অপারেশন দরবারের চূড়ান্ত বৈঠকে ‘শপথ’ নেয় ১৪ সিপাহি
প্ল্যানার্স মিটিংয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জাকিরের প্রিম কোচিং সেন্টার ও বাস্কেটবল মাঠ
এই সেই কোচিং সেন্টার, যেখানে অপারেশন দরবারের বৈঠক হতোঃ
‘অপারেশন দরবার’-এর চূড়ান্ত বৈঠকে শপথ গ্রহণের চাঞ্চল্যকর তথ্য-প্রমাণাদি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে বিডিআর ট্র্যাজেডির ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটি। স্মরণকালের ভয়াবহ এই কিলিং মিশনে কে কোন দায়িত্ব পালন করেছে, কার অবস্থান কোথায় ছিল, কিভাবে অপারেশন সম্পন্ন করা হয়েছে, এতে বাইরে থেকে কে বা কারা সহযোগিতা করেছে অথবা সমর্থন জুগিয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তিতে তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তদন্তকারীরা আরো নিশ্চিত হতে পেরেছেন যে, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানার দরবার হলে অপারেশন বাস্তবায়নের আগে বিদ্রোহের হোতারা ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে চার দফা ‘প্ল্যানার্স মিটিং’ করেছে। তাদের এসব বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিডিআর ৫ নম্বর গেট সংলগ্ন ৪২/এ, মনেশ্বর রোড, হাজারীবাগের ‘প্রিম কোচিং সেন্টার’। ভাড়া করা বাড়িতে অবস্থিত এ কোচিং সেন্টারটির স্বত্বাধিকারী রহস্যময় এক ব্যক্তি সিভিলিয়ন, নাম জাকির। এই জাকির অবসরপ্রাপ্ত নায়েক সুবেদার কাঞ্চনের পুত্র। বিডিআর বিদ্রোহের খলনায়কদের সাথে প্রতিটি বৈঠকেই ছিল তার রহস্যময় উপস্থিতি।
প্ল্যানার্স মিটিং-১
৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি রফিক তদন্তকারীদের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে, চার দফা বৈঠকের প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৬ ফেব্রুয়ারি সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের বাস্কেটবল মাঠে। মাগরিবের নামাজের পর পূর্বনির্ধারিত এ বৈঠকে একে একে হাজির হয় ১৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি মঈন, একই ব্যাটালিয়নের সিপাহি মাসুদ, ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি সেলিম, সিপাহি কাজল, সিপাহি রফিক ও সিপাহি রেজাউল। কেউ যাতে টের না পায় সেজন্য তারা বাস্কেটবল মাঠে বসে আড্ডারছলে কথা বলে। সেদিন স্বাগত বক্তব্য রাখে সিপাহি রেজাউল। সে সবার উদ্দেশে বলেন, ‘দরবারে দাবি জানিয়ে কোনো লাভ নেই, অফিসারদের জিম্মি করে দাবি আদায় করতে হবে।’ তার এ বক্তব্যে সবাই একমত হওয়ার পর পরবর্তী মিটিংয়ে কাকে কিভাবে জিম্মি করা হবে তা নির্ধারিত হয়।
প্ল্যানার্স মিটিং-২
অপারেশনের লক্ষ্যে দ্বিতীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় জাকিরের প্রিম কোচিং সেন্টারের অফিস রুমে। এ বৈঠকের ব্যাপারে অত্যন্ত গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। বৈঠকে যোগদানের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম সেক্টরে কর্মরত হাবিলদার মহিউদ্দিন ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসে। এ সময় উপস্থিত ছিল ৩৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি শাহাবুদ্দিন, ২৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি তারেক, রেকর্ড উইংয়ের হাবিলদার মনির, সদর রাইফেলের সিপাহি আইয়ুব, রাইফেলস ইন্টেলিজেন্সের (আরএসইউ) হাবিলদার খাইরুলসহ ৮-১০ জন। বহিরাগতদের মধ্যে উপস্থিত ছিল জাকির ও তার শ্যালক অপু। বৈঠকে তাদের দাবিসংক্রান্ত একটি লিফলেট বানানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাকির তার স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে, লিফলেট বানানোর দায়িত্ব ছিল সিপাহি মঈনের ওপর। মঈন একটি খসড়া তৈরি করে দিলে তৎক্ষণাৎ জাকিরের কম্পিউটারে তা টাইপ করে দেয় জাকিরের শ্যালক অপু। বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় ১ ঘণ্টা পর মিটিং মুলতবি করা হয়। প্ল্যানার্স মিটিং-৩
