ঘটনা-১: গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি বরিশাল শহরের হোটেল আলী ইন্টান্যাশনালে প্রকৌশলী জহির তার স্ত্রী শোভাকে জবাই করে খুন করে। জহির তার স্বীকরোক্তিতে জানায়, তার স্ত্রী তাকে শারিরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করত। এমনকি ত্র্রিশ দিনের পচিশ দিনই তার স্ত্রী তাকে মারধোর করত। সর্বশেষ গত ১৪ ই ফেব্রুয়ারি (খুনের আগের দিন) ঝালকাঠির একটি বিবাহ অনুষ্ঠানে বহু সংখ্যক মানুষের সামনে বসে স্ত্রী শোভা নিজের জুতা দিয়ে জহীরের মুখের উপর পিটিয়েছে। তারপর একটি গ্লাস তার দিকে ছুড়ে মেরেছে। জহীর তখন হাত জোর করে তার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। তাতেও সে শান্ত হয়নি।
ঘটনা -২: গত ১৭ ই ফেব্রয়ারি রাত দেড়টার দিকে পাশের ফ্লাট থেকে মারামারির শব্দ আসতে থাকে, সাথে চেচামেচি। প্রতিবেশীরা ঘরে ঢুকল। দেখা গেল স্বামী-স্ত্রী দুজনই রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হল। দু জনই মারামারি করে একে অন্যকে আহত করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দু জনের কেহ অন্য জনের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ জানায়নি। তারা বলেছে, এটা আমাদের নিজেদের ব্যাপার। মাঝে মাঝে এ রকম হয়েই থাকে। দু জনই ভাল মানের চাকুরী করে।
ঘটনা - ৩: জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখের একটি ঘটনা। তিনটি ছোট ছোট সন্তান রেখে একজন মা হঠাত মারা গেলেন ষ্টোক করে। তার কোন রোগ ছিল না। বয়স ২৮-৩০। সমাজের সকলে তার অকাল ও হঠাত মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ল। এমনকি যারা তাকে চেনে না তারাও ব্যথিত হল ছোট সন্তানদের লালন-পালনের বিষয়টি ভেবে। কিন্তু আশ্চর্য জনকভাবে তার স্বামীর মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া নেই। সে স্বাভাবিক। বরং দেখা গেল স্ত্রী জীবিত থাকাকালীন সময়ের চেয়ে বেশী স্বাভাবিক ও আনন্দিত। লোকেরা সন্দেহ করতে থাকল। এ সকল সন্দেহ দেখে প্রথম মুখ খুলল মেয়েটির ছোট বোন। সে বলল, আমি জানি আমার বোন তার স্বামীকে খুব মারধর করত।
লোকজন এ ব্যাপারে যখন মৃতের স্বামীকে প্রশ্ন করল, সে বলল, আমাকে মেরে ফেলার জন্য কয়েকবার সে চেষ্টা করেছে। এমনকি সে অণ্ডকোষ চেপে কয়েকবার আমাকে প্রায় আধ-মরা করেছিল। আর বলেছিল, এভাবে একদিন আমি তোমাকে শেষ করে দেব।
ঘটনাগুলোতে আমি কারো পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছি না। ঘটনাগুলো আমাদের সমাজে যারা বড়লোক ও শিক্ষিত তাদের ঘরেই ঘটেছে। যে খুন করেছে সে অবশ্য নরপিচাশ। ত্র্রিশ বছর একটি মানুষের সাথে বসবাস করে তাকে যে খুন করতে পারে, তাকে আমরা কি বিশেষণে ভুষিত করতে পারি তা আমার জানা নেই।
এমন একটা সময় ছিল যখন স্ত্রীরা স্বামীদের সেবা করে গর্ববোধ করত। এক সময় মুরব্বীদের দেখতাম স্বামীভক্ত নারীদের ইতিহাস পাঠ করতে। তারা পাঠ করে আমাদেরও শুনাতেন। বর্তমানকালে স্ত্রীরা স্বামীদের সাথে দুর্ব্যবহার করে আনন্দ পায়, গল্প করে বেড়ায়। মানুষের সামনে স্বামীকে অপমান করে মজা পায়। নির্মলেন্দু গুণ ঠিকই বলেছেন : ইলেক্ট্রিক সভ্যতা নারীকে স্বামী সেবার দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে . . ।
আজকালের নারীরা মনে করে নিয়েছে স্বামীর সেবা না করা, তাদের কথা না শুনা, তাদের খাটো করে দেখানো, বোকা বলে পরিচিত করা, তার উপর নিজেকে কর্তা বলে জাহির করা হল আধুনিকতা এবং সভ্যতা। এতেই আছে নারীদের মুক্তি ও অগ্রগতি। আর স্বামীর চাওয়া পাওয়ার প্রতি খেয়াল রাখা হল একটি সেকেলে পশ্চাদপদ ভাবনা।
