শেভ করার সময় পুরুষেরা আয়নায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখে। তার বয়সটা নিয়ে ভাবে। গালের মাংসের হ্রাসবৃদ্ধি, শ্মশ্রুর ঘন হয়ে যাওয়া, সন্ধ্যা ঘনাতে থাকলে নক্ষত্রের মতো উঁকি দেয়া সাদা চুল -এ সব খুঁতিয়ে দেখে। আমি জানি আমার কয়েকটা চুল সাদা হয়েছে, মানে বুড়ো হচ্ছি।
রুমিনার তার স্বামীকে বুড়ো দেখতে ইচ্ছে হত না। যখনই চোখে পড়ত আমাকে থামিয়ে একটা একটা করে চুল তুলে ফেলত। দ্বিতীয় একজন এটা খেয়াল করেছিল। ওর নাম দুলাল। ওদের পৈত্রিক সেলুনে বহুবছর চুলকাটাই। সে একদিন বলেই ফেলল, কোরিয়ান একটা ক্রিম আসছে, লাগায়ে দিমু, দেখবেন সাদা ভাব কাইটা গিয়া সিল্কি হয়া গেছে।
আমি গর-রাজি হয়ে বলেছিলাম, না দুলাল, আজকে টাইম নাই।
আমার চুল ঘন আর পুরু। কৌশলে সিঁথির অবস্থান সরিয়ে নিলে দুর্গতি কম বোঝা যায়। কলপে শুনেছি ক্যান্সার হয়।বয়স লুকানোয় পিছনে পুরুষের একটা গোপন ইচ্ছেও থাকে। সেটা হল পর-রমণীর মন জয়ের সুপ্ত বাসনা ।
কিন্তু আমি একটি মাত্র মেয়ের স্বীকৃতি চাই। আমার স্ত্রীর। সেই মেয়েটি আমাকে আপাদমস্তক জানে। বর্তমান-অতীত কোন কিছুই তার অজানা নয়। সেই কবে স্কুল জীবনে পাড়ার কোন কিশোরীর জন্য গোপনে কবিতা লিখতাম - তাও সে জানে। রুমিনা কপট রাগ করে বলত, ও, প্রথম কাহিনী! এখনো সেই মেয়ের জন্য আফসোস আছে, না?
না আফসোস নেই, আমি বলি। আমি কিন্তু ওরকম না। খুব আটপৌরে মানুষ । নিজেকে হীনমন্যতায় ভাসিয়েছি। এখনো ভাসাই। নারীদের স্বপ্নের পুরুষ আমি না। চিকন হাতের গ্রন্থি, অস্থিসার পাঁজর, ভোতা নাক, পুরু ঠোট, কম উচ্চতা, সাধারণ মেধা -কোন কিছুতেই আমি চোখে পড়ার মত বিশেষ কেউ না।
টিন-শেড বাড়িতে বড় হয়েছি, তাও ভাড়া। নীল রক্ত আভিজাত্য হলে, বর্ণহীন রক্ত বয়ে যায় আমার শিরায় শিরায়। গ্রাম থেকে উঠে এসেছিল এক চাষার সন্তান। তিনি আমার বাবা, স্বল্পবেতনের চাকুরে। আমিও পড়াশোনায় সেকেন্ড ডিভিশনে মেট্রিক ইন্টার পাশ করি। তারপর বিকম শেষ করে একটা চাকরী পাই। আমার মা সোজা সরল মহিলা। যখন একটা কোন রকম চাকুরী পেলাম তিনি পাত্রী খুঁজলেন। প্রথম বা দ্বিতীয় প্রস্তাবেই রুমিনার সঙ্গে সম্বন্ধ ঠিক হয়ে গেল।
বলাবাহুল্য আমি কোন দিনই প্রেমপত্র লিখি নি। রুমিনাকেও চিঠি লেখার প্রশ্নও ওঠে না। ঘরে থাকা বউ সে। প্রতিদিই দেখা হয়। কথা হয়। কোথাও মাস-খানেকের জন্য যাই নি। গেলে না হয় সাহিত্য দিয়ে লিখতাম -
-----------------------------------------------------
