জায়েদের ছবি আঁকা দেখে আজ ড্রইং ক্লাসে মিস অনেক প্রশংসা করেছেন। খাতাতেও এক্সিলেন্ট লিখে দিয়েছেন। জায়েদের মন আজ খুব খুশি। এই প্রথম ও খাতাতে এক্সিলেন্ট পেয়েছে। স্কুল থেকে বাসায় ফিরেই মাকে খাতাটা দেখাতে গেল। মা টিভিতে সিরিয়াল দেখা নিয়ে এত ব্যস্ত যে, খাতাটা ভাল মত দেখলেনই না। কিছু বললেনও না। জায়েদের মনটা দমে গেল। এদিকে স্কুল থেকে ফিরে খিদেও পেয়েছে প্রচণ্ড। খিদের কথা মাকে বলার পরে তিনি উঠে যেয়ে খাবার এনে দিলেন। তারপরে আবার ব্যস্ত হয়ে গেলেন টিভি নিয়ে। খেতে খেতে জায়েদ ভাবে, আজকে ওর এই খাতার খবরের কথা আর কাকে বলা যায়। মা তো এমনই। হয় রান্না, নয় টিভি, আর না হলে শপিং একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত সব সময়। জায়েদের কথা ভাল করে শোনেনই না। বাবাও ফেরে সেই রাতে। বাসায় ফেরার সময়ও পকেটে করে অফিস নিয়ে আসেন। তিনিও মায়ের মতই, দায়সারা ভাবে কিছু কথা বললে বলেন, না হলে বলেন না। জায়েদের কথা শোনার মত সময় কারোরই নেই। এসব ভাবতে ভাবতেই ওর মনে পড়ল পাড়ার চায়ের দোকানদার চাচার কথা। ব্যস! তক্ষুনি খাওয়া ফেলে ছুটে চলে গেল নিচে, চাচার কাছে খাতাটা নিয়ে। জায়েদকে দেখে খুব আদর করে চাচা কাছে টেনে নিলেন। জায়েদের খাতার কথা শুনে খুশি হয়ে অনেক প্রশংসা করলেন। তারপর জায়েদকে একটা মজার খাবারের কথা বললেন। সে খাবারের কথা কাউকে বলা যাবে না। আবার সেটা এমনি এমনিও খেতে দেবেন না, টাকা লাগবে। জায়েদের কাছে টাকা নেই। সাথে সাথে মায়ের কাছে যেয়ে দশটা টাকা চাইল ও। মা টিভি দেখায় মগ্ন, তার উপর টাকার কথা ভাল মত কিছু না শুনেই মানা করে দিলেন। শেষে চাচার বুদ্ধিতে মায়ের ব্যাগ থেকে চুপিচুপি কিছু টাকা নিয়ে আসল। এরপরে খাবারটার স্বাদ নিতে পারল জায়েদ। খাবারটা বিশেষ ধরনের। এটা হল এক ধরনের সিগারেটের মত। কিন্তু সিগারেট নয়। অন্যরকম। সেদিনের পর আরো কয়েকবার জায়েদ এ খাবারটি খেয়েছে। টাকাগুলো অন্যান্য বারের মত মায়ের ব্যাগ, বাবার পকেট থেকে লুকিয়ে সরাতে হয়েছে।
জায়দের প্রতি ওর বাবা-মায়ের অবহেলা থেকে ধীরে ধীরে ও নেশাগ্রস্ত হয়ে গেল। এ ধরনের বাবা মায়েদের মনোবিজ্ঞানীরা অমনোযোগী অভিভাবক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এরা সংসারের প্রয়োজন, চাহিদা, খরচ মেটাতে, নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে সন্তানের প্রতি মনোযোগ দেন না। সন্তানের কাছে কোন রকম প্রত্যাশা যেমন তারা করেন না, তেমনি সব দায়িত্বও ঠিক মত পালন করেন না। অনেক সময় বাবা/মা নিজেই বিষন্নতায় ভুগে থাকতে পারেন বা কোন সংকটে (অর্থনৈতিক/পারিবারিক) পড়ার কারণে সন্তানের প্রতি মনোযোগ ও সময় দিতে পারেন না। সন্তানের প্রতি ভালবাসা এরা প্রকাশ করেন না। এর ফলে সন্তানের সাথে তৈরি হয় দূরত্ব। সন্তানের কাজের প্রতি তেমন খেয়াল রাখেন না। তাদের নিয়ম শৃংখলাও শেখানো হয় না। অনেক সময় সচেতনভাবেই তারা সন্তানকে এড়িয়ে চলেন। সন্তানের স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা অভিভাবক মিটিংএও তারা থাকেন অনুপস্থিত। এমন কি বাবা-মা এতটাই অমনোযোগী থাকেন যে, সন্তানেরা তাদের সামনেই অনেক সময় দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে থাকে।
এমন বাবা-মায়েদের সন্তানদের কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে চলুন জেনে নেওয়া যাকঃ
সামাজিক, মানসিক, আবেগিক, প্রায় সব ক্ষেত্রেই দক্ষতা থাকে না
অন্যের প্রতি আস্থা রাখতে পারে না
কিশোর অপরাধের প্রবনতা দেখা যায়
পরিবারের সমর্থন না পাবার কারণে অহেতুক ভয়, উদ্বেগ বা মানসিক চাপে থাকে
তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া আচরণগুলো পরবর্তীতে নিজের সন্তানের সাথেও করে থাকে
আত্নবিশ্বাস কম থাকে
জীবনে যতই ব্যস্ততা থাকুক, নিজের সন্তানের জন্য কিছু সময় বাবা-মায়েদের বের করে নিতে হবে। জীবনের সংকট বোঝার মত বয়স ওদের হয় নি। আর সব সংকট চিরদিন থাকেও না। আপনার সমস্যার প্রভাব যেন আপনার সন্তানের উপর না পড়ে, সেদিকে আপনাকেই খেয়াল রাখতে হবে।
২০ জানুয়ারি, ২০১২
১ম পর্বঃ
Click This Link