আমাদের বাড়িতে শত বছরের পুরানো কিছু জিনিস আছে,এর মাঝে একটি সিন্ধুক, কিছু কাঠা(ঝুড়ি) ইত্যাদি। ঝুড়িগুলো যেন কেমন অদ্ভুদ রকমের, না কাঠের না লোহার কিন্তু খুব আকর্ষনীয়। আমরা শীতকালে সকাল বেলায় ঐ কাঠা(ঝুড়ি)তে সরসের তেল দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে খেতাম। কৌতুহলবসত আমার দাদীর কাছে মাঝে মাঝে জানতে চাইতাম এই কাঠা কিভাবে তৈরী করা হয় ? তখন দাদী আমাকে বলত পড়ার সাথে বেশি বেশি লিখতে। তাহলে নাকি বেশি পড়তে হবে না, আর খুব তারাতারি কাঠা (ঝুড়ি) তৈরী হয়ে যাবে। আমি রহস্যের মাঝে থাকতাম! প্রায় বছরখানিক পর দাদী আমাকে ডেকে জানতে চাইলেন আমার নষ্ট করা খাতাগুলোর কথা। তখন গ্রামে কাগজওয়ালা খুব একটা যেতেননা বলল্লেই চলে। আমি আমার পুরানো খাতাগুলো দাদীর সামনে এনে দিলাম। দাদী আমাকে বলেন যে, তিনি আমাকে কাঠা (ঝুড়ি) বানানো দেখাবেন আমি তখন অনেক খুশি। দাদী আমাকে মজার এক কাজ করতে দিলেন, তা হল আমার নষ্ট করা খাতাগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাবে ছিরতে হবে। আমি খুব আনন্দের সাথে কাজটা শেষ করলাম। এর পর দাদী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ গুলোকে পানিতে ভিজিয়ে একটি পাত্রে রেখে দিলেন। প্রায় ১৫ দিন পার হয়ে গেল দাদী কাঠা (ঝুড়ি) তৈরী করে না আমি অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলাম। একদিন দাদী আমাকে মার কাছে জানতে পাঠালেন যে ভাত রান্নার পর যে ফেন বের হয়েছে তা যেন ফেলে না দেয়া হয়। মা রান্নার পর ভাতের ফেন রেখে দিলেন। দাদী আমাকে পাঠালেন ঐ পাত্র নিয়ে আসতে যেখানে কাগজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ গুলোকে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে। আমি নিয়ে আসলাম। তারপর দাদী জের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ গুলোকে পানি থেকে উঠিয়ে, পাটাতে বেটে নিলেন। বাটা শেষে ভাতের ফেনের সাথে তা মাখিয়ে নিলেন। আমি অবাক হয়ে দাদীর কাজ দেখতে লাগলাম। মাখানো শেষে দাদী আমাকে বললেন যে ঘর থেকে নতুন একটি মাটির কলস নিয়ে আসতে। আমি নিয়ে আসলাম, তারপর দাদী ঐ কাগজের ভর্তা গুলো কলসের পিঠে লাগিয়ে রোদে শুকাতে দিলেন। ৭ দিন শুকানোর পর তা একটি কাঠা (ঝুড়ি) তে পরিনত হল।
এখন আমি বড় হয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। দাদী পরকালে চলে গেছেন অনেকদিন হল, শুধু রয়ে গেছে স্মৃতি। যখন কম্পিউটার চালাই ডেস্কটপে দেখি রিসাইকেল বিন, তখন দাদীর কথা খুব মনে পরে। যারা শত বছর আগে নষ্ট করা খাতাগুলোর মাধ্যমে আকর্ষনীয় কিছু তৈরী করেছেন। তাদের কথা মনে হলে অনেক ভালো লাগে, অনেক আগে তারা কত আধুনিক চিন্তাধারার ছিলেন।
আমার মনে হয় আমাদের নষ্ট করা জিনিস বা ফেলে দেয়া জিনিস দিয়ে নতুন অনেক কিছু তৈরী করা সম্ভব। যেমন আমরা তাপ শক্তির কথা চিন্তা করি। এই তাপ শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরী হচ্ছে। আমাদের দেশেও তাপ শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরী হচ্ছে। এখানে কাঁচামাল হল ”কয়লা”। কয়লা আমাদের দেশের একটি প্রধান খনিজ সম্পদ। উন্নত বিশ্বে তাপ তৈরীর কাঁচামাল হিসেবে নষ্ট করা জিনিস বা ফেলে দেয়া জিনিস ব্যবহার হচ্ছে।
এখানে আমার কথা হল ঐসব দেশে আমাদের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক কম। আমাদের জনসংখ্যা বেশি। আর জনসংখ্যা বেশি মানে নষ্ট করা জিনিস বা ফেলে দেয়া জিনিসের পরিমানও বেশি। যদি সরকার এইসব নষ্ট করা জিনিস বা ফেলে দেয়া জিনিস রিসাইকেল করার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আমাদের দেশের খনিজ সম্পদের উপর থেকে চাপটা কমবে। আর লোডসেডিং ও কমবে আশাকরা যায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



