somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

করুণার বারিতলে

১৪ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ১০:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
তানিজা ভীষণভাবে ধাক্কা খেল।তার জীবনের চরম অথচ লুকানো সত্য আজ বোধহয় উন্মোচিত হলো।নাকি আরও কত কিছু অজানা আছে কে জানে!তানিজা কিছু ভাবতে পারছে না।সে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে জিনিয়া ফেরদৌসীর ব্যক্তিগত ডায়েরী হাতে নিয়ে।তার মাথা ফাঁকা হয়ে গেছে,পুরো পৃথিবী শূন্য মনে হচ্ছে।

ডাঃজিনিয়া ফেরদৌসী এবং ইঞ্জিনিয়ার নাঈম জামান-তানিজার মা-বাবা,প্রাইভেট কারে করে বাসায় ফিরছেন।নাঈম একটু তাড়াহুড়ো করেই ড্রাইভ করছেন।আজ বড্ড দেরি হয়ে গেছে।মেয়েটা বাসায় একা।এমনিতেই নাঈমের অফিস আর জিনিয়ার চেম্বার শেষ করে ফিরে আসতে রাত দশটা বাজে।আজ আবার গুলশানের দিকে যাওয়ায় দেরি হয়ে গেল।তাদের একমাত্র মেয়ে তানিজার জন্মদিন আগামীকাল।দেখতে দেখতে মেয়েটার বয়স পনের বছর পেরিয়ে গেল।অথচ মনে হচ্ছে এইতো সেদিন ওর জন্ম হলো!

তানিজার জন্য একটা DSLR camera কিনেছেন দুজনে মিলে।এটা ওর জন্য সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ হবে।কথা ছিল এস.এস.সি. তে গোল্ডেন A+ পেলে তবে এটা কিনে দেয়া হবে।ছবি তোলার প্রচন্ড শখ তানিজার।ছবি অনেক ভালও তোলে সে।এস.এস.সি. পরীক্ষার পর লম্বা ছুটিতে সে কোথায় ফটোগ্রাফীর কোর্স করবে-তাও ঠিক করে ফেলেছে।জিনিয়া আর নাঈমের একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি আছে ড্রইংরুমে,তানিজার তোলা।যে-ই দেখেছে,ভেবেছে কোন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের তোলা।
‘তানিজার এক্সপ্রেশনটা দেখার মত হবে।কী বল জিনি?’কল্পনা করেই নাঈমের ভাল লাগছে।
‘হুম...কিন্তু অনেক দেরি করে ফেলেছি আমরা।না জানি মেয়েটা একা একা কী করছে!যে বৃষ্টি-পাগল মেয়ে তোমার-দেখোগে,বৃষ্টিতে ভিজে না আবার জ্বর বাধায়!’জিনিয়ার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
‘আরে,এত টেনশন করো না তো!আমার তানি বড্ড লক্ষ্মী!এই তো,আর ৫ মিনিটেই পৌঁছে যাব’।বলেই গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলেন নাঈম।


২.
কলিংবেল বাজছে।টুং টুং.....
তানিজা ডায়েরী হাতে বসে আছে।উঠার কোন লক্ষণ নেই।
আবার কলিংবেল বাজছে।টুং টুং.....বেজেই চলেছে.......
হঠাৎ সম্বিত ফিরে পায় তানিজা।দ্রুত পায়ে উঠে ডায়েরীটা নিজের বালিশের নিচে রেখে দিয়ে দরজা খুলে।
‘কী রে!কোথায় ছিলি?ঘুমিয়ে পড়েছিলি নাকি?’জিনিয়া হেসে জিজ্ঞেস করেন মেয়েকে।
নাঈম বললেন, ‘স্যরি মা!আজ একটু বেশিই দেরি করে ফেললাম’।
তানিজা মাথা নাড়ে।ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘তোমরা তো কাকভেজা হয়ে গেছ।এত ভিজলে কীভাবে?’
‘আর বলিস না!বাইরে এত ঝুম বৃষ্টি যে গ্যারেজ থেকে এটুকু আসতেই পুরো ভিজে গেছি।আমি তো আরও ভাবছিলাম তুই বোধহয় ভিজে সারা।যাতো মা,তোয়ালেটা এনে দে।গোসলটা সেরে ফেলি’।
তানিজা দুজনের তোয়ালে এনে দেয়।ঝটপট দুজনে দুই বাথরুমে ঢুকে পড়েন।তানিজা নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়।বালিশের নিচ থেকে ডায়েরীটা বের করে আবার পড়ে-

