somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রেম সম্বন্ধে শেষ কথা কে-ই বা বলতে পারে!

১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাঝে মাঝে কতোকিছু নিয়ে যে লিখতে ইচ্ছে করে, হয়ে ওঠে না। পর্বতপ্রমাণ আলস্যে আমার আঙুলগুলো পর্যন্ত অবশ হয়ে থাকে, কিছুতেই সেই অবসাদ ও আলস্য কাটিয়ে উঠতে পারি না। অনেক লেখা পড়ে মুগ্ধ হই, মন্তব্য করার ইচ্ছে জাগে - কিন্তু ওই একই কারণে তা-ও সবসময় হয়ে ওঠে না।

ফলে ব্লগে আমার সক্রিয়তা সেই প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেল এতদিন পরও। গত কয়েক মাসে আমি যতোটুকু পাঠক হয়ে উঠতে পেরেছি, ততোটুকু 'ব্লগার' হয়ে উঠতে পারিনি। ['ব্লগার' শব্দটি আমার পছন্দ নয় যদিও, কিন্তু বিকল্প কোনো শব্দও খুঁজে পাচ্ছি না। আমার নিজের কাছে 'ব্লগার' মানে শুধুই লেখক নন, শুধুই পাঠকও নন, একই সঙ্গে লেখক ও পাঠক এবং একজন ইন্টারঅ্যাক্টিভ ব্যক্তি।] আর ব্লগের আনন্দদায়ক দিকটাই হলো লেখক-পাঠক মিথস্ক্রিয়া বা মতবিনিময়। কিন্তু সেই কাজটি খুব একটা করে ওঠা হচ্ছে না আমার। অনেক লেখা পড়ছি, কিন্তু অনুভূতিগুলো জানানো হচ্ছে না। ব্লগে আমার নিজের লেখার পরিমাণও হাতে গোনা। আলস্য কাটিয়ে নিয়মিত হওয়া হচ্ছে না কিছুতেই। একবার ভেবেছিলাম, আমার পড়া প্রিয় গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ, বা প্রিয় চলচ্চিত্র বা মঞ্চনাটক নিয়ে আমার ভালোলাগাটা শেয়ার করবো আপনাদের সঙ্গে। দু-একবার করেছিও, কিন্তু সেটিও কন্টিনিউ করা হয়নি।

