[
--------------------------------------------------------------------------------
শিরকের ভয়াবহতা
মাওঃ মোঃ আবুল বশর
ভুমিকা: আমরা মুসলমান ইসলাম আমাদের ধর্ম। এ জন্য আমরা মনে মনে যেমন আনন্দ বোধ করি, তেমনি তা আমাদের গৌরবের বিষয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বড় দুঃখের বিষয় এই যে, ইসলামরে হুকুম-আহকাম আমরা তেমন একটা জানিনা এবং জানার চেষ্টাও করিনা। ইসলামরে ব্যাপারে আমাদের এ আচরণ মোটেই গৌরবের বিষয় নয়। সে জন্য কালেমায় বিশ্বাসী প্রত্যেক নর-নারীকে ইসলাম সম্বন্ধে জানতে হবে, যেমনিভাবে আলো ও অন্ধকারকে জানি। অন্ধকার সম্পর্কে যদি আমাদের ধারণা না থাকতো তাহলে আলোর কদর বুঝতাম না। তেমনি আলোকে জানতে হলে, অন্ধকারকে জানতে হবে। মিষ্টি কি জিনিস সেটা বুঝতাম না যদি টকের স্বাদ না জানতাম। টক খাই বলেই তো মিষ্টির কদর বুঝি। সুতরাং ইসলামকে বুঝার জন্য ইসলামের বিপরীত কুফর, শিরক ও বিদ’আত সম্বন্ধে জানতে হবে। সে চেতনা নিয়েই সংক্ষিপ্তভাবে বাংলা ভাষা-ভাষী ভাই-বোনদের উদ্দেশ্যে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
* শিরকের অর্থ: শিরক অর্থ অংশীদার স্থাপন করা। আর পরিভাষায় শিরক অর্থ: ঈমান কিংবা ইবাদতে অংশীদারকরণ, বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা. কুরবানী করা, মান্নত করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করা, অন্য কারো কাছ থেকে কোন কিছু পাওয়ার আশা করা এক কথায় জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া বিধান পরিহার করে মানব রচিত মতাদর্শ গ্রহণ করা ইত্যাদি।
গুনাহ সমূহের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্যতম হচ্ছে শিরক। কেননা শিরক হচ্ছে সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার উলুহিয়্যাতের বৈশিষ্ট ও গুনাহের উপমা ও তুলনা করা, অতএব যারা আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরীক করল, সে আল্লাহকে অন্যের সমকক্ষহওয়ার তুলনা করল। আর এটাই হচ্ছে বড় জুলুম। এ সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:
“নিশ্চয় শিরক হচ্ছে বড় জুলুম।” (সূরা লুকমান: ১৩)
* যে ব্যক্তি শিরক হতে তাওবা করবে না, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। সূরা নিসার ৪৮ নং আয়াতে বলেন: “ নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না, উহা ব্যতীত অন্য যে কোন াপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।
* আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন; “যে ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে শিরক করবে তার প্রতি জান্নাত হারাম করে দিবেন এবং সে চিরস্থায়ী জাহান্নামে অবস্থান করবে। (সূরা মায়েদা: ৭২)
* শিরক সমস্ত প্রকার নেক আমল নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ বলেন; যদি তারা শিরক করতো তাদের কাজ-কর্ম ব্যর্থ হয়ে যেত। (সূরা আন’আম: ৯৯)
