
১
নদীতে হাতের তালু ডুবে যায়, পায়ের পাতায় টলটলে পানি। নেলকাটারের কসরতে ছোট হওয়া অদ্ভুত নখকে খাবার ভেবে পানি যেন খোলসে মাছ হয়। পায়ের নিচে মৃদু ঠোকরাতে থাকে।
পায়ের ডিমে অসাবধানে লেগে যাওয়া কাদা শুকিয়ে গেছে । সাদা ছোপ, বাড়ি ফেরার আগেই মুছে ফেলতে হবে। অজস্র কাটাকুটির ভিড়ে, উঁচুনিচু মাংসল পর্বত উপত্যকার মধ্যে, গোড়ালীর এই কাটা চিহ্নটা কিসের? শৈশবে পাঁচিল টপকাতে গিয়ে পড়ে যাওয়া ক্ষতচিহ্ন? এমন হলে মা ছদ্মবকুনিতে তার কষ্ট চাপতে পারতো না। বছর পাঁচেক আগেও সেই মায়ের হাতটা চাইলে ছুঁতে পেতাম। মনে পড়ে স্যাভলন আর গামছার টুকরো বেঁধে দেয়ার পর কতবার ছুটে গিয়েছি মাঠে।
পায়ের তলাটা মোটা চামড়ায় গড়া। যেন কাঠের মতো অনমনীয়। গ্রামে পরীক্ষার অবসরে বেড়াতে গিয়েছি। দুরন্ত ষাড়ের তাড়া খেয়ে জুতো ছাড়াই এই পাতায় জংলী কাঁটার বন পার হয়েছি। বনে বেগুনী ফুল দেখে অবশ্য ভয় কেটে গিয়েছে। বেগুনী ফুলকে পাহারা দেয় লতানো বিষমান্দার। তখন এই পায়ের শক্ত তলাটা হেলমেটের মতো কাঁটার আঘাত থেকে পা বাঁচিয়েছে।
পায়ের তলাটা এমন যেন জুতো না হলেও চলতো। রবীঠাকুরের কবিতার জুতো আবিষ্কারের আগে খোলা পায়ে মানুষ তো দিব্যি চলেছে! স্কুলের টীমে স্ট্রাইকারের সংখ্যা বেশী হওয়ায় ব্যাকে খেলতে হতো। ভয়ানক শক্তিশালী ছিল এই পা জোড়া। অনেক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নস্যাৎ করেছে ছুটে গিয়ে, হয়তো শৈশবের ফুটবল তারকারা এখনো আমাকে গালি দেয়। অন্যদিন গুরুত্বপুর্ন এক ক্রিকেট ম্যাচে - কর্কের বল এই পায়েই লাগে আর দলের পরাজয়টা নিশ্চিত হয়ে যায়।
আমার তৃষ্ণার্ত পা নদীর জলে শীতল হয়ে যেতে থাকে । নিচ থেকে জলজ মত্স, ঝিনুকেরা উঁকি দেয়। বুদ্বুদ উঠে আসে। মাছেদের শরীর তো আমার মতই। পেটে দানা পানি লাগে তাই জেনে শুনে টোপ গিলে ফেলে। যেমন ক্ষুধা আর প্রাসঙ্গিক চাহিদা আমাকে অফিস ঠেলে পাঠায় ।পাকস্থলীটা আমার মতই মাছটাকে লেজ নাড়াতে বাধ্য করে। মাছেদের যেমন লেজটা তার সম্পত্তি। মানুষের সম্পত্তি তার হাত অথবা পা।
