মাদার তেরেসা।
ঔপনিবেশিক কলকাতায় একটি কনভেন্টের চার দেওয়ালের মাঝখানে একটি ভাবগম্ভীর প্রার্থনাময় জীবন অপেক্ষা করছিল একজন আলবেনিয় তরুণী নান-এর। কিন্তু, বুদ্ধের মতন ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেলের মতন তরুণীটির শরীরে লেগেছিল কলকাতার বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষের দুঃসহ জীবনের আগুনের আঁচ। আলবেনিয় তরুণীটি তারপর লম্বা একটি শ্বাস টেনে দেওয়াল ঘেরা নিরাপদ নির্জন প্রার্থনাময় জীবন পরিত্যাগ করে বাইরের বিক্ষুব্দ আলোয় বেরিয়ে আসে ... প্রথমে ফুটপাতে, তারপরে মানিকতলার সরু গলিতে ... তারপরে ঘিঞ্জি বস্তিতে । লোকজন তাকে ঘিরে ধরল ...সেও শুনল সভ্যতার সুবিধাবঞ্চিত মানুষজনের কথা, কোলে তুলে নিলেন তাদের উদোম কালো শিশুকে ...তারপর? তারপর দীর্ঘ ৪৫ বছরের সেই ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে শ্বাশত কালের পৃষ্ঠায় ...
থেরেসি দ্য লিসিয়ে; ‘যিশুর ছোট্ট ফুল’ ...আমরা নাম দিতে পারি নির্মলা ...
রোমান ক্যাথলিক চার্চের ইতিহাস পুরুষনিয়ন্ত্রিত। যে কারণে মাত্র তিনজন নারী রোমান ক্যাথলিক চার্চের দীর্ঘকালীন ইতিহাসে ‘সাধু’ উপাধি পেয়েছেন। থেরেসি দ্য লিসিয়ে ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। থেরেসি দ্য লিসিয়ে -এর জন্ম ফ্রান্সে ২ জানুয়ারি ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম জীবনে থেরেসি দ্য লিসিয়ে ছিলেন ফ্রেঞ্চ রোমান ক্যাথলিক কারমেলাইট নান। তাঁকে ‘যিশুর ছোট্ট ফুল’ও বলা হত। থেরেসি দ্য লিসিয়ে -এর কথা এই জন্যই বলা যে-১৯৩১ সালের ২৪ মে কলকাতায় আলবেনিয় একজন তরুণী নান যখন নতুন নাম নেওয়ার কথা ভাবছিল তখন তার ‘যিশুর ছোট্ট ফুল’ ...কথাই মনে পড়ছিল।
রিপাবলিক অভ মেসিডোনিয়া ও এসকোপজে শহর।
১৯৯১ সালে সাবেক যুগশ্লাভিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মেসিডোনিয়া, বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন নাম গ্রহন করে রিপাবলিক অভ মেসিডোনিয়া । এসকোপজে শহরটি এখন রিপাবলিক অভ মেসিডোনিয়া রাজধানী। ঐ এসকোপজে শহরেই ১৯১০ সালের ২৬ অগাস্ট একটি আলবেনিয় পরিবারে জন্ম হয় মাদার তেরেসার। তেরেসার জন্মের সময়ে এসকোপজে শহরটি ছিল তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত।
এসকোপজে শহরের দৃশ্য
আমরা যাকে মাদার তেরেসা বলে জানি তাঁর পরিবার প্রদত্ত নাম Agnesë Gonxhe Bojaxhiu. আলবেনিয় ভাষায় Gonxhe মানে হল, ‘গোলাপকুঁড়ি’। যা হোক, ভাইবোনদের মধ্যে অ্যাগনেস সবার ছোট। অ্যাগনেস-এর বাবা আলবেনিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯১৯ সালে এসকোপজে শহরটি আলবেনিয়ার সঙ্গে যুক্ত না-হলে অ্যাগনেস-এর বাবা ভয়ানক অসুস্থ্য হয়ে পড়েন, তারপর মারা যান।
এসকোপজে শহরের দৃশ্য
অ্যাগনেস এর তখন নয় বছর বয়েসে। যা হোক, বাবার মৃত্যুর পর অ্যাগনেস-এর মা অ্যাগনেস কে রোমান ক্যাথলিক হিসেবে গড়ে তুলতে থাকেন।
ছোট্ট অ্যাগনেস
ছোট্ট বয়েসেই নাকি মিশনারিদের গল্প শুনে ভারি অবাক হয়ে যেত অ্যাগনেস । ১২ বছর বয়েসেই নাকি ধর্মীয় জীবন বেছে নেওয়ার কথা ভেবেছিল অ্যাগনেস।
১৮ বছর বয়েসে গৃহত্যাগ করল কিশোরী অ্যাগনেস। (দেখেছি, যারা পৃথিবীর জন নির্বাচিত-তাদের পরিবার পায় না।) মা আর বোনদের অ্যাগনেস আর কখনও দেখেনি !