* শিরক হচ্ছে কবীরা গুনাহ গুলির মধ্যে সবটেয়ে বড়। রাসূল (সাঃ) বলেন; আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বগ গুনাহ সম্পর্কে সংবাদ দিব না? আমরা (সাহাবাগণ) বললাম, নিশ্চয় হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেন; আল্লাহর সাথে শরীক করা ও পিতা-মাতার অবাধ্যতা (বুখারী ও মুসলিম)
* নিশ্চয় শিরক হচ্ছে এমন জিনিস যা নেকীকে ত্র“টিযুক্ত করে দেয়। আল্লাহ পাক সর্ব প্রকার খুত ও ত্র“টি থেকে পবিত্র যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করল সে আল্লাহর সাথে চরম শত্র“তা এবং সীমাহীন বিরুদ্ধাচরন করল।
* শিরক দু’প্রকার: ১। বড় শিরক ২। ছোট শিরক
* বড় শিরক: যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়, তাওবা না করে মারা গেলে চিরস্থায়ী জাহান্নামে অবস্থান করবে। বড় শিরক হলো: যে কোন ইবাদত আল্লাহ ছাড়া অন্যের জন্য হয়। যেমন আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আহ্বান করা। শয়তান, জিন ও কবরের কাছে সাহায্য চাওয়া। সাওয়াবের আশায় আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা। কবর জিন ও শয়তানের নামে মান্নত করা। মৃত ব্যক্তিকে ভয় করা যে মৃত ব্যক্তি তাকে কোন প্রকার ক্ষতি কিংবা রোগে ফেলতে পারে। দরগাহ এবং কবরের কাছে অভাব বা চাহিদা পূরণের এবং দুঃখ দূর হওয়ার আশা পোষণ করা।
এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “এবং তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডেকো না, যা তোমার লাভ ও ক্ষতি সাধন করতে পারে না। আর যদি তাই কর তা হলে তুমি অত্যাচারীদের অর্ন্তগত। (সূরা ইউনুস: ১০৬)
* ছোট শিরক: ছোট শিরককারী ব্যক্তিকে দ্বীন ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, তবে ছোট শিরক আস্তে আস্তে বড় শিরকের দিকে নিয়ে যায়। ছোট শিরক রিয়া বা লোক দেখানো আমল।
* ছোট শিরক দু’ভাগে বিভক্ত:
(ক) প্রকাশ্য শিরক: এটা আবার দু’ভাবে হয়। কথার মাধ্যমে হয় এবং কাজের মাধ্যমে হয়।
* কথার মাধ্যমে; যেমন- আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা। রাসূল (সাঃ) বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করল সে অবশ্যই কুফরী বা শিরক করল। (তিরমিযী) অর্থাৎ এ কথা বলা যে, আল্লাহ আর অমুক ব্যক্তি যদি না হতো বা এমন বলা যে “আল্লাহ আর আপনি যা চেয়েছেন” এ রকম বলা ঠিক নয়।
রাসূল (সাঃ) বলেন: তোমরা এরূপ বলো না, যে আল্লাহ যা চেয়েছেন আর অমুক ব্যক্তি যা চেয়েছে, বরং তোমরা বলবে আল্লাহ যা চেয়েছেন অতপর অমুক ব্যক্তি যা চেয়েছে। (মুসনাদে আহমদ)
* কাজের মধ্যে শিরক: যেমন বিপদ দূর করার জন্য আংটি বা সুচ পরা। নজর লাগার ভয়ে তাবিজ ঝুলিয়ে রাখা।
রাসূল (সাঃ) বলেছেন; যে ব্যক্তি তাবিজ লটকালো সে শিরক করল। (মুসনাদে আহমদ) যদি এ বিশ্বাস রাখে যে আংটি, সুচ, কড়ি, তাবিজ এ সব বস্তু বিপদ দূর করার মাধ্যম মাত্র, তাহলে ছোট শিরক হবে। আর যদি এ বিশ্বাস রাখে যে, এ সমস্ত বস্তু নিজেই বিপদ দূর করতে পারে, তা হলে তা বড় শিরক হবে।