এক সময় হৈমন্তী গল্পের কঠিন অংশটা সোজা করতে গিয়ে শিক্ষক সম্পদ বা সম্পত্তির তফাৎ বুঝিয়েছে। আমার কাছে সেই তফাৎ ভাল লাগে নি। নিয়ম না মেনে দেহটাকে সম্পত্তিই লাগে। আর মনে পড়ে একটি নারীর সম্পত্তি দখলের জন্য কাঁচা আবেগের নৌকায় ভেসে কত স্বপ্নই না দেখেছি।
কলেজের নবীন বরণে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কারণ বয়সটাই এমন যে উচ্চাঙ্গ নৃত্যকলা আর উপদেশের ভাষণ ভাল লাগতো না। কিন্তু সুজার ভাল লাগতো ।কারণ সেও সম্পত্তি বাড়াতে চায়। সে নিয়ে যায় "শ্যামা" নৃত্যনাট্য দেখতে। শ্যামা ভুমিকায় চন্দ্রা নামের মেয়েটা তার বিশেষ পছন্দের। হয়তো সবাই প্রিয় নারীর প্রশংসা শুনে তার দখলের সার্থকতা পেতে চায়।
আমি সেই চন্দ্রাবতীর নৃত্যকলায় আহামরি কিছু না পেয়ে উঠে আসছিলাম। বাইরে তখন শীত কাটানো মিষ্টি রোদ। শীতাতপের মঞ্চগৃহের চেয়ে বাইরে হেটে বেড়ালেও অনেক ভাল। দুরে ছেলেরা টেনিস বল নিয়ে খেলছে। সেটাতেই আমার নজর।
কিন্তু ততক্ষণে আলোর পালকিতে চোখে ভেসে এসেছিল শ্যামার সখীদের এক অপরিচিত পায়ের নৃত্যকলা। শ্যামাকে নয় সেই সখীর দেহছন্দেই ভাললাগা পেয়ে যাই। আমি আর উঠি না। বোকার মতো সেই অপরিচিত মেয়েটার আলতা পায়ের কথা সুজাকে বলতেই - সে পরের দিন অতিউৎসাহে দুজনের পরিচয় করায়।
প্রেমে পড়লে মানুষ কত কিছু করে। খেলা ধুলা ছাড়া তেমন কোন বিষয়ে আমার আগ্রহ ছিল না ।নিজেরই অবাক লাগে কি করে নৃত্যকলা নিয়ে গল্প করেছি। একটু বেশীক্ষন বসিয়ে রাখতে তার নাচের প্রশংসাগুলো পেন্ডুলাম হয়। আর পেট-উঁচু ব্রীজে ঠেলে গাড়ি তোলার মতো একবার উঠে দুবার নিচে পড়ে যেতে থাকে। সে সময় চোখে চোখ পড়তেই কথা চঞ্চল কাঠবিড়ালীর মতো কোথায় হারিয়ে যেত। তাই নগ্ন পায়ের রূপবন্দনা আর সম্ভব হয়নি। কেমন একটা লজ্জা এসে ভর করেছিল ।
আর প্রকৃতির খেয়াল সে পা ঢাকা জুতো পরে আসে। যত বার দেখা হয়েছে, নতুন নতুন জুতো পরেছে, জামা গায়ে দিয়েছে - যত্ন করে রহস্যময় হতে যেন মেয়েদের জুড়ি নেই।
কাকতালীয় ভাবে সেদিনের অনুষ্ঠানে যে শ্যামা সেজেছিল তার নাম চন্দ্রাবতী আর শ্যামার এই সখিটার নাম শ্যামা।
২
