কাল রাতে স্বপ্ন দেখার পয়সা ছিল না বলে একটা স্বপ্নহীন ধূসর রাত কাবার করতে হলো। মনে হচ্ছিল যেন সিনেমা হলে বসে আছি। পর্দায় এক্ষুণি ছবি শুরু হবে, কিন্তু হয়নি। লজিং মাস্টার উসমান মিয়া থাকে পাশের খাটে। ওর পকেট আমার চেয়ে খারাপ। চোখ ডলে জেগে উঠে বললো, আর ভাল লাগেনা ভাইজান। কবে যে পয়সা হবে আর কবে অন্তর জুড়িয়ে স্বপ্ন কিনতে পারবো। আজকের স্বপ্নদর একশত উনপঞ্চাশ টাকা । এই দামে স্বপ্ন দেখে কি পোষায়? ভবিষ্যতে দাম না কমলে স্বপ্ন দেখাটা স্বপ্নই থেকে যাবে।
আজ সকালে সূর্য ওঠেনি। আঁধারে হাতড়ে বাইরে এসে বললাম, তা সূর্যদেব আপনারও কি পয়সার ধান্ধা? সূর্য ক্ষেপে গিয়ে উত্তর দেয়, ধান্ধা কে করে? নিজেরা সোলার প্যানেলে রোদ ভরে বিক্রি করো না? টাকা নাও না? আমি যে প্রতিদিন রোদ্দুর ফুটাই তার বিনিময়ে কী পাই?
গাছে গাছে পাখিদের গান বন্ধ। বটের পাতায় নোটিশ লাগানো - এতদ্বারা পক্ষীকূলের পক্ষ হইতে সর্বসাধারণকে জানানো হইতেছে যে কুহুতান পরিবেশনার নিমিত্তে বৃক্ষদের নিকট হইতে নিয়মিত ফল ক্রয় করিতে হয়।একশত কুড়ি টাকায় মাত্র এক কেজি জাম পাওয়া যায়। প্রতিকেজি জামফল ভক্ষণে দশ ঘন্টা সঙ্গীত পরিবেশন সক্ষম হয়। সুতরাং ঘন্টা প্রতি বার টাকা করিয়া ব্যয় হয়। ইহার সহিত আট টাকা সার্ভিস চার্জ সহযোগে কুড়িটাকা প্রদান করুন এবং আমাদের সুশ্রাব্য সঙ্গীত শ্রবণ করুন।
একটা ডাহুক ডান ঝাপটে বলছিল, যান গাছের কোটরে ক্রেডিট কার্ড চার্জ করে গান শুনে নিন। দোয়েল আর শ্যামার গান শুনতে শুনতে একটা স্কুলঘরের সামনে আসলাম। আকাশ বাতাস নদী নালা গাছ পালা সব যেন এক একটা দোকান। পয়সা আর পয়সা। তৃষ্ণা পায়। টিউবয়েলের হাতল ধরে চাপতেই পানির কলটা মুখ ভেঙচে বললো, এসব কি? তোদের বাপ দাদাদের ফ্রি দিয়েছি বলে সারাজীবন ফ্রী পানি পাবি? তোরা দোকানে বোতল ভরে যে পানি বেচিস সেগুলো কি ফ্রী?
