এক.
আজ আমি বিশ্লেষণমুলক দরকারি কিছু লিখব, সেই ভরসা নিয়ে বসিনি। নানা কারণে মন ভারি হয়ে আছে। অথচ মনে মনে ‘আমার দেশ’-এ বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নিয়ে লেখার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। যেমন, আমাদের সমাজের বিরোধকে একটি রাজনৈতিক ধারা হাজির করেছে সেক্যুলারিজম বনাম ইসলাম হিসেবে! তাই কি? এটা প্রমাণ করার জন্য জঙ্গিবাদ নিয়ে তোলপাড় শুরু করছে তারা। এক ব্যবসায়ীকে টেলিভিশনে দেখেছি। তিনি বলেছেন, এই যে বাংলাদেশের সর্বত্র
জঙ্গিরা ‘গিজ গিজ’ করছে বলা হচ্ছে-এটা বাড়াবাড়ি। এই বাড়াবাড়ির ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ নিম্নমুখী। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো আমাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়, তারা তো সেটা করবেই। কিন্তু যখন আমাদের সরকার নিজেই বাংলাদেশে জঙ্গি গিজ গিজ করছে প্রচার করে, তখন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য তো অবশ্যই, এমনকি তা ব্যবসা-বিনিয়োগের দিক থেকেও তৎক্ষণাৎ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সরকার যদি জানেই জঙ্গিরা আছে, তাহলে তাদের ধরুক, বিচার করুক। কিন্তু প্রচারণার ধরনটা একান্তই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরির বিরোধী। এই আত্মঘাতী খাসিলতের পরিবর্তন দরকার।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ থাকতেই পারে। ক্ষমতাধর প্রতিটি রাজনৈতিক দলও জঙ্গি। তারা রামদা, কাটা রাইফেল, বোমা-গ্রেনেড নিয়ে যেভাবে পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাতে অবিশ্বাস করার কোনোই কারণ নেই যে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ আছে। শুধু ইসলামী জঙ্গিবাদ আছে-এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাঙালি জাতীয়তাবাদী জঙ্গি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী জঙ্গি, মায় কমিউনিষ্ট জঙ্গি-সবই এদেশে আছে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল প্রত্যেকটিই সন্ত্রাসী। সন্ত্রাস ছাড়া রাজনৈতিকভাবে তাদের টিকে থাকার কোনোই উপায় নেই। কিন্তু যখন জঙ্গিবাদকে শুধু ইসলামের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়, তখনই বোঝা যায় যারা এই প্রচারে নেমেছে, তারা ভারত-মার্কিন-ইসরাইলের পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়নের জন্যই প্রচারণা চালাচ্ছে। নিজেদের রক্তাক্ত রাম দা, কাটা রাইফেল, বোমা-গ্রেনেড লুকিয়ে রাখার, আড়াল করারও এটা একটা ছুঁতো।
এই প্রচারণার বিপরীতে আমাদের এখনকার লড়াই ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক জনগণের লড়াই। এই দিকটি দ্রুত আমাদের স্পষ্ট করা দরকার। জনগণের এই লড়াইও ক্ষমতাসীন জঙ্গি শক্তির বিরুদ্ধে বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক রুপ পরিগ্রহণ করতে পারে। একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণকেও আমরা অস্ত্র হাতে লড়তে দেখেছি। পাকিস্তানি শাসকরাও এদেশের জনগণকে তখন ‘জঙ্গি’, ‘দুষ্কৃতকারী’ ইত্যাদি অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছে, প্রচারণা চালিয়েছে। আজ তাদের ভাষাই আমরা ফ্যাসিবাদীদের মুখে শুনি। তারা জনগণকে ভয় দেখানোর জন্যই কি এ ভাষা ব্যবহার করছে? ইতিহাস থেকে কি তারা কোনো শিক্ষাই নেয়নি? অট্টহাস্য ছাড়া এক্ষেত্রে আমাদের কী আর করার আছে!