রাস্তা-ঘাটে চলাফেরা করতে অনেক কিছু দেখতে হয়, শুনতে হয়। দেখে শুনে চুপ করে থাকাও যায় না। মেয়েদের কথা-বার্তা শুনে আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না তারা স্বামীদের নিয়ে কতটা ভাবেন। তারা পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তানাদি এমনকি অনাত্নীয় বন্ধু-বান্ধবসহ সকলের কথা সহ্য করতে রাজী, সকলের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত, কিন্তু স্বামীর কোন নেতিবাচক কথা শুনতে রাজী নয়। কোন কিছুর প্রতিবাদ করাটা স্বামী বেচারার জন্য অন্যায়। তার কাজতো শুধু আনন্দ দেয়া, আদর-যত্ন করা, ভালোবাসা আর আয় রোজগার করা। এ ছাড়া আর কিছু সে করতে পারবে না। করলে খবর আছে।
আমরা যখন নারীদের সাহসিকতার ঘটনা শুনি তখন খুশী হই, বাহবা দেই। মনে করি, দিন মনে হয় সত্যিই বদলে যাচ্ছে। কিন্তু যখন এই ঘটনাগুলো শুনি, তখন কি বলতে হবে তার জন্য অনেক চিন্তা-গবেষণা করতে হয়। কেন এমন হয়? প্রশ্ন যে কাকে করব তারও কোন দিশা পাই না।
বর্তমানে নারীদের মধ্যে এমন এক ভাবনা লক্ষ্য করা যায় যে, স্বামীকে কোন কিছুতে ছাড় দিতে নেই। তারা একটা দিলে দুটো লাগিয়ে দিতে হবে। এভাবেই আমরা জেগে উঠবো। যুগ যুগ ধরে আমাদের উপর অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবো আমরা এভাবেই।
তৃতীয় ঘটনায় যে স্ত্রী তার স্বামীকে মারধর করতো সে তার বড় বোনকে নির্যাতিত হতে দেখেছিল। তখন থেকে সে প্রতিজ্ঞা করে, আমি আমার স্বামী কে কোন সুযোগ দেব না।
আসলে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ হওয়াটাই স্বাভাবিক। না হওয়াটা হল ব্যতিক্রম। আর এ বিবাদ নিরসনের জন্য ইসলাম অনেকগুলো অপশন রেখেছে। যদি কোন দম্পতির মধ্যে এ বিবাদ অসহ্যের পর্যায় পৌছে যায় তখন অনাকাংখিত ঘটনা এড়ানোর জন্য ব্যবস্থা দেয়া হয়েছে তালাক, খুলআ-পারস্পারিক সম্মতিতে বিচ্ছেদ ও শালিস মীমাংসা। কিন্তু বিভিন্ন অপপ্রচারের মাধ্যমে এ সকল অপশনকে সমাজে ঘৃণিত বিষয় হিসাবে তুলে ধরা হয় এক শ্রেণীর মিডিয়া ও মানুষের পক্ষ থেকে। ফলে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় যারা মিসকীন তারা মনে করে আমার দামপত্য সমস্যা সমাধানের কোন পথ আর বাকী নেই। তাই তারা খুন, জবাই, অপবাদ ও ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের পথে পা বাড়ায়।
অনেক ধর্মনিরপক্ষে দেশেও দাম্পত্য কলহ নিরসনের জন্য রয়েছে পারিবারিক শরয়ী আদালত। যেখানে স্বামী স্ত্রীর বিরুদ্ধে, স্ত্রী স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সুযোগ পায়। এ সকল আদালত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের দিক-নির্দেশনা দেয়। শুধু শাস্তি দিয়ে বা তিরস্কার জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করে না। তারা পরিবার ভেঙ্গে দেয়ার চেয়ে বাচিয়ে রাখার প্রতি বেশী গুরুত্ব দেয়। আমাদের দেশে এ ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কেননা পারিবারিক বিবাদ নিরসনে ইসলামী শরীয়ার বিকল্প নেই আমাদের সমাজে। পরিবারের শুরু ও শেষ যখন ইসলামী বিধান মতে হয় তখন পরিবারে স্বামী স্ত্রীর অধিকার আদায়ে ন্যায়সঙ্গত ভূমিকা ও তাতে যত্নবান হতে পারে শুধু শরয়ী আদালত। বিষয়টি নিয়ে সুশীল সমাজ, সচেতন দায়িত্বশীল মহল ভাববেন বলে আশা করি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



