somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আওয়ামী লীগে কি দেশপ্রেমিক অবশিষ্ট নেই? ----- সিরাজুর রহমান

২৬ শে জানুয়ারি, ২০১০ ভোর ৫:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ত্বরিত সাফল্য বিশ্বব্যাপী বিস্ময় ও প্রশংসা লাভ করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রাম, এমনকি শেখ মুজিবের ছয় দফা স্বায়ত্তশাসনের দাবিও দীর্ঘস্খায়ী ছিল না। ছয় দফার দাবি প্রথম উথাপিত হয় ১৯৬৬ সালে। অবশ্য মওলানা ভাসানী তার আগেও স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানিদের ‘খোদা হাফেজ’ জানিয়েছিলেন। মুজিব ১৯৭১ সালের মার্চের ভাষণে স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন, কিন্তু স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। তার পরও তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে অনেক আলাপ-আলোচনা করেছেন, তাকে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করার দাবি পরিত্যাগ করেননি।
পাকিস্তানিরা যখন বিশ্বাসঘাতকতা করে ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর সামরিক আক্রমণ চালায়, দেশের মানুষ তখনই প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করে। মুজিব তখন পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমান মুজিবের নামে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে আনুষ্ঠানিকতা দেন। তার নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল।
আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিব যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের হৃদয়ে দৃঢ় আসন লাভ করেছিলেন, তার কারণ এই ছিল যে, তারা গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবির সাথে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য আপসহীন সংগ্রাম করেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ শোষণ ও আহরণ করেছে। তৎকালীন দেশের এ অংশের বিকাশ ও বিবর্তন এবং মানুষের জীবন-মানের উন্নতি তাদের লক্ষ্য ছিল না। পাট মূলত পূর্ব পাকিস্তানে উৎপন্ন হতো। তাই কয়েকটি পাটকল এখানে স্খাপন করা হলেও সেগুলোর মালিকরা ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি আদমজী, বাওয়ানী প্রমুখ। মুনাফার অর্থ সাথে সাথে চলে গেছে পশ্চিম পাকিস্তানে। ভেতরে ভেতরে তারা পশ্চিম পাকিস্তানে পাট উৎপাদনের গবেষণা চালাচ্ছিলেন।
একটি দৃষ্টান্ত থেকে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যাবে। ১৯৫১ বা ১৯৫২ সালে এ খবরটি আমি পত্রিকায় ছেপেছিলাম। পূর্ব পাকিস্তানের মাত্র বৃহত্তর সিলেটে চা উৎপন্ন হতো। চা রফতানি করার জন্য প্লাইউডের ‘চেস্ট’ (বাক্স) তখন আমদানি করা হতো। পূর্ব পাকিস্তানের এক উদীয়মান শিল্পপতি সুন্দরবন অঞ্চলের সুন্দরী কাঠ থেকে টি-চেস্ট তৈরির একটা প্রকল্প তৈরি করেছিলেন। তিনি প্রয়োজনীয় লাইসেন্স সংগ্রহ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও আনার অর্ডার দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো পশ্চিম পাকিস্তানি মন্ত্রী কিংবা আমলার ধারণায় সেটা অনুচিত ছিল। টি-চেস্ট কারখানার লাইসেন্স পরিবর্তন করে জনৈক পশ্চিম পাকিস্তানিকে দেয়া হয়। মাঝসমুদ্র থেকে যন্ত্রপাতি পূর্ব পাকিস্তানের বদলে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়। স্খির হয়, কারখানা পশ্চিম পাকিস্তানেই বসবে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে সুন্দরী কাঠ যাবে সেখানে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তৈরি টি-চেস্ট পূর্ব পাকিস্তানে আসবে চা ভর্তি করার জন্য। মনে আছে, বিভিন্ন মহল থেকে এই উদ্ভট কাণ্ডকারখানার প্রতিবাদ করে পত্রিকায় বিবৃতি ছাপা হয়েছিল।
সার কথাটা হলো­ পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ শোষণ এবং এখানকার মানুষকে বঞ্চিত করে পশ্চিম পাকিস্তানের শ্রীবৃদ্ধির বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিল এবং সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছিল। এ দলটির জনপ্রিয়তা প্রায় রাতারাতি আকাশচুম্বী হয়ে ওঠার এটাই ছিল কারণ, এবং এ কারণেই অন্য সব স্বাধীনতা আন্দোলন ও যুদ্ধের মতো বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার জন্য যুগ যুগ সংগ্রাম করতে হয়নি।