ফ্যাসিবাদ ইতোমধ্যেই তার দাঁত এবং নখ প্রদর্শন করতে শুরু করেছে। তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। ফ্যাসিবাদ মোকাবিলাই এখনকার প্রধান কাজ। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ এই যুগে মামাতো ভাই-ফুফাতো ভাইয়ের মতো; তারা পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে হলে উভয়ের চরিত্রকে আমাদের অবশ্যই স্পষ্ট করতে হবে। কিন্তু আজ শুধু প্রসঙ্গটি তুলে অন্য প্রসঙ্গে যাব।
দুই.
পিলখানার জওয়ানদের বিদ্রোহ এবং পরিস্হিতির সুযোগ নিয়ে যে হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত হয়েছে, তার স্মৃতি ভোলা দুঃসহ। যে কোনো নাগরিকেরই এ ঘটনার জন্য মন খারাপ থাকার কথা। ইতোমধ্যে ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বিভিন্ন ও বিচিত্র সব বয়ানে আমরা পড়ছি। আমাদের মস্তিষ্ক খুবই উর্বর। নানান গল্প, কেচ্ছা-কাহিনী ফেঁদে আমরা আমাদের অবসরের বিনোদন ব্যবস্হা মোটামুটি পাকা করে ফেলছি। অথচ আমাদের দরকার দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা সম্পুর্ণ নিরপেক্ষভাবে, রাজনীতির ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে। বলাবাহুল্য, স্পষ্ট হয়ে উঠছে আমরা ব্যর্থ হতে চলেছি। সরকারি তদন্ত কমিটির মেয়াদ তৃতীয়বারের মতো আরো ৩০ কর্মদিবস বাড়ানো হলো। এখন তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হবে মে মাসে। তারপরও তদন্ত শেষ হবে কিনা সন্দেহ।
অন্যদিকে সেনাবাহিনী নিজেরা যে তদন্ত করছে, তার পরিণতি কী দাঁড়াল-তা আমাদের পক্ষে জানা ও বোঝা মুশকিল। অবস্হাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে সত্যিকারের তদন্ত বলতে আমরা
যা বুঝি, সেটা হচ্ছে না। না হওয়ার বিপদ হচ্ছে ক্ষতের
মতো এই বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হবে। সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়াবে। এই ক্ষতে রক্তক্ষরণ ঘটতে থাকবে অদৃশ্যে। ছাইয়ের মধ্যে জিইয়ে থাকা আগুনের মতো রয়ে যাবে এবং সময় ও সুযোগ বুঝে জ্বলে উঠবে আবার। কিন্তু কিভাবে, কেমন করে কোথায় এই আগুন জ্বলবে-তার কিছুই আমরা আগাম বলতে পারব না।
যে কারণে আমি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন বোধ করছি, সেটা হলো মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের ঘটনায়। মানবাধিকার সংস্হা ‘অধিকার’ জানাচ্ছে, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার তদন্ত চলাকালে এ পর্যন্ত ৭ বিডিআর সদস্য মারা গেছেন। এদের মধ্যে পিলখানায় অন্তরীণ তিনজন বিডিআর সদস্য এবং একজন ইমামের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গত ১৬ মার্চ জয়পুরহাট ৩ ব্যাটালিয়নের সিগন্যালস ল্যাস নায়েক এএইচএম ওয়াহিদুজ্জামান, ২৪ মার্চ রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার ম্যারিশার ৯ ব্যাটালিয়নে কর্মরত বিডিআর সদস্য মিজানুর রহমান এবং ২৫ মার্চ সিলেটের ৩৮ আখালিয়া ব্যাটালিয়নে কর্মরত বিডিআর সিপাহী শেখ ওয়ালিউর রহমান মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে তিনজন আত্মহত্যা এবং চারজন অসুস্হ হয়ে মারা গেছেন বলে বিডিআর কতৃꦣ2474;ক্ষ দাবি করেছে। এদিকে নির্যাতনের কারণে বিডিআর সদস্য মনির হোসেন ও মোবারক হোসেনের মৃত্যু হয়েছে বলে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিডিআর সিপাহী মনির হোসেন গত ১৭ মার্চ এবং ল্যাস নায়েক মোবারক হোসেন ২২ মার্চ র?্যাব হেফাজতে থাকাবস্হায় মারা যান। নিহত মোবারকের পরিবার জানায়, মোবারকের শরীরের বিভিন্ন স্হানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার দু’হাতের আঙুলের নখের নিচে রক্ত লেগে ছিল। মৃত অবস্হায় তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল।
