তখন দৈহিক সামর্থ্য বেশি ছিল। ভ্রমণ ভালোবাসতাম। প্রায়ই বাংলাদেশে যেতাম। বিবিসিতে যখন চাকরি করতাম, কোনো কোনো বছর দুই কিংবা তিনবারও যেতে হতো। যে দেশটাকে আমরা সবাই মিলে স্বাধীন করেছি, সে দেশ এবং সে দেশের মানুষ কেমন আছে দেখতে খুবই ইচ্ছে করত। সে রকম এক সফরে উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে দেখি জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামের জিয়া অংশের আলো জ্বলছে না।
পরের সফরেও ঠিক একই অবস্খা। ভাবছিলাম আমার এই দুই যাত্রার মধ্যবর্তী সময়ে কত লাখ, হয়তো কত কোটি যাত্রী এ বিমানবন্দর দিয়ে ওঠা-নামা করেছেন। নিয়ন আলোর এ অংশটুকু মেরামত করতে ২০-২৫ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়। এই দীর্ঘ সময়েও সে মেরামতের কাজটা করা হয়নি। এই অসংখ্য যাত্রীর মনে বাংলাদেশী জাতির কর্মদক্ষতা সম্পর্কে নিশ্চয়ই ভালো ধারণা হয়নি!
আমরা কেউ কেউ কারণটা জানতাম। বাংলাদেশে প্রবেশের মুখে সারা দুনিয়ার মানুষ বিমানবন্দরের মাথায় বিরাট বিরাট অক্ষরে যে নামটা দেখতে পাচ্ছে সেটা তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতার নাম নয়। তার চেয়েও বড় কথা, সে নামটা যার, দেশের মানুষ তাকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে জানে। সেটা প্রধানমন্ত্রীর চিত্তশূলের কারণ। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর পিতার হত্যার পর থেকে তার নিজের ক্ষমতাপ্রাপ্তি পর্যন্ত মাঝের সময়ে যারা কোনো ক্ষমতার আসনে ছিলেন শেখ হাসিনা তাদের সবাইকে তার পিতার হত্যার ‘বেনিফিশিয়ারি’ বা ফলভোগকারী মনে করেন। প্রধানমন্ত্রীর ঈর্ষাতুর ও প্রতিহিংসাপরায়ণ মনে সেটা সহনযোগ্য ছিল না। বাংলাদেশে অনেকে আমাকে বলেছেন, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামটা মেরমাত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই গাফিলতি করা হচ্ছিল। দুয়েকজন তো এ কথাও বলেছিলেন যে, শেখ হাসিনার নির্দেশে ইচ্ছে করেই জিয়ার নামটার আলো নিভিয়ে দেয়া হয়েছিল।
সেটা ছিল শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলের কথা। হাসিনা লগি-লাঠি-বৈঠার আন্দোলন দিয়ে সড়কে মানুষ হত্যা করেছিলেন, দেশ অচল ও অর্থনীতিকে বìধ্যা করে দিয়েছিলেন। ‘সে আন্দোলনের ফসল’ হিসেবে বিদেশীদের তত্ত্বাবধানে একটা বর্ণচোরা সেনাশাসন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার এবং অন্যতম প্রধান দলকে বিলুপ্ত করার যথাযোগ্য চেষ্টা করেছে। হাসিনা এখন সে সেনাশাসনের ‘বেনিফিশিয়ারি’। তিনি মইন ইউ ও ফখরুদ্দীন আহমদের অসাংবিধানিক, অবৈধ সরকারের ফসল ভোগ করছেন, বিদেশীদের কল্যাণে এবং একটা মাস্টারপ্ল্যানের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু তার স্বভাবের কোনো উন্নতি হয়নি। দেশের প্রধান প্রধান ইমারত কিংবা স্খাপনায় তার পিতা ছাড়া অন্য কারো নাম থাকবে হাসিনার দৃষ্টিতে সেটা অসহনীয়।
