বাস্তবে ফিরে আসেন রফিকউল্লাহ। কানেও তেমন ভালো শোনেন না তিনি। তবুও চেষ্টা করছেন ফকরুলের কথা শুনতে। ফকরুলের চেহারায় একটা নূরানী ভাব আছে। দুবার হজ্ব করে এসেছে। এখন নেতা। মফস্বলের প্রাণপ্রিয় নেতা। কিন্তু নূরানী চেহারাটার ভেতর যে কি আছে সেটা বোধহয় এই এলাকায় রফিকউল্লার চেয়ে ভালো কেউ জানেনা। এই ফকরুইল্লাকে তিনি জীবন্ত কবর দিতেন যদি পা টা সুস্থ থাকতো। চোখের সামনে ভেসে উঠে চল্লিশ বছর আগের সেই ভয়াল অন্ধকার রাতের কথা।
ঘরে মা, বাবা, ছোটভাই, আর সাত মাসের পোয়াতী বউটাকে রেখে যুদ্ধে গিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। দেশও তো মা। মাকে বাচাতে জীবন বাজী রেখে আদরের বউটাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধে। বউটার নাম ছিল জরী। মেজখালার ভাসুরের মেয়ে। একবারের দেখাতেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। বিয়ে করে যেদিন ঘরে তুলেছিলেন সেদিন মনেহয় বেহেশতের সব রোশনাই ঘরটাকে আলো করে দিয়েছিলো। মেয়েটা বড় লাজুক ছিলো। মাথায় এতবড় একটা ঘোমটা দিয়ে রাখতো সবসময়। রফিকউল্লার ইচ্ছে করতো সবসময় বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে। যেদিন জরী হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে বমি করে সেদিন আনন্দে নেচে উঠেছিলেন তিনি। রাতে একা ঘরে জরীকে কোলে তুলে ফেলেছিলেন খুশীতে। জরীর পেটে কান রেখে অনুভব করতে চেয়েছিলেন নিজের অনাগত সন্তানকে। জরী লজ্জায় লাল হয়ে শুধু বলেছিলো “আপনি একটা ইবলিশ”। আনন্দে পুলকিত হয়ে গিয়েছিলো মনটা।
বউটাকে ছেড়ে যেতে অনেক কষ্ট হয়েছিলো তার। জরী কিছু বলেনি। যাবার সময় শুধু টপটপ করে চোখের পানি ফেলেছিলো। তিনিও চোখের জল চেপে বাড়ীর সবাইকে সাবধানে থাকতে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ফিরে আসবেন একদিন। আবার ঘরে আনন্দের শিখা জ্বলে উঠবে। ফিরে এসেছিলেনও। কিন্তু আনন্দ নয় জীবনের সবচেয়ে বড় অঘটনকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন ঘরে।
রাত তখন তিনটার মত বাজে। যুদ্ধ করতে করতে পাশের গ্রামে যখন এসে পড়েছিলেন তখনই ধরা পড়েছিলেন রাজাকারদের হাতে। তাদের মাঝে নিজের গ্রামের ছেলে ফকরুলকে দেখে কিছুটা আশা পেয়েছিলেন যে এরা হয়তো জানে মারবেনা। জানে মারেনিও ফকরুল। তাকে বেধে মিলিটারীদের সাথে করে নিয়ে যায় তারই বাড়ীতে। দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার পর ঘুম ভেঙে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে সবাই। রাজাকার বাহিনীর সাথে নিজের ছেলেকে দেখে ডুকরে কেদে তাকে জড়িয়ে ধরে মা। বাবাও ঘুম ভেঙে দৌড়ে আসছিলেন। কিন্তু তখনই মিলিটারীরা গুলি করে তার লাশ ফেলে দেয় মাটিতে। শব্দ শুনে পাশের ঘর থেকে ঘুমকাতুরে ছোটভাইটাও ঘুম থেকে উঠে এ ঘরে আসে। দুটো গুলি তার নরম বুকটাকেও ছিদ্র করে দিয়ে চলে যায়। স্বামী সন্তানকে এভাবে মরতে দেখে চিৎকার করে উঠে মা। চিৎকার এসেছিলো রফিকউল্লাহর মুখেও। কিন্তু মুখে গোজা কাপড় ঠেলে তা বাইরে বের হতে পারেনি। ফকরুল আর তার বাহিনী টেনে হিচড়ে নিয়ে আসে জরীকে। রফিকউল্লাহর বিস্ফোরিত চোখের সামনে মিলিটারীরা তার মা আর ফকরুল জরীকে নিয়ে টানা হেঁচড়া শুরু করে দেয়। গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে মিলিটারীর হাত থেকে ছোটার চেষ্টা করে রফিকউল্লাহ। ফকরুল তখন জরীকে একটা মিলিটারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে বন্দুকটা দিয়ে আঘাত করে তার বামকানের একটু উপরে। মুহুর্তে রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে। প্রচন্ড ব্যাথায় দৃষ্টিটাও ঝাপসা হয়ে আসে। শুনতে পায় ফকরুলের কন্ঠ। “সালা ভারত কি দালাল, দেস স্বাধীন করেগা? বাংলা করেগা। বাংলা হোগি তেরি মা। দেখ সালা দেখ। তু দেখ। তুঝে মে মারুঙ্গা নেহি। জিন্দা মরেগা তু।”
