবনের পরিসমাপ্তি নয়, প্রকৃতপক্ষে এ এক অনন্ত যাত্রা।
হয়তো এ কথাটি ভেবেই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেছিলেন (মামুন হুসাইনের লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি)-- 'ওয়ান মাস্ট হ্যাভ প্রিপারেশন ফর ডেথ, সো দ্যাট ডেথ ইজ অ্যা হ্যাপি ওয়ান' বা 'লাইফ ইজ টু বি লিভড টু ইটস ফুলেস্ট সো দ্যাট ডেথ ইজ জাস্ট অ্যানাদার চ্যাপ্টার। মৃত্যুর মজা আছে হে আলাদা, যখন তুমি মরবে বা ধরো কই মাছ খাওয়ার পরেও পটল তুলতে বাধ্য হলে, দেখবে স্মৃতি উড়ছে বাতাসে, ... এ্যান্ড অল আওয়ার মেমোরিস, অল আওয়ার ওয়ার্কস এ্যান্ড অল আওয়ার ডিডস উইল কনটিনু ইন আদার্স। '-- এভাবে ভেবে নিলে জীবন ব্যাপারটা অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমাদের সকল অর্জন, স্মৃতি ও কর্ম যদি অন্যদের মধ্যেও প্রবাহিত হয় এবং বেঁচে থাকে তাহলে নিজের জীবনের পরিসমাপ্তি নিয়ে আর হাহাকার কিসের?
কিন্তু মুশকিল হলো-- চাইলেই এরকম ভেবে নেয়া যায় না। আর আমাদের অস্তিত্বের সংকটটি আসলে সেখানেই। জীবন তো একটিই, মৃত্যুতেই যার সব শেষ। জীবনকে এভাবে দেখা হয় বলে জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের নানামাত্রিক চেষ্টা চলে এবং সবক্ষেত্রেই ফলাফল হয় প্রায় একই-- মৃত্যুই যার শেষ কথা, সে জীবন নিশ্চিতভাবেই অর্থহীন। মানুষের এই চিন্তা খুব ফেলে দেবার মতোও নয়-- রবীন্দ্রনাথের নাম আমরা কোটিবার উচ্চারণ করি, সে তো আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের তাতে কী আসে যায়?
আগেই বলেছি-- পৃথিবীতে প্রচলিত ধর্মসমূহ মৃত্যুর পরও একটি ভিন্নতর জীবনের লোভ দেখিয়েছে, সে জীবন পাপের শাস্তি অথবা পূণ্যের পুরস্কারের জীবন। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় নব্বইভাগ মানুষ কোনো না কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হয়েও, ধর্মকথিত পারিলৌকিক জীবনের প্রতি বিশ্বাস রেখেও ইহলৌকিক জীবন নিয়ে-- বলা ভালো, এই পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব নিয়ে-- অসুখী বোধ করে কেন, কেন অস্তিত্বের অর্থ অনুসন্ধান করতে চায়? তার কারণ হয়তো এই যে, মানুষ অবচেতনভাবে অনুভব করে-- এই সমস্ত ধ্যান-ধারণা তার ওপর চাপিয়ে দেয়া, এগুলো কিছুই সে নিজে বেছে নেয়নি। এমনকি তার নিজের জীবনটিও তার নিজের বেছে নেয়া নয়। (মিলান কুন্ডেরা যেমন বলেছিলেন-- আমরা আদৌ জন্মাতে চাই কী না সেটা জিজ্ঞেস না করেই আমাদের জন্ম দেয়া হয়েছে, যে শরীরে আমাদের আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে সেটা আমরা নিজেরা বেছে নিইনি, এবং আমাদের জন্য অবধারিত করে রাখা হয়েছে মৃত্যু)। প্রতিটি জীবন তাই এই চাপিয়ে দেয়া মূল্যবোধ থেকে মুক্তি চায়, প্রতিটি জীবনই স্বাধীন হতে চায়। অথচ সে আবিষ্কার করে-- জন্ম থেকেই সে শৃঙ্খলিত। ধর্ম-সমাজ-জাতীয়তার