নোলক বাবুর বাংলাদেশ বিজয় ও রাজনীতির মঞ্চ
০৬ ই জানুয়ারি, ২০০৬ রাত ১০:২৭
ক্লোজ-আপ ওয়ানের প্রতিযোগিতায় নোলক বাবুর বিজয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বিচারকদের কাছে নোলক শ্রেষ্ঠ পছন্দ ছিল না। বিচারকরা আরেকটু পরিশীলিত আরেকটু শহুরে ছেলে আরেকটু শিক্ষিত ছেলে রাজীবকেই এগিয়ে রেখেছিলেন তাদের বিচারে। আমি রাজীবের কণ্ঠ ও গায়কিকে ছোট করে দেখছি না। রাজীব আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত গায়কের চেয়ে ভালো গায়ক। নোলকের চেয়েও সে কম কিছু না। কিন্তু বিচারকরা যত কম পয়েন্ট দিয়েছেন নোলককে রাজীবের তুলনায় তা চোখে পড়ার মত। তা তাদের পক্ষপাত থাকতেই পারে। তাদের ভালোলাগা মন্দলাগার বিষয় থাকতেই পারে। এমনকি কে হবে শ্রেষ্ঠ গায়ক সে সম্পর্কেও তাদের ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকতে পারে। যা তাদেরকে প্রাণিত করেছে রাজীবকে যথেষ্ট নাম্বার দিয়ে এগিয়ে রাখার জন্য।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেনো চূড়ানত্দ দিনে বিচারকদের পক্ষপাতমূলক বক্তব্যের পরও এত বিপুল সংখ্যক মানুষ নোলকের পক্ষে ভোট দিলেন। যা প্রায় রাজীবের দ্বিগুণ। সমাজবিজ্ঞানীরা এর ওপর একটা গবেষণা করতেই পারেন। কারণ আমার বিবেচনায় এখানে আমি বাংলাদেশের মানুষের ভিন্নরকম এক প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। অথবা বলা যায় আচরণের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। ভোটের সময় বা রাজনৈতিক প্রতিনিধি নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের জনগণ এমন আচরণ করেন না। তারা রাজার ছেলেকে রাজা বানানোর জন্য ভোট দেন। সুশ্রী মহিলাকে ভোট দিতে পছন্দ করেন। গ্রামের সৎ স্কুল শিক্ষককে ভোট না দিয়ে কালোবাজারি নব্য ধনীকে ভোট দেন এই আশায় যে তাদেরও নগদভাগ্য খুলবে। সম্ভবত: এই চিন্তাধারা থেকে দেশের মানুষ খানিকটা সরে এসেছেন। অন্তত: নোলকের বিজয় আমার কাছে সে ইঙ্গিতই করে।
আমার এই ধারণাটি সত্য কিনা তার প্রমাণ হয়তো আগামী সংসদ নির্বাচনে পাওয়া যাবে। তবে যদি যথেষ্ট সাধারণ ও দরিদ্র পরিবারের প্রার্থী নির্বাচনে ভোটের জন্য দাঁড়ান। সমাজবিজ্ঞানীরা সংসদ নির্বাচনে যদি আগে থেকেই লক্ষ্য রেখে এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন তবে হয়তো বাংলাদেশের জন্য এক আশাময় দিনের আগাম সংবাদ শোনাতে পারবেন। অর্ধেকেরও বেশি দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী বাংলাদেশের অধিবাসীরা হয়তো ধীরে ধীরে নিজেদের সত্যিকার প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করতে শুরম্ন করবেন। দেশটি তাহলে শহর কেন্দ্রিক লোভী শেকড় বিচ্ছিন্ন নেতাদের খপ্পর থেকে রক্ষা পাবে। দেশের মানুষ পাবে তাদের সত্যিকার হিতৈষিদের। আর কেউ কি এমন ইঙ্গিত অনুভব করতে পারছেন?