(খ) গোপন শিরক: যা নিয়ত ও ইচ্ছার মাধ্যমে হয়। যেমন- লোক দেখানো বা সুনাম অর্জনের জন্য কাজ করা। কোন আমলের মধ্যে লোক দেখানো উদ্দেশ্য হলে তা বাতিল হয়ে যায়। যেমন আল্লাহর বাণী: “যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাত লাভে আশা রাখে, সে যেন নেক আমল করে এবং তার রবের ইবাদত করতে অন্য কাউকে শরীক না করে। (সূরা ক্বাহাফ: ১১০)
মূল কথা হলো- যে ব্যক্তি তার আমলের মাধ্যমে আল্লাহ ছাড়া অন্যের সন্তুষ্টির ইচ্ছা করে, তা হলে সে তার নিয়তে বা ইচ্ছায় শিরক করল। মনে রাখতে হবে আমল কবুল হওয়ার তিনটি শর্ত আছে; ১) আল্লাহ ও তাঁর একাত্ববাদের উপর ঈমান আনা। ২) ইখলাস অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল করা। ৩) রাসূলের তরীকা অনুযায়ী আমল করা।
নিুে শিরকী কাজসমূহ সংক্ষিপ্তভাবে পেশ করা হলো:
১. কবরে মৃত ওলীদের নিকট বিপদ-আপদ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করা। ২. কবরে বাতি-চেরাগ দেয়ার মান্নত করা। ৩. আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নামে জবাই করা। ৪. যাদু বিদ্যা শিক্ষা করা। ৫. গনক ও জোতিষি, যেমন বালুর মধ্যে রেখা টানা, কড়ি চালা, বাটি চালা, হস্ত রেখা দেখা ইত্যাদি। ৬. তুলা রাশি, ভাগ্য রাশির উপর ভরসা করা শিরকের অর্ন্তভূক্ত। ৭. তাবিজ-কবজ, মাদুলী, কড়ি ঝুলানো। ৮. রিয়াও শিরকের অর্ন্তভূক্ত। ৯. পাখি উড়িয়ে শুভ লক্ষণ ধারণা করা। ১০. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা। ১১. আল্লাহর দেয়া বিধান পরিত্যাগ করে মানব রচিত মতবাদ গ্রহণ করা ইত্যাদি।
আল্লাহ আমাদেরকে শিরক সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান দান করুন, আর শিরকী কর্ম-কান্ড হতে হেফাযত করুন। আমীন ॥
বিদ্আতের ভয়াবহ পরিনতি
মাওলানা মোঃ আবুল বশর
বিদআতের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে এমন নব আবিস্কার যার পূর্বে কোন প্রকার দৃষ্টান্ত নেই । এ কথার প্রমানে রয়েছে আল্লাহ তায়ালার বানী ঃ
"বাদিউস্ সামাওয়াতে ওলআরদে" বাকারা ১১৭ অর্থ ঃ তিনি (আল্লাহ) আকাশ মন্ডলী পৃথিবীর স্রষ্টা । অর্থাৎ আল্লাহ আসমান ও জমিনের পূর্ব কোন দৃষ্টান্ত ব্যতিরেকেই সৃষ্টি করেছেন । এ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, বিদআত হচ্ছে নব আবি¯কৃত জিনিস ।
শরীয়তের পরিভাষায় ’বিদআত’ হচ্ছে দ্বীনে বা শরীয়তে এমন নতুন জিনিস তৈরী করা যা পূর্বে ছিল না । সে আবিস্কারই সুন্নতের বিপরীত আর সেটা হল বিদআত । অর্থাৎ দ্বীনের মধ্যে বিদআত হচ্ছে এমন কাজ (বা আমল) যার প্রতি শরীয়ত সমর্থিত কোন দলিল বা প্রমান নেই ।
