somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার তো কপিলে বিশ্বাস, প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ

০৮ ই অক্টোবর, ২০১১ সকাল ১১:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবি আল মাহমুদের কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’-এর আমার তো কপিলে বিশ্বাস/প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ-এই পঙতিটির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর । এবং কবি আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’-এর ভাঁজে-ভাঁজে বাংলার বিস্মৃত ইতিহাস নিহিত বলেই এই পঙতির ব্যাখ্যায় বাংলার প্রাচীন দার্শনিক ভাবধারার স্বরূপটি উদঘাটিত হয়ে যায়। বাক্যটি ঈষৎ দুরূহ হলেও প্রত্নতাত্ত্বিকের একান্ত ধৈর্য ও নিষ্ঠায় তার পাঠোদ্ধার করাও সম্ভব। এবং পরিশেষে যা হয়ে উঠতে পারে বাংলার নিগূঢ় দার্শনিক ইতিহাসের বিস্ময়কর এক বয়ান।
কবি (আল মাহমুদ) কপিলকে (কিংবা তাঁর দর্শনকে) বিশ্বাস করেন। কিন্তু, কে কপিল? আমরা বৈদিক আর্যসংস্কৃতিতে কপিল নামে একজন মুণির নাম পাই অবশ্য। তিনি? কিন্তু, একজন মুণি তো বৈদিক ধর্মেরই প্রচারক এবং পৃষ্ঠপোষক? কাজেই উল্লেখিত পঙতির দ্বিতীয়াংশের (‘প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ?’ ) সঙ্গে কবির বিশ্বাসের ভাবগত সামঞ্জস্য বজায় থাকে না। তাহলে সংগত কারণেই এই প্রশ্নটি উত্থাপিত হতে পারে যে -কপিল কি কোনও স্বাধীন মতবাদের প্রচারক ছিলেন?
পন্ডিত জহরলাল নেহেরুর লেখা The Discovery of India বইটি ধ্রুপদি গ্রন্থের মর্যাদা লাভ করেছে। বইটির পাতা উল্টিয়ে দেখি, অধ্যাপক রিচার্ড গার্বে লিখেছেন, In Kapila’s doctrine, for the first time in the history of the world, the complete independence and freedom of the human mind, its full confidence in its own powers were exhibited. ( P.184) অধ্যাপক রিচার্ড গার্বের এ বক্তব্যে আমরা কৌতূহলী এবং বিস্মিত হতেই পারি। উপরন্ত অধ্যাপক গার্বে কপিলের সময়কাল seventh century b.c. বলে উল্লেখ করেছেন । খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতকে প্রাচীন ভারতে মহাজনপদ গড়ে উঠছিল। কপিল, সম্ভবত তারও আগের কৌমসমাজের স্বাধীন মতবাদের প্রচারক ।
বাঙালি কবি আল মাহমুদ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন: আমার তো কপিলে বিশ্বাস ...। এ কারণে এই ভাবনাও অত্যন্ত যৌক্তিক কারণে উঁকি দেয়-প্রাচীন বাংলারই কোনও কৌম গ্রামে, যিশুর জন্মের সাত শ বছর আগে জন্ম হয়নি তো কপিলের? এ প্রসঙ্গে তপোব্রত সান্যাল লিখেছেন, “প্রাচীনকালের লেখকরা বঙ্গকে উপেক্ষা করলেও মহামুনি কপিলের সঙ্গে গঙ্গার সম্পর্কে কে মান্য করেছেন। সাংখ্য-দর্শনের প্রবর্তক কপিল যে বঙ্গবাসী ছিলেন, তার প্রমান আছে। সাংখ্যই ভারতের প্রাচীনতম দর্শন। বৌদ্ধধর্মের মূলতত্ত্বের উৎসও এই সাংখ্যদর্শন। বস্তুত, বুদ্ধের দু’জন গুরুই ছিলেন সাংখ্যমতাবলম্বী। সনাতন ধর্মাবলম্বী আর্যশাস্ত্রীরা কপিলের লোকায়ত সাংখ্যশাস্ত্রকে কখনোই মেনে নেন নি, কারণ কপিল বেদকে প্রমাণ বলে স্বীকার করেননি। মনে হয় এই কারণেই বৌদ্ধ-অধ্যুষিত বঙ্গ আর্যদের দ্বারা অবহেলিত হয়েছে।” (গঙ্গা: তত্ত্ব ও তথ্য। পৃষ্ঠা ১৬)।
এখানে উল্লেখ করি যে, প্রাচীন ভারতে ৬টি দার্শনিক মত ছিল। সাংখ্য, যোগ, মীমাংশা, বেদান্ত, ন্যায়, এবং বৈশেষিক। এই দার্শনিক মতগুলির মধ্যে সাংখ্য দর্শনের প্রবক্তা কপিল। সাংখ্য দর্শন প্রসঙ্গে Kim Knot তাঁর Hinduism ; A Very Short Introduction গ্রন্থে লিখেছেন: This dualistic and atheistic perspective focuses upon the distinctive nature of purusha,self or spirit, and prakriti,matter.(Page118) এতে করে বোঝা যায় সাংখ্য দর্শনের প্রবক্তা কপিল ছিলেন নিরেশ্বরবাদী। এর কারণ, কপিল বেদকে প্রমাণ বলে স্বীকার করেননি। কাজেই ‘আমার তো কপিলে বিশ্বাস/প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ?’ - এই পঙতির পাঠ অনেকখানিই স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।
‘প্রকৃতি ত্রিগুণাত্মক চঞ্চলা, পুরুষ অপ্রধান’- কপিলের এই উক্তিটি বহু প্রাচীন। এবং বাংলার বিদ্বদ্সমাজে সুপরিচিত। অনেকের মতে সাংখ্যদর্শন বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে নারীবাদী এবং এর প্রবক্তা কপিল ‘প্রকৃতি’ বলতে মূলত নারীকে বুঝিয়েছেন। বাংলাকে আজও ‘মাতৃতান্ত্রিক বাংলা’ বলে অবহিত করার এও এক কারণ। আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন, ‘বাউলসাধনায় নারীর একটি স্বতন্ত্র গুরুত্ব ও মূল্য আছে। নারী বা প্রকৃতি বাউলের সাধনসঙ্গিনী।’ (লালন সাঁইয়ের সন্ধানে। পৃষ্ঠা:৯৫) কপিলের সঙ্গে লালনের পারম্পার্য নির্ধারণের পর কপিল কে বাংলার প্রাচীন দার্শনিক ভাবধারার অন্যতম উৎস বলে মনে করা অসংগত এবং অযৌক্তিক হবে না।
কবি আল মাহমুদ গভীর আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন: ‘আমার তো কপিলে বিশ্বাস/প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ?’ বাঙালি কবির এরকম আত্মবিশ্বাসের উৎস আর কি হতে পারে যদি না তিনি মূলধারা থেকে অনুপ্রেরণা পান? কবি আল মাহমুদের এই পঙতিটি যেন প্রাচীন বাংলার দার্শনিক বিশ্বাস সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা দেয় । একই সঙ্গে প্রাচীন বাংলার স্বাধীন কৌমসমাজ সম্বন্ধে একটা ধারণা লাভ করি , যে আবহমান বাংলার কৌম সমাজের দার্শনিক ভাবনার মধ্যমনি ছিলেন কপিল -লালন যেমন বাউলদর্শনের মধ্যিখানে বিরাজমান, ঠিক সেরকম। কপিলও ছিলেন লালনের মতেই বেদবিরোধী স্বাধীন ভাবধারার বিশ্বাসী।

৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×