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরি বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
1. বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম আর বাংলাদেশ মিডিয়ার প্লাটফর্ম কমপেয়ারেবল না। রাজনীতিতে প্রথমত অনেক ধরনের দুনর্ীতি জড়িত, ভোট কারচুপী, মাস্তানী ইত্যাদি। অনেক মানুষ ভোট দেয়ার গুরুত্বও বুঝতে পারেন না, বরং তাঁদের জন্য তাৎক্ষণিক লাভটাই বড় ব্যাপার। এতে তাঁদের দোষ ও দেয়া যায় না, যেহেতু ক্যম্পেন এর সময়কার সামান্য অর্থসাহায্য অথবা গিফট ছাড়া, দেশের রাজনীতির সাথে সরাসরি কোন যোগাযোগ তাদের নাই।রাজার ছেলেকে রাজা বানানোর মত এত লিনিয়ার ব্যাপার না এটা। অবশ্য বাংলাদেশের রাজনীতি দলভিত্তিক না হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, তবে সেটা অন্য আলোচনা।
2. ক্লোজ আপ ওয়ান কম্পিটিশান কিন্তু অন্য ব্যাপার। মুলত এটা একটা প্রফিট মেকিং ভেনচার। আর লাভের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো দর্শকদেরকে ইমোশনালি জড়ানো এর সাথে। যেমন ব্যক্তিগত ভাবে গায়ক হিসাবে আমার কিন্তু রাজীব কেই বেশী অরিজিন্যাল লেগেছে, এর সাথে রুচি বা ব্যকগ্রাউন্ডের সম্পর্ক নাই। নোলক বাবুর গলা ভালো, এবং যে কোন শিল্পীর অনুকরণ ভালো করেন, শুনতে ভালো লাগে তাঁকে। কিন্তু একজন অরিজিন্যাল শ্লিল্পী যাই করবেন তা নিজের মত করে করবেন। নোলক বাবুর প্রশংসা হিসাবে প্রায়ই শুনেছি -তুমি এত ভালো গাইলে, একদম পার্থর মত! অথবা একদম তপনের মত!' পার্থ এবং তপন তো একজন একজন করে বিদ্যমান, তাদের ডুপ্লিকেটের দরকার কি? বরং রাজীব যখন গান গেয়েছে, গানগুলি নিজের মত করে নিয়েছে, মনে হয়েছে রাজীবের গান। এটাই তার প্লাস পয়েন্ট। কাজেই বিচারকদের রাজীবকে পছন্দ করার মধ্যে কোন রাজনীতি ছিল বলে মনে হয়না।
3. তবে রাজনীতি ছিল এই অনুষ্ঠানের মধ্যে। তা হলো দর্শকদের এরকম একটা বোধ দেয়া যে ক্লোজ আপ একটা বিরাট জনহীতকর কাজ করছে কোন রকম উদ্দেশ্য ছাড়াই। সত্যি কিন্তু তা না। হঁ্যা এই বিসনেস ভেনচারের কারণে দর্শকের মনোরঞ্জন হয়েছে, নতুন কিছু শিল্পী পরিচিতি পেয়েছে, সমাজের সব স্তরের থেকে ট্যালেন্ট উছে এসেছে ইত্যাদি, কিনতু এগুলো সবই পজিটিভ এক্সটারনালিটিস। অর্থাৎ বিসনেসটার পাশর্্ব প্রতিক্রিয়া হিসাবে এসেছে।
4. নোলক বাবুর জয় এর পেছনে আছে দর্শকদের ইমোশনাল ইনভলভমেন্ট। তার সোশ্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে একটা ছাড় দেয়া মনোভাব। এবং এরকম একটা অ্যানালাইসিস যে বিজয় টা কার প্রয়োজন বেশী। তাই নোলকের ট্যালেন্টই তার জয়ের একমাত্র কারণ নয়। যেমন বিঊটির চেয়ে আমার সোনিয়াকে অনেক যোগ্য মনে হয়েছিল তৃতীয় স্থানের জন্য।
অতিথি বলেছেন:
আমি ও লুনা রুশদীর সাথে একমত। নোলকের গান আমার ভাল লেগেছে, তবে রাজীব কেই আমার যোগ্য বলে মনে হয়েছে। রাজীব যেই গায়কের গান যখন গেয়েছে তখন মনে হয়েছে এটা মূলত রাজীবেরই গান। অর্থাৎ কোন গায়ককে সে অনুসরন বা অনুকরন করেন নি।