একুশে ফেব্রুয়ারীর মিছিলে আজানের অনেক আগে উঠে বসেছিলাম। কলেজ থেকে বড় দল যাবে শহীদ মিনারে। লম্বা ছেলে বলে ব্যানারের খুঁটিটা ছিল আমার হাতে। পাশেই ছিল শ্যামা। ভোরের আলোয় কালো পাড়ের শাড়ীতে শ্যামাকে সদ্যস্নাত বটাপাতার মতো উজ্জ্বল মনে হয়। বৃষ্টিবৃক্ষের ডালে একজোড়া শালিকের পাশে বসে ছিল তার প্রতিদ্বন্দ্বী - শ্যামা পাখী।
সমবেত গানের ফাঁকে ভাষাশহীদদের শোকে অপরাধীর মতো আনন্দ নিয়ে উঁকি নিয়ে তার পা ফেলা দেখি। শোকের প্রহরে নুপুরের শব্দ বেনানান, ঘুঙুরের সঙ্গত নিন্দনীয়, শুধু আজিমপুরে শত মৃতের শুয়ে থাকা মাঠের ভেতর জীবনরস নিয়ে খালি পায়ে হেঁটে চলেছিল জীবন্ত শ্যামা নামের মেয়েটা।
খুব স্বার্থপরের মতো মনে হয়েছিল যদি বছরের সবগুলো দিন হতো একুশ। আমি হয়তো তখন অন্ধই ছিলাম।
৩
ফরিদপুর থেকে মোটর সাইকেলে টাঙ্গাইল যাচ্ছিলাম। এনজিওতে চাকুরী করার শর্ত হিসাবে মোটর বাইকে জেলা অফিসগুলোতে ছুটতে হতো। অফিসের পুলের চাইনিজ বাইকগুলো শ্যালো ইঞ্চিনের মতো শব্দ হয়। আমি ভাগ্যক্রমে জাপানী ব্র্যান্ডের একটা মোটর বাইক পাই। মসৃন আর দ্রুত গতির।
পাঠকদের আন্দাজটা ঠিক। মোটর সাইকেলের সঙ্গে কোথাও দুর্ঘটনার একটা সম্পর্ক আছে। আমি কখনো স্পিডিং করিনি। নিয়ম কানুন মেনে চলেছি। এতটা সতর্ক অন্যরা থাকে না। তবুও বিধি বাম। সেদিন আরিচার আগে আগে যেখানে নতুন ইটেরভাটা হচ্ছে সেখান ১০০ মাইল বেগে একটা ট্রাক আমাকে আড়াআড়ি আঘাত করে। তারপর জ্ঞান ফেরার আগ পর্যন্ত কিছুই মনে নেই।
শ্যামা বসে ছিল হাসপাতালে। উত্কণ্ঠা। জ্ঞান ফিরে চোখ খুলতেই তার মুখ দেখতে পাই। সে আমাকে খুশী করার জন্য মিষ্টি করে হাসির ভান করে। আমি আবার চোখ বুঁজে যাই।
৪
অনেক দিন পর মোহাম্মদপুরের বাড়ির ৬ তলায় নিজের বিছানায় শুয়ে আছি। হাসপাতালের ম্যাচের বাক্সের মতো খাটে শুয়ে থেকে ক্লান্ত লাগতো। বাড়ির কথা ভুলেই গিয়েছি। যদিও সুস্থ সময়েও বাড়িতে থাকতে পারতাম না। কাজের জন্য ছুটতে হতো ভিন্ন জায়গায়। বাড়িতে থাকে দেশের বাড়ি আনা এক গরীব নানী আর শ্যামা।
শ্যামাকে মিস করলেও কিছু করা যায় না। ছুটির চাইলে ম্যানেজার সাহেব মুখ গম্ভীর করে বলে, "গতমাসে একবার ছুটি নিয়েছেন, অসুস্থতার জন্য তিন দিন আসেন নি। এত ছুটি লাগলে অফিসে না আসলেই হয়"। দুর্ঘটনার উপলক্ষে এবার সহজেই ছুটি পাওয়া গেছে। অফিসগুলো কি ভাল হয়ে গেল?