এসকোপজে শহরেই ছিল সিসটার লরেটোর মিশনারি। সিসটার লরেটোর মিশননারিরা কাজ করে ভারতে। মিশনের ভাষা ইংরেজি। ইংরেজি ভাষা শিখতে অ্যাগনেস আয়ারল্যান্ড গেল ।
১৯২৯ সাল। অ্যাগনেস ভারতে এল। প্রথমে দারর্জিলিং এ থেকে মিশনারির কাজকর্ম শিখল। ১৯৩১ সালের ২৪ মে; অ্যাগনেস কে। নতুন নাম নিতে হবে। নামের তাৎপর্যের বিষয়টির উল্লেখ আমি আগেই করেছি ... নির্মলা কিংবা ‘যিশুর ছোট্ট ফুল’ ...
কলকাতার পুবে লোরেটো কনভেন্ট স্কুল। শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন তেরেসা।
লোরেটো কনভেন্ট স্কুল, কলকাতা।
তো, লোরেটো কনভেন্ট স্কুল পড়াচ্ছেন তেরেসা। কিন্তু, চর্তুদিকের দারিদ্র তাঁকে বিন্দুমাত্র স্বস্তি দিচ্ছিল না। তারপর ১৯৪৩ সালে হল দুর্ভীক্ষ। কলকাতা হয়ে উঠল কঙ্কালসার মানুষের মৃত নগরী। ১৯৪৬ সালে সংঘটিত হল অনাকাঙ্খিত হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা। কলকাতা শহর আতঙ্কে ও শোকে নিমজ্জিত হল। তেরেসার তখন এই কথাগুলি মনে হল-
Where is my faith? Even deep down ... there is nothing but emptiness and darkness ... If there be God—please forgive me. When I try to raise my thoughts to Heaven, there is such convicting emptiness that those very thoughts return like sharp knives and hurt my very soul ... How painful is this unknown pain—I have no Faith. Repulsed, empty, no faith, no love, no zeal, ... What do I labor for? If there be no God, there can be no soul. If there be no soul then, Jesus, You also are not true ...
১৯৪৬ সাল। সকল সংশয় কাটিয়ে তেরেসা ‘শ্বাশতের ডাক’ শুনতে পেলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল কলকাতা থেকে দারজেলিং যাওয়ার পথে।
এরপর ১৯৪৮ সালে দরিদ্রদের মধ্যে মিশনারি কাজ আরম্ভ করলেন। কনভেন্ট ত্যাগ করার সংকল্প নিলেন। কনভেন্ট এর অভ্যেস ত্যাগ করার সংকল্প নিলেন । কেননা, তিনি যে মা হয়ে উঠবেন। মায়ের দেশে মা হয়ে উঠবেন। দূর্গার দেশে এক বিদেশিনী মা ... নীল পারের সুতির সাদা শাড়ি শাড়ি পরা শুরু করলেন তেরেসা। কাজটা কি সহজ হয়েছিল? সংকীর্ণমনারা কি ভুঁরু কোঁচকায় নি?
আমরা সেসব দুঃসহ কঠিন ও একাকী দিনগুলির কথা অনুমান করতে পারি।
সেই সময়ে
কলকাতায় জীবন বিসর্জন দেবেন বলে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহন করেন তেরেসা। বস্তিতে যেতে শুরু করেন ...
এভাবে তেরেসা মা হয়ে উঠতে থাকে।
যা সহজ ছিল না।
প্রথম প্রথম য়ে পথ ছিল বড় কঠিন।
৭ অক্টোবর ১৯৫০। তেরেসা প্রাতিষ্ঠানিক সেবা করার জন্য ভ্যাটিকানের অনুমতি পেলেন। ‘মিশনারিজ অভ চ্যারিটির’ স্থাপিত হল কলকাতায়। ক্ষুধার্ত, বস্ত্রহীন গৃহহীন, পঙ্গু অন্ধ কুষ্ঠরোগী -এক কথায় সমাজে যারা অবাঞ্ছিত তাদের সেবা করবে ‘মিশনারিজ অভ চ্যারিটি’। মাত্র ১৩ জন সদস্য নিয়ে ‘মিশনারিজ অভ চ্যারিটি শুরু হয়েছিল। আজ ৪,০০০ নান অনাথ আশ্রমগুলি দেখাশোনা করছে।
১৯৫২ সাল। কলকাতায় মৃত্যুপথযাত্রীদের জন্য একটি ভবন গড়ে তুললেন তেরেসা। কালীঘাটের একটি পরিত্যক্ত হিন্দু মন্দিরকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। নাম দিয়েছিলেন: নির্মল হৃদয়। ...বিনে পয়সায় দরিদ্ররা এখানে জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাত। মৃত্যুর সময় মুসলিমরা শুনত কোরাণ-এর আয়াত। হিন্দুরা পেত গঙ্গাজল, খ্রিসটানদের জন্যও আয়োজন করা হত অনুরুপ ধর্মীয় কৃত্যাদি। মা তেরেসা বলতেন, ‘ সুন্দর মৃত্যু। জীবনভর এরা পশুর মতন বাঁচলেও-এখন মরবে দেবদূতের মত।
কুষ্ঠরোগীদের জন্য আশ্রম খুললেন মা। নাম দিলেন: শান্তি নগর।
১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন নির্মলা শিশু ভবন। যে নির্মলা শিশু ভবনটি হয়ে উঠেছে গৃহহীন পথশিশুদের ঘর।
এভাবে তেরেসা মা হয়ে উঠেছিলেন।
যা সহজ ছিল না।
যে পথ ছিল বড় কঠিন ।
এভাবে তেরেসা মা হয়ে উঠেছিলেন ...
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ১০:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