ডানপায়ে গুনে গুনে দুটো গুলি করে ফকরুল। মাটিতে পড়ে যায় সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখের সামনে মায়ের উপর ঝাপিয়ে পড়ে সৈন্যরা। ফকরুল জোড় করে ছিড়তে থাকে জরীর গায়ের কাপড়। চিৎকার করতে থাকে রফিকউল্লাহ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আদরের বউটার শরীর রক্ত ভেসে যায়। জান বোধহয় তবুও ছিলো। ফকরুল সাতমাসের বাচ্চাটাকে বয়ে চলা পেটে দুটো লাথি মেরে সেটাও নিয়ে নেয়। নারকীয় উল্লাস শেষে মায়ের গায়ে গুলি করে চলে যায় মিলিটারীরা। চোখের সামনে মা আর বউকে ইজ্জত দিতে দেখবে কোনদিন কল্পনাও করেনি সে। মাথাটা কেমন যে চক্কর দিয়ে উঠে। একা ঘরে বসে চোখের জল ফেলতে থাকে রফিকউল্লাহ। মাথায় গন্ডগোল দেখা দেয়।
আজ দুপুরে এলাকার কিছু ছেলেপেলে গিয়ে তাকে নতুন পাঞ্জাবী লুংগি পড়িয়ে অনেকটা জোড় করেই নিয়ে এলো এখানে। কি নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা দেবে। তাকে কিছু টাকা হাতে গুজে দিয়ে বলেছে এখানে যা করতে বলা হবে তাই করতে। এখানে ফকরুলকে দেখে মনটা কেমন যেন বিষিয়ে উঠছে। ভাষণ শেষে ফকরুল সব মুক্তিযোদ্ধারদেরকে কিছু টাকা দেয়া শুরু করলো। তার কাছাকাছি আসতেই ক্র্যাচ হাতে উঠে দাড়ালেন রফিকউল্লাহ। ফকরুল তার হাতে টাকার একটা খাম গুজে দিলো। তারপর ঠান্ডা হাতটা যখনই তার কাধে রেখে দুটো চাপড় দিলো তখনই মাথাটা গরম হয়ে গেলো তার। প্রথমে ফকরুলের মুখে তারপর টাকাটায় থুথু মেরে ছুড়ে দিলো মাঠে। দুর্বল কন্ঠে চিৎকার করে উঠলো “কুত্তার বাচ্চা কোথাকার.........”
*********************************************
নিজের কিছু কথা
যুদ্ধ নিয়ে কিছু লেখা খুব কঠিন মনে হয় কারণ যুদ্ধটা করতে পারিনি, দেখতেও পারিনি। কিছু একটা লিখবো লিখবো করেও লেখা হচ্ছিলো না এতদিন।
আজকে দুপুর থেকে ইউনিভার্সিটিতে ডিপার্টমেন্টের ল্যাবে বসে কাজ করছিলাম। আমি রাতেও ল্যাবেই থাকি বেশীরভাগ সময়। আজ ঘন কুয়াশার মাঝে রাত ১২টায় একটু ডিপার্টমেন্টের বাইরে বেরিয়েছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন আগে চেতনায় ৭১ নামে একটা ভাস্কর্য বসানো হয়েছিলো। সেখানে দেখলাম অনেক বন্ধুবান্ধব, সিনিয়র, জুনিয়ররা এসেছে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে শহীদদের প্রতি। তাদের দেখেই হঠাৎ কিছু একটা লেখার প্রচন্ড তাগিদ অনুভব করলাম। ল্যাবে বসেই লিখে ফেললাম। এই ল্যাবটা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সফটওয়ার হাউস। অনেক কিছুর সাক্ষী। এই ল্যাবেই তৈরী হয়েছে দেশের প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিন পিপীলিকা। অন্ধদের কম্পিউটার চালানোর সহায়ক সফটওয়ার মঙ্গলদ্বীপ। এখানে কাজ করে গেছে প্রযুক্তির যোদ্ধারা। আমিও এখন কাজ করছি। গল্পটা লেখার সময় প্রচন্ড ঘেন্না হচ্ছিলো এই ফকরুল আজমদের উপর। জানিনা কোনদিন এদের বিচার হবে কিনা। সরকারের কাছে এরা কি পাবে জানিনা। তবে আমার কাছে এদের জন্য জমা আছে একদলা থুতু।
কুয়াশার ঝড়ে ভেজা চেতনায় ৭১ এর একটা অস্পষ্ট ছবি দিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১১ রাত ১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