আল্লাহ, তায়ালা আমাদের যে জীবন বিধান দিয়েছে, সেটাই ইসলাম বা দ্বীন । এ দ্বীন ইসলাম আল্লাহর রাসুল (সাঃ) প্রচার করে গিয়েছেন, তার মধ্যে কোন খালি নেই যে তাতে একটু বাড়ানো বা সংযোগ করা যাবে অথবা আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এমন কোন আয়ত গোপন করে গেছেন, যা প্রচার করা হয়নি । এ রকম যদি কেউ ধারনা করে অথবা কেউ যদি বলে দ্বীন অপূর্ন তা হলে সে মুসলমান থাকবে না ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন ঃ
" আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ন করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সমূহ পূর্ন করে দিলাম আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে মনোনীত করে দিলাম (আল মায়েদাত) ।
এ আয়াত হতে বুঝা যায় আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সাঃ) এর মাধ্যমে দ্বীন পুরা করেছেন । সুতরাং যদি কেউ মনে করে রাসুল (সাঃ) দ্বীনের মধ্যে কিছু কিছু গোপন করে গেছেন পরবর্তী কোন আলেম, কোন পীর বা বুজুর্গ তা প্রকাশ করে দ্বীনের পরিপূর্নতা আনলেন এ রকম ভাবলে সে মুসলমান থাকবে না । নবী করিম (সাঃ) এরশাদ করেন ঃ
"যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু সংযুক্ত করবে যা তার অংশ নয় তা পরিতাজ্য (বোখারী মুসলিম) । অন্য বর্ণনায় আছে ঃ যে এমন আমল করবে যা আমাদের দ্বীনের মধ্যে নেই তা পরিতাজ্য (মুসলিম) ।
রাসুল (সাঃ) এর হাদীস থেকে আমরা বুঝলাম শরীয়তের যে বিষয়ে রাসুল (সাঃ) এর কোন নির্দেশ নেই, সাহাবাদের কোন আমল নেই বা সাহাবাদের যুগে ছিল না, তাবেঈনদের যুগেও ছিল না, তা যদি নতুন করে আমাদের মাঝে আসে শরীয়তে বা দ্বীনে তা হলে তা পরিতাজ্য এবং যদি কেউ তা গ্রহন করে তাহলে তা হবে বিদআত ।
বিদআত দুই প্রকার ঃ
প্রথমত ঃ দুনিয়ার বিষয় নব আবিস্কার । যেমন মাইক, ঘড়ি, ফ্যানের হাওয়া, ট্রাক্টারের চাষ, জামা স্ত্রি করা, খাটে ঘুমানো নিত্য নতুন বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ও উদ্ভাবন ইত্যাদি এ সমস্ত জায়েয এগুলো গ্রহন করা বৈধ । কারণ দুনিয়ার বিষয় নব আবিস্কারের মূলনীতি হল জায়েয । এগুলো বিদআত নয় , কারণ এগুলি দ্বীন বা শরীয়ত নয় । মনে রাখতে হবে দুনিয়ার বিষয় অদি কেউ কোন কিছু আবিস্কার করে তা বিদআত নয় । সুতরাং আল্লাহর রাসুলের যুগে ফ্যানের হাওয়া, রেডিও, টেপরেকর্ড ছিল না এসব প্রশ‘ন চলবে না ।
দ্বিতীয়ত ঃ দ্বীন ইসলামের মধ্যে নব আবিস্কার আর এ প্রকার নব আবিস্কার হারাম বা অবৈধ । কারণ দ্বীন ইসলামের মূলনীতি হল দলিল ভিত্তিক । যা কুরআন ও সুন্নার প্রমানের প্রতি নির্ভরশীল । যেমন নবী করিম (সাঃ) বলেছেন ঃ যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু সংযুক্ত করবে যা তার অংশ নয় তা পরিতাজ্য (বোখারী এবং মুসলিম) ।
বিদআত বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঃ
(১) বিদআতে মুকরাফ্ফেরা ঃ কাফির পরিনতকারী বিদআত, যে বিদআত করলে মানুষ কাফের হয়ে যায় । যেমন মৃত অথবা অনুপস্থিতদের আহবান করা এবং তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা অর্থাৎ এরূপ বলা যে ’হে আমার অমুক নেতা/পরীর আমাকে সাহায্য কর’ অথবা দরগাহ্ বা মাজারে গিয়ে সন্তান চাওয়া, সাহায্য চাওয়া, কবর বা দরগাহে মানত করা ইত্যাদি ।