পরিচয়চিহ্ন লেপ্টে দিয়ে প্রথমেই তাকে শৃঙ্খলিত করে ফেলা হয়। অথচ সে শৃঙ্খলিত হতে চায় না, এই বিপুল মহাবিশ্বে সে তার ক্ষুদ্র অস্তিত্বের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চালায়। কে আমি, কেন আমি, কোত্থেকে এসেছি, কেন এসেছি, কোথায় যাবো-- এইসব প্রশ্নের উত্তর তাকে কেউ দেয় না, এমনকি ধর্মবর্ণিত উত্তরও বিশ্বাসীদের কাছে মনপূত হয় না, সে নিজেও কোনোভাবেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না। উত্তর না নিয়েই তাকে মরে যেতে হয়। মানুষ তাই শেষ পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের দায় থেকে মুক্তি পায় না।
কখনো কখনো আমি মৃত্যুর পক্ষেও দাঁড়াই। মনে হয়, মানুষের জীবন যতো কালারফুল মৃত্যুও ততো কালারফুল। আসলে জীবনকে নিয়ে যে এত এত আয়োজন, সেটা ওই মৃত্যুটাকে কালারফুল করে তোলার জন্যই। আমরা বুঝে হোক, না বুঝে হোক মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। এমন সব কাজকর্ম করতে থাকি, যেন, মৃত্যুর পর একটা আলোড়ন পড়ে। কতো লোকই তো রোজ মরে যাচ্ছে। ধ্যারধ্যারিয়ে মরা যাকে বলে আর কী! সেগুলো কোনো সাড়াই ফেলে না কারো মধ্যে। কিন্তু কারো কারো মৃত্যুর পর সাড়া পড়ে যায়। নিজের পরিবার-পরিজনের বাইরে সেই সাড়া ছড়িয়ে পড়ে সমাজের মানুষের মধ্যে। কখনো কখনো দেশজুড়ে। কখনো বা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। কখনো বা একটি মৃত্যু সারা পৃথিবীকে বিমূঢ় ও স্তব্ধ করে দেয়। সেটা ডায়নার মৃত্যুই হোক আর রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুই হোক। কখনো কখনো আমার এমনও মনে হয় যে, মৃত্যু জীবনের অদেখা রঙগুলোকে উজ্জ্বল করে তোলে। আমাদের চোখে পড়ে, এই লোকটির এই এই গুণ বা দোষ ছিলো। জীবন অর্থহীন জেনেও যে আমরা জীবন যাপন করে যাই, নানারকম কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করি তার কারণ তো আসলে মৃত্যুর প্রতি সম্মান জানানো, যেন সে আমাদের এইসব কাজকে যথাসাধ্য উজ্জ্বল করে সকলের সামনে মূর্ত করে তুলতে পারে।
কিন্তু মৃত্যু নিয়ে যতোই সুন্দর-মনোহর কথাবার্তাই বলি না কেন, আসলে মৃত্যু মানে বর্ণিল জীবন-নাট্যের ওপর কালো যবনিকাপাত। মৃত্যুতেই আমাদের জীবনের সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটে, সমস্ত অর্জন শেষ হয়ে যায়, সব আয়োজন অর্থহীন হয়ে পড়ে। আমরা তাই আমাদের ক্ষুদ্র জীবন নিয়ে বেদনাবোধ করি, মরে যেতে হবে-- এ কথা ভাবলে কষ্টে আমাদের বুক ভরে যায়। মৃত্যুকে নিয়ে এত হাহাকার আমাদের-- কারণ, আমরা জানি, আমাদের সমস্ত কীর্তি ও কর্ম, সমস্ত সাফল্য ও অর্জন, সমস্ত ব্যর্থতা ও দায়ভার, সকল সুখ ও দুঃখ, সকল আনন্দ ও বেদনা রেখে যেতে হয় মৃত্যু নামক কালো যবনিকার এপারে, আর ওপারে কী আছে সে সম্বন্ধে আমরা কিছুই জানি না!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