০২.০২.২০০৯
আজ তানিজার জন্মের চৌদ্দ বছর পেরিয়ে গেল।ও পনেরতে পা দিল।অথচ এতটা বছর পরে সত্যটা জানতে পারলাম।না জানলেই ভাল হতো।কী এমন ক্ষতি হতো মিথ্যা নিয়ে বেঁচে থাকলে!
আমি কি জামানকে বলব?কীই বা বলব?বলব,তোমার শক্রানুতে আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশন সম্ভব হয় নি?তানিজা তোমার সন্তান নয়?আমার কী করা উচিৎ বুঝতে পারছি না।আমার তো তবু সান্ত্বনা আছে-ও আমার ডিম্বাণু,আমার সন্তান,আমার অস্তিত্ব।কিন্তু জামান?এতো ভালবাসে মেয়েটাকে!যদি জানতে পারে তানিজা ওর মেয়ে না,তানিজার বাবা অন্য কেউ,অন্য কোন এক ডোনার-ও কী সহ্য করতে পারবে?নাহ!আমি আর ভাবতে পারছি না!
হে স্রষ্ঠা,কী কঠিন পরীক্ষায় তুমি আমাকে ফেললে!এত কঠিন সত্য বুকে নিয়ে বাকি জীবন আমি কীভাবে বাঁচব?না তানিকে বলতে পারব,না জামানকে!ফয়সালকেও দোষ দিতে পারছি না।ও মৃত্যুর আগে সত্য বলে যাওয়া কর্তব্য মনে করেছে তাই বলেছে।তবু রক্ষা যে জামানকে বলে নি।জামান কিছুতেই সহ্য করতে পারতো না।চৌদ্দ বছর আগে কত কষ্ট করে আমি আর ফয়সাল মিলে ওকে রাজি করিয়েছিলাম আর্টিফিসিয়াল ইনসেমিনেশনে।ফয়সালই ছিল আমাদের ডক্টর।কথা ছিল,জামানই হবে ডোনার।আমাদের সন্তান হবে শুধুই আমাদের দুজনার।কিন্তু সেটা যখন সম্ভব হয় নি,তখন ফয়সাল কেন আমাদের জানালো না?বেঁচে থাকলে আমি ওকে নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করতাম।
হে খোদা!তুমি আমাকে বলে দাও এখন আমি কী করব?

তানিজার মনে পড়ে ডাঃফয়সাল রহমানকে।খুব আদর করতেন ওকে ফয়সাল আঙ্কেল।এক বছর আগে এক সড়ক দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আঙ্কেল।এর দুদিন পর মারা যান তিনি।ভীষণ কেঁদেছিল তানিজা সেদিন।আজও কাঁদছে।

তানিজা প্রচন্ড ভালবাসে বাবাকে।জিনিয়াও অনেক ভালবাসেন জামানকে।তাই তিনি জানাতে পারেননি সত্যটা।তানিজা ভাবে,স্রষ্ঠা মাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিলেন।কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়,নাঈম জামান ওর বাবা না।তাহলে কে,কে ওর বাবা?ও কি তাহলে পিতৃপরিচয়হীন?

বাবা-মা কেউই এখনো গোসল সেরে বের হননি।তানিজা ছাদে চলে যায়।ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে এখনও।আকাশের কান্নার যেন আজ বিরাম নেই।তানিজাও কাঁদছে।চীৎকার করে কিছুক্ষণ কেঁদে আবার থেমে যাচ্ছে।ছাদে রাখা চেয়ারটাতে বসে তানিজা।সমস্ত বৃষ্টি ফোঁটা ওর গা বেয়ে নিচে নামে।


৩.
জামান গোসল সেরে বেরিয়ে দেখেন বারোটা বেজে গেছে।জিনিয়ার দরজায় নক করে তাড়া দেন জামান।

তানিজার জন্মদিন আজ।

তানিজাকে খুঁজতে খুঁজতে ক্যামেরা হাতে ছাদের সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ান জামান।এক অপূর্ব দৃশ্য দেখেন জামান।তার ষোড়শী মেয়ে তানিজা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।যেন স্রষ্ঠার সাথে কথা বলছে।আর স্রষ্ঠা তাঁর করুণা বর্ষণ করছেন বৃষ্টি ফোঁটায়-তানিজার চোখে-মুখে,চশমার কাচে।জামান ক্যামেরাবন্দী করলেন দুর্লভ মুহূর্তটা।জামান তাকিয়ে দেখছেন অপলক।মেয়ে একেবারে তার মতো হয়েছে –বৃষ্টিপ্রিয়,জোছনাপ্রিয়।বাবা বলতে অজ্ঞান।জামানের খুব ইচ্ছে হচ্ছে মেয়ের সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে।কিন্তু আবার এই সুন্দর মুহূর্তটা দেখতেই বেশি ভাল লাগছে।জামান মনে মনে স্রষ্ঠাকে ডাকলেন,কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টিতে তাকালেন কালো আকাশের বুকে।


৪.
জিনিয়া গোসল সেরে বেরিয়ে তানিজাকে ডাকলেন।সাড়া না পেয়ে তানিজার ঘরে উঁকি দিতেই ধাক্কা লাগলো বুকে।তানিজার বালিশের উপর পড়ে আছে তার নীল ডায়েরীটা।দ্রুত হাতে ডায়েরীটা নিয়েই দেখলেন ডায়েরীর পৃষ্ঠা ভেজা।০২.০২.২০০৯ তারিখের লেখাটা জেলপেন দিয়ে লেখা ছিল।অনেক জায়গায় ছড়িয়ে গেছে সেটা।জিনিয়ার কিছু বুঝতে বাকি রইল না।

ছুটে গিয়ে ছাদের সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠতে থাকেন জিনিয়া।সিঁড়ি যেন শেষ হচ্ছে না।সিঁড়ির শেষ মাথায় জামান দাঁড়িয়ে আছেন ক্যামেরা হাতে।মুগ্ধ চোখে দেখছেন ছাদের দিকে।আর তানিজা হাঁটছে ছাদে।এই তো কিনারার দিকে পৌঁছে গেছে প্রায়।ওর চশমার কাচ ভিজে ঝাপসা হয়ে গেছে।নিশ্চয়ই কিছু দেখতে পাচ্ছে না ও।নাকি ইচ্ছে করেই ঐ রেলিংবিহীন অংশটার দিকে হাঁটছে তানিজা!

জিনিয়ার মাথা কেমন যেন করছে।মনে হচ্ছে পায়ের নিচে কোন মাটি নেই।শুধু চিৎকার করে বলতে পারলেন, ‘জামান ,ওকে ফেরাও’।তারপর ধপ করে বসে পড়লেন সিঁড়িতে।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ১০:২০
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×