(২) বিদআতে গায়রে মুকাফ্ফেরা ঃ অবৈধ বা হারামকৃত বিদআত অর্থাৎ যে বিদআত করলে মানুষ কাফর হয় না, গুনাহ্ হয় তাকে বিদআনে গায়রে মুকাফফেরা বলে । যেমন ঃ মৃতদের মাধ্যমে বানিয়ে উছিলা গ্রহন করা, কবরের উপর সৌধ নির্মান করা, ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থাৎ নবী দিবস পালন করা (এ রকম স¥রণ সাহাবী ও তাবেয়ী তাবেতাবেযীদের যুগে ছিল না) অথবা এমন পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত করা যা শরীয়তের বিধান বর্হিভূত নিয়ম । যেমন ঃ বিনাদলিলে নতুন নামায উদ্ভাবন করা যার আদৌ কোন শরীয়তে দলিল প্রমান নেই ।
(৩) মাকরূহ বা অপছন্দনীয় বিদয়াত ঃ যেমন জুমআর নামাযের পর যোহরের নামায আদায় করা, আযানের পর উচ্চস¦রে দরুদ ও সালাম পাঠ করা ।
(৪) নিয়তের উপর বিদআত ঃ যেমন এক ব্যক্তি যায়েদ মিয়া সকালে বড় একটা বট গেছের নিচে এ পাশ ও পাশ দৌড়াচ্ছে, ২য় ব্যক্তি করিম মিয়া ঠিক একই কাজ করছে, তৃতীয় ব্যক্তি রফিক মিয়া ও চতূর্থ ব্যক্তি খালেদ মিয়া ঠিক একই কাজ করছে । এখন আপনি ১ম ব্যক্তি যায়েদ মিয়াকে জিজ্ঞেস করেন যে, ভাই আপনি সকাল বেলায় বট গাছের নিচে এপাশ ওপাশ দৌড়াচ্ছেন কেন ? সে জবাব দিল রাতে আমার একটা জিনিস পড়ে গিয়েছিল তা খোঁজ করছি, তাতে আপনি বললেন বেশ ভাল । ২য় ব্যক্তি জবাব দিল যে আমি একটু ব্যায়াম করছি, আপনি বললেন বেশ ভাল । ৩য় ব্যক্তি জবাব দিল এটা করলে ছওয়াব হয়, তখন আপনি বললেন তুমি তা বিদআত করছ । ৪র্থ ব্যক্তি জবাব দিল এমনটি করলে একটি ভাল সন্তান হবে, আপনি বললেন, তুমি তা শিরক করছ । রাসুল (সাঃ) বলেন ঃ
’দয়াময় (আল্লাহ) আরশে সমাসীন’ (সুরাঃ ত্বাহা-৫)
আল্লাহ তায়ালা আরশে কিভাবে সমাসীন তার কোন সীমাবদ্ধতা ও ধরন বর্ণনা করা ছাড়া বিশ্বাস রাখতে হবে । এ সম্পর্কে আমাদের কোন জ্ঞান নেই । অর্থাৎ তাঁর জন্যে যে ভাবে উপযুক্ত সে ভাবে সমাসীন । কিভাবে আছেন এর কোন দৃষ্টান্ত বা ধারনা করা হারাম । এখানে আরোহন অর্থ কোন কিছু উর্ধে অবস্থান করা । তা কিভাবে কেমন করে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না । আমরা শুধু সেই অর্থই গ্রহন করিব যেমন তাবেয়ীনদের (রহ) কর্তৃক তাঁর সমারুঢ় হওয়ার ব্যাখ্যা সহীহ বুখারীতে বর্ণিত এবং তা এই যে, তিনি সারা সৃষ্টির উর্ধে আরশের উপর সমারুঢ় । যেমন তাঁর মহিমা ও মহত্বের উপযুক্ত এবং তা কারো সদৃশ নয় । যেমন আল্লাহ বলেন ঃ
