somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভালবাসা

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ১০:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হতে পারে পতঙ্গ, জীবাণু, হতে পারে বহুমাথার রাবন অথবা প্রভুর আবাস। খুব ভয়ে ভয়েই সখিনা নিজেকে আবিষ্কার করে সুউচ্চ প্রাসাদে। ঝালর বাতি চোখ ঝলসায়। সোনা রূপায় বাঁধানো দরজার কপাট, সোফায় হীরার হাতল। ফ্লুরোসেন্ট আলোর স্নিগ্ধতায় সুতী জমিনকে মনে হয় কাতান। কিন্তু সেই আলোতেও স্পষ্ট হয় না সে কোথায়?

অনতিদুরে মণিমাণিক্য খচিত চেয়ারে এসে বসে এক দুর্দান্ত মহিলা। জড়োয়া গয়না, হাতে দামী আংটি। আলোর প্রতিফলনে চোখ ধাঁধায়। ভয়ে নতজানু হয়ে যেতে থাকে সখিনা। সে জানে এরকম মহিলারা কেমন হয়, সে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে
-আমারে মাফ করেন, এইখানে আনছেন কেন? আমার কি দুষ?
-আরে না না, আপনার কোন দোষ নেই। দেখলাম কষ্টে আছো। তাই একদিনের জন্য বেড়াতে আনলাম। থাকি একা। সঙ্গী সাথী হয় অনুগত ভৃত্য অথবা ছেলে মেয়ে। মন খুলে কথা বলার উপায় থাকে না।
-(সখিনা চুপ থাকে, অবিশ্বাস্য মনে হয়)
-ভয়ের কিছু নেই। শুনলাম তুমিও আমার মতোই মা। এখন খাও দাও, বিশ্রাম করো। তারপর গল্প করা যাবে।

চোখের পলক ফেলতেই গ্লাস ভর্তি মদ আর পেয়ালা ভরা দুধ চলে আসে। সখিনা মদ ঘৃণা করে। এই মদতো আর রুস্তমের বাপের কাঞ্জি না, চোলাই ও না। বিদেশী আতরের মতো সুবাস উড়ে আসে সেই গ্লাস থেকে। পেটে তখন রাজ্যের ক্ষুধা। সে এমারেল্ডের টেবিলে রাখা স্ফটিকের পেয়ালার দুধ দু' হাতে ধরে অভদ্রের মতো ঢক ঢক করে খায়। দুধ না যেন অমৃত। অধরে দুধের সর লেগে গেলে ডান হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নেয়।

সখিনার মনে হয় যদি এই দুধে খেজুরের গুড় আর ভাত ছেড়ে দিতো পারতো ! এখন তো গুড়ে খালি সোডা মিশায়। স্বাদ নাই। আর ভাত মানে ইরির ভাত, সেই বুরো চালের সেই মিঠা গন্ধও নাই।
গৃহকর্তী মিশরীয় রাজকন্যার মতো কাজলরঞ্জিত চোখে স্থির তাকিয়ে দেখে। বলে
-আরও দুধ লাগবে? দুধ, মধু, চীজ যেটা চাও অভাব নেই। তুমি বোধহয় গুড় দিয়ে ভাত খেতে চাইছো। চোখের নেড়ে ইসারা করতেই টেবিলে বুরো চালের ধোঁয়া ওঠা ভাত উড়ে আসে। আর সোনার বাটিতে লাল নরম খেজুরের গুড়।
-চিনা মাটির থালায় খেতে চাও? না সানকি?
-সানকি আছে? থাকলে দেন। চিনের থালিতে হাত ডুবায়ে খাওন যায় না।
সখিনা অনেকদিন পর জীবনের সুখ মিটিয়ে খাচ্ছে। সিংহাসনের মতো সোফায় বসে থাকা মহিলাটা স্থির ভাবে মিটিমিটি হাসছে।

