গার্মেন্ট থেকে হোটেল রেস্টুরেন্ট, বিজ্ঞাপনী সংস্থা এবং মোবাইল ফোন কোম্পানি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কম করে হলেও পাঁচ লাখ বিদেশি চাকরি করছে। বড়কথা, বছরের পর বছর ধরে চাকরি করছে তারা অবৈধভাবে। অনেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় দু’মাসের জন্য এসেছে, অনেকে আবার ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এলেও সে পারমিট আর নবায়ন করেনি। সবকিছুর পেছনে রয়েছে সরকারি সংস্থাগুলোর চরম গাফিলতি। নগদ নারায়ণের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অনেক কর্মকর্তাও নাকি এ ব্যাপারে যোগসাজশ করে থাকেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার প্রভাবশালীদের খুশি করার ব্যাপার-স্যাপারও রয়েছে। অন্য একটি গুরুতর বিষয় হলো, অবৈধ বিদেশিদের সংখ্যা এবং তারা কোথায় কোন ধরনের চাকরি করছে এসব সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য-পরিসংখ্যান নেই। এ অবস্থারও সুযোগ নিচ্ছে বিদেশিরা। তারা আরও বেশি সংখ্যায় চাকরি নিয়ে ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে। এর ফলে একদিকে শিক্ষিত তরুণ-যুবকরা চাকরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকির সৃষ্টি হচ্ছে। উল্লেখ্য, স্বল্পসংখ্যক ছাড়া অবৈধ বিদেশিদের প্রায় সবাই ভারতীয়।
দেশের ভেতরে লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ-যুবক যেখানে চাকরি পাওয়ার জন্য হা-পিত্যেশ করছে, বেকারের সংখ্যাও যেখানে হু-হু করে বেড়ে চলেছে সেখানে পাঁচ লাখের বেশি বিদেশির অবৈধভাবে চাকরিতে নিয়োজিত থাকার খবর শুধু আশঙ্কাজনক নয়, যথেষ্ট আপত্তিকরও। একে বেকারের দেশে নির্মম নিষ্ঠুরতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বলা বাহুল্য, সরকারের গাফিলতিই এমন অবস্থার প্রধান কারণ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্থল সীমান্তপথে পাসপোর্ট ছাড়া যে হাজার হাজার ভারতীয় আসছে তাদের তো খবরই নেই, পুলিশ এমনকি সেসব ভারতীয় সম্পর্কেও কোনো খোঁজ-খবর করে না যারা পাসপোর্ট নিয়ে আসে। অর্থাত্ বিদেশিদের ব্যাপারে সরকারের কোনোরকম মনিটরিং নেই বললেই চলে। অথচ বিদেশিরা কোথায় কী করছে বা কোন ধরনের তত্পরতা চালাচ্ছে, এসব বিষয়ে পুলিশের মাধ্যমে খোঁজ-খবর রাখাটা সরকারের কর্তব্য। ভিসার মেয়াদশেষে বিদেশিরা ফিরে যাচ্ছে কি-না, তা মনিটর করার পাশাপাশি ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর কেউ থেকে গেলে তাকে বহিষ্কার বা গ্রেফতার করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়াও সরকারের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে সরকার কর্তব্য পালনের ধারে-কাছে পর্যন্ত যাচ্ছে না। আরও অনেকভাবেও সরকার অবৈধ বিদেশিদের জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে। বায়িং হাউস ও মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর উদাহরণ লক্ষ করলে দেখা যাবে, বিনিয়োগের আড়ালে বিশেষ করে ভারতীয়রা তাদের দেশ থেকে লোক-লস্কর নিয়ে আসছে। বেতনও দিচ্ছে তাদের অনেক বেশি পরিমাণে। ফলে বাংলাদেশের তেমন কেউ চাকরি পাচ্ছে না। একই কারণে এসব বিনিয়োগে দেশও উপকৃত হচ্ছে না। এভাবে বিশেষ করে গার্মেন্ট ও মোবাইল ফোনের মতো খাতগুলো ভারতীয়দের দখলে চলে যাচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় শিল্পের বিকাশ। বিদেশিদের ব্যাপারে মনিটরিং না থাকায় দেশের নিরাপত্তার দিকটিও উপেক্ষিত হচ্ছে। তথ্য পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
সব মিলিয়েই অবৈধ বিদেশিদের কারণে দেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত অবিলম্বে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যাতে বিদেশিদের পক্ষে অবৈধভাবে চাকরি ও বসবাস করা সম্ভব না হয়। এজন্য সরকারকে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কতজন বিদেশি আসছে, ঘোষিত উদ্দেশ্যের বাইরে অন্য কোনো কাজ—বিশেষ করে চাকরি করছে কি-না, এসব বিষয়ে কঠিন মনিটরিং থাকতে হবে। ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে যারা বাংলাদেশে আসছে, তাদের কাউকে কোনো চাকরিতে ঢুকতে দেয়া যাবে না; বরং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার বা গ্রেফতার করতে হবে। বিনিয়োগের অনুমতি দেয়ার সময়ও শর্ত রাখা দরকার, যাতে স্থাপিত শিল্প বা প্রতিষ্ঠানে চাকরি কেবল বাংলাদেশীরাই পেতে পারে। এ উদ্দেশ্যে প্রথমে দরকার বর্তমানে চাকরিরত অবৈধ বিদেশিদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য-পরিসংখ্যান। কিছুটা আশার কথা হলো, দেশপ্রেমিক মহলগুলোর অব্যাহত চাপের মুখে সরকার সম্প্রতি কিছুটা নড়েচড়ে উঠেছে। বৈধ-অবৈধ বিদেশিদের তালিকা হালনাগাদ করার জন্য বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা আশা করতে চাই, তালিকার পাশাপাশি এ কমিটি অবৈধভাবে চাকরিরত বিদেশিদের ব্যাপারে এমনভাবে গুরুত্ব দেবে যাতে তারা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। অবৈধ জেনেও এসব বিদেশিকে যারা চাকরিতে রেখেছে, তাদের বিরুদ্ধেও লাইসেন্স বাতিল করাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা মনে করি, ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার যে অঙ্গীকার নির্বাচনের আগে করা হয়েছিল, তা পূরণের কিছুটা কাছাকাছি যেতে হলেও অবৈধ বিদেশিদের বিদায় করা দরকার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