’’তাঁর সদৃশ্য কোন কিছুই নেই এবং তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা (সুরা শুরা১১) ।আল্লাহ সবখানে আছেন ঃ তার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর দৃষ্টি, আল্লাহর শক্তি, সাহায্য সব জায়গায় আছে, যারা বলে আল্লাহ ক্বলবে বা সবখানে আছেন, তারা কথায় এবং বিশ্বাষে বিদআত করছেন । আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন, অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর শ্রবণ শক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও জ্ঞান অনুসারে আমাদের সাথে আছেন । আল্লাহ বলেন ঃ ’’তোমরা ভয় করো না, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি । আমি তোমাদের কথা শুনতেছি ও দেখতেছি (সুরা ত্বাহা ৪৬ ।
(৫)বিদআতের হুকুম ঃ দ্বীন ইসলামের মধ্যে প্রতিটি দিআতই হচ্ছে হারাম নিষিদ্ধ এবং গোমরাহী । কারণ রাসুল (সাঃ) বলেছেন ঃ তোমরা অবশ্যই নিজেদেরকে দ্বীন ইসলামে নব আবি¯কৃত বিদআতী কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখবে । কারণ প্রতিটি নব আবি¯কৃত বস্তুই হচ্ছে বিদআত, আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী ও পথ ভ্রষ্টতা (মুসলিম) ।
এই হাদিস থেকে জানা গেল যে, দ্বীন ইসলামের মধ্যে প্রতিটি নম আবি¯কৃত বস্তুই হচ্ছে বিদআত, আর প্রতিটি বিদআতই হচ্ছে পথ ভ্রষ্টতা ও পরিতাজ্য । তবে বিদআতের ধরন ও ধারণ অনুযায়ী বৎবধান ও পার্থক্য আছে । কারণ কোন কোন বিদআত স্পষ্ট কুফুরী । যেমন কমরস্থ ব্যক্তির নিকট নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কবরের চার পার্শে তাওয়াফ করা এবং কবরের উদ্দেশ্যে নযর নিয়াম পেশ করা । কবরস্থ ব্যক্তির নিকটে প্রার্থনা আশ্রয় ও সাহায্য চাওয়া । এ সমস্ত সবই কুফুরী । কোন কোন বিদআত শিরকের মাধ্যমে যেমন কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করা । মৃতদের মাধ্যমে বানিয়ে উছিলা গ্রহণ করা ।
বর্তমান সময়ে কিছু বিদআতের নমুনা উল্লেখ করছি । যেমন ঃ
(ক) রাসুল (সাঃ) এর জন্ম তারিখে ঈদে মিলাদুন্নবী নামে জন্মবার্ষিকী পালন করা ।
(খ) আল্লাহর সুন্তষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদতে বিভিন্ন প্রকার নব নিয়ম ও পদ্ধতি আবিস্কার করা, যেমন শবে বরাতে নির্দিষ্ট করে বার রাকাত নামাজ পড়া এবং সেটাকে শবে বরাতের নামাজ বলা ।
(গ) প্রচলিত মিলাদের নামে রাসুল (সাঃ) এর প্রশংসায় সীমা লংঘন, অতিবঞ্জন ও বাড়াবাড়ি থাকে । যেমন ঃ আল্লাহ তায়ালাকে বাদ দিয়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে দোয়া করা এবং তাঁর মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া হয় । অথচ রাসুল (সাঃ) তাঁর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করতে নিষেধ করেছেন । রাসুল (সাঃ) বলেন ঃ
’’তোমরা আমাকে প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না খৃষ্টানরা যেভাবে মরিয়ম পুত্র ঈসা কে প্রশংসার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছিল । নিশ্চয় আমি একজন বান্দা সুতরাং তোমরা আমাকে আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসুল বলেই আখ্যায়িত করবে (বোখারী ও মুসলিম) ।
