আমার প্রিয় পোস্ট

এক আরব কন্যার বাবার গল্প

১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:০৬

শেয়ারঃ
0 0 0

এটা এক বাবার গল্প। এক আরব জাহেল বাবার কথা।

রোজার ঈদের জামাতের শেষে ঈমাম সাহেব খুৎবা দিলেন। নানা প্রসঙ্গে বলতে বলতে হঠাৎ বলে বসলেন, "যার মেয়ে নাই, বাবা হবার আনন্দের অনেকটা থেকেই সে বঞ্চিত।" এটা পূত্র সন্তানকে অবহেলা করার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন নি, কন্যা সন্তানের মিষ্টতাকে ইঙ্গিত করেছেন। এরপর শুরু হল আসল কাহিনী।

ঘটনা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সময়ের। একজন এসে তাঁর কাছে বললেন, "আমি জীবনে যত পাপ করেছি তা যদি পৃথিবীর সব মানুষের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয় তবে সেই ভগ্নাংশই তার দোজখে যাবার জন্য যথেষ্ট। আমি কোনদিনই সৃষ্টিকর্তার ক্ষমা পাবনা।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার কাহিনী বলতে বললেন। লোকটা শুরু করলেন তার জীবনের করুনতম ঘটনা। (আমি সেই ব্যক্তিকে ১ম পুরুষ ধরে বর্ননা দিচ্ছি)

আমার স্ত্রীর গর্ভে একে একে সাতটা সন্তান জন্ম নেয়; কন্যা সন্তান। আমি এক জাহেল পিতা, লোকলজ্জার ভয়ে সব সন্তানকেই জন্মের পরপরেই জ্যান্ত কবর দিয়ে দেই। অষ্টম বার আমার স্ত্রী যখন গর্ভবতী, ব্যবসায়িক কাজে দীর্ঘদিনের জন্য আমি বাইরে ছিলাম। কয়েক মাস পর ফিরে এসে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, "কই, আমার সন্তান কই? এবার নিশ্চয় পুত্র সন্তান হয়েছে?"

স্ত্রী বললেন, "না, এবারও কন্যা সন্তান হয়েছিল। তুমি কন্যা সন্তান হলে তো জ্যান্ত পুঁতে ফেল, আমি সেই কাজটা এবার নিজ হাতে করেছি।"

শুনে আমি চুপ করে গেলাম। দিন যায়, মাস যায়। এর মধ্যে চার বছর মত অতিবাহিত হয়ে গেছে। একদিন হঠাৎ আমার সামনে ফুটফুটে সুন্দর একটা মেয়ে এসে হাজির। এসেই বাবা বাবা বলতে বলতে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। আমিতো হতবাক। দেখলাম, আমার স্ত্রী একটু দুরে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। আমার প্রশ্নবোধক দৃষ্টির জবাবে সে জানাল এটা আমারই কন্যাসন্তান, আমি বিদেশে থাকাকালিন সে জন্ম নেয়। তারপর তাকে এতদিন আমার চোখের আড়ালে রেখে মানুষ করে হয়েছে।

কি অদ্ভুত ফুটফুটে মেয়ে! আর মুখে কথার যেন খই ফুটছে। আমার দু'গাল চুমুয় ভরিয়ে দিচ্ছে আর বলছে, "বাবা তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? কেন আমার কাছে আসনি?" আমার মন যেন মোমের মত গলে গেল। এরকম সুন্দর একটা বাচ্চা, আমার? অদ্ভুৎ এক ভাল লাগায় ভরে গেল মন।

তারপরেই আমার ভেতরের আসল রূপটা প্রকট হল। এতো কন্যা সন্তান, একে কিভাবে রাখি। বড় হলে সে অন্যের ঘরে যাবে, গোলামী করবে আর সমাজে আমার মাথা হেঁট হবে। একে কোনমতেই রাখা যাবেনা। কিন্তু আমার স্ত্রীকে আমার মনোভাব বুঝতে দিলামনা। তাকে বললাম, "মেয়েকে আমার সুন্দর করে সাজিয়ে দাও। বাজারে নিয়ে যাব।" মেয়েকে আমার সাজিয়ে দেয়া হল। আমি বাজারের উদ্দেশ্যে তাকে নিয়ে চললাম।