দুয়েকটা দৃষ্টান্ত দিলেই বেশ বুঝতে পারবেন। যমুনা নদীর ওপর সুরম্য সেতু তৈরির কাজটা সম্পন্ন হয়েছিল খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে। সেতুটির নাম যথাযোগ্যভাবেই দেয়া হয়েছিল যমুনা সেতু। প্রধানমন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর সে সেতুর নাম নিজের পিতার নামানুসারে বঙ্গবìধু সেতু রাখার প্রলোভন শেখ হাসিনা সামলাতে পারলেন না। ঢাকা স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবìধু স্টেডিয়াম করা হয়। যেটা এককালে ছিল ইনস্টিটিউট অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন, রাতারাতি সেটার কপালে বঙ্গবìধুর নাম উল্কি মেরে দেয়া হলো। দিনাজপুরের সর্বজনবরেণ্য জননেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামে একটা কৃষি কলেজ হয়েছিল। সেটিকেও বঙ্গবìধু কলেজ করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু এলাকার লোকের প্রবল বিরোধিতার মুখে হাসিনাকে তা থেকে সরে আসতে হয়।
আগেই বলেছি, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর স্বভাব বদলায়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে গদিতে বসার পর থেকে তিনি তক্কে তক্কে আছেন আর কোন ইমারত কিংবা স্খাপনার কপালে পিতার নাম লিখে দেয়া যায়। চীনারা বাংলাদেশে কয়েকটি সেতুসহ বেশ কিছু অবকাঠামো তৈরি করে দিয়ে বাংলাদেশের প্রভূত কল্যাণ করেছে। এরা নিজেদের ব্যয়ে ঢাকায় একটা বিশাল ও সুরম্য সম্মেলন কেন্দ্র তৈরি করে দেয়। খালেদা জিয়ার সরকার সঙ্গতভাবেই তার নাম দিয়েছিল চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র। খালেদা জিয়ার কিংবা তার শহীদ স্বামীর নামে নয়। কিন্তু শেখ হাসিনা গদি পাওয়ার কিছুকালের মধ্যেই চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র ‘বঙ্গবìধু সম্মেলন কেন্দ্র’ হয়ে যায়। এটা আমার কাছে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক মনে হয়েছে। আমার বিবেচনায় যে লিïসা, লোলুপতা আর তস্করবৃত্তি থেকে আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা পরের জমি, বাড়ি, দোকান দখল করে নিচ্ছে; শেখ হাসিনাও সে লোলুপতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারছেন না। হয়তো এই তস্করবৃত্তির প্রবণতা আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা পেয়েছে তাদের নেত্রীর কাছ থেকে।
ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখা হয়েছে ২৭-২৮ বছর আগে। এ সময়ের মধ্যে বহু কোটি মানুষ নামটির সাথে পরিচিত হয়ে গেছে, সারা বিশ্বের এয়ারলাইনস ও ট্রাভেল অপারেটররা জিয়া নাম দিয়েই বাংলাদেশকে চেনে। আগেই বলেছি, তার প্রথম সরকারের আমল থেকেই সেটা শেখ হাসিনার চিত্তশূল আর গায়ে জ্বালা সৃষ্টি করে। হাসিনা বুঝে গিয়েছিলেন, ভূমি গ্রাসের মতো করে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামটিও যদি তিনি পিতার নামে গ্রাস করেন, তাহলে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে, সেটা সামলানো কঠিন হবে। এবার তিনি একটা সুকৌশল ফন্দি আবিষ্কার করেছেন। তার আজ্ঞাবহ মন্ত্রীরা খুব সম্ভবত তার নির্দেশে স্খির করেছেন যে, ঢাকা বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে শাহজালাল বিমানবন্দর করা হবে খুব সম্ভবত সাময়িকভাবে, জিয়ার নাম পরিত্যাগ করা জনসাধারণের গা-সওয়া হয়ে যাওয়া পর্যন্ত।
পুণ্যস্মৃতি লগি কিংবা লাঠি নয়
হজরত শাহ জালাল রহ: বাংলাদেশে একটি পবিত্র নাম, পবিত্র স্মৃতি। বাংলাদেশের সর্বত্র, বিশেষ করে সিলেট বিভাগে তার ভক্ত-অনুসারী অজস্র। সর্বত্র অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তার নাম স্মরণ করা হয়। হাসিনা আশা করছেন, আপাতত শহীদ জিয়ার পরিবর্তে হজরত শাহজালাল রহ:-এর নামে বিমানবন্দরের নাম রাখা হলে ব্যাপক প্রতিবাদ হবে না, কিছু লোক বরং তাতে খুশি হবে; তারপর সুবিধাজনক কোনো এক সময় নামটা তার পিতার নামেও পরিবর্তিত করা সম্ভব হবে।
