মহান কবি ছিলেন কিনা জানি-না। তবে মহান বন্ধু বলবো তাকে আমি আর বলবো, পৃথিবীর একজন (মহাকালের হিসেবে নিঃসন্দেহে) মহাকালের আমার নিজস্ব হিসেব মতে (ও এতে অধিকাংশ মানুষেরও অনুমোদন রয়েছে) শামসুর রাহমান, একজন প্রতিষ্ঠিত কবি হিসাবে রয়ে যাবেন পৃথিবীর অন্তবর্তীকালীন সময়ে আমি-ও এটা মানি বা মনে করছি।সে-তো ছিল আমারও একজন বন্ধু, যদিও তিনি শেষজীবনে যখন আমাকে আরো গভীরে জায়গা দিয়েছিলেন।তখন আমাকে তার কবিবন্ধু বলে সম্বোধন করেই বেশি স্বত্তি পেতেন। সে যখন (প্রায় পতিদিন, আমি তার দোতালার বেডরুমে পোঁছনোর পর আড্ডা ও তার ঘরে ভাত একসাথে খেয়ে যখন তার ঘুমের সময় হত আর সে ঝিমতো; আমি যদি জ্ঞিগাস করতাম-, 'রাহমান ভাই, ঘুমাবেন-না!' সে চোখ মেলে যেন অস্হির হয়ে উঠত কিন্তু কিছুতেই তার অনুরোধ থামতো-না।বলতো-, 'আরে! ধুত! বসো তো' তখন আমি তাকে বলে রাজী করিয়ে বিছানায় শোয়ায় দিতাম, আর বিছানা হতে সদ্য উঠে আসা আমি বসতাম তার ৫০ বছর ধরে কবিতা লিখেছে যে চেয়ারে বসে, সে-চেয়ারে। নামকরা অনেকেই তাকে ফোন করে আসতো হঠাৎ(হয়তো আমরা কথা বলছি, রাহমান ভাই শুয়ে, আমি যথারীতি বসে ওই চেয়ারে) রুমে ঢুকে শামসুর রাহমান এর চেয়ারে প্রায় অচেনা একজনকে দেখে অবাক হত। যে যে চিনতো, সে-ছাড়া, বাকীরা রাহমানকে জিজ্ঞেস করতো, কে আমি? তারপর সেই একই ডায়লগ সবাইকে দিতো _আরে! এ-ই তো আসল কবি, নাম, বন্ধুও ইত্যাদি। বৃদ্ব হয়েও বন্ধুর মায়ের নিম্রন্ত্রনে আমার বাড়ি এসেছিলেন তিনবার। একবার আমার গ্রন্থ প্রকাশে প্রেস ক্লাবে এসেও ধন্য করেছে আমাকে, এ-ছাড়াও ধন্য করেছে, নানাভাবে। যা আর বলা উচিত-না। আমি নাকি কবি, তাই মদ্যপানের সভায় যখন সবাই মদ খাচ্ছিল, (নানান সরকারী কর্মকর্তারা।)যখন আমার কাছের হঠ্যাৎ-ই একজন দেখলো যে তার পাশের জন, শীতে কাঁপছে আর সে মদ খাচ্ছিলো-না (মানে আমি), তখন অফিসার জানতে চাইলো, আমি কিছু নেবো? আমি বলি বিনয়ের সঙ্গে, 'রাহমান ভাই যদি অনুমতি দেয়, তাহলে খেতাম'আমি জানতাম বলা মাত্রই কথাটা রাহমান ভাইয়ের কানে যাবে আর তিনি নিঃসন্দেহে অনুমোদন দিবেন। এবং তাই হল, আমি ঠিক-ই খেলাম। কিন্তু অভিনয় করে। একটু র্ধৈয্য ধরে ।ওই দিন শ্যামলী থেকে কাকরাইল আসা পর্যন্ত তার সঙ্গে অনেক কথা এই রাস্তায় বসে হল।একজন খ্যাতিমান কবি ও সাংবাদিক জানেন, এ-সব-ই। অন্য অনেককের মতো রাহমান ভাইয়ের সব কিছু অংশবিশেষ, আমি পেয়েছি, তার অনেক অজানা তথ্য, তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর সমস্ত বই (যে-সব আমার কাছে হতে কানাডায় এখন আমার জন্য একটু অপেক্ষা করছে!) কিন্তু গবেষকরা কী করবেন? তার শেষজীবনের চুমু হতে হারিয়ে-যাওয়া গ্রন্হও আমার মাধ্যমে আলোর মুখ দেখছে। তাকে ভালোবাসি। একদিন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে-, 'আপনি কাউকে বা বিশেষ কোনো গোত্রকে অনুসরণ করেছেন' ? তিনি বললেন-,
-'আমি আমাকেই প্রবলভাবে অনুসরণ করি'
আর একদিন রাত ১২ টায় তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কপালে চুমুর মাধ্যমে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জাগলো মনে-,
'আচছা রাহমান ভাই, আপনার এই যে নিজের সব লেখা, এতো রচনা, নিজেকে সত্যি কতখানি সফল মনে করেন? আপনার মাধ্যমে বাংলা কবিতা কতটুক এগোলো'?
তিনি হঠ্যাৎ কিছুক্ষণ গভীর চিন্তা করে বললেন-,
'আমার মনে হয় কী জানো ইবন, এই ত্রিশের পর আমাদের কবিতা, ধরো আমার কবিতা খুব বেশি ভিতরের দিক যেতে পারে-নাই, গভীরতার দিকে যেতে পারে নাই। তার চেয়ে আমি বাইরের কোলাহল নিয়ে বেশি সময় দিয়েছি, সে-সব নিয়ে অনেক লিখছি, যা ক্ষতি করছে আমার। আমর কবিজীবনটা সত্যিকার অর্থে ব্যর্থ।'
এইসব তথ্য, হাহাহা। ভালোবাসা আর বিনয়ের মাধ্যমে অর্জন করেছি। এ-রকম স্টাইলে আমি অনেকের ভিতর পর্যন্ত গেছি।
যাইহোক, আমার বিনয় প্রসঙ্গে আমার সেই অতি খ্যাতিমান সাংবাদিক বন্ধু একটা কথা শামসুর রাহমানকে বলেছিলেন, যে রাহমান ভাই, ইবন এতো বিনয়ই যে সে যদি আপনাকে খুনও করে, তা হলেও আপনাকে জিজ্ঞেস করে নিবে, 'রাহমান ভাই, আপনাকে খুন করি'।
হাহাহা ...বিচিত্র দুনিয়া ও আমরা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



