১
অলক্ষা নদী তীরে সুবেসাদেকে বান্ধা পড়ে রুস্তমের তরনী। অতিদুর ক্ষীণ আসছালাতু খাইরুমে...সহসা পুব আসমানে দেখা দেয় ভাতছাড়া মাটির সানকি।গাছের উঁচা জঙ্ঘায় বনকুক্কায় চিল্লান পারে -কুউকু। মইষের লোমবতী দেওদারু তরু - তার লক লকা হরিৎ জিহবায় উঁষের লুল ঝরে । মাছের মটকা ভাঙ্গে, ঘুমন্ত নদীর উলান চুষে শুশুকের জোড়া। একপাশে পোড়া আটার রুটির মতন পোড়ামাটি উপটান খায় গাঙের দেওয়ালে। চরের উচা কোমড়ে ঘাস - সেই ঘাসের কেশরে মিন্নতে জিরায় জংলীহাস।
দক্ষিণ মুখে কুলঙ্গা গেরামের হাওলাদার নিশান পাঠায়। জমিরা পালোয়ানের লাইঠ্যালের হাঁক পারে বদর বদর। উড়ালে লাগায় লগ্গি। ইয়াজিদের দলেরা নৌকা বান্ধে, দলে দলে বান্দীর বাচ্চারা হাতে উড়াইছে বল্লমের ধ্বজা।
ঝাপাইয়া পড়ে রুস্তমের মুখের সামনে - ছা-ড়, চরের মাটি ছাড়, ফিরা যা জননীর দুধে। ছা--ড় ।পথ ছা---ড়। জংলী কুত্তারে শিকলে বান্ধা জমির পালোয়ানের যেন হুক্কায় তামুক সাজানি।
রুস্তমের মগজে চিলিক দিছে বেইজ্জতী উস্কানি। ফুৎকারে পশ্চিমে - হিম্মতী হামজারে যদি তোরা ভুল যাস, রুস্তমের চিনে নে আইজ। সে চিল্লায় বুকের পিঞ্চর খুলে বাতাসের পংখী উয়ায়ে - হা রা রা, এই মাটি এক দানা দিবো না, উপরে খোদা জমিনের নিচে শয়ান পিতার কিরা, রুস্তমের বল জানে যাইবনা ফিরা।
পাত্থরের চাঙ্গি সিনায় বান্ধিয়া - পৃষ্ঠে দড়ির আকর্ষে রোজকেয়ামতের কিরিচের তীর, যাইবনা ফিরা, যদি না পাই চরের দখল। বাহুতে খিদা, কব্জায় কামড়ায় আঙ্গুলের পঞ্চদাঁত - খিদায় চায়া থাকে নদীর থালিতে ভাইসা ওঠা সাদা ভাতের চর। লুঙ্গীর গিরায় বান্ধে কোঁচড়িয়া সঙ্গীরে ডাকে রুস্তম, আ----য় জানের বদলে বন্দক দিছে যেই নদীর সন্তান, এর দত্তক নিবে রুস্তমের গুস্টি, আর কেউ না।
নারায়ান তকবীর ধ্বণি ফুঁকে ইসরাফিলের চুঙ্গায় - রুস্তম জমিরে কাটাকাটি হয়, শিং চোক্ষা ঘাড়ের লড়াই।
২.
বল্লমের সুতা নলী সাপ ছোবল মারে চরের পিঁপড়ার কাইজ্যায়।
লুহুবর্ণ রঙ জ্বালা গামছার মতো পইড়া থাকে চর। সৈন্দব মাটিতে জমিরার বুক খন্ড হয়, নরম পাঞ্জরের মধ্যে ঢুইকা যায় কিরিচের হুল। রক্তের সাঁতার দিয়া জমিরা ঢুইকা যায় মরনের বাড়ির চৌকাঠে।
সুবেসাদেকের মেঘ রক্তের মাঞ্জা ঢালে ধুধু চরের বালুর নাটাইএ। রুস্তম নাটাই হাতে ছিড়া ঘুড্ডি উড়ায়ে হা হা হা হা হাসে। পুস্করুনী নদীর জোয়ার প্রতিশব্দ করে হা হা হা হা। উপচানো হাতে মাংসের ছাল, পেশীর কামারের হাতুড়ি বাহু কদলীর ছিন্ন ভিন্ন বেশে। মরা তিন বলিষ্ঠ জোয়ানরে তুলে নিয়া নাও ছাড়ে।
২.