অতিথি বলেছেন:
সালেহ ও লুনা রাজীব ও নোলক সম্পর্কেআপনাদের যে মতামত তা লেখকেরও। তিনি নিজেও রাজীবকেই এগিয়ে রেখেছেন। তবে তিনি বলেছেন যে, এই যে শহুরে মানুষের বিশেষ পছন্দের বাইরে বিশাল জনগোষ্ঠীর ভোট যা কিনা গিয়ে পড়লো নোলকের ভাগে তা একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তারা নোলককে নিজেদের লোক মনে করেছেন। তাই ভোট দিয়েছেন। সিনেমার দর্শকরা যখন সিনেমাতে দেখে গ্রামের বোকা ছেলেটি ডিসকো নাচে আর গানে পাঁচতারা হোটেলের শহুরে ছেলেটিকে হারিয়ে দিচ্ছে তখন তারা খুশি হয়ে হাততালি দেয়। সিনেমাটি হিট হয়। সিনেমার সেই কাহিনী টানাপড়েনের সংস্কৃতির মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে কোনো কাহিনীই নয়। বেশিরভাগ মানুষকে তা কেনো টানে তাও তারা বুঝে না। ধরে নেয় ঘিলুর অভাব তাই।
নোলকের নির্বাচনে যেহেতুঅনেক লোক গাঁটের পয়সা খরচ করে ভোট দিয়েছেন সেহেতু লেখকের সাথে আমিও একমত এই পরিবর্তনের হাওয়া হয়তো শহুরে মধ্যবিত্তের হাত থেকে ক্ষমতাকে দেশের সিংহভাগ জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধির কাছে নিয়ে যাবে। যারা নোলককে নিজেদের সন্তান ভাববে। বিচারে পক্ষপাত করে ভোট দেবে এইজন্য যে, সে কখনো গান শেখার সুযোগ পায়নি তবু যা শোনে তাই গেয়ে দিতে পারে। আর মধ্যবিত্তের আদর আহ্লাদে বড় হওয়া ছেলেটির সাথে তার কি প্রতিযোগিতা।
আমাদের মতো সুবিধাভোগী লোভী অথচ ভীতু মধ্যবিত্তের হাত থেকে নেতৃত্ব, হোক তা রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক, কেড়ে নিক সিংহভাগ মানুষের সত্যিকার প্রতিনিধিরা শ্রেণীচু্যত হয়ে আমিই তাই চাই।
রুনা লায়লা বা সামিনা চৌধুরীর চেয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে বড়ো হয়ে উঠুক মমতাজ বা কাঙালিনী সুফিয়া। রাজীব বা সোনিয়ার চেয়ে বড়ো হয়ে উঠুক নোলক ও বিউটি।
অতিথি বলেছেন:
প্রতিযোগিতায় নিজের গান পর্ব ছাড়া সব পর্বের দাবী ছিলো মূল গানের অনুকরন। বিউটির গান আমার পছন্দ হয় নি , রাজীব ব্যান্ড সঙ্গীতের সময় মাকসুদের গান গেয়েছে ভালো লাগে নি আমার। রাজীবের মতো হওয়া যদি প্রতিযোগীতার উদ্দেশ্য হতো তাহলে এত জনের এতো গান তাদের মতো গাওয়ার চেষ্টার প্রয়োজন ছিলো না।। রাজীবের গায়কী কিংবা মেধার প্রশ্ন না এটা এটা দর্শকের বিচার । আমার ধারনা নোলকের অনুকরন করার ক্ষমতা তাকে প্রথম করছে আর নিজস্ব গানে সে যে গান গেয়েছে তাতে এটুকু বোঝা যায় ও নিজের মতো গাইতে পারে। সেখানে রাজীবের গান কোনমতে পাশ মার্ক পাবে।
মো: মোফাচ্ছির হোসেন বলেছেন:
জানিনা কথাটা কিভাবে নিবেন তারপরও বলছি যে 'জনগণের ভোটে আমাদের সরকার ক্ষমতায় যায় নাকি পশ্চিমারা কে এবার সরকার গঠন করবে তা নির্ধারণ করে দেয়' সেটাও কিন্তু একটা অনুসন্ধানের বিষয়।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...















অনেক ধন্যবাদ।