কিন্তু একটা কথা তিনি ভুলে যাচ্ছেন। সিলেট বিভাগসহ বাংলাদেশের মানুষ এ কথা বোঝে যে, মন্ত্রীদের আলোচ্য সিদ্ধান্ত আকস্মিক ধর্মাসক্তি কিংবা অলি-আউলিয়াদের প্রতি অনুরাগ থেকে সঞ্জাত নয় প্রতিহিংসাপরায়ণতাই হচ্ছে আসল কারণ। বাংলাদেশের মানুষ রাষ্ট্রপতি জিয়ার নাম ও কীর্তি স্মরণ করবে, সারা বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশের মুখে জিয়ার নাম দেখতে পাবে শেখ হাসিনা সেটা সহ্য করতে পারছেন না, তার দিনের শান্তি এবং রাতের ঘুম তাতে হারাম হচ্ছে। তাই শাহজালাল রহ:-এর পুণ্যস্মৃতিকে তিনি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, যেমন তিনি রাজনীতির লগি ও লাঠি হিসেবে পিতার নাম ব্যবহার করে জাতির জনকের স্মৃতিকে ক্রমেই বেশি বিতর্কিত করে তুলছেন। নইলে এ কথা সবাই জানে, হজরত শাহজালালের স্মৃতিকে সম্মান দেখানোর আরো বহু পথ খোলা ছিল। একজনকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে অন্য একজনের স্মৃতিকে অপমান করাকে শাহজালালের ভক্তরাও সমর্থন করবেন না।
শেখ হাসিনার পিতা কিছু দুষ্ট লোকের প্ররোচনায় বহুদলীয় গণতন্ত্র বাতিল করেছিলেন। রাজনৈতিক দলগুলো (আওয়ামী লীগসহ) নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং চারখানি সরকারি পত্রিকা ছাড়া অন্য সব পত্রপত্রিকা বìধ করে দিয়েছিলেন। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে এনেছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র আবার চালু করেছিলেন, এমনকি ড. কামাল হোসেন আর আবদুর রাজ্জাককে দিল্লিতে পাঠিয়ে সাদরে হাসিনা ও রেহানাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। ইচ্ছে করলে জিয়া তাদের দিল্লিতে সমাজবিচ্ছিন্ন নির্বাসনে ফেলে রাখতে পারতেন। যে মিডিয়া এখন শেখ হাসিনার অন্যায়গুলোকে নির্বিচারে সমর্থন করছে, তাদেরও পুনর্জীবিত করেছিলেন জিয়াউর রহমান। পত্রপত্রিকার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তিনি তুলে নিয়েছিলেন, সংবাদ ও বাকস্বাধীনতা পুন:প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এখন হাসিনার দিবা-রাত্র দু:স্বপ্নের কারণ। এ দলটিকে বিলোপ করা না গেলে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার মনে শান্তি আসবে না।
শেখ হাসিনাকে এ কথাটা বলার ইচ্ছা আমার বহু দিনের। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর বেনিফিশিয়ারি শুধু খোন্দকার মোশতাক আহমদ, জেনারেল খালেদ মোশাররফ, জেনারেল জিয়াউর রহমান কিংবা খালেদা জিয়া নন। বিরাট একজন বেনিফিশিয়ারি ছিলেন লে. জে. এরশাদ। তবু শেখ হাসিনার সহযোগিতায় এরশাদ নয় বছর গণতন্ত্রকে বিধ্বস্ত করে সামরিক স্বৈরতন্ত্র চালিয়েছেন। খালেদা জিয়াকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে এরশাদের সামরিক অভ্যুথানকে স্বাগত জানিয়েছিল আওয়ামী লীগের মুখপত্র বাংলার বাণী।
মুজিব হত্যার বেনিফিশিয়ারি
