somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাপ ------------------------------- (গল্প)

১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি আজম তালুকদার। নিতান্ত সাধারণ নাম, কিন্তু মাঝে মাঝে আমার কর্মে বিস্মিত হয়ে নিজেই নিজেকে অসাধারণ ভাবি। আমি অবশ্য বিশেষ কেহ না; আবার, হয়ত কেউ। আমার ক্ষমতা আছে এটা সত্যি, সেই হিসেবে আমি অসাধারণ বিবেচ্য। দুনিয়াতে টাকা থাকলে ক্ষমতা হস্তগত করা পান্তাভাত পচানোর মত সহজ; আমার তা আছে।
আমার বুদ্ধি বেশ, কুটিলবুদ্ধি বলতে পারেন। এই বুদ্ধিই আমার প্রধান হাতিয়ার। আপনি হাসছেন নাকি? নিজের ঢাক নিজেই পিটাচ্ছি বলে! হাসবেন না দয়া করে; আপনাকে একটা ঘটনা বলি, তাতে আমার সম্পর্কে হয়ত ধারণা পেতে পারেন।
আমার জীবন শুরু হয়েছিল গ্রামের মাদ্রাসায়, সুশিক্ষা পেয়েছিলাম কিনা আমার সে বিষয়ে ঢের সন্দেহ; কিন্তু, কথা দিয়ে মানুষকে কিভাবে তুষ্ট করতে হয় তার শিক্ষা আমি পেয়েছিলাম, এটি অনস্বীকার্য। আমার প্রথম ধূর্ততার পরীক্ষা হয়েছিল 'আমিল' পড়ার সময়। আমার হুজুর ছিল চরম বৃদ্ধ ব্যক্তি; অথচ সে সেই সত্তুর বছর বয়সেও তন্বী ললনাকে নিকা করে চতুর্থ বিয়ের সুন্নত পালন করতে তিনি দ্বিধা করেনি! যাই হোক, আসল ঘটনায় আসি। বলতে সংকোচ নেই, হুজুর পত্নী আমার বড়ই পিরিতের ছিল; আমার লোভ ছিল। সে লোভের লালসা চরিতার্থ করি আমি এক ভরা জোছনার রাতে। আমি আর হুজুরমশাই ফিরছিলুম মাদ্রাসা থেকে রাত দশ কি এগারটার দিকে! এত রাত্তিরে ফেরার অবশ্য কারণ ছিল। মাদ্রাসা ছুটি হত বিকাল পাঁচটায়, তারপর যখন সবাই আঙিনা ত্যাগ করত হুজুরমশাই তখন কোরআন তেলাওয়াত করতেন। সে প্রার্থনা স্থায়ী হত রাত্রি সাত থেকে আটটা পর্যন্ত।
তো হুজুরের বাড়িতে আসতে হলে একটা বাঁশের সাঁকো পার হতে হত তখন, নিতান্ত নড়েবড়ে সাঁকো ছিল ঐটি। আমরা ফিরতেছিলাম, হুজুরমশায় আমার সামনে; আমি অনতিদূরে সাঁকোর হাতুনী ধরে কৌমুদী আকাশ দেখতে দেখতে আসছিলাম।
হঠাৎ আমার হাত থেকে সাঁকোর হাতুনী ছুটে গিয়েছিল, গভীর নিকষ স্রোতসিনী খালে পড়ার উপক্রম প্রায়। আর তখনই বিদ্যুৎ-গতি আমার মাথায় পরিকল্পনাটা খেলে গিয়েছিল। আমি জোরে হাতুনীটা নাড়া দিয়েছিলাম। বৃদ্ধ হুজুরেরও আমারই মত অবস্থা হলো, তবে আরো করুণতর। পড়ে যাওয়ার ঠিক আগে তিনি আমার দিকে তাকালেন; সে চক্ষুদ্বয়ের দৃষ্টি ছিল নিরল, শীতল আর অবাক।
আমি যেন কিছু হয়নি এরকম ভাব নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলুম। আমার একার আগমনীতে হুজুর-পত্নী'র প্রশ্নের উত্তরে আমি বলেছিলাম, "উনি গঞ্জে গিয়েছেন দ্বি-প্রহরে, মাদ্রাসার ব্যাপারে চেয়ারম্যানের সাথে শলা-পরামর্শ করার জন্য। ফিরতে রাত হবেনে, কিংবা কাল আসবে। আমার ভাত দাও।" ইছা (ছোট চিংড়ি) মাছ দিয়ে পাকানো লাউের তরকারী দিয়ে আমি সুস্বাদু একটা ভোজন দিয়ে নিদ্রাযাপনে গিয়েছিলুম।
তাঁর শবদেহটা পাওয়া গেল দুইদিন পর অষ্টপ্রহরে দৌলতিবাজারের কাছে, স্রোতের টানে মাইল বিশেক চলে গিয়েছিল।
সমাজ আমাদের এক ছাদের নিচে তিন রাত্রি যাপনের আনন্দ মেনে নিলোনা। মাইরি বলছি, ঐ তিনরাত্রি ছিল নিষ্পাপ; কিন্তু, নির্বাক অথচ প্রত্যাশিত দারুণ শাস্তি মাথায় পেতে নিয়ে আমাকে হুজুর-পত্নী অবনীকে শাদী করতে হয়েছিল।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

