গভীর রাতে ফোন পেয়ে চট্টগ্রামের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব ফাতেমা জোহরা চৌধুরী পড়ে যান দোটানায়। গুপ্তধন পাওয়ার লোভ তো আছেই, উপরন্তু রাজি না হলে সন্তানের অমঙ্গলের আশঙ্কা। অবশেষে যেই কথা সেই কাজ। রাজি হয়ে যান জিনের বাদশার প্রস্তাবে। নয় ভরি সোনার গয়না আর তিন লাখ ৮৬ হাজার টাকা তুলে দেন জিনের বাদশার হাতে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, পুরো ব্যাপরটাই ধাপ্পা। লোভে পড়ে হয়েছে সর্বনাশ। তখন শরণাপন্ন হন র্যা বের। র্যা ব-১-এর সদস্যরা জিনের বাদশার তিন স্যাঙাতকে গ্রেপ্তার করেছেন। তাদের বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে। গতকাল সোমবার বিকেলে র্যা ব-১-এর কার্যালয়ে এই তিনজনকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। এ সময় ফাতেমা জোহরা চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২২ অক্টোবর। ফাতেমা সাংবাদিকদের জানান, তাঁর কাছে ফোনটি আসে রাত তিনটার দিকে। জিনের বাদশা গলার স্বর বিকৃত করে কথা বলছিলেন। ওই দিন সকালে জিনের বাদশার কথামতো তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা হয়ে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে যান। সেখানে জিনের বাদশার প্রতিনিধি হিসেবে আসা এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন ছয় হাজার টাকা, দুটি সোনার চেইন ও এক জোড়া কানের দুল। এরপর জিনের বাদশা তাঁকে ফোন করে জানান, তাঁর জন্য বরাদ্দ করা সাতটি কলসের মধ্যে চারটি ফেটে গেছে। সেটি মেরামত করতে আরও সোনা ও টাকাপয়সা লাগবে। জোহরা চৌধুরী এবারও জিনের বাদশার দাবি মেটান। ২ নভেম্বর আবারও তিনি বগুড়া শহরের সাতমাথা মোড়ে গিয়ে বাকি টাকা পরিশোধ করেন। সব মিলিয়ে তিনি নয় ভরি সোনা ও তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা তুলে দেন জিনের বাদশার সমীপে। কিন্তু তারপর গুপ্তধনের আর হদিস নেই। বুঝতে পারেন, প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন। এরপর র্যা বের কাছে অভিযোগ করেন।
জোহরা চৌধুরী জানান, তিনি চট্টগ্রাম শহরের খুলশী এলাকার জাকির হোসেন রোডে থাকেন। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই, দুই সন্তান ব্যবসা করেন।
র্যা ব-১-এর কর্মকর্তা মেজর আইনুল মোর্শেদ খান পাঠান প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর র্যা ব-১-এর মেজর আহসানুল কবির ও এসএসপি কামরুজ্জামান তদন্ত শুরু করেন। তাঁরা প্রতারকদের ফোন নম্বরের সূত্র ধরে গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর উত্তরা থানার আবদুল্লাহপুর থেকে প্রতারক মো. কফিল উদ্দিন, মো. সাজু মিয়া (২২) ও মো. আবুল বাশার মিলনকে (২৫) গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারের পর তিনজনই প্রতারণার কথা স্বীকার করেন।
তিন যুবক জানিয়েছেন, তাঁদের মতো আরও ২০-২৫টি চক্র গোবিন্দগঞ্জে সক্রিয় আছে। তাঁরা প্রতিনিয়ত ‘জিনের বাদশা’ সেজে প্রতারণা করছেন। গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন এ পর্যন্ত ১২ জনকে প্রতারিত করেছেন বলে স্বীকার করেন।
র্যা ব কর্মকর্তারা জানান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ও কোমরপুর থেকে কাটাখালী বাজার পর্যন্ত এলাকায় বলতে গেলে কোনো বেকার যুবক নেই, নেই কোনো রিকশাচালক কিংবা দিনমজুর। তাঁদের পেশা জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ‘জিন করি।’ জিন সেজে বিভিন্ন প্রলোভন ও ভয় দেখিয়ে তাঁরা সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছেন।
গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের মধ্যে কফিল উদ্দিন অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অন্য দুজন লেখপড়া জানেন না। কফিল আগে রিকশা চালাতেন। অন্য দুজন কৃষিকাজ করতেন। তবে এখন ‘জিন করে’ ভালো আয় হওয়ায় কাজকর্ম সব ছেড়ে দিয়েছেন। তিনজনই বলেছেন, এলাকার অন্য যুবকদের দেখাদেখিতে তাঁরা এ পথে এসেছেন।
র্যা ব জানায়, তাদের কাছে তথ্য আছে, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের তাজপুর, চণ্ডীপুর, উত্তরপাড়া, সামসপাড়া ও রাঘবপুর এবং পার্শ্ববর্তী দরবস্ত ইউনিয়নের খলসি, কাতিয়াদহ, বিশুবাড়ী, মারিয়া, গন্ধববাড়ী গ্রামে এ চক্রের বিস্তার ঘটেছে। এসব এলাকায় অর্ধশতাধিক লোক ‘জিনের বাদশা’ হিসেবে পরিচিত। প্রতারণার জন্য চক্রের সদস্যরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রিকশা-ভ্যানচালক, কুলি ও দিনমজুর শ্রেণীর লোকজনকে ব্যবহার করছে। তারা দিনমজুর সেজে বিভিন্ন জেলায় অবস্থাপন্ন মানুষের বাড়িতে কাজ নেয়। সেখানে কিছুদিন কাজ করে গৃহকর্তার মুঠোফোন নম্বর ও বিস্তারিত পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করে। সে তথ্য তুলে দেয় চক্রের হোতাদের হাতে। এরপর তারা জিনের বাদশা সেজে মুঠোফোনে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে নানা প্রলোভনের ফাঁদ পেতে প্রতারণা করে।
প্রথম আলো থেকে কপি করা। এর পুর্বে ক্রাইম ওয়াচে এ বিষেয়ে একটি রিপোর্ট দেখেছিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১০ ভোর ৬:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