তবে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি শেখ হাসিনা নিজে। ওই তারিখের ঘটনাগুলো না ঘটলে, শেখ মণি ও শেখ কামাল জীবিত থাকলে হাসিনা কখনো দলনেত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না। এ কথা অন্তত কিছু কিছু লোকের স্মরণ আছে, হাসিনা ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে তার পিতা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন; কন্যার বুদ্ধিমত্তার ওপর তার আস্খা ছিল না বলেই স্ত্রীকে বলেছিলেন চটপট মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে।
অবশ্য সেটা শেখ পরিবারের ভেতরের ব্যাপার। বর্তমান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সবাইকে মনে রাখতে হবে, ‘যা ওঠে সেটা আবার নামেও’। প্রতিষ্ঠিত এবং সর্বজনের পরিচিত ভবন ও স্খাপনাগুলোর নাম পরিবর্তন করে হাসিনা একের পর এক নজির সৃষ্টি করে চলেছেন। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এসে যদি সে নামগুলো আবারো বদলে দেয়, যেখানে যেখানে মুজিব কিংবা বঙ্গবìধুর নাম আছে সব যদি বদলে দেয়। যমুনা সেতু যদি আবার যমুনা সেতুই হয়ে যায়, চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র যদি আবার স্বনামে ফিরে আসে তাহলে অন্যায় কিছু হবে না, বাংলাদেশের মানুষ আদৌ বিস্মিত হবে না।
বিএনপি’র ক্ষমতা লাভের কথায় শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই মনে মনে হাসবেন। সেটা তার স্বভাবসুলভ দম্ভ আর একগুঁয়েমির ব্যাপার। স্বভাবের এই ত্রুটির কারণেই তিনি বাস্তবকে দেখতে পান না, বাস্তবে বিশ্বাস করেন না। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। হাসিনা ভেবে নিয়েছিলেন, জাতির পিতার কন্যা তিনি যখন প্রার্থী হয়েছেন, তখন আর কারো জয়ী হওয়ার অধিকার নেই। ২৫ ফেব্রুয়ারি টেলিভাষণে তিনি শহীদ জিয়াউর রহমান, তার স্ত্রী এবং গোটা বংশকে অকথ্য গালিগালাজ করেছিলেন। সাধারণ মানুষ ছি: ছি: করেছিল। যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চান তার মুখ দিয়ে এমন ভাষা বেরোচ্ছে, যে ভাষা ইতরজনেও ব্যবহার করতে লজ্জা পায়! সে নির্বাচনে খালেদা জিয়াকে জয়যুক্ত করে জাতি শেখ হাসিনাকে শাস্তি দিয়েছিল।
কিন্তু হাসিনা বাস্তবতাকে মেনে নেননি। সারা দুনিয়া থেকে শত শত পর্যবেক্ষক এসেছিলেন। সবাই একবাক্যে বলেছিলেন, সে নির্বাচন হয়েছিল আদর্শ নির্বাচন। পর্যবেক্ষকদের সবাইকে বিশেষ করে হাসিনার পিতার সমর্থক এবং তার শুভকামী ব্রিটিশ রাজনীতিক ও কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের নেতা পিটার শোরকে স্তম্ভিত করে দিয়ে হাসিনা দাবি করেন, কারচুপি করে তাকে পরাজিত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনের আগে অতীতের ভুলত্রুটির জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ ক্ষমাশীল, তারা বিশ্বাস করে, অনুশোচনা এবং ক্ষমাপ্রার্থনা আন্তরিক হলে আল্লাহ তায়ালাও মানুষকে ক্ষমা করে দেন। তারা শেখ হাসিনাকে আরেকবার সুযোগ দিতে চেয়েছিল। সে নির্বাচনে হাসিনা জয়লাভ করেছিলেন।
হিটলারি কায়দা
বাংলাদেশের মানুষকে সে জন্য পস্তাতে হয়েছিল। হাসিনা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেননি, জাতিকে প্রতারিত করেছিলেন। প্রশাসন আর পুলিশকে আত্মস্খ করেই হাসিনা ক্ষান্ত হননি। হিটলারি কায়দায় গদি চিরস্খায়ী করার জন্য একটা সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী তিনি গঠন করেছিলেন। বিরোধী বিএনপি দলকে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করার লক্ষ্যে তাদের ব্যবহার করা হয়েছিল। বিএনপিকে সভা-সমিতি