আমাকে আজ অনেকদুর হাটতে হবে। গ্রাম পেরিয়ে শহরে যেতে হবে কাজে। পয়সা আয় করে সুখে থাকবো। সময় বাঁচাতে মাঠের ঘাসের হাটতে থাকি। ঘাসের লম্বা পাতারা কানাকানি শুরু করে দেয়, মানুষ জাতটাই এমন, স্ট্যান্ডার্ড নেই কোন। নিজেরা করার সময় সব ঠিক। অন্যদের বেলায় মাথা নষ্ট। লোকটা তার বাড়ি সাজাতে হাজার টাকার ঘাস পুষছে বারান্দার টবে। অথচ আমাদের উপর হেটে যাচ্ছে পয়সা না দিয়ে।
একটা সবুজ পাতা পাকা সেলস গার্লের মতো মাঠের রেট বললো। সে লাজুক ভাবে বললো প্রতিদিন চলতে চাইলে মান্থলি ওয়াকিং কার্ড করে নেয়াই ভাল। রসিক শুকনো খড় গলা খাকারি দিয়ে বলে, এতদিনে ঘাসেরা মানুষ হয়েছে। মাটি তো আর এমনি এমনি খাদ্যরস দেয় না
এতদিন টাকার হিসাবটা শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন প্রকৃতির শেয়ানা হয়েছে। বুঝতে পেরেছে মানুষ তাদের রোদ, পানি, ঘাস বিক্রি করে পয়সা বানায়। তাই ট্রেডইউনিয়নের শ্রমিকের মতো বিদ্রোহ করছে পয়সার দাবীতে। পান থেকে চুন খসলেও পয়সা দিতে হচ্ছে।
পকেটে তখন টাকা নেই। কয়েকটা খুচরো পয়সা ঝনঝন করছে। কপর্দকহীন হয়ে বিস্তীর্ণ নদীর ধারে এসে বসলাম। শরতের কাশফুল ফুটে আছে নদীর দু'ধারে। অবশ্য প্রিয় ছোট নদীটা কাচের মতো স্থির । উথাল পাথাল ঢেউ নেই, কুলু কুলু শব্দ নেই। শো শো নিরবতায় ঢেকে আছে নদীর পার। বুঝতে কষ্ট হয়না নদীও পয়সা চাইছে।
উদাস হয়ে পাথরে বসতেই - মিহি গলায় শিলাকন্যা বলে ওঠে, স্বাগতম, আজকের প্রতিবর্গসেন্টিমিটার পাথরে বসার রেট আঠাশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা। মেঘলা দিনে সুশীতল তাপমাত্রা ফ্রি। একটা ক্যাশমেমো উড়ে আসে, কাশবনের পাঁচ গ্রেডের ধপধপে সাদা ফুলের দোল দেখার জন্য প্রতিঘন্টা দশ টাকা হিসাবে তিরিশ টাকার বিল এসেছে। পয়সা না থাকলে তিন মাসে শোধ করে দেয়া যাবে।
সারাদিন সব কিছুই চলছে অর্থ নিয়ে। গোলাপের প্রিপেইড পাঁপড়িগুলো বুঁজে ছিল। ওরা বললো, আমাদের ছবি তুলে ড্রইং রূমে বাঁধাতে পার পাঁচশ টাকা দিয়ে, তবে আমাদের পঞ্চাশ টাকা করে রয়ালিটি দিতে এত কষ্ট কেন? আমরা এও দেখেছি তোমাদের ব্যবসায়ীরা মাটি খুঁড়ে বিক্রি করছে, জোছনার ছবি তুলে বিক্রি করছে, এমন কি সমুদ্র দেখাতেও পয়সা নিচ্ছে।
দ্বিমতের অবকাশ নেই। অনেকেই চুরি করে মেঘ দেখে, পানি পান করে, ফুলের রূপ উপভোগ করে। বিজ্ঞ আদালত বলছে অর্থ যদি অনর্থের মূল হয় তবে তা থাকার কোন যৌক্তিকতা নেই।নয়তো প্রকৃতিতে যারা বিনে পয়সায় সব দিয়ে যাচ্ছে তাদেরও পয়সা দিতে হবে। সাংবাদিক সম্মেলনে নি:শ্বাস মন্ত্রী বলেছেন, সমস্ত বৃক্ষ ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে। যদি অর্থনীতিবিদেরা রাজি না হয় তাহলে রান্নার গ্যাসের মতো নাকে নাকে অক্সিজেনের মিটার স্থাপন করা হবে। বিল না পেলে সঙ্গে সঙ্গে নাকের ছিপি বন্ধ।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০১০ রাত ৮:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

