বাংলাদেশের বিস্ফোরণোন্মুখ নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে চ্যালেঞ্জ
ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদন
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বিডিআর বিদ্রোহের অবসান হলেও সৃষ্ট অনেক জটিলতার অবসান এখনো হয়নি। বরং আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ফ্রিডম হাউস এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এখানে সেটির অনুবাদ দেয়া হলো। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাগ্রহণের দু’মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বাংলাদেশ রাইফেলসে (বিডিআর) সৃষ্ট বিদ্রোহ বাংলাদেশে অনেক জটিলতার সৃষ্টি করেছে। এটা শুধু বাংলাদেশের নিরাপত্তার ওপরই হুমকি সৃষ্টি করেনি, স্বাধীনতার পর থেকে বিদ্যমান বেসামরিক-সামরিক জটিল সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে। বিদ্রোহীদের দাবিগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে সাদামাটা এবং এতে মূলত সামরিক বাহিনীর চেয়ে তাদের অবমূল্যায়নের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছিল। বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ৬৭ হাজার সদস্যবিশিষ্ট বাহিনীটি আধাসামরিক সংস্থা হিসেবে পরিচিতি পেয়ে আসছিল। ফলে সেনাবাহিনীর মতো তারা জাতিসঙ্ঘের অধীনে আর্থিকভাবে লাভজনক শান্তিরক্ষী অভিযানে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। অধিকন্তু যেসব সেনাকর্মকর্তা বিডিআরে নেতৃত্ব দেন, তারা প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আনুগত্যও দেখাতেন কম। এ ছাড়া বিডিআর সদস্যরা অভিযোগ করেন, এসব সেনাকর্মকর্তা তাদের অসুবিধাগুলো অগ্রাহ্য এবং বিশেষ সুবিধা থেকে তাদের বঞ্চিত করেন। বিডিআর দাবি করে, এসব হতাশা থেকেই বিদ্রোহটি উদ্ভব হয়েছিল। বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক ফলাফল ছিল আনুমানিক ৭৪ জনের মৃত্যু। তাদের অধিকাংশই সেনাকর্মকর্তা। তাদের মধ্যে বিডিআর প্রধানের স্ত্রীও ছিলেন। অধিকাংশ মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল গণকবরে, বিকৃত অবস্থায়। তবে বিদ্রোহের ভয়াবহ আকারের কারণে এটাকে কয়েকজন অফিসারের কৃতকর্মের বিরুদ্ধে আকস্মিক কোনো আক্রমণ হিসেবেও অভিহিত করা যায় না। বরং এটা ছিল একটি পরিকল্পিত বিদ্রোহ। আর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই বিদ্রোহের ব্যাপারে কোনো পূর্বাভাস দিতে না পারার মধ্যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর শোচনীয় ব্যর্থতাই প্রকট হয়েছে। বিডিআর’র একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। বাহিনীটিকে এমনকি শতাব্দী-প্রাচীন ইউরোপিয়ান ইউনিটগুলোর সাথেও তুলনা করা হতো। দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের অত্যন্ত প্রশংসনীয় অবস্থান ছিল। ১৭৯৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রামগর লোকাল ব্যাটালিয়ন গঠনের মাধ্যমে এর সোনালি ইতিহাসের সূচনা হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে জাতির হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে নেয় এবং তারা ’সীমান্তের অতন্ত্র প্রহরী’ হিসেবে অভিহিত হতে থাকে। একটি আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে বিডিআর’র মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান বাংলাদেশের জন্য দু’টি সুবিধা এনে দিয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সংগঠনটি সেনাবাহিনীর আওতামুক্ত থাকায় এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছিল। তবে ইতোমধ্যেই গুজব রটেছে বিডিআরকে সেনাবাহিনীর অফিসারমুক্ত করতে সরকারের একটি মহল এই বিদ্রোহে ইন্ধন দিয়েছে, যাতে একটি প্রাইভেট বাহিনী গঠন করা যায়। অন্য দিকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত টহল দেয়ার সময় বিডিআর ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে প্রায়ই সংগঠিত লড়াই একটি অত্যন্ত উত্তেজনাকর বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। স্থানীয় সংবাদপত্রে বাংলাদেশী ভূখণ্ডে বিএসএফ’র অনুপ্রবেশের খবরে দুই বাহিনীর মধ্যকার লড়াইয়ে ইন্ধন যোগাত। দুই দেশের মধ্যে মারাত্মক কিছু সমস্যা আছে। কিন্তু আধা সামরিক বাহিনী হিসেবে বিডিআর ও বিএসএফ’র উপস্থিতির ফলে সম্ভাব্য পূর্ণ যুদ্ধ থেকে রেহাই পাওয়ার একটা ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল। বিদ্রোহ অবসানের পর শেখ হাসিনা এফবিআই ও ব্রিটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ কামনা করেন। কারণ ক্রমবর্ধমান হারে গুজব সৃষ্টি হচ্ছিল যে, শুধু বেতন নিয়ে বিদ্রোহটি হয়নি এবং তাদের লক্ষ্য ছিল সরকার উৎখাত করা। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিদেশী সাহায্য গ্রহণে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে। আশা করা যায়, এর ফলে তদন্তের ফলাফল ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে ব্যবহারের জন্য তালাবদ্ধ না রেখে সবার কাছে প্রকাশ করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি উন্নত হবে। অবশ্য এ ইঙ্গিতও পাওয়া যায়, সরকার নিজে যে হুমকির মুখে পড়েছে, তা মোকাবেলায় নিজেকে যথেষ্ট শক্তিশালী ভাবছে না এবং সামরিক বাহিনীও উদ্বেগের সাথে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে। রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হুমকিগুলো মোকাবেলায় বেসামরিক প্রশাসন যখন ব্যর্থ হয় তখন সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের ইতিহাস রয়েছে এবং জনগণও সবসময় তা অসমর্থন করেন না। বস্তুত, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে বেসামরিক সরকারের কাছ থেকে সেনাসমর্থিত সরকারের দায়িত্বগ্রহণকে সাধারণ মানুষ ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতি ব্যাপকমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে পাঁচ বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে অভিহিত করছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের সর্বপ্রথম লক্ষ্য হিসেবে দুর্নীতি উচ্ছেদের কথা ঘোষণা করেছিল। দুর্নীতি দমন অভিযানের ধারণাকৃত (যদিও প্রশ্নবোধক) সাফল্যের অর্থ ছিল সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কাছে বেসামরিক সরকারের আনুকূল্যে এমনকি পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো। সামরিক বাহিনী মনে করেছিল দুর্নীতির এত বিস্তার লাভ করেছে, যা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক এবং বেসামরিক সরকারের পক্ষে তা মোকাবেলা করা কঠিন। শেখ হাসিনা অবশ্যই এই আশঙ্কায় ভীত। পূর্ববর্তী সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাথে তার খুবই খারাপ সম্পর্ক ছিল। সেই সরকারের আমলে ২০০৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে তার দেশে ফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল। এবং এর পরপরই জুলাইতে তিনি গ্রেফতার হন। একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও। বস্তুত পুরো ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল বাংলাদেশকে এই দুইজনের কবল থেকে মুক্ত করা। শুধু শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলেও এতে করে হাসিনা ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার খারাপ সম্পর্কের অবসান ঘটেনি। সত্যিকারের স্বাধীন বেসামরিক সরকার ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনের সামান্য পরই সৃষ্ট বর্তমান সঙ্কটের ফলে সামরিক বাহিনীকে অবিশ্বাস্য হতাশায় ফেলবে। আবারো তারা সেই আশঙ্কা অনুভব করবে। বাংলাদেশের সীমান্ত অরক্ষিত থাকায় চোরাচালানিদের অবাধ বিচরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অধিকন্তু সেনাবাহিনী বিডিআর’র নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করার পরপরই অনেক বিডিআর সদস্য অস্ত্র ও বিস্ফোরক নিয়ে পালিয়ে গেছে। সেই সাথে রয়েছে দুষ্কৃতকারীদের বিভিন্ন বিডিআর কম্পাউন্ড থেকে অস্ত্র লুটে নেয়ার ঘটনা। শেখ হাসিনার সরকারের জন্য প্রয়োজন হলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করা এবং জনগণের আস্থাভাজন হওয়া। অন্যথায় সামরিক বাহিনীর আবার ক্ষমতা গ্রহণের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আর সে ক্ষেত্রে তা হবে বাংলাদেশে বেসামরিক শাসন সুসংহত হওয়ার প্রয়াসে মারাত্মক বিপর্যয়। অধিকন্তু সেনাবাহিনী ফের ক্ষমতা গ্রহণ করলে তারা এত সহজে তা ত্যাগ করবে না। বাংলাদেশের টালমাটাল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর প্রেক্ষাপটে শাসনকর্মের মৌলিকতার মধ্যে এরকম অস্থিরতা দেশটির ভবিষ্যৎ নীতির স্থিতিশীলতা সম্পর্কে খারাপ আভাস দিচ্ছে।
সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ০১.০৪.০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




