
মানুষকে বাড়ি কল্পনা করলে বন্ধুত্বকে মনে হয় সাঁকো । সে সাঁকো বেয়ে দুই বাড়িতে উৎসবে-পার্বনে মিষ্টি আদান প্রদান হয়। এক বাড়ির আনন্দ অন্যবাড়িকে উদ্ভাসিত করে। ওপারের মেয়েটা তার কষ্টের চিঠিটা এপারের সইকে এসে পড়ে শুনিয়ে যায়। একজনের ঘরে চাল না থাকলে অন্যবাড়ির কাছে ধার নেয়। এভাবে জ্ঞান হবার পর থেকে দ্বীপের মত বিচ্ছিন্ন মানব আত্মা গড়ে তোলে অজস্র অদৃশ্য সাঁকো।
তবে বন্ধুত্বের সঙ্গে সাঁকোর বেশ খানিকটা গরমিল আছে। পুরনো হলে সাঁকো নড়বড়ে হয়ে যায়। ভেঙে যায়। বন্ধুত্বটা পুরনো হলে মজবুত হয়, মধুরতর হয়। একাউন্টিংয়ের অবসায়ন তত্ত্ব কে মিথ্যে করে দিয়ে দিনে দিনে তার মুল্য বাড়তে থাকে।
বন্ধুত্বের স্থায়িত্ব বা প্রকাশ স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্ন। কোন কোনটি মিনিট থেকে কয়েক বছর স্থায়ী হয়, কোনটি আমৃত্য বেঁচে থাকে। অফিসের উল্টোদিকের ডেস্কের গোমড়া মুখো মানুষটি একদিন বন্ধু হয়ে যায়। অনেক কথা বলে। চা খায় এক ক্যান্টিনে। তার স্ত্রীর সুস্বাদু রান্নার উপভোগের জন্য পীড়াপীড়ি করে। কর্মস্থল বদলের সঙ্গে সঙ্গে সেই সখ্যতা জীবনের শ্লেট থেকে মুছে যায়। তবে স্কুলে, কাজে, আত্মীয়তায়, যাত্রাপথের অনেক সাময়িক বন্ধুত্ব সময়ের কষ্টি পাথরে টিকে থাকে আজীবন।
শৈশবের বন্ধুগুলো হয় সবচেয়ে মজার। বড় হলেও এরা শিশু রয়ে যায়। আড্ডায় সুযোগ পেলেই স্মৃতি রোমন্থন করে - কাদা মাঠে দল বেধে খেলতে নামে, এক সঙ্গে সবাই মেলার প্লাস্টিকের রঙিন চশমা পরে ঘুরে বেড়াতে থাকে।
শিশুদের বন্ধুত্ব কাঁচের মত নির্মল। শিশুরা প্রতিযোগিতা ভালবাসে, ঈদের জামাটা বন্ধুদের থেকে লুকিয়ে রাখে, হৈচৈ করে, আবার মুহুর্তে কনিষ্ঠ আঙুলে বিচ্ছেদ নিয়ে ফেলে। কথা বন্ধ করে দেয়। বাবা মায়েরা প্রায়ই শিশুদের ঝগড়া নিয়ে ঝগড়া করতে থাকে - ততক্ষনে হয়তো তারা ভাব করে ফেলেছে।
বন্ধুত্ব প্রয়োজন ও পরিস্থিতিতে বিবর্তিত হয় । বয়সে পরিণত হয়। অর্থের আগমনে বন্ধুরা বেড়ে যায় পঙ্গপালের মত। আবার অভাব উঁকি দিলে মৌসুমী বন্ধুরা অদৃশ্য হয়ে যায়।বলা হয় বিপদের চালুনিতে আসল বন্ধুরা পরিশ্রুত হয়ে যায়। কলেজে যে বখাটে ছেলেটা দুচোখের বিষ সেও হতে পারে বন্ধু। যেমন অর্থাভাবে কলেজের বেতন দিতে দেরী হয়েছিল। বাড়ি থেকে টাকা আসেনি। কেউ বোঝেনি। ধার দিতে ইত:স্তত করছিল। বখাটে ছেলেটা তখন বলেছিল, আর ধুর নে। এই টাকা কয়টা রাখ। পরে দিস যখন সুবিধা হয়। সে একদিন বন্ধু হয়েছিল।
বন্ধুত্বের সরল কোন সংজ্ঞা নেই, কেননা বন্ধুত্ব সংজ্ঞার চেয়ে সরল। একজন যদি পনেরো হয় অন্যজন পঞ্চাশ তাতেও ক্ষতি নেই। ছেলে, মেয়ে, বিত্তশালী, দরিদ্র - সবাই সবার বন্ধু হতে পারে। এমন হাসপাতালের পাশের বেডের মানুষ থেকে বাসের টার্মিনালে সহযাত্রী - যে কেউ হতে পারে বন্ধু । শুধু ভাবতে হবে সে বন্ধু, আর বাড়িয়ে দিতে হবে হাত।
অবশ্য চালের কাঁকরের মতো প্রায়ই বন্ধুত্বে বিশ্বাসঘাতকেরা মিশে থাকে । হন্তা বন্ধু সেজে পিঠে ছুরি বসায়, নরনারীর বন্ধুত্ব প্রেমে বদলে গিয়ে জটিলতার মরুভূমিতে পথ হারায়।
তারপরও দুর্গম জীবনের পথে বন্ধুত্ব যেন দেবদারু গাছের ছায়া, তৃষ্ণার জল, প্যান্ডোরার বাক্সের সেই শেষ আশা যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ২:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