আজকেও তেমন ইচ্ছে নিয়ে বসেছিলাম, কিন্তু, এখন আর লিখতে ইচ্ছে করছে না! :(

কিন্তু আলস্যকে আজ হটিয়ে দিতেই হবে। আসলে তো, জীবনকে যে যেভাবে দেখে সেভাবেই নির্মাণ করে বেঁচে থাকবার কৌশল। রাহাত খানের 'ভাল মন্দের টাকা' গল্পের রহিমদাদ হয়তো জীবনকে নিয়েছিল এক নিষ্ঠুর কৌতুক হিসেবে। রাহাত খান আমাদের এখানে কখনোই খুব গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হননি। যদিও তাঁর 'অমল ধবল চাকরি'র মতো অসাধারণ উপন্যাস আছে; 'চুড়ি' 'ইমান আলীর মৃত্যু' বা 'আমাদের বিষবৃক্ষ'র মতো বিখ্যাত সব গল্প আছে। সেই তুলনায় 'ভাল মন্দের টাকা' গল্পটি তেমন বিখ্যাত নয়। অথচ এটিকে আমার কাছে খুবই শক্তিশালী গল্প মনে হয়। এই গল্পের 'নায়ক' রহিমদাদ হয়তো জীবনকে নিয়েছিল এক নিষ্ঠুর কৌতুক হিসেবে - সে তো আগেই বলেছি। কোনো বিষয়েই যেন কোনো মোহ নেই, আগ্রহ নেই, উচ্ছ্বাস নেই তার। এক অদ্ভুত নিরাসক্তি আর নিস্পৃহতা তাকে ঘিরে থাকে, আর এগুলো নিয়ে সে এক বিচিত্র কৌতুকে মেতে ওঠে সে। 'পর্নোগ্রাফি' আর 'থ্রিলার' লিখে জীবনধারণ করে সে, কিন্তু এতেও যেন তার বিশেষ কোনো অংশগ্রহণ নেই। বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই লেখা আর এজন্যই বিচিত্র সব মানুষের সংস্পর্শে আসা। 'হীরু মিয়া', 'আমিনা' কিংবা 'হাজী সাহেবের' মতো লোকজনের সঙ্গে তার মেলামেশা স্রেফ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে - তাদের আচার-আচরণ তার ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে না। হীরু মিয়া অবলীলায় তার লেখা পর্নোগ্রাফি 'কিছু হয় নাই' বলে মুখের ওপর ফেরত দিয়ে গেলেও তার তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, সে বরং আমিনার সঙ্গে গল্প জমাতে চেষ্টা করে। হেনাবুর সংসার ভাঙার সংবাদ শুনে সে অবসন্নতা কাটিয়ে 'ঠিক আগের মতো জেগে উঠল'। বন্ধু সাখাওয়াত প্রায় ভিখারি সদৃশ জীবনযাপন করে - রহিমদাদের এতেও কোনো বিকার নেই। রায়হানার পাশে শুয়েও নিজেকে অনুত্তেজিতই দেখতে পায় সে। যেন এক জীবন-মৃত মানুষ সে - অনুভূতিশূন্য, প্রতিক্রিয়াহীন। বন্ধু জামিল মৃতু্যপথযাত্রী, অথচ এ নিয়ে তার কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। আছে দুশ্চিন্তা - জামিল মরে গেলে কে তাকে থ্রিলারের রসদ জোগাবে! জামিলের আসন্ন মৃত্যু নিয়েও সে এক বিস্ময়কর কৌতুকে মেতে ওঠে। যেন বন্ধুর মৃত্যুও একটি ঠাট্টার বিষয়।

রহিমদাদের এই আচরণ আমাদের চমকে দিয়ে যায়। এমন নিস্পৃহ, নিরাসক্ত আচরণের ব্যাখ্যা কি? সে কি কোনো কারণে হারিয়ে ফেলেছে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা, নাকি জীবনকে অতিমাত্রায় ক্যাজুয়ালি নিয়েছে সে? অর্থহীন আর বৈশিষ্ট্যহীন এই জীবনের জন্য এত আয়োজন কি হাস্যকর মনে হয় তার কাছে? জামিলের সঙ্গে কথোপকথনে তার নিস্পৃহ কৌতুকপ্রবণ আচরণটি ফুটে ওঠে -

''জামিল মরে যাওয়ার আগে তার সম্পত্তির কাকে কি দিয়ে যাবে সেই কথা হচ্ছিল। রহিমদাদ বলল, দোস্ত, তুই লেখাপড়া করে এই তিনতলাটা আমাকে দিয়ে যা না।

পাগল নাকি। জামিল বলল। তুই আমার কে যে বাড়িটা দিয়ে যাব?

রহিমদাদ বলে, কেন আমি তো তোর ফ্রেন্ড। দিয়ে যা না বাড়িটা।

জামিল বলে, না। আমি তোকে লেখার টেবিল আর বইগুলো দিয়ে যাব।

আর জামাকাপড়? তোর পার্কার পেনটা? চেনওয়ালা সোয়েটারটা?