মূল কলা হলো, রাসুলের প্রতি প্রকৃত ভালবাসা ও সন্মান দেখানোর উত্তম পন্থা হলো তাঁর আনুগত্য ও নির্দেশের অনুসরন করা এবং তাঁর সুন্নাতের প্রতিষ্ঠার চেষ্ঠা করা । প্রচলিত মিলাদ যা দাড়িয়ে বা বসে পড়ার ব্যাপারে গ্রামে গঞ্জে দলাদলি হচ্ছে । অথচ প্রচলিত মিলাদের কোন ভিত্তি শরীয়তে নেই । এটি রাসুল (সাঃ) মৃত্যুর ৬০০ বছর পর মিশরের বাদশা মুজাফফার আবিস্কার করেন ।
(ঘ) দরগা ও মাজারে ওরশ করা টাকা পয়সা দেয়া, পশু জবাই করা বিদআত ।
(ঙ) নামাযেজ পর সম্মিলিতভাবে যিকির বা দোয়া করা । কারণ নামাজের পর শরীয়ত সম্মত বিধান হলো প্রতিটি নামাযী ব্যক্তি একা একা যে সমস্ত মাসনুন যিকির আযকার আছে তা পাঠ করা এবং দোয়া করা ।
(চ) মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা, পরিশ্রমের বিনিময়ে কুরআন তেলাওয়াতের ব্যবস্থা করা এ বিশ্বাসে যে, মৃত ব্যক্তির জন্য উপকার হবে । এ সমস্ত কর্মকান্ডই বিদআত । বিদআত থেকে বাচার একমাত্র পথ হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের (সাঃ) সুন্নাত কে মজবুত ভাবে আকড়ে ধরা । আল্লাহ তায়ালা বলেন ঃ
’’নিশ্চয় এটি আমার সরল পথ । অতএব এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না । তা হলো সে সব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে (সুরা আনআম ১৫৩) ।
এ বিষয়ে রাসুল (সাঃ) স্পষ্ঠ করে বলেছেন, যা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, তিনি এভাবে বলেন ঃ আমাদের উদ্দেশ্যে রাসুল (সাঃ) একটি রেখা টানলেন । তারপর বললেন এটা আল্লাহ পাকের সোজা ও সঠিক পথ । তারপর তার ডানে ও বামে আরো কিছু রেখা টানলেন, তারপর বললেন এগুলো অন্য পথ যাদের প্রত্যেকটার শুরুতে শয়তান বসে মানুষদেরকে তার দিকে ডাকছে । তারপর কোরআন থেকে পড়লেন, অবশ্যই এটা আমার সরল সঠিক পথ, তোমরা অবশাই এর অনুসরন করবে এবং অন্যান্য রাস্তা সমূহকে অনুসরন করবে না । তা হলে এ রাস্তা সমূহ তোমাদেরকে তার রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে । আল্লাহ তায়ালা এই ভাবে তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন । যাতে তোমরা মুত্তকী হতে পার (আহমদ) । রাসুল (সাঃ) বলেন ঃ
যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব মেনে চলে, সে দুনিয়ায় পথ ভ্রষ্ট হবে না, এবং পরকালেও সে হতভাগ হবে না (মিশকাত)। রাসুল (সাঃ) আরো বলেন ঃ আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতক্ষন তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারন করে থাকবে, ততক্ষন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না, তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাহ (মিশকাত) ।
আসুন যাবতীয় বিদআতী কর্মকান্ড পরিহার করে আল্লাহ কিতাব ও রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ আলোকে সঠিক আমল করে দুনিয়ায় ও আখেরাতের সাফল্য অর্জন করি । আমিন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