বাজার এল, বাজার পেরিয়ে গেলাম। মেয়ে জিজ্ঞেস করছে, "বাবা, বাজারতো ফেলে এলে!" আমি বললাম, সামনে একটা কাজ সেরে এসে বাজারে খেলনা কিনে দেব তোমাকে" এই বলে তার হাত ধরে এগিয়ে গেলাম, লোকালয় ফেলে একটা নির্জন মরুপ্রান্তরে জনমনিষ্যির দৃষ্টিসীমার আড়ালে নিলাম তাকে।

সেখানে দাঁড়িয়ে গিয়ে তাকে একটা পাথরের ওপর বসিয়ে শুরু করলাম গর্ত খোঁড়া। মেয়ে বসে বসে দেখতে লাগল আর বলতে থাকল ফিরি গিঢে বাজারে সে কি কি নেবে; খেলনা পুতুল, হাঁড়ি পাতিল। আমাকে কি ভাবে কোরমা রান্না করে খাওয়াবে তাও বলল। তার মুখ একটুও বন্ধ ছিলনা।

গর্ত খোঁড়া শেষ হলে এবার আমার মামনির হাত-পা শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেললাম। এবার সে আসল ঘটনা টের পেল। তার মায়ের কাছে তাকে লুকিয়ে রাখার কারন আবছা ভাবে শুনেছে, মনে পড়ে গেল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মা আমার তাকে ছেড়ে দেবার জন্য অনুনয় করতে শুরু করল, "বাবা, বাবা গো, আমি তোমার সন্তানগো বাবা। আমাকে কেন তুমি মারবে বল? আমাকে ছেড়ে দাও। আমার মায়ের কাছে যেতে দাও। মা আমার পথ চেয়ে আছে।" কিন্তু আমি তাকে আরও শক্ত করে বেঁধে ফেললাম। এবার সে আরও আকূল অনুনয় শুরু করল, " বাবা, ও বাবা, আমি তোমার কাছে কক্ষনও কিচ্ছু চাইবনা। আমাকে কোন খেলনা দিতে হবেনা। এমনকি তোমাকে বাবা বলেও ডাকবনা-তুমি যদি না চাও। কখনও তোমার সামনেও আসবনা। কিন্তু আমাকে মেরে ফেলনা, বাবা।"

তার এমন আকূল আর্জিতে পাথর গলে যাবার কথা কিন্তু তখন আমার যে কি হয়েছিল জানিনা। কোন শয়তান আমার ওপর ভর করেছিল। তার কান্না আমার ভেতরের রাগকে শতগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

আমি তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম গর্তের ভেতর। সে তখনও কাঁদছিল আর বলছিল" বাবা, বাবা, আমাকে মায়ের কাছে যেতে দাও। আমি মা'কে একবার দু চোখ ভরে দেখতে চাই। তুমি আমাকে ছাড়া ফিরে গেলে মা কে কি জবাব দেবে? মা আমাকে না দেখে মরেই যাবে। আমাকে তুমি নিয়ে চল বাবা।"

আমি আর তার কন্ঠ সহ্য করতে পারছিলাম না। তার মুখ চিরতরে বন্ধ করার জন্য ইয়া বড় এক পাথর তুলে তার দিকে ছুঁড়ে মারলাম। পাথর গিয়ে তার মাথায় লাগল। রক্ত ছিটে এসে আমার গায়ে পড়ল। মা আমার কয়েকবার ছটফট করে নিথর হয়ে গেল।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাকে ক্ষমার বিষয়ে কি বলেছিলেন তা না হয় থাক। কিন্তু আমি দেখলাম আমার দু'চোখ বেয়ে জলের ধারা সমানে বয়ে যাচ্ছে। একজন কন্যার পিতা হয়ে এমন ঘটনা সহ্য করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। কিন্তু এমন ঘটনা তখন অহরহ ঘটেছে। বিশ্বের অনেক স্থানে এখনও ঘটছে।


 

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:০৮ | বিষয়বস্তুর স্বত্ত্বাধীকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:৩০
রোডায়া বলেছেন: হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কি বলেছিলেন দয়া করে সেটা বলেন৷
১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:৪০

লেখক বলেছেন: আপনি বুঝেছেন অবশ্যই।

১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:৩৯

লেখক বলেছেন: সাংঘাতিক। ভাবাই যায়না।

নিচে আমার মেয়েকে নিয়ে একটা লেখার লিঙ্ক দিলাম।
Click This Link

৩. ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:৩৮
রাত বলেছেন: আইয়ামে জাহেলিয়াতের (বানান ভুল হতে পারে) যুগে কন্যা সন্তানকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হত, এটা জেনেছি স্কুলের পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে।

