স্কুল ছেড়ে আসলাম আজ দুদিন। আগামী কাল মাদরাসায় যেতে হবে। মন খুব খারাপ। বিশেষ নজরদারিতে আছি। আব্বা আমার বড় এক বোনকে বললেন, ওর দিকে খেয়াল রাখিস। যেন বাহিরে না যায়।’ আছরের পর থেকে মাগরিব, সময়টা এমন, যারা মানুষকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এ সময়টাতে তারাও যেন উদাসী হয়ে যায়। আপা গেলেন পাশের বাড়ীর আলেয়ার সাথে সাপ-লুডু খেলতে। আমাকে সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। যাতে পাহাড়াদারির কাজও হয় আবার খেলাও যায়। আমার মন যেতে চাইল না। কারণ অবশ্য অন্য। তা হলো আমি খূব লাজুক। বিশেষ করে মেয়েদের দেখলে মাথা তুলতাম না। বাড়ীতে কোন মেয়ে ঢুকলে আমি বাশ ঝড়ের মধ্যে পালিয়ে থাকতাম। যখন শুনতাম চলে গেছে তখন বেড় হয়ে আসতাম। এখনো নিজ স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন মেয়ের চোখের দিকে চেয়ে কথা বলতে পারি না। এমনকি নিজের বোনদের সাথেও না। এটা আমার স্বভাব| আমিও নিজের এ স্বভাবটাকে নিজেই পছন্দ করি না। কিন্তু ছেড়ে দিতে কি অনুশীলন করতে হয় তাও জানি না। অবশ্য আমার স্ত্রী এ স্বভাবটার খূব প্রশংসা করে।
এ নিয়ে স্কুল জীবনেও অনেক বিরম্বনা পোহাতে হয়েছে। মেয়েদের সাথে তেমন কথা বলতাম না। সহপাঠি রুনা বলত, হুজুরের ছেলে তো, মেয়েদের সাথে কথা বললে পাপ হয়ে যাবে, তাই আমাদের সাথে কথা বলে না। সপ্না বলত, হুজুরের ছেলে তাই অহংকারী। এ জন্য আমাদের সাথে কথা বলে না। যত দোষ সব হুজুর আর হুজুরের ছেলেদের, কিন্তু আমার স্বভাবটা কেহ বুঝতে চাইল না। কাজল ছিল অবশ্য ব্যতিক্রম। সে জানতো আমার থেকে কথা কিভাবে আদায় করতে হয়।
যাই হোক, আপা যখন আলেয়ার কাছে যাওয়ার জন্য বের হল, তখন হঠাৎ মনে জাগল, স্কুলটা শেষ বারের মত একটু দেখে আসি।
এক দৌড়ে গেলাম স্কুলে। তখন সে স্কুলের দরজা জানালা ছিল না। এখন অবশ্য তিন তলা দালান। প্রথমে ঢুকলাম নিজের ক্লাশ চতুর্থ শ্রেণী কক্ষে। যেখানে আমি বসতাম সে জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেক্ষণ। কাজল যেখানে বসত সে জায়গাটাতে হাত রাখলাম। হৃদপিন্ড যেন অচল হয়ে আসছে। আমার বসার জায়গাটা অবশ্য সারেরা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কাজল বসত মেয়েদের বেঞ্চির অপর মাথায়। দুবেঞ্চির দু মাথাকে বিন্দু ধরে যদি সরল রেখা টানা হয় তাহলে একটি ক্রিভুজ হবে। তখন আমি সরল রেখার একবিন্দুতে কাজল অপর বিন্দুতে। তার একটু মাস্তানী ভাব ছিল। জোর করেই এ জায়গাটা নিজের দখলে রাখত।
মনের মত করে খুব কাঁদলাম। বাধা দেবার কেহ ছিল না। পরে চলে আসলাম বাসায়। মাগরিবের পর আব্বা আমাকে নিয়ে বসলেন। বুঝালেন, এই যে স্কুলে বাংলা, অংক, ইংরেজী পড়ানো হয় এগুলোর উদ্দেশ্য হল নিজে ভালভাবে খেয়ে পরে কিভাবে বেঁচে থাকা যায়, সেই ধান্ধা ছাড়া আর কিছু না। এ দ্বারা অন্য মানুষের উপকার হয় না। অন্তহীন পরকালিন জীবনে কোন কাজে আসে না। আর মাদরাসায় পড়লে যদিও দারিদ্র জীবন বেছে নিতে হয় তবুও তা আখেরাতে মুক্তির পথ করে দেয়। দুনিয়াতে ভালভাবে জীবন যাপন করার জন্য তো জন্তু জানোয়ারগুলো মেহনত করে। আমরা মানুষ হয়ে তা করব কেন?
আব্বার নসীহতে হৃদয় কিছুটা গলল ঠিকই কিন্তু অনেক প্রশ্ন থেকেই গেল।
আব্বা যখন তার নসীহত করে যাচ্ছিলেন তখন আপা হাটে হাড়ি ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করল। সে আব্বাকে সাপোর্ট করে বলল, আব্বা ওর স্কুল মাদরাসার পার্থক্য নিয়ে মাথা ব্যাথা নয়। তার মন পুরে যায় কাজলের জন্য। আব্বা বললেন, কাজল কে? সে বলল, ঐ যে, যে মেয়েটির সাথে রাস্তায় হাত ধরে আপনি হাটতে দেখেছেন! আব্বা খুব উত্তেজিত হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হাছছোইও? আমি দু দিকে মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম। সে দিন হা বললে আমার খবর ছিল।
মেয়েরা যেন বাপের সাথে কথা বলতে কোন ভয় পায় না। আমি দেখতাম, যে কথা আব্বাকে বলতে আমরা ছেলেরা ভয় পেতাম, সংকোচ করতাম, বোনেরা সে কথা নিসংকোচে বলে দিত আব্বার কাছে। ব্যাপারটা এখনো আমার কাছে আশ্চর্যের বিষয়।
[email protected]
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




