somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অব্যাহতি না অভিমান - মাসুদ মজুমদার

১০ ই এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৪:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শেখ হাসিনা আর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী নন। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি 'অব্যাহতি' নিয়েছেন। দলের প্রেসিডিয়াম সভায় বসে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অতি মাত্রায় তোষামোদকারীদের ভাষায় তিনি নাকি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্খাপন করেছেন। নিজেকে দায়মুক্ত করার এ এক অনন্য নজির বটে। তবে নৈতিক বিবেচনায় এটিকে নজির না ভেবে ‘মন্দ দৃষ্টান্ত’ বলতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় এ অব্যাহতির কোনো মূল্য নেই। ছাত্রলীগের অবস্খান অঙ্গ সংগঠনের না সহযোগী সংগঠনের সেটাও গুরুত্বহীন ব্যাপার। এ অব্যাহতি নেয়াকে বড়জোর রাজনৈতিক অভিমান বলা চলে। রাজনৈতিক অভিমান ও জেদ কোনো অর্থ বহন করে না। যদি অর্থ বহন করে তা হলে রাজউক শ্রমিকলীগের কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রী কি পাতালে লুকাতেন?
এর পর হয়তো ছাত্রলীগের কমিটিও বিলুপ্ত করা হতে পারে। তাতে কী? এর মাধ্যমে ছাত্রলীগের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। নিশ্চয় নয়। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তিবাণিজ্য, দলীয় কোন্দল, খুনাখুনির সাথে ছাত্রলীগ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। সব গর্হিত কাজে জড়িয়ে গেলে মা-ও সন্তানের সাথে সম্পর্ক ছেদের ঘোষণা দেন। তাতে মাতৃত্বের সম্পর্ক কেটে যায় না। এ সম্পর্ক ছেদের ঘোষণাও শেষ পর্যন্ত কোনো অর্থ বহন করে না। দুর্বিনীত ও বখে যাওয়া সন্তানকে ত্যাগ করা সমাধান নয়। এর নাম শাসনও নয়। সঠিক পথে আনার প্রক্রিয়াও নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বলা যাবে, কিন্তু ছাত্রদের সম্মিলিত শক্তির অবদান অস্বীকার করা ঠিক হবে না। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ও মগজে পচন ধরার অর্থ সব ছাত্র উচ্ছন্নে গেছে এটা মনে করা যাবে না। তবে ছাত্ররাজনীতির বিষাক্ত ছোবল আর নয়। গঠনমূলক তৎপরতা নিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে নতুনভাবে সজ্ঞায়িত করার সময় এসেছে বলে কি প্রধানমন্ত্রী একটি পটভূমি রচনা করতে এ পদক্ষেপ নিয়েছেন?
সে ব্যাপারেও সন্দেহ জাগার কারণ আছে। কথিত অব্যাহতির দু’দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগ নেতাদের সময় দেননি। তিন দিনের মাথায় জাতীয় সংসদে বললেন, ছাত্রদল ও শিবিরের ছেলেরা ছাত্রলীগে ঢুকে অপকর্ম করছে। এ বক্তব্য তার নিজের অবস্খান, অব্যাহতি নেয়ার কৌশল এবং রাজনৈতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য কতটা সঠিক! একজন নেত্রী এতটা স্ববিরোধী হলে ছাত্রলীগ আস্কারা পাবে না কেন? এর মাধ্যমে ছাত্রদল ও শিবিরকে দমনের একটা প্রক্রিয়া জায়েজ করার ব্যবস্খা করলেন নাতো? তা না হলে ধরা পড়লে চেঁঁচামেচি না করার আগাম সাবধান বাণী উচ্চারণ করবেন কেন?
চাঁদাবাজি, দলবাজি, দলীয়করণ ষোলকলায় পূর্ণ হতে বসেছে। অত:পর শেখ হাসিনা কি আওয়ামী লীগ থেকেও অব্যাহতি নেবেন? স্বাস্খ্য মন্ত্রণালয়ের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ তার অনুগত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের দখলে নেয়া হয়েছে। তিনি এ ফোরামের নেত্রী হওয়ার ব্যাপারে আপত্তি জানাবেন! হয়তো জানাবেন। হয়তো জানাবেন না। তিনি অব্যাহতি নিয়ে নিলেই কি পরিস্খিতির উত্তরণ ঘটবে। হ্যাঁ বলার কোনো কারণ দেখি না। এতে গুণগত পরিবর্তনের আশা ষোলআনা অনিশ্চিত।
ছাত্রলীগকে বশীভুত করে রাখতে না পারাটা অবশ্যই সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা। তবে তার চেয়েও বড় ব্যর্থতা প্রশাসনিক। তাহলে তিনি কি সরকারের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন? তার নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ। এ ব্যর্থতা যেমন সামষ্টিক, তেমনি তার ব্যক্তিগত দায়ও। এ যুক্তিতে মহাজোট সরকারের পুরো মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিত রচনা করাটাই সমীচীন ভাবার সময় কি এসে গেছে! অন্তত রাজনৈতিক বিবেচনা ও গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের মাত্রাজ্ঞান তাই ভাবতে বলে। প্রধানমন্ত্রী সে ধরনের ভাবনায়ও যেতে চান! আমাদের প্রশ্ন শেখ হাসিনা এতটা অসহায় বোধ করছেন কেন? প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি সরকারকে সহযোগিতা করছে না? নাকি প্রশাসন অসহায়। অসহায় বা জিম্মি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাত-পা গুটিয়ে নেয়। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপে প্রশাসনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করতে পারে না। সেই বিবেচনায় আমাদের প্রশাসনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি রাজনৈতিক সরকারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে? নাকি দলীয়করণের কুফল এখনই ফলতে শুরু করেছে।
