মারিয়া আকতার ২৮তম বিসিএস সাধারণ ক্যাডারে মোট ৬৫৭ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৭ জনই নিয়োগ পাচ্ছেন বিভিন্ন কোটায়।
মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সত্য ইতিহাস হচ্ছে প্রায় শতভাগ লোক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সেখানে ০.১২% মুক্তিযোদ্ধার সনদ প্রদান করে যে বৈষম্য করা হয়েছে তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। প্রকৃত অর্থে ১৯৭১ সালে দেশের গুটিকয়েক রাজাকার ছাড়া প্রায় সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযোদ্ধা। যে দেশের/সংগ্রামের জন্য কবিতা লিখেছে, যে বৃদ্ধ পিতা-মাতা মুক্তির জন্য জায়নামাজে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেছে, যে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার বা আশ্রয় দিয়েছে, যে শিশু শত্রুদের গোপন খবর বয়ে এনেছে, যারা মাঠে যুদ্ধ করেছে তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা।
কোটা গিলে ফেলছে মেধাকে! কোটার নামে বাকশালী কায়দায় বৈষম্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী।
মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তারা বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য যুদ্ধ করেছে। আর মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে সত্য কথা হলো এ দেশে ৯৮ শতাংশ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সেখানে মাত্র ০.১২ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেয়েছে এবং অনেকের সনদ পাওয়া নিয়েও বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। আর মাত্র ০.১২ শতাংশ পরিবার থেকে ৩০ শতাংশ কোটার অর্ধেকও কখনো পূরণ হতো না। ফলে সেখানে অন্য মেধাবীদের সুযোগ দেয়া হতো কিন্তু পিএসসি’র বর্তমান সুপারিশে সে পথকে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
সমাজের যেকোনো শ্রেণীর মানুষকে বিশেষ সুযোগ দেয়ার প্রয়োজনটা যেকোনো সমাজের জন্য অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেটা কখনো ৫০ শতাংশ বা ৫৫ শতাংশ হতে পারে না। আর প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তো অবশ্যই নয়। কারণ গাড়ির চালকের আসনে কোনো হেলপারকে বসানোর পরিণতি কী হতে পারে তা আমাদের প্রশাসনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। কোনো সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীকে যেখানে সহযোগিতা করার অনেক উপায় রয়েছে সেখানে অসংখ্য মেধাবীকে বাদ রেখে কম মেধাবীদের সুযোগ ড্রাইভার রেখে হেলপারকে চালকের আসনে বসানোর নামান্তর মাত্র।
আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও কিছু স্বঘোষিত সুশীলরা সম্পূর্ণ আবেগ ও অযৌক্তিক কারণে মুক্তিযোদ্ধা কোটা না কমানোর দাবি করছেন। পাশাপাশি বর্তমানে আমাদের দেশের মেয়েরাও কোটা নয় বরং তাদের যোগ্যতার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। কোনো কোটা ছাড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী নারী। প্রায় ২৬.২ শতাংশ নারী তাদের যোগ্যতায় শিক্ষক হতে পেরেছেন। সেখানে ১০ শতাংশ কোটা রাখা তাদের জন্য অমর্যাদাকর ও অপ্রয়োজনীয়।
এর পরও কোনো বিশেষ শ্রেণীকে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণীর চাকরির কিংবা আর্থিক সুবিধা দেয়া যেতে পারে। কিন্তু জাতির নীতিনির্ধারক ও দাতারা কোন যুক্তিতে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনে ৫০ শতাংশ কোটার সুপারিশ করেন তা মোটেই বোধগম্য নয়। এর অর্থ কি তারা আমাদের সিভিল সার্ভিসকে উন্নত দেশের তুলনায় অদক্ষ ও অযোগ্য রাখতে চায়? দেশের মেধাবীরা কোটার ব্যাপারে পিএসসি’র বর্তমান সুপারিশে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছে। পরিশেষে বলতে চাই একবিংশ শতাব্দীর অগ্রসরমান বিশ্বে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে অযৌক্তিক আবেগ পরিহার করে বাস্তবমুখী হওয়া দরকার।
২৮তম বিসিএসে মেধাবীদের চেয়ে কোটায় বেশি নিয়োগ হচ্ছে। এ বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে মোট ৬৫৭ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪৭ জনই নিয়োগ পাচ্ছেন বিভিন্ন কোটায়।
ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণদের ১৯০ জনের মধ্যে ১০০ জনই প্রাধিকার কোটায় নিয়োগ পাচ্ছেন। সাধারণ বাকি ক্যাডারের মধ্যে পুলিশে ১৮৯ জনের মধ্যে ৯৯ জন, নিরীক্ষায় ১৯ জনের মধ্যে ১০, আনসারে ১১ জনের মধ্যে ছয়, শুল্ক ও আবগারিতে ২৯ জনের মধ্যে ১৫, পররাষ্ট্রে ১৫ জনের মধ্যে আট, তথ্যে ৮৭ জনের মধ্যে ৪৬, ডাকে সাতজনের মধ্যে চার, করে ৪৬ জনের মধ্যে ২৫, ইকোনমিকে ৪৬ জনের মধ্যে ২৪ জন নিয়োগ পাচ্ছেন প্রাধিকার কোটায়।
প্রফেশনাল ক্যাডারের মধ্যে সহকারী সার্জন হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ৭২৪ জনের মধ্যে ২৪৭ জন, সহকারী ডেন্টাল সার্জনের ১০১ জনের মধ্যে ৩৩, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ক্যাডারে ১২৩ জনের মধ্যে ২৯ জনকে প্রাধিকার কোটায় নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছেন। এ ছাড়া প্রার্থী না পাওয়ায় প্রফেশনাল ক্যাডারের ৮১৩টি পদ শূন্য থাকছে।
এভাবে মেধার চেয়ে কোটায় বেশি নিয়োগ দেওয়ার কারণেই বাংলাদেশের জনপ্রশাসন দিন দিন মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে। মেধাবীরাও বিসিএসে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
পিএসসির চেয়ারম্যান সা’দত হুসাইন বলেছেন, সরকার যেভাবে কোটা অনুসরণ করতে বলেছে, সেভাবেই নিয়োগ-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পিএসসির করণীয় কিছু নেই।
জনপশাসনের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি এভাবে মেধার চেয়ে কোঠার গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয় তাহলে এ জাতির উন্নয়ন কিভাবে হবে?
মুল লেখক: মারিয়া আকতার , এস বি ব্লগ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