প্রিয়া রুমিনা,
পৃথিবীতে খুব সামান্য চেয়েছি। তুমি গেলাস ভর্তি জলের তৃষ্ণায় অমৃতের পাত্র উজাড় করে দিয়ে গেছ। প্রথমে ভেবেছি তুমি মোহ। বিয়ের প্রথম কয়েক মাস সবার জন্যই অনন্য। কিন্তু যত দিন গেছে আমি তোমাকে দেখেছি এক ধৈর্যশীলা মেয়ে হিসেবে। একান্নবর্তী পরিবারের শত ঝামেলায় তুমি একটুকু অভিযোগ করনি । কখনো আলাদা হতে চাও নি। আমি জীবনের কাছে চেয়েছি একজন ভাল স্ত্রী। যে আমাকে বুঝবে। তুমি না বললেও শীতকালে স্নানের জন্য গরম পানি, আর অফিস ফিরে এক পেয়ালা গরম চা - সবই তোমার যাদু। টানাপড়েনের সংসারে তুমি হাসি মুখে থাকো। সব অভাব মানিয়ে নিয়েছ। আর মধ্যবিত্ত আদর্শের বাঙালি মেয়ে হিসেবে স্বামীকে ঘিরে রাখছ সোনালী লতার মত।
-------------------------------------------------------
দায়িত্বশীল স্বামীরা এমনই হয়। বিয়ের ঠিক দেড় মাস পরের এক ঘটনা রুমিনার ছোট এক ভাই কাতার চল যায়। এয়ারপোর্টে বিদায় দিয়ে এসে তখন বাড়ি থম থমে ।
রুমিনা ফোঁপাচ্ছিল আর বাসায় ঢুকেই আমার বুকের উপর আছড়ে পড়েছিল। কষ্টের দিনই ভালবাসা জানা যায়। নির্ভরশীলতাতে প্রমাণিত হয় কে ভালবাসে কাকে। রুমিনার অশ্রুতে জামা সিক্ত হয়ে আমি জেনেছিলাম এই নির্ভরশীলতার জবাব হয় না। ওকে কখনোই কষ্ট দেব না।
রুমিনার একটা কষ্ট অবশিষ্ট ছিল। সে বলত একটা সন্তানের ইচ্ছে । মাটির নিচে বহমান নদীর মতই সেই তৃষ্ণা সারাক্ষণ বয়ে যায়।
বিয়ের পর হুট করে সন্তান নেয়া আমি চাই নি। দুই তিন বছর দেরী হলে হোক, একটু পয়সা জমুক। অতিথি আসার আগে বাড়ি ঠিক হতে হয়।
আমার ঘনিষ্ঠ মানুষ নেই খুব বেশি। হাতে গোনা কয়েকজন আছে। প্রথম-জন দু বছরের বড় মিন্টু ভাই। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র। অনেক জানেন, আর দায়িত্ব-সম্পন্ন মানুষ। বাবা স্ট্রোকে মারা গেলেন যখন মিন্টু ভাই আপন ভাইয়ের মত পাশে ছিলেন। এখনো পরিবারের বিপদে আপদে ছুটে আসেন। দ্বিতীয়জন পাড়ায় আশৈশব বড় হওয়া বন্ধু ইকবাল। ইকবাল হালকা মেজাজের এবং খোলা মনের। ভাবছিলাম মিন্টু ভাইয়ের উপদেশ নেব, কি করা উচিত।
বলা-বাহুল্য ইকবালের স্ত্রীর একটা সমস্যা জেনেছিলাম। মহিলা বহুদিন চেষ্টাতে সন্তানধারণে ব্যর্থ। আমি ভাবি নি বিষয়টা এত জটিল হতে পারে। আমাদের দেশে যেখানে না চাইলে জনসংখ্যা বাড়ে। অফিসের পিয়ন, দারোয়ান এমন কি ভিখারিরও গণ্ডায় গণ্ডায় বাচ্চা- সেখানে সন্তান ধারণ কেন এত জটিল হবে?