ছুটি পেলেও নড়ার উপায় নেই। শ্যামা উঠে কাঁচের জানালাটা খুলে দেয়। শরতের বিকেল। মেঘেরা ভেসে চলেছে সিনেমার স্লাইডের মতো। ওদের দেখলে পুরনো ইতিহাসের ছবি দেখতে থাকি । আফ্রিকার পিতৃপুরুষেরা যেন আকাশে দলবেঁধে হেঁটে চলছে - হাতে পাথরের খন্ড, মুখ চুল কেশাবৃত, তখনও পবিত্র অঙ্গগুলো সুতোর বুননে হিপোক্রেট হতে শেখে নি, মাথায় খড়ের টুপি নেই, পায়ে নেই বুনোমোষের ছাল।
সেই প্রাচীন মানুষগুলোর কাছে আমি ঋণী। জৈবজীনের নকশায় তারা সম্পুর্ণ একজোড়া পায়ের উত্তরাধিকার দিয়েছিল। কিন্তু আমারই কপাল মন্দ। দুর্ঘটনায় একটি পা প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। বিছানায় শুয়ে ঘোলা চোখে ডাক্তারেরা ইসারায় অন্যদের যা বলেছিল তাতে বুঝতে কষ্ট হয়নি গ্যাংগ্রিন ঠেকাতে তারা কোন রিস্ক নেবেনা।
কিন্তু সৌভাগ্যজনক ভাবে সেই ডাক্তারেরা মায়া মমতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছে। পা আর কাটেনি শুধু মাত্র পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলটা বিসর্জন দিতে হয়েছে। সেই জায়গাটা খালি। যমদুত জীবনের ক্রিকেটে নিশ্চিত একটা ক্যাচ ড্রপ করেছে।
মেঘ থেকে চোখ সরিয়ে নেই। আমি বরং মঞ্চের সামনের মুগ্ধ ছেলেটার মতো আমার স্ত্রী শ্যামাকে দেখি। গত তিন মাসে তার চোখ বসে গেছে। সুন্দর মসৃণ ত্বক থেকে হাড়েরা বের হয়ে এসেছে। আইসিইউ থেকে ফেরার পর সে কাঁদার সুযোগও পায়নি। বাড়ি থেকে চাচারা এসেছে। চাচাতো মামাতো ভাইবোন সবাই সান্ত্বনা দিয়েছে। তাদেরকেও সামলেছে সে।
আমি বললাম, "তুমি কত হতভাগা। আমার জন্য তোমার কত কষ্ট হচ্ছে। যদি একটা ভাল চাকুরী থাকতো এভাবে জেলায় জেলায় তোমাকে রেখে ছুটতে হতোনা। আর তোমার কত প্রতিভা ছিল, সংসারের বোঝা চাপিয়ে সব শেষ করে দিলাম। আর আজ ...."।
নিজেকে খুব অভিশপ্ত মনে হয়। হয়তো কোথাও কোন পাপ করেছি। না হলে এমন কেন হবে। বরাবরের মতোই চুপ থাকা থেকেই আমাকে উত্তরটা খুঁজতে হয়। আমার সাদা স্যান্ডো গেন্জি থেকে সে তার খোলা চুলের মাথাটা সরিয়ে নেয়।
মাথায় তার অনেক চুল ছিল। বেনী বাঁধলে তাকিয়ে থাকতে হতো। কয় দিনে অযত্নে কী হয়েছে! তারপর সে তার গালটা নিচে নিয়ে আমার পায়ে ঠেকায়। সযত্নে ঘষতে থাকে, যেন অনেক কষ্টে সে ফেরত পেয়েছে এই আমাকে, আমার হতভাগ্য পা কে। তার চোখ থেকে গড়ানো একবিন্দু জল সমস্ত অভাবকে সারিয়ে ফেলে। সেদিন সারারাত বুকের উষ্ণতায় ডুবে ছিলাম।
আজ প্রথম বারের মতো বাইরে এসেছি। মানিকঞ্জের কালিগঙ্গা নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে নিজেকে তুলে আনতে চাইছি নতুন করে। আমার শরীরের ঠিক পাশেই হেলান দিয়ে বসে আছে জীবনসঙ্গী। সেই আমি যেন প্রাগৌতিহাসিক মানুষের মতো তার আত্মাকে ভর করে শুধু সামনে এগিয়ে যেতে থাকি।
(ড্রাফট,১.৫ - বানানের ভুল ত্রুটি মার্জনীয়)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ১২:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