আরে! মহিলার শাড়ীটা দেখি বদলে গেছে। শাড়ীটাই কি এমন? বদলাতে হয় না - যখন তখন নানান রং ডিজাইন হয়ে যায়! সখিনা শুনেছে ভবিষ্যতে মানুষ অনেক কিছু আবিষ্কার করবে। সে তাহলে কোথায়? ঘরে কোন এসি নেই ফ্যান নেই।চারদিক থেকে শীতাতপের বাতাস তাকে ঘুম পাইয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎ নিজের দিকে তাকিয়ে রুস্তমের মায়ের লজ্জা পায়। তার গায়েও নতুন শাড়ী। সাউথ কাতান।সখিনার এক ধরণের রাগও হয়। এই মহিলা যাদু জানে ভাল কথা। কিন্তু সখিনার শাড়ী বদলাতে যাবে কেন? সে তো আর এমন শাড়ী চায়নি। এসব কথা সে আর ভাবতে চায় না। মহিলা বোধ হয় তার মনের কথা বুঝতে পারে।

-তা সখিনা বিবি তুমি কি তোমার ছেলেটার কথা ভাবছো?
-জ্বি। রুস্তমটা একটা পেঁয়াজ দিয়া ভাত খাইছে কালকে রাত্রে। আমি এই গুড়ের চাক্কাটা নেই?
-নাও। তোমার ছেলেকে ঠিক মতো খেতে দাও না। অথচ তোমার কথা সে শোনে কি করে?
সখিনা বুঝতে পারে না। বোকার মতো প্রশ্ন করে,
-আপনার পোলা মাইয়া কয় জন? কই থাকে?

মহিলা তাকে দেখাতে নিয়ে যায়। সে বলে,
-আমাদের এখানে নিয়ম আলাদা। আমি যখন যা চাই তাই পেয়ে যাই। মুহুর্তে ছেলে জন্ম হয়। চাইলে মেয়ে।

কাচের বিশাল একটা ঘর দেখালো। দেখছেন? সখিনা চোখ বড় করে দেখে দেখে হাজার হাজার বাচ্চা খেলছে সেই ঘরে।
-বুঝলাম না, আপনের একার পুলাপান এইগুলান?
মহিলা না থেমে বলে, হ্যা, এখানে শিশুজন্মদান সোজা। আমি সকালে বিকালে যখন চাই শিশু জন্মাই। ওরা ঐ ঘরে চলে যায়। খেলে।
-তারপরে?
-ওদের খেতে দেয়া হয়, ভৃত্যরা সেবা করে। আর ভাল না খারাপ কাজ করে সেজন্য শাসন করা হয়
-বাচ্চারা বুঝে কুনটা ভালা আর কুনটা খারাপ?
-অবশ্যই। বুঝতে হবে। দেয়ালে নিয়মকানুন লিখে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। নোটিশ বোর্ডও আছে
১. মা বলে ডাকতে হবে একটু পর পর।
২. খাবার খেতে চাইলে সুন্দর করে চাইতে হবে
৩. মারামারি করলে মায়ের কাছে কেঁদে কেঁদে বলতে হবে
৪. মিথ্যা বলা যাবে না
৫. খাবার খেয়ে ঝুটা করা যাবে না
৬. কেয়ার টেকার বুড়োগুলোর যত্ন করে বলে ভুল করে তাদের মা ডাকা নিষেধ

মহিলা তাকে একটা শোয়ার রুমে নিয়ে আসে। বলে,
-এখন আর না, একটু জিরায়ে নাও। ঘুমানোর জন্য বালিশ নিয়ে আসবে ভৃত্য। বিকেলে বাকিটা শুনবো। সখিনার কৌতুহল মেটেনি। মখমলের এই নরম বালিশে তার ঘুম আসবে না।


এখনে সম্ভবত: বিকেল। রুবি জিরকনিয়াম খচিত পথ। কৃত্রিম আলো আর আসল আলোর তফাৎ করা মুশকিল। সে উঠে হাটতে হাটতে চলে আসে এক বাগানে। টগর ফুল ফুটে আছে। চম্পা। শেফালী ঝরছে। উঁচু ঢিবি থেকে ঝর ঝর করে ঝরণার জল ঝরছে। সাজানো ডালে পাখীদের বাসা। একটু পর পর কোকিলের গান আসছে। পিছন থেকে মহিলা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল
- এটাও কিন্তু বাচ্চাদের জন্য। তবে শুধু ভাল বাচ্চাদের জন্য। আমার সন্তানদের যারা আমাকে সুন্দর করে মা ডাকে তাদের জন্য বিশেষ ভাবে বানানো। কত ধরণের গোলাপ আছে দেখেছেন?
- দেখেছি (ভয়ে ভয়ে বলে সে)
- আর চকলেট আছে বিশ্বের সেরা কোম্পানীর। খুব ভাল বাচ্চাদের জন্য আইসক্রিমের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে।

সখিনা হতবাক হয়ে শোনে।
-তারপরে?
-ঐ যে কাচের ঘর দেখেছেন। ঐটাই সেই শিশুগৃহ। পাহারাদারেরা ভাল বাচ্চাদের বেছে এই ঘরে পাঠিয়ে দেয়।
-কিন্তু, যারা অবুঝ বাচ্চা। উল্টাপাল্টা কাজ করে?
-তুমি কি কর রুস্তমকে?
-আমি তো রুস্তমরে গালি দেই। কিন্তু সেই গালি দিয়া নিজেই কান্দি। পুলাডা জন্মের সময় থেকে আমি সুতিকার জ্বরে ভুগছি। সাড়ে সাত মাসের পুলা। তিন মাসের পোয়াতী তখন। দাই কইছিল বাচান যাইবো না, বাচ্চার হাড্ডি নরম। পেট ফুইলা ঢোল হইছিল। কত গাছ গাছড়া পেটে মালিশ করছি। সারাদিন বমি হইতো, মাছ খাইতে পারতাম না। খালি কালিজিরা আর ভাত গিলছি। গরীব মানুষ সেই শইল নিয়া কাজ কাম করতাম। যেদিন পর্থম বাচ্চাটা পেটের ভিত্রে লাত্থি দিছে, চিক্কুর দিসি খুশিতে। খালি ভাবতাম, আমি মরলে মরি, বাচ্চাডা যেন ঠিকমত বাইর হয়। অনেক কষ্টের জান এই রুস্তম।
-তা বুঝলাম, কিন্তু সে তোমার কথা মানে? তোমার তো কোন নিয়ম কানুনই নাই
-জানিনা। আমি মুখে মুখে যা কই মাঝে মইধ্যে শুনে, মাঝে মইধ্যে শুনে না।
-যে বাচ্চা নিয়ম কানুন মানে না, তাকে আমি যন্তর মন্তর ঘরে দেই। সেখানে আগুনে তাকে জ্বেলে ফেলা হয়। পুড়িয়ে কয়লা করে ফেলি। অসুবিধা তো আর নেই, যখন ইচ্ছে নতুন বাচ্চা জন্ম দেই। তোমাদের মতো তো আর এতো ঝামেলা নাই।
-ওহ! কী কন! সেই বাচ্চা কান্দে না, কষ্ট পায়না?
-কাঁদে
-চিৎকার করে না?
-করে
-আপনার মায়া লাগে না?


সখিনার জ্বরের ঘোর কমে যায়। ৬ বছরের ছেলেটা মাথায় পানি ঢালছে। সে চোখ মেলে দেখে তাকে। ছেলেটা বোধ হয় কিছু খায়নি। সে তাকে বলে,
-মা ডাক্তার আনসিলাম। কইছে ভালা হয়া যাইবা। এইবার উঠ। ভাত যা আছে আমি আর তুমি ভাগ কইরা খামু।

সখিনার হাসি ফুটে ওঠে মুখে। মনে মনে ভাবে, যার নিজের পেটে মাসের পর মাস সন্তান বড় হয় না, জন্মদেওয়ার ব্যথা বুঝে না, যার যাদুর মতো সন্তান পয়দা হয়, সে এই নিয়মই বুঝবো, আগুনে পুড়ায়া শাস্তিই বুঝবো। নিজের নাড়ির লগে বান্ধা সন্তানের জন্য ভালবাসাটা সে কী কইরা বুঝবো?

--
ড্রাফট ১.০
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ২:৪৪
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×