ইকবালের ভাষ্য অনুযায়ী তার স্ত্রী একটা জন্মবিরতিকরণ পিল গ্রহণ করছিল দীর্ঘদিন। এসব পিলের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় অনেক মেয়েরইএমন সমস্যা হয়। আর বয়স বাড়লে মেয়েদের ঝামেলা বাড়ে। তারপর থেকে সন্তানহীনতার ভয় রুমিনাকে পেয়ে বসে।
আমি তখন চাকুরীটা বদল করেছি মাত্র। অপটিফার্মার ভাল চাকুরী ছেড়ে টিনা লেদার্সে জয়েন করেছি কিছু বেশী পয়সার জন্য। মতিঝিলের ফিটফাট অফিসের তুলনায় তেজগাঁর কারখানা বেশ কদর্য। সেই ট্র্যান্জিশনর সময়ই রুমিনা একদিন খবর দিল যে জন্মপরীক্ষার কাগজ আনিয়েছিল আর তাতে সগৌরবে দেখাচ্ছে যে আমরা বাবা-মা হতে চলেছি।
সে এক আশ্চর্য অনুভূতিই। যদিও জানতাম এসব কাগজ চীনদেশের প্রডাক্ট। গুণমানের বালাই নেই। ডাক্তারের কাছে ছুটলাম। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে অভিনন্দন জানালেন তিনি।আমি তখন কি করে কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। আনন্দে ক্রিকেট ম্যাচের বিজয়ী ক্যাপ্টেনের মত লাফাচ্ছিলাম। রুমিনাকেও তার চেয়ে সুখী কোনদিন দেখিনি।
পরদিন অফিস থেকে ফিরে রুমিনাকে সারপ্রাইজ দিতে চাইলাম । গুলশানের নামজাদা দোকানে একটা ভাল চামড়ার ব্যাগ পেলাম। পরে ওটা রেখে কিনলাম বহু সখের কানের ঝুমকা। পরে ওটাও মনে হল ঠিক মনে ধরল না। আসলে আমি এত বোকা এতদিনেও জানি ও না রুমিনা সবচেয়ে বেশী কি পছন্দ করে। ও সম্ভবত: একজোড়া ভাল জুতো কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু পায়ের মাপ না জেনে তো কেনা সম্ভব না। কি কাণ্ড!
***
সন্তানের জন্য অপেক্ষা শুরু হল আমাদের। শহরের নামকরা প্রাইম ম্যাটারনিটিতে রুমিনাকে রেজিস্টার করলাম। ছেলে বা মেয়ে কোনটি কার দরকার এ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। আমি জানতাম আমার মেয়েই হবে। তবুও বললাম যেটাই হোক আমি তাকে রিমু ডাকবো। ওকে লেখা চিঠির একটা
-----------------------------------------------
প্রিয় রিমু,
তোমাকে মনে মনে চিঠি লিখতে শুরু করি যখন তুমি প্রথম একটি বিন্দু। শুক্র থেকে নিষিক্ত মানুষ তুমি। পাথরের চূড়ায় বসে তোমাকে লেখার অধিকার নেই আমার । তবে তুমি জেনে নিও, আমি তোমাকে ভালবাসি। পৃথিবীতে যাবতীয় বাবার চাইতে আমি ভিন্ন। তবুও তুমি আমার ধ্যানে। আর আমার মত পিতা যেন পৃথিবীতে আর না আসে। এই যে হাত দেখ এই হাতেই আমি তোমার সর্বনাশের সূচনা করেছি। এই আঙুলগুলো তোমার বিলুপ্তি নিশ্চিত করেছে। আমি চাইলেই নিজের হাত কেটে ফেলতে পারতাম। কিন্তু পারিনি। এই বিশ্বাসঘাতক বাবা, যে তোমার মাকে যত ভালবাসে যতটুকু তারচেয়েও তোমাকে ভালবেসেছিল।
একদিন ডাক্তারের কাছে শুনেছি তোমার হৃৎস্পন্দন শোনা যাবে। তোমার মায়ের পেটে শব্দ শোনানোর ধরতেই ভাষাহীন হয়েছিলাম। খুব মৃদু একটা শব্দ অথচ দ্রুত লয়ে ।আমি ঘুমাতে পারি নি আবেগে। কতনা উদ্বেগের রাত ছিল। তোমার মায়ের পেটে চুমু খেয়েছি এই ভেবে তুমি আমার আদরটার ভাগ পেয়ে যাবে।