বজলুল পা বাঁড়ানোর আগে আরেকবার গগণপানে তাকাল - ঈষাণকোণে মেঘ জমেছে। সকালে যদিও একপশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, তদাপি এখন মুষলধারে বৃষ্টি নামার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। বজলুল গায়ে গামছাটাকে আরো ভালো করে এঁটে নিল - একটু শীত ভাব করছে।
শরতের মৃদু বাতাস তার ত্রি-নিশি না কামানো দাঁড়িতে শিরশির অনুভূতির জন্ম দিল।
তাকে যেতে হবে আজম তালুকদারের বসতবাড়িতে। গাছ ছিলতে হবে ওকে, জমি নিড়ানী দিতে হবে। এবারে জমি বর্গায় চাষ হয়নি, টাকার অভাবে নিজের জমিটাও বন্দক আছে তালুকদারের কাছে।
বজলুল কি মনে করে যেন ছোট ছেলেটাকে ডেকে নিল সাথে, সাহায্য পাওয়া যাবে। আজ বিদ্যালয় গমন হয়নি ওর, কাকভেজানো বৃষ্টিতে সড়ক, জনপদ অশ্লীল কাঁদা মাখানো।
ডান হাতে ধরা কুড়ালটাকে বাম হাতে চালান দিয়ে পুত্রকে কাছে টেনে নিল বজলুল। ছেলের এলোমেলো, আহলাদি চুলে বিলি কেটে দিল।
"কিরে, মাকে বলিস না কেন চুল ছেঁটে দিতে?" শুধালো বজলুল।
"আমার এমনিতেই ঢের লাগে।" কন্ঠ ভাঙা স্বরে বললো নিমন। কৈশোরের জৌলুস তার দেহে।
"ধূর, পাগল ছেলে। মাকে চুল কেটে দিতে বলবি। মার দেয় না পাঠশালায়?"
"বারে, আমি ভালো ছেলে না। প্রতিদিন পড়া করে নিয়ে যাই।" গর্বিত স্বর নিমনের। "বরং আমি বানিয়ে বললে পন্ডিতমশাই অন্যদেরকে মারে।"
"ছিঃ, বাবা, এসব করে না। পাপ হয়।"
নিমন মাথা নিচু করল। পাপ হয়! হয়তোবা।

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

বেলা গড়িয়ে গেল সব কাজ করতে করতে। শালার, এতো খারাপ অবস্থা জানলে বজলুল কাজই করত না আগে। মাইনেটা আনার জন্য বসাখানাতে গেল বজলুল, ছেলেটা ঐখানে; আজম তালুকদারও বোধহয়।
হাতে ধরা কুড়ালটা মাটিতে রেখে গামছাটা দিয়ে ঘাম মুছল বজলুল। গা তীব্র গরম হয়ে আছে।
বসাখানায় ঢুকে তো চক্ষু চড়কগাছ বজলুলের। মাটিতে পড়ে আছে নিমন। বাঁ গালে রক্ত লেগে আছে ওর।
"কি হয়েছে, ওর? কি হল.... " কন্ঠে একরাশ উদ্বেগ বজলুলের।
"তোমার ছেলেরই দোষ।" আজম তালুকদারের বাঁজখায়ী গলা, শীতল। "একটা কাচের পুতুল আর কয়েকটা খেলনা ভেঙেছে ঐ পোলা। চাকর এসে মাইর দিল।"
"আপনার সামনে? কিভাবে ভাঙল?"
"আমার সামনেই তো ঘটল। হাত থেকে পড়ে।"
"আপনার সামনে ঘটল!" কাঁপা স্বরে বলে বজলুল।"আপনি বারণ করেননি চাকরটাকে?"
"চাকর মানুষ... এরা মানুষ মেরে আনন্দ পায়। আমি অবশ্য বারণই করেছিলুম। তা বাপু, যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে, টাকা নিয়ে বিদায় হও এখন; আর, ছেলেকে মাঝে মাঝে শাসন করো কিন্তু। "
আজম তালুকদারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ রক্তচোষার কথা মনে পড়ল বজলুলের। টের পাওয়া মুশকিল। চোখের সামনে যেন জ্বলসে উঠল এক টুকরো জমি, হিমানু'র কচি মুখটা; পাতিলের উৎসুক ভাত।
এক ঝাঁকড়ায় মাটিতে রাখা কুড়ালটা হাতে তুলে নিল বজলুল, আজম তালুকদার ঐতো বসা। বজলুলের মনে কোন পাপ বোধ সৃষ্টি হল না এবার।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৫৯
৩৪টি মন্তব্য ৩৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×