বলাবাহুল্য, নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের কৌশল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাংলাদেশ অনুমোদন করেছে ৫ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে। এই কনভেনশন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে দৈহিক বা মানসিক নির্যাতন বা দুর্ভোগ এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তি দেয়া যাবে না।
একদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন, অন্যদিকে তদন্তের অধীন থাকাবস্হায় বিডিআর জওয়ানদের মৃত্যুর অর্থ হচ্ছে আলামত ও সাক্ষীদের অপসারণ করা। তদন্তের যে বয়ান হাজির করা হবে এবং যাদের কাছ থেকে তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে, তাদের কেউ যদি জীবিতই না থাকে, তাহলে সরকারি বয়ান বা সেনাবাহিনীর বয়ান দু’য়ের কোনোটাই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। এর ফলে রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ বাড়বে এবং পরিণতিতে রাজনৈতিক অস্হিরতা প্রকট রুপ ধারণ করবে।
ওদিকে আবার যেসব বিডিআর সদস্য পলাতক রয়েছেন, তাদের কোনো তালিকা সরকার প্রকাশ করছে না। এতেও সন্দেহ বাড়ছে। কারণ কে জীবিত আছে আর কে নেই, তার কোনো হদিস জানা অসম্ভব হয়ে উঠবে। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য এ ধরনের পরিস্হিতি উদ্বেগজনক।
গত ১৯ জানুয়ারি সন্ত্রাস দমন বিলকে আইনে পরিণত করার জন্য মন্ত্রি সভার বৈঠকে চুড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ ২০০৮ সালে প্রথমে সেনাসমর্থিত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ১১ জুন ঘোষণা করে। মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞরা এই অধ্যাদেশের প্রতিবাদ জানিয়েছেন; কারণ ‘সন্ত্রাস’-এর সংজ্ঞা এখানে এত ব্যাপক ও অস্পষ্ট যে, অনায়াসেই এর অপব্যবহার হতে পারে। অনির্বাচিত ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার এই বিলটি প্রণয়ন করে। এর কোনো কাটছাঁট না করেই অপরিবর্তিত রেখে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ অনুমোদিত হলো।
এটা পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে, কোনো নীতিগত অবস্হান নিতে আমরা পারছি না। দলবাজি, প্রতিহিংসা এবং পরাশক্তির স্বার্থের কাছে আমরা বার বার নিজেদের বিকিয়ে দিচ্ছি। শাসন বলতে আমরা বুঝি জোর যার মুল্লুক তার নীতি। এ অবস্হায় কোনো রাষ্ট্রই স্হিতিশীল হওয়া দুরে থাক, টিকে থাকতেই পারে না।
এ পরিস্হিতিতে মন খারাপ করার বিলাসিতা থাকা উচিত নয়। এটা ঠিক যে, আমরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত হয়েছি। কিন্তু এতটুকু যদি বুঝতে পারি যে, বাংলাদেশের সংকট ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা নয়- বরং গণতান্ত্রিক জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বনাম ফ্যাসিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, তাহলে আমরা এক কদম এগিয়ে যাব অবশ্যই।
আজ এ কথাটা জোর দিয়ে বলাই যথেষ্ট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