বাংলাদেশের মানুষের দুর্ভাগ্য, আজকের আওয়ামী লীগকে আর সে আওয়ামী লীগ বলে চেনাই যায় না। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতা পেয়েছে, শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন­ এক বছরেরও কয়েক দিন বেশি আগে। কিন্তু এ সরকার আর এই প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে এসেছেন। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণ বিক্রি না হলেও বìধক দিয়ে এসেছেন। শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের ইশতেহারের আর কোনো ব্যাখ্যা দেয়া সত্যিই কঠিন।
আওয়ামী লীগ সমর্থক মিডিয়া গোড়ায় মিথ্যা দাবি করেছিল যে, ভারত বাংলাদেশকে এক শ’ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিতে রাজি হয়েছে। ইশতেহারে দেখা গেল, সেটা এক শ’ নয়, এক বিলিয়ন মাত্র এবং সেটাও বাংলাদেশের শিল্পায়ন কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অনুদান নয়। ভারতের নিজের অনেক আন্তর্জাতিক মানের সমুদ্রবন্দর আছে। কিন্তু সে আরো দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চায়। সেজন্য আরো দ্রুত আমদানি-রফতানির জন্য সে বাংলাদেশের দুটো সমুদ্রবন্দরই চায়। সে সব বন্দরে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য প্রয়োজন দৃঢ়তর-প্রশস্ত সড়ক ও রেলপথ। এসব অবকাঠামোর প্রয়োজনীয় উন্নয়নের জন্য ভারত এক বিলিয়ন (এক শ কোটি টাকা) ডলার ঋণ দিচ্ছে বাংলাদেশকে, ১.৭৫ শতাংশ সুদে।
উল্লেখ্য, অবকাঠামোর এসব উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক ৪০ বছর মেয়াদে এবং এক শতাংশেরও কম হারের সুদে বাংলাদেশকে ঋণ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল বলে আগে শুনেছি। সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের ঋণের অর্থে বাংলাদেশের অর্থনীতির এবং বাংলাদেশীদের কর্মসংস্খানের বিশেষ কোনো উন্নতি হবে না। দিল্লি ইশতেহারে বলা হয়েছে, এতদ-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাজের কন্ট্রাক্টের ব্যাপারে ভারতীয় ঠিকাদাররাও টেন্ডার দিতে পারবেন। সাধারণ বুদ্ধিতেই বলে, যেহেতু তাদের অভিজ্ঞতা ও সম্পদ বেশি এবং প্রকল্পের অর্থায়ন করছে ভারত, সেহেতু কন্ট্রাক্টগুলো তারাই পাবেন। কাজ সম্পন্ন হলে তাতে লাভবান হবে ভারতীয় অর্থনীতি। তাতে সে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে।
প্রায় সব কাজই হবে যন্ত্রভিত্তিক। ম্যানেজার, স্খপতি, ইঞ্জিনিয়ার, ওভারশিয়ার সবই আসবেন ভারত থেকে; বাংলাদেশের কিছু মানুষ হয়তো মাটি কাটা কিংবা চৌকিদারের কাজ পেতে পারেন। অর্থাৎ আদমজী-বাওয়ানীরা যেমন পূর্ব পাকিস্তানে যৎসামান্য পুঁজি বিনিয়োগ করেছিলেন মুনাফাটা পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার জন্য, একই রকম কাজ ভারত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশে।
ব্যর্থতার চুক্তি
আর একটা ব্যাপার আপনারা পুরোপুরি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন কি না, জানি না। বাংলাদেশের আশুগঞ্জ নদীবন্দর হয়ে ভারী ও বিশাল যন্ত্রপাতি যাবে আগরতলায়। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা তৈরি হবে এবং সে কারখানা থেকে তিন বছর পর বাংলাদেশের কাছে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রি করা হবে। এই তিন বছরে আড়াই শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী একটা কারখানা বাংলাদেশে তৈরি করা কি সম্ভব ছিল না? নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে হাসিনা স্বয়ং বলেছেন এবং আওয়ামী লীগও বলেছিল, তাদের কার্যকালের পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে তারা বাড়তি সাত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবেন। হায়! সেসব প্রতিশ্রুতির কথা আর শোনা যায় না আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীদের মুখে!