আপনার লেখাটা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নাম সহ ঘটনা পড়ে লেখাটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার ইচ্ছা করছে। লেখাটার তথ্যসূত্র জানান, লেখাটা সম্পূর্ণ করুন এবং আমাদের নবিজী কি বলেছিলেন সেটাও জানান।

অপেক্ষায় থাকলাম।
১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:৪৪

লেখক বলেছেন: লেখক বলেছেন: শুরুতেই বলেছি এটা ইমাম সাহেবের মুখে শোনা। তথ্য সূত্র তাঁর কাছে পেলে অবশ্যই জানাব। তবে এ ধরনের ঘটনা যে বিরল না এটা তো সত্যি।

নবিজী বলেছিলেন, অন্তরে প্রকৃত অনুশোচনা হলে ও কায়মনে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ্ অবশ্যই ক্ষমা করেন।

৪. ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:৫৮
নিঃসঙ্গ বলেছেন: এই ঘটনা টা অনেক আগের শোনা তবে শেষে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কি বলেছিলো ঠিক মনে পরতেছেনা :(
১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১:০৫

লেখক বলেছেন: নবিজী বলেছিলেন, অন্তরে প্রকৃত অনুশোচনা হলে ও কায়মনে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ্ অবশ্যই ক্ষমা করেন।

১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ১০:৪২

লেখক বলেছেন: বুক ভেঙ্গে যাবার মত।

৬. ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১:১৮
রাত বলেছেন: ধন্যবাদ, শুরুটা খেয়াল করিনি।
১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ১০:৪২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ

৭. ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১:৩০
মোহাম্মাদ আব্দুলহাক বলেছেন: আমি দোয়া করেছিলাম ইয়া আল্লাহ আমাকে দুটি মেয়ে দিয়ে আমি নবীজী (সঃ) এর সাথে বেহেস্থ যেতে চাই। আমার দুটি মেয়ে হয়েছে বড় মেয়ে আগামী বছর কলেজে যাবে। আমার মেয়েদের জন্য দোয়া করবেন। একবার এক ইংলিশ মহিলা বলেছিল, তুমিত খুব সাহসী। আমি বলেছিলাম, আমি প্রমাণ করব মেয়ের অধীকার ছেলের চেয়ে বেশী এবং মেয়ে হল মানবতার মেরুদণ্ড। তবে মাঝে মাঝে চিন্তিত হওয়ার কারণ হল আমার আবার অন্ধযোগ ফিরে যাচ্ছি।
১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ১০:৫০

লেখক বলেছেন: আপনার যাত্রা সফল হবে ইনশাআল্লাহ্। আন্তরিক দোআ রইল। ফি আমানিল্লাহ্।

৮. ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ২:৪০
প্রবাস কন্ঠ বলেছেন: @মোহাম্মাদ আব্দুলহাক, সাব্বাস

ভালো লিখেছেন +
১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ১১:০২

লেখক বলেছেন: অবশ্যই তিনি চমৎকার লিখেছেন।

৯. ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ ভোর ৪:৪৯
কঁাকন বলেছেন: আমারো মনটা খারাপ হয়ে গেলো
১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ১১:০৩

লেখক বলেছেন: মন খারাপ করে দেবার জন্য দুঃখিত। খুব হৃদয় বিদারক ব্যপার এটা।

১০. ১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ ভোর ৬:৫৪
কোলাহল বলেছেন: আগেই জানি ঘটনাটা। খুবই মর্মান্তিক।
১৪ ই অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ১১:০৩

লেখক বলেছেন: খুবই হৃদয় বিদারক

১১. ২১ শে অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ১১:৪২
এম জেড আই ডাল্টন জহির বলেছেন: আসলে এইতো জীবন , ..................
খুবই ভালো লিখেছেন,
আপনাকে ধন্যবাদ.
http://www.daltonzahir.blogspot.com
২১ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১০:৩২

লেখক বলেছেন: আপনার নাম ব্লগে এসে অনেক শুনেছি। প্রথম প্রথম সবাই প্রশ্ন করেছে আমি 'সেই' ডালটন জহির কিনা। জেনেছি, ডালটন নামে একজন খুব প্রমিনেন্ট মানুষ আছেন। ডালটন নামটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আনকমন, তাই ইচ্ছে ছিল আলাপ করার।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ব্লগস্পটটা প্রিয়তে রাখলাম।

কথা হবে।

 

মোট সময় লেগেছে ১.৩০৮১ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আমি মানুষের পায়ের কাছে
কুকুর হয়ে বসে থাকি,
তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে।

রক্তের গ্রুপঃ এ+

রাজশাহীতেই আছি।...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