প্রথম তোমার ছবি পাই তখন একটা আবছায়ার মত কিছু ছিলে। সেটাই গর্ব নিয়ে সবাই দেখেছি। তারপর যখন কুড়ি সপ্তাহ একদিন আমাকে ডেকে পাঠালেন ডাক্তারের চেম্বারে। তিনি আমাকে আশ্বাস দিচ্ছিলেন যে মানুষের সব কিছু মানুষের হাতে নয়, আর তার সেই কথায় আৎকে উঠি। ডাক্তারদের ভেতর আবেগ কম কাজ করে। তোমাকে কি বলব রিমু, ডাক্তার তোমার যে সর্বশেষ ছবিটা দেখালেন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি স্পষ্ট দেখেছি তুমি বিকৃত হয়ে গেছ। শরীর চর্বির মত গলে যাচ্ছে। তুমি এক কঠিন এক রোগে আক্রান্ত মাতৃগর্ভেই। তারপর আমাকে ডাক্তার দ্রুত বলপেন ক্লিক করে একটা সাদা কাগজ দিয়ে বললেন সই করতে। কারণ পৃথিবীতে সব শিশুর আসার নিয়ম নেই। তুমিও আর জন্মাতে পার না। কিন্তু বাবা মা কখনো সন্তানের মৃত্যু চায় না। তক্ষুনি আমাকে বলা হল যে আমার অনুমতি দেয়া উচিত। আমি একটা যন্ত্র হয়ে গিয়েছিলাম। দ্রুত সই করে দিয়েছি।
রিমু, আমি তোমাকে মেরে ফেললাম। হ্যাঁ, আমি খুনি। তুমি যত অসুস্থ হও, আমি না বললে তোমাকে মেরে ফেলতে পারত না হয়তো।
-----------------------------------------------
আমি যেন সম্মোহিত ছিলাম। ডাক্তার বলল যে অধিকাংশ ভ্রূণই এমনিতে মরে যায়। শিশুর সেই বয়সে ব্যথার অনুভূতি থাকে না। আপনারা সুস্থ দম্পতি বেঁচে থাকলে সব ভুলে যাবেন।
রুমিনাকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। কৌশলে জানানো হল যে গর্ভস্থ শিশুটি অজ্ঞাত কারণে মৃত ।
রুমিনা বিশ্বাস না করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। তারপর উন্মাদের মত নিয়ন্ত্রন হারালো। নার্স এল। ঘণ্টায় ঘণ্টায় চিৎকার করে মা মা বলে কেঁদে উঠছিল সে, তার বদ্ধমূল ধারণা ডাক্তারের অবহেলায় এমন হয়েছে। একটানা এক সপ্তাহ মরফিন দিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানো হয়েছে। দুই সপ্তাহ পর ট্রমা সারাতে কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা নেয়া হয়।
আমি তখন একজন দাগী খুনির মত কিছুই জানি না এমন অভিনয় করে গেলাম। জলজ্যান্ত সত্যটা চেপে রুমিনাকে ঈশ্বরের দোহাই দিয়েছি। মাথায় হাত দিয়ে বলেছি, রুমিনা, আল্লাহকে ডাকো। আমরা তো কেউ না। পৃথিবীর সব কিছু তার হাতে। উনি চাইলে সব হয়। না চাইলে কিছু নয়।
***
আজ রুমিনা হাসপাতাল থেকে বাড়ি যাচ্ছে। ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরছিলাম। রুমিনা পলকহীন চেয়ে আছে গাড়ির ঘোলা কাচের দিকে। চোখের নিচে কালশিটে দাগ বসে গেছে। পাংশুল মুখ। থোকা থোকা রক্ত জমে আছে ফর্সা গালে। আমি ট্যাক্সিতে তার হাত ধরে বসে থাকলাম। খবর এসেছে মা নিজেও এই ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন। রুমিনা আমার ঘাড়ে হেলান দিয়ে নিস্তেজ হয়ে হেলে আছে।
শহর চিড়ে ট্যাক্সিটা এগিয়ে চলছে। ইঞ্জিনের শব্দ হচ্ছে। যদিও পথে ভিড় কম কিন্তু অধীর হয়ে আছি বাড়ির জন্য। রাতের নিয়নগুলো চোখ ঝলসে দিচ্ছিল।
খুব হালকা ভাবে সাদা ওড়নায় ঢাকা রুমিনার মাথায় হাত বুলাতে থাকি। আমি রুমিনাকে ভালবাসি। হাতের স্পর্শে তাকে বোঝাতে চাই, আমরা ঠিক হয়ে যাব রুমিনা। জীবন তো থেমে থাকে না। আমাদের দিন আবার ঠিক হবে।
কিন্তু কিছুই বলা হয় নি মুখে।
এক সময় নিরবতা ভেঙে ট্যাক্সি ড্রাইভার বলে ওঠল, স্যার ভুল করে আপনার বাসার গলি পার হয়ে এসেছি। সামনে গেলে অনেক ঘুরতে হবে। এখন গাড়ি কি পিছনে ঘুরাবো? আমি তাকে বললাম, পিছনে যাবা কেন? সামনে যাও।
রুমিনা কিছুক্ষন পর সামনে তাকালো । পথে সোডিয়াম বাতি ঝলমল করছে। মনে হয় পৃথিবীতে কোন দু:খ নেই কোথাও । আমিও ভুলে গেছি শোক। আর পৃথিবীর নিয়মটাই এমন সামনেই তাকিয়ে থাকতে হয়, পিছনে ফেলে আসা ছবিকে ক্রমাগত বিস্মৃতির হাতে সঁপে দিয়ে।
--
ড্রাফট ১.২ / জীবন থেকে শোনা
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ২:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