কিংবা মিছিল করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার কোনো চেষ্টারই ত্রুটি রাখা হয়নি। আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ডা. ইকবালের পার্শ্বচররা ঢাকায় বিএনপি’র মিছিলে গুলি চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছিল। দেশের বিভিন্ন স্খানে অনুরূপ ঘটনা আরো বহু ঘটেছিল। হাসিনা আশা করেছিলেন, অত্যাচার আর নির্যাতন দিয়ে তিনি আসন পোক্ত করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের ভোটাররা সেসবের জন্য তাকে শাস্তি দিয়েছেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। অìধ ক্রোধে আওয়ামী লীগ নেত্রী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানকে গালিগালাজ করেছেন।
গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনা আবারো বাংলাদেশের মানুষের ক্ষমাশীলতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তার প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, তিনি ঘৃণা, প্রতিশোধ আর প্রতিহিংসার পথ ত্যাগ করবেন, সমঝোতা ও ঐকমত্যের রাজনীতি করবেন। কিন্তু দেশের মানুষ দেখছে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্খা। প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধ বাসনা এ যাবৎ তার সরকারের একমাত্র লক্ষণীয় দিক। এমনকি বিচারের কথাও যখন তিনি বলেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আসলে প্রতিশোধই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র লক্ষ্য। কিছু অবিবেচক মানুষের অìধ আবেগের সুযোগ নিয়ে হাসিনার ক্যাডাররা বিএনপি’র বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার আড়ালে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের পর্বত-প্রমাণ ব্যর্থতাকে ঢাকা দিচ্ছেন।
কিছু দিন আগে এক কলামে লিখেছিলাম, হাসিনার ক্যাডারদের কার্যকলাপ হিটলারের নাৎসিদের কাণ্ডকারখানাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সে অবস্খার শণৈ:শণৈ: অবনতি হচ্ছে। বিরোধীদলীয় বহু নেতাকর্মীকে হত্যা ও নির্যাতন করা হচ্ছে। এখন তারা মিডিয়ার বিরুদ্ধেও হুমকি দিতে শুরু করেছে। মাহমুদুর রহমান ও আমার দেশ পত্রিকার বিরুদ্ধে সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা এবং শাসক দলের দুয়েকজন নেতা যে ভাষায় হুমকি দিচ্ছেন, সেটা নাৎসিদের হুমকি থেকে অভিন্ন। হাসিনা এসব কাণ্ডকারখানা করছেন নিজের গদি চিরস্খায়ী করার আশায়। কিন্তু তার ফল বিপরীত হতে বাধ্য। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বাংলাদেশের ভোটদাতারা যেভাবে শেখ হাসিনাকে শাস্তি দিয়েছিলেন, পরবর্তী নির্বাচনেও (সে নির্বাচন যখনই হোক না কেন) সেভাবেই শাস্তি দেবেন তারা। এই মুহূর্তে নির্বাচন হলেও শেখ হাসিনা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবেন। শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশের, এমনকি নিজেরও ভালো চান, তাহলে এক্ষুনি এই মারাত্মক পথ তাকে ছাড়তে হবে। তাকে স্মরণ করতে হবে, অত্যাচারী সাদ্দাদের প্রাসাদ ধসে পড়েছিল, অত্যাচারী হিটলার ও তার নাৎসিরা নিপাত হয়েছিল। তেমনি অত্যাচার ও নিপীড়নের পথ ত্যাগ না করলে হাসিনারও পতন হবে।
লেখক :সিরাজুর রহমান, বিবিসি খ্যাতসাংবাদিক ও কলামিস্ট

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