জাকির তার স্বীকারোক্তিতে বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে লিফলেট পৌঁছে দেয়া হয়। ২১ তারিখের মধ্যে লিফলেট নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে যায়। লিফলেট পৌঁছানোর জন্য ফোনে যোগাযোগ করে হাবিলদার মনির। জাকিরের ছোটভাই কবির ধানমন্ডির এক প্রভাবশালীর অফিসে লিফলেট পৌঁছে দেয়। বেইলী রোডের একটি বাসায় যায় সিপাহি শাহাবুদ্দিন। বনানীতে যায় ডিএডি জলিল, ডিএডি হাবিব, হাবিলদার মনির, সিপাহি শাহাবুদ্দিন, সিপাহি তারেক ও সিপাহি আইয়ুব। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় লিফলেটের দু’টি কপি পৌঁছে দেয় সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি মফিজের শ্বশুর। ৩৫ রাইফেল ব্যাটালিয়নের নায়েক মতিউর স্বীকারোক্তিতে বলেছে, ২৩ ফেব্রুয়ারি ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের এক সৈনিকের বাসায় অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে লিফলেট বিতরণের বিষয়টি পর্যালোচনা এবং চূড়ান্ত পরিকল্পনার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিল বিডিআর বিদ্রোহের অন্যতম হোতা ডিএডি তৌহিদ, ডিএডি রহিমসহ তিন-চারজন।
প্ল্যানার্স মিটিং-৪ (চূড়ান্ত বৈঠক)
গ্রেফতারকৃত সিপাহি সেলিম রেজা ও সিপাহি কাজল আলীর স্বীকারোক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, অপারেশন দরবার-এর চূড়ান্ত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিডিআর ৫ নম্বর গেটের বাইরে ২ শ’ গজ দূরে ডান দিকে একটি টিনশেড বাসায়। তিন কক্ষবিশিষ্ট এই বাসাটি প্রিম কোচিং সেন্টারের একজন শিক্ষকের। এর একটি রুমে সাবলেট থাকত ১৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি জাকিরের শ্যালক। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় অনুষ্ঠিত এ চূড়ান্ত বৈঠকে ‘শপথ গ্রহণ’ করা হয়। এ সময় শপথ নেয় ৪৪ ব্যাটালিয়নের সিপাহি হাবিব, সেলিম, কাজল, হাসিবুল, মিজান, মতিন, ১৩ ব্যাটালিয়নের সিপাহি মঈন, রুবেল, মাসুদ, শাহাদাত, তোফাজ্জল, জহির, আরপি সিপাহি রেজাউল ও ৪৪ ব্যাটালিয়নের সিপাহি মতিন। তাদের ওপরই অপারেশনের মূল দায়িত্ব দেয়া হয়। সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, ডিজি ও ডিডিজিকে জিম্মি করা হবে। তাদের জিম্মি করার পর অন্য অফিসারদেরও জিম্মি করা হবে। কোনো প্রকার বাধা এলে ডিজি ও ডিডিজিকে গুলি করা হবে। তবে তাদের হত্যা না করে পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল সেই বৈঠকে।
পূর্ববর্তী বৈঠকগুলো কোচিং সেন্টার ও মাঠে হলেও চূড়ান্ত বৈঠকের ভেনু পরিবর্তন করে জাকিরের কোচিং সেন্টারের একজন শিক্ষকের বাসায় করার সিদ্ধান্ত হয়। কেননা তাদেরও ভয় ছিল, কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে কি না।
সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২২.০৩.০৯
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৩:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