জামিল হাসতে হাসতে বলেঃ আর কিছু না। লেখার টেবিল আর বইগুলো, ব্যস।

রহিমদাদ দুঃখিত হয়ে বলেঃ ঠিক আছে তাই দিস। কিন্তু তুই মরে গেলে আমার সিরিজটা মার খেয়ে যাবে।''

চমকে উঠতে হয়, এ কি কোনো মৃত্যুপথযাত্রী বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন? এত নিস্পৃহতা, এমন নিষ্ঠুর কৌতুক কি করে সম্ভব একজন অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে? রহিমদাদ বাংলা গল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যে এক বিস্ময়কর চরিত্র। জীবনকে এত ক্যাজুয়ালি, এত ঠাট্টা-মশকরা, কৌতুক-বিদ্রূপের বস্তু হিসেবে দেখাটা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। রহিমদাদ তাই দেখেছিল। এ যেন এক ঐশ্বরিক নিরাসক্তি, মানুষের মধ্যে এর দেখা মেলা ভার!

পাঠককে আবারও চমকাতে হয় জামিলের মৃতু্যসংবাদ শোনার পর রহিমদাদ ও রায়হানার আচরণ দেখে। মৃত্যুসংবাদ শুনে -

''রহিমদাদ : মারা গেছে। দুপুরবেলা? ইস!

রায়হানরা : দুপুর একটা পঁচিশে মারা গেল। খুব শান্তভাবে মরল। একটাও কথা বলেনি। কারো দিকে তাকায়নি।

রহিমদাদ : যাক, জামিল তাহলে মারা গেল। উঃ কদ্দিন থেকে মারা যাওয়ার কথা। জামিল নিজেই টায়ার্ড হয়ে পড়েছিল।''

এখানেই মৃত্যুর আলোচনা শেষ, অতঃপর দুজনেই প্রবেশ করে জীবনের আলোচনায়। যেন জামিলের মৃত্যু বিশেষ কোনো ঘটনা নয় তাদের কাছে, যদিও রায়হানা জামিলের একদা প্রেমিকা, রহিমদাদ বন্ধু। আবারও দেখতে পাই জামিলকে সমাধিস্থ করে এসে -

''বাসায় নামিয়ে দিয়ে রায়হানা বললো, তুমি কবিতা লিখেছিলে?

রহিমদাদ বলেঃ নাহ।

রায়হানা বলেঃ তুমি পারবেও না।

রহিমদাদ বলেঃ তাই। আমি থ্রিলারও লিখতে পারছি না আর।...

রায়হানার গাড়িটা চলে গেলে রহিমদাদ কিছুক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল। পরে নিজেকে নিজে বলল : হয়তো আমি একটা কবিতা লিখতে চাই। এছাড়া উপায় নেই আমার। আমাকে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপায় নেই আমার।''

গল্পের একেবারে শেষ পঙক্তি নতুন করে ভাবিয়ে তোলে পাঠককে - যেন এতক্ষণে রহিমদাদের মধ্যে খানিকটা মানবিক বোধের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে আর থ্রিলার লিখতে পারছে না। একটি কবিতা লিখতে চায় সে, কারণ, 'এছাড়া উপায় নেই' তার। কেন? কে তাকে নষ্ট করেছে? রায়হানা? যে আশ্চর্য নিরাসক্তি নিয়ে সে বরাবর জীবনকে দেখে এসেছে, থ্রিলার লিখেছে, পর্নোগ্রাফি লিখেছে, একটি কবিতা লেখার প্রেরণা বা প্রেম - যা রায়হানা কতৃক প্রদত্ত - কি সেই নিরাসক্তিকে ধ্বসিয়ে দিলো?

প্রেম কি তাহলে ঐশ্বরিক নিরাসক্তি আর নিস্পৃহতাকেও ধ্বসিয়ে দিয়ে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয় মানবিক জীবনের পক্ষে? হয়তো! প্রেম থাকা মানে হয়তো অবসাদ থেকে মুক্তি, ক্লান্তি থেকে মুক্তি, নিরাসক্তি আর নিস্পৃহতা থেকে মুক্তি। কিংবা হয়তো এর কোনোটাই নয়, প্রেম সম্বন্ধে শেষ কথা কে-ই বা বলতে পারে!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৩৬
২২টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×