কাটা ঘায়ে নুনের ছিঁটা। গোড়ায় বলাবলি হচ্ছিল, ভারত আশুগঞ্জের ভেতর দিয়ে একবার মাত্র ‘অস্বাভাবিক বোঝাগুলো’ নিয়ে যাবে। কিন্তু ১২ জানুয়ারির দিল্লি ইশতেহারে বলা হচ্ছে, আশুগঞ্জের ‘দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের’ কথা। ভারতের এই ঋণের অর্থ থেকে কিছু ব্যয় হবে ভারতের প্রয়োজনে লাগার মতো কয়েকটি নদীতে ড্রেজিংয়ের কাজে। কথা হচ্ছে, নদীতে যদি নিয়মিত পানি না আসে, তাহলে নদী হেজেমজে যাবেই। ড্রেজিং করে তাকে কত দিন নাব্য রাখা যাবে? এটা মূলত মানুষের চোখে ধুলো দেয়ার একটা ফন্দি মাত্র। মোট ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ভারত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সরিয়ে নিচ্ছে। এমনিতেই ভারতের সেচের কাজে অনেক উজান থেকে পানি সরিয়ে নেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হচ্ছে টিপাইমুখ। সেখানে বাঁধটি তৈরি হলে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকাও মরুভূমিতে পরিণত হবে­ যেমন হয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ তৈরির ফল পদ্মা অববাহিকায়। অথচ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় নেতাদের সাথে আলোচনায় নদীগুলোর পানি সম্বìেধ কথাই বলেননি। অকর্মা যৌথ নদী কমিশনের অনিশ্চিত বৈঠকের জন্য সেসব বিষয় ফেলে রেখেছেন। গত ১৬ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে মনে হয়, টিপাইমুখে কী হতে যাচ্ছে সে সম্বìেধ তার সামান্যতম ধারণাও নেই।
দেশে দিল্লী ইশতেহারের সমালোচনা প্রায় সার্বজনীন। তার জবাব হিসেবে হাসিনা গর্ব করে ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি চুক্তির কথা বলছেন বারবার। বাংলাদেশীরা কিন্তু জানে, সে চুক্তি ভারতের কাছে প্রতিশ্রুতির মূল্যহীনতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। কেননা সে চুক্তি অনুযায়ী ভারত কোনো বছরই বাংলাদেশকে পানি দেয়নি।
আন্তর্জাতিক পটপরিবর্তন
বিবিসি’র কাজে একসময়ে ঘন ঘন উপমহাদেশ সফরে যেতে হতো আমাকে। কলকাতা গেলে বহু বাড়িতেই দেখতাম, তারা ঢাকা টেলিভিশনের নাটক (প্রথমে পিটিভি ও পরে বিটিভি) দেখছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সে পরিস্খিতি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে। কৃত্রিম উপগ্রহের কল্যাণে অজস্র টেলিভিশন চ্যানেল চালু হয়েছে ভারতে। এর মধ্যে যেগুলো অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে দিবারাত্রি ‘বলিউডের সংস্কৃতি’ উদ্গিরণ করছে, সেগুলোর কয়েকটি দেখানো হচ্ছে বাংলাদেশে। অন্য দিকে বাংলাদেশের টেলিভিশন ভারতে সম্পূর্ণ অনুপস্খিত। অতি সম্প্রতি জানতে পেরেছি, সে জন্য মূলত দর্শকদের রুচি নয়, বরং বাংলাদেশী অনুষ্ঠানের ওপর ভারতের শুল্ক আরোপই হচ্ছে দায়ী। হয়তো এ বিষয়টা দিল্লি শীর্ষ বৈঠকে উথাপন করা শেখ হাসিনা প্রয়োজনীয় বলেই বিবেচনা করেননি। হয়তো ভারতীয় চ্যানেলগুলোর ওপর একই রকম শুল্ক আরোপ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতকে অসন্তুষ্ট করতে চান না। কিন্তু বলিউডি সংস্কৃতির অত্যাচার যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে শিগগিরই বাংলাদেশী দর্শকদের রুচি-বিকৃতি ঘটবে। বাংলাদেশে তৈরী অনুষ্ঠান তারাও আর দেখতে চাইবেন না।
অস্ত্রের জোরে অন্যের দেশে ‘রেজিম চেঞ্জের’ যে দর্শন মার্কিন নিওকনজারভেটিভরা আবিষ্কার করেছিল, ঘৃণা আর ধিক্কারের মধ্যে সেটার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়েছে। ইরাক আর আফগানিস্তান এর প্রমাণ। নিওকনদের লেজে জড়িয়ে যারা শক্তিশালী হতে চেয়েছিল, তারাও নিজেদের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। পাকিস্তান তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ইয়েমেন আরেকটি দৃষ্টান্ত হতে চলেছে। বিশ্বের বহু দেশ এখন তাদের বাতায়ন খুলে দিচ্ছে আগামী দিনের এক নম্বর পরাশক্তি চীনের দিকে। আফিন্সকার বহু দেশ এবং ভেনিজুয়েলা ও ব্রাজিলের মতো ল্যাটিন আমেরিকারও কোনো কোনো দেশ হচ্ছে তার দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের দেশপ্রেমী চিন্তাবিদরা সেজন্যই ‘লুক ইস্ট’ পররাষ্ট্রনীতির সুপারিশ করেছিলেন। আত্মসমর্পণ নয়, চীনের সাথে যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নতিই ছিল তার সার কথা। সে লক্ষ্যেই এশিয়ান হাইওয়ের আওতায় টেকনাফ থেকে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ চীন পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের পরিকল্পনা হয়েছিল চারদলীয় জোট সরকারের আমলে। শেখ হাসিনার সরকার সম্ভবত বিশ্ব বলতে ভারতকেই চেনে। তারা এশিয়ান হাইওয়ে নিতে চায় বেনাপোল থেকে তামাবিল পর্যন্ত এবং বাংলাবাìধা থেকে আবারো তামাবিলে।
ভারতকে এই ডবল করিডোর দেয়ার অর্থনৈতিক লোকসান সম্বìেধ অনেক চিন্তাশীল বিশ্লেষক লিখেছেন। আমার মনে হয়, বাণিজ্যিক লোকসানের ব্যাপারটা এখনো যথেষ্ট আলোচিত হচ্ছে না। এটা প্রায় অনিবার্য যে, এসব পথের ট্রানজিট শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশে বাংলাদেশের শুল্কবিহীন তৈরী পোশাক ও নিটওয়্যার রফতানির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ উত্তর-পূর্ব ভারতে চলে যাবে।
‘সাতবোন’ নামে বর্ণিত উত্তর-পূর্বের সাতটি ভারতীয় রাজ্যের মুক্তিকামীদের সামরিক তৎপরতা এই করিডোর নির্মাণের ফলে বাংলাদেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যে পথে তাদের হত্যার জন্য ভারতীয় অস্ত্র যাবে, সে পথকে তারা সুনজরে দেখতে পারে না। তার চেয়েও বড় আশঙ্কা, চীন বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতের এই অবাধ চলাচলকে ভালো চোখে দেখবে না। অরুণাচল প্রদেশটি ভারতের দখলে থাকলেও তার একটা বড় অংশ চীন নিজের বলে দাবি করে। এ নিয়ে ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধও হয়েছিল। তারপর থেকে ভারত ওই অঞ্চলে তার সমর প্রস্তুতি বাড়িয়ে চলেছে। বেইজিং জানে, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে শুধু সরবরাহ পাঠাবে না, চীনের বিরুদ্ধে রণপ্রস্তুতির জন্য সৈন্য আর অস্ত্রশস্ত্রও যাবে সেই পথে। ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর অবাধ ব্যবহার করতে দেয়াকে একই রকম শঙ্কার চোখে দেখবে চীন।
মগজ ধোলাই?
‘সবগুলো ডিম এক ঝুড়িতে রাখা’, ‘এক চক্ষু হরিণ’ ইত্যাদি নানা উপমা ব্যবহার করা যায় ভারতের সাথে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সম্পর্কের ব্যাপারে। বিজ্ঞজনরা বলে থাকেন, সবটুকু সঞ্চয় একই ব্যাংকে রাখতে নেই। কিন্তু দিল্লি সফরে হাসিনা সেটাই করে এসেছেন। বাংলাদেশকে তিনি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সমরনৈতিক দিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়ে এসেছেন। প্রয়োজনবোধে ভারত এ বìধনকে আরো দৃঢ় করে আঁটবে­ অজগর যেমন তার শিকারকে পিষে মারে।
এ প্রশ্ন অনেকেই করছেন, শেখ হাসিনার ভারতনির্ভরশীলতা কেন এমন নিরঙ্কুশ? শুনেছি, এ ব্যাপারে কোনো পরামর্শ তিনি গ্রাহ্য করতে নারাজ। কেউ কেউ বলে থাকেন, তার প্রয়াত স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া ভারতপ্রীতি একটু কম করার পরামর্শ দিয়ে হাসিনার এতই বিরাগভাজন হয়েছিলেন যে, তাকে তিনি সুধাসদন থেকে বের করে দিয়েছিলেন। ড. ওয়াজেদ মিয়াকে শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