শেখ হাসিনার নিজ দলের ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে অব্যাহতিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ছেলেমি ভাবতে পারেন। ভাবতে পারেন তিনি দায় এড়াচ্ছেন। অথবা এ প্রক্রিয়ায় নিজের এবং দলের ইমেজ পুনরুদ্ধার করার একটি সস্তা ভাবনা তাকে পেয়ে বসেছে। দলের বেশির ভাগ সিনিয়র নেতা মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। সংসদীয় কমিটিতে অনেককে জায়গা করে দিয়েছেন। বাজারে একটা মূল্যায়ন আছে, সিনিয়র নেতারা শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করছেন না। তাদেরই কেউ কেউ ছাত্রলীগকে বেপরোয়া হতে আস্কারা দিয়েছেন। দলের ভেতরের সিনিয়রদের একটি রাজনৈতিক ম্যাসেজ দেয়ার জন্য শেখ হাসিনা ‘অব্যাহতির’ এ নাটকীয় ভাবনাটি কৌশল হিসেবে ছুড়ে দিয়েছেন।
যে সরকারের বয়স তিন মাস হয়নি। সংসদে যারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মেজাজি ভাব প্রদর্শন করছে। প্রশাসনে দলীয় প্রভাব বলয় যখন পুরো মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত। রদবদল, বদলি এবং ওএসডিকরণের মাধ্যমে ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করা হয়েছে। তখন প্রধানমন্ত্রীর অসহায়বোধ এবং অব্যাহতির মতো বিষয় এক ধরনের ছেলেভুলানো গল্প বলেই মনে হয়।
আমাদের মনে হয়, দেশ জাতি এর মাধ্যমে কোনো সান্তবনা পায়নি। স্বস্তিও বোধ করেনি। বরং রাজনৈতিকভাবে প্রবঞ্চিত হলো কি না সেটাই ভেবে দেখতে চাচ্ছে। বেপরোয়া ছাত্রলীগের রাশ টেনে ধরার জন্য গত এক মাস ধরে সব মহল থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। অনুনয়-বিনয় করে বলা হয়েছে, ছাত্রলীগের বেপরোয়া অবস্খান শুধু আইনশৃঙ্খলাকে চ্যালেঞ্জ করবে না। শিক্ষা জীবনকেও বিপর্যস্ত করবে। প্রধানমন্ত্রী মাথায় নেননি। মন্ত্রীদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘পরিস্খিতি কিছুটা খারাপ হয়েছে, তবে আগের চেয়ে ভালো আছে। এখনো ব্যবস্খা গ্রহণ না করে বলা হচ্ছে ‘সরকার বিব্রত’। ছাত্রলীগের কাজকর্ম ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’। এখনো কৌশলে বলা হয় ‘ছাত্রলীগ নামধারী’ এবং ‘বহিরাগতরা’ অপকর্ম করে ছাত্রলীগের ওপর দোষ চাপাচ্ছে, অর্থাৎ ছাত্রলীগ সোনার ছেলে। পাপ শাপ তাদের স্পর্শ করতেই পারে না। তাদের নাম ভাঙিয়ে অন্যরা তা করছে। বিরোধী দল মাঠে নেই। প্রধানমন্ত্রী অব্যাহতি নিয়ে মন্ত্রীদের সাফাইকেও চ্যালেঞ্জ করে দিলেন। শুধু স্বাধীনতা-উত্তর কালে নয়, আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাসে স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি কোনো সরকারি ছাত্র সংগঠনের আচরণ কখনো এতটা সমালোচিত হয়নি।
ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আমাদের দেশে বিরূপ ধারণা নতুন নয়। বহুবার ছাত্ররাজনীতি বìেধর দাবি উঠেছে। আমরা মাথা ব্যথার কারণ মাথা কাটা এটা কখনো মনে করিনি। এখনো মনে করি না। এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ মানে আতঙ্ক। অন্যান্য ক্ষেত্রে ত্রাস। এ বাস্তবতা অস্বীকার করা সত্যকে অস্বীকার করার মতোই ভাবতে হবে।
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দেশ-জাতিকে যদি বোকা না ভাবেন, তাহলে বুঝতে হবে ছাত্রলীগের ক্ষমতা ও দাপটের উৎস কোথায়। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেত্রীর কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করে, দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তোয়াক্কা না করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে উপেক্ষা করে এরা নৈরাজ্যের উৎসবে মেতে উঠেছে। কারা এদের মদদদাতা, কারা এদের পৃষ্ঠপোষক, এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে, কোথায় পাওয়া যাবে।
এ দেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস অনেক বেশি বর্ণাঢ্য। অনেক বেশি গৌরবময়। সময়ের প্রতিটি বাঁকে ছাত্র শক্তির নব উথান জাতিকে গ্লানিমুক্ত করেছে। সেখানে ছাত্রলীগের ইতিহাস অনেক বেশি স্মরণীয়। আজ সেটি ক্ষমতার পঙ্কিলতায় হারিয়ে যাক এটি কোন বিবেকবান মানুষের কামনা হতে পারে না।
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×