রুস্তমের বিজয়ী তরনী ফিইরা আসে ডুগান্তির ঘাটে। ডুগান্তির জুতদারের ঝিলিক্যা সুন্দর কাজকাটা টিনের নকশা চালে ডুবি পঙ্খী বসে। লেপা উঠানে জুতদারের মাঝলা পত্নী রুপার ধপধপা সাদা পাও হাঁটতে থাকে। দাস দাসী কেদারায় বসায় জুতদাররে। বাতাস খাওয়ায় তারে হাওয়ালী তালের পাঙ্খায়।
রুস্তম দল ফেইলা ঢুকে বাড়িতে একাকি হা হা সুসংবাদে। লুহুর হস্ত, ছিড়া শরীলের চামড়া বাঁশে মুছা দিয়া চরের চাবি দেয় জুতদারের হাতে।
রুস্তমের নিজের বাড়ির উগার খালি, বাড়ি খালি, চালের ছন ভিজা খুলে যায় যেমন সর্দির সিকনি। দাই নাই - কাবিনী বউ মরা বাচ্চা পোয়ায় ছটফট করে । ঝিণুকের ধার দিয়া নাড়ি কাটা দেহ নিয়া রুস্তম কান্দে, গঞ্জের কবিরাজ চায় শুকনা নোট।
জুতদারের চরের দাম পঞ্চশত টেকা যদি পায় বউ গঞ্জে গিয়া আজরাইলে লগে বল্লমের পাঞ্জা দিতে পারে। জুতদার একশত নোট সাধে। হাসি মুখে তবকের পান সাধে, হুকুম দেয় মজিদুদ্দিরে সাজাইতে ডাবুরের পানি। জুতদার বুঝ দিতে চায় তার দুই হাত খালি কার্তিকের মঙ্গায়, অল্পদিন বাদে পরে জমিতে যদি উঠে ধানের মসুম, পুবপশ্চিম ফলনে ভইরা গেলে শত শতটেকা ছড়া ছড়ি হবে, বাকি অর্থ সুদেমূলে রুস্তমে হবে পরিশোধ। আর লাঠ্যাল রুস্তমেরে জুতদার নিজ বাড়িতে জিয়াফত দিবে দুধে আর ভাতে।
রুস্তম শেষ বার ডাকে, আমার পাঁচশত অদ্য প্রয়োজন।
জুতদার মস্তক নড়ায় পুনর্বার, যন্ত্রের পাঙ্খার মতো ধীরে। আবারও আঙ্গুলে বুঝায়, তার অতি অর্থাভাব, চৈত্রখরায় ডুলি শুন্য মটকায় ভেক নিদ্রা যায়। রুস্তমের রাইজ্যের ভুখ, কপালের হাড্ডি ভাইঙ্গা পড়ে, চক্ষু ঢাইকা যায় চক্ষুপাতির ঢাকনে। নাকে সন্দেহ পায় অন্দরে ফুটে মুরগার সালুন, মিছা অভাব। চাউলে-ধানে জুতদারের উগারঘরের দেওয়াল পোয়াতি ইলশার মতো ফুইলা থাকে।
সহসা রুস্তমের হাড্ডিতে জুর হয়। ঝাপ দিয়া চাইপা ধরে জুতদারের আলগা গলায় লাগানি মাথা। জুতদার ভাঙতে ভাঙতে মেদিবিলাইয়ের মত আ-আ চিল্লায়।
৩
গাঙের পানিতে ভাসে সুবেসাদেকের রক্তের টোবলা। মরা বুদ্বুদানি উঠে নামে, ঘাটের ফুসফসে। এক হাত ডুবে ডুবে। অন্যপাঞ্জা ঝুলে থাকে মাথার সমান্তরাল ডুবন্ত ঢেউয়েতে। রুস্তম যেন মরা বাচ্চাটার মতো আরামে ঘুমায়। পাত্থরে নাইলনের দড়ি তারে নিচে টানে- আ-য়- আ-য়। মাছেরা ঠোকরায় পিরানের ছিন্ন বগলে। বদর বদর আওয়াজে তরোয়ালের মত ধার দেওয়া রুস্তমের কানচাপা ডুবসাতার কাটে যেন শৈলমৎসের পাতাকাঠি ।
৪.
জুতদারর বাড়িতে মহা ভুজ লাগে - চরের জমির মচ্ছবে বাইদ্য হয়, তালতো ভাই বিয়াইরা দস্তর খানার চিনা বাসুন যেন বোয়াল মাছের মুখ। হি হি হাসি কলের গানে মাইক বাজে বাতাসে তুফান নাচে বেহুলা নাগিনের লেঞ্জার মতন। তেল তেলা সরুয়ায় রুম্তম পালোয়ানের মতো ভাসে মুরুগ আর আলুর সালুন।
-----
(নিরীক্ষামূলক রচনা - প্রথম ড্রাফট)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