অনেকেই মনে করেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের মে পর্যন্ত দিল্লিতে অবস্খানের সময় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্খা র হাসিনার ব্রেন ওয়াশ করে দিয়েছিল। দিল্লিতে তাকে সামাজিকভাবে কারো সাথে দেখা করতে দেয়া হয়নি, সারাক্ষণ তার দেখাশোনা করেছিলেন র-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। হাসিনা তখন নিহত পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যের শোকে আকুল। যেকোনো মনোবিজ্ঞানী আপনাকে বলে দেবেন ব্রেনওয়াশ করার জন্য এর চেয়ে অনুকূল অবস্খা আর হতে পারে না। অনবরত রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে হাসিনার মনে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতার বিষ ঢুকিয়ে এবং ভারতকে তার একমাত্র রক্ষক ও সুহৃদ হিসেবে দেখিয়ে একটা ব্রেন ওয়াশ করা কোনো গোয়েন্দা সংস্খার জন্যই কঠিন কাজ নয়। উপরিউক্ত ধারণা আরো জোরদার হওয়া স্বাভাবিক এ কারণেই যে, ঢাকার একটা গুজব অনুযায়ী হাসিনার সংসারের চাকর-পরিচারকরা সবাই নাকি র-এর ছদ্মবেশী লোক।
রাষ্ট্রনীতির মধ্যে বিদেশী প্রভাবের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর লক্ষ্যে পাকিস্তানিরা একটা ভালো আইন করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, সর্বোচ্চ স্তরের অনুমতি না নিয়ে কোনো কূটনীতিক কিংবা আমলা কোনো বিদেশীকে বিয়ে করতে পারবেন না। আইনটি খুবই প্রাসঙ্গিক বলে বাংলাদেশও সেটা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সব শেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার (সম্ভবত তাদের একজন উপদেষ্টার স্বার্থে) সে আইনটি বাতিল করে দেয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে একটা বিষয় অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। শোনা যায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্খানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিয়ে করেছেন এক ভারতীয় মহিলাকে। স্ত্রী তার রাজনীতিকে প্রভাবিত করছেন কি না বলা যায় না, কিন্তু সম্ভাবনাটা একেবারে উড়িয়েও দেয়া যায় না। কোনো দলের চেয়ারপারসন এবং মহাসচিব যদি যেকোনো কারণেই হোক, বিশেষ কোনো দেশের প্রতি অতিমাত্রিক অনুরক্ত হন এবং সে দলটি যদি সরকার গঠন করে, তাহলে সে দেশের মুক্ত ও সুস্খ নীতি গ্রহণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রয়োজন গণভোট
শেখ হাসিনা দিল্লিতে যেসব চুক্তিতে সই করে এসেছেন, তার বিবরণ এখনো গোপন রাখা হয়েছে, যদিও সংবিধান অনুযায়ী বিদেশের সাথে কোনো চুক্তি সংসদের অনুমোদন ছাড়া কার্যকর করা যায় না। স্বভাবতই সব বিরোধী দল এবং নিরপেক্ষ সাধারণ মানুষ শঙ্কিত ও সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছেন। সরকারের উচিত, অবিলম্বে চুক্তিগুলোর পূর্ণ বিবরণ সংসদে পেশ এবং মিডিয়ায় প্রকাশ করা। সংসদ এখন কার্যত একদলীয় চাটুবাক্যের প্রতিযোগিতার আসর। এ সংসদের সিদ্ধান্তও এখন দেশবাসীকে সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়। এ চুক্তিগুলোর ব্যাপারে একটা গণভোট অবশ্যই নিতে হবে। উল্লেখ্য, বহু উন্নত দেশেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় বিতর্ক নিষ্পত্তির জন্য গণভোট নেয়া হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন আইন ও বিধির ব্যাপারে এর বিভিন্ন সদস্য দেশ বিভিন্ন সময় গণভোট করেছে।
জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে এককালের আওয়ামী লীগের আপসহীনতার কথা গোড়াতেই বলেছিলাম। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে দেশের স্বার্থবিরোধী এত যে কাণ্ডকারখানা হয়ে যাচ্ছে, সে সম্বìেধ সংসদের ভেতরে-বাইরে আওয়ামী লীগপন্থীদের কারো কণ্ঠেই প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে না। সেই আওয়ামী লীগের এবং তখনকার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের গুণগ্রাহী হিসেবে আমার জন্য সেটা রীতিমতো মর্মবেদনার ব্যাপার। আওয়ামী লীগে যারা এখনো দেশপ্রেমিক আছেন, তাদের আর নীরব থাকা জাতীয় স্বার্থের মারাত্মক ক্ষতি করবে। তাদের প্রতি আমার আকুল আবেদন, জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে নীরব থাকার দিন বিগত হয়েছে, এখন দেশের স্বার্থে সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে।
২২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×