ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের চতুর্থ তলা। এক শিক্ষক ও দু’জন ছাত্রী দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। কথা বলার একপর্যায়ে হঠাৎ করেই এক ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরে চুমো দেয়া শুরু করলেন শিক্ষক। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রী নিজেকে রক্ষা করতে দৌড় দিলেন। জানালেন অন্য ছাত্রীদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু মুসা আরিফ বিল্লাহ আগ থেকেই তার বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ ছিল। ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিভাগের চেয়ারম্যানের পদ থেকেও এক বছরের মাথায় সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। ১ম বর্ষের ১ম সেমিস্টারের এক ছাত্রীকে বিভাগের শিক্ষক ড. আরিফ ফোন করে সোমবার সকালে তার কক্ষে দেখা করতে বলেন। আরিফ বিল্লাহর কক্ষ নম্বর ৪০২৮। ওই ছাত্রী তার এক বান্ধবীকে নিয়ে আরিফ বিল্লাহর সঙ্গে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে দেখা করতে কলা ভবনে যায়। আরিফ ওই ছাত্রীর জন্য কলা ভবনের গেইটের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। তিনি দুই ছাত্রীকে নিয়ে ৪০২৮ নম্বর কক্ষে যান। গিয়ে দেখেন বিভাগের আরেক শিক্ষক আবুল কালাম সরকার টিউটোরিয়াল ক্লাস নিচ্ছেন। আরিফ বিল্লাহ দু’ছাত্রীকে নিয়ে কলা ভবনের চতুর্থ তলার ফাঁকা জায়গায় দাঁড়ান। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা কথাবার্তা বলেন। একপর্যায়ে এক ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরে চুমো দেন। এ দৃশ্য দেখে অপর ছাত্রী দৌড়ে বিভাগে গিয়ে বিষয়টি জানায়। বিভাগের অপর শিক্ষার্থীরা কলা ভবনের চতুর্থ তলায় গিয়ে দেখেন ওই ছাত্রী কেঁদে কেঁদে কলা ভবনের চতুর্থ তলা থেকে নামছে। ওই ছাত্রী আর ক্লাসে ফিরে যায়নি। চলে যায় বাসায়। মঙ্গল ও বুধবার ওই ছাত্রী ক্লাসে আসেনি। বৃহস্পতিবার বিভাগে গিয়ে চেয়ারম্যান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর ড. আবু মুসা আরিফ বিল্লাহর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করে বিচার দাবি করে। সেইসঙ্গে বিভাগের অন্য ছাত্রীরাও আরিফ বিল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। আরিফ বিল্লাহকে বিভাগ থেকে বহিষ্কারের দাবিতে ছাত্রীরা চেয়ারম্যান ড. মো. মুহসীন উদ্দীন মিয়াকে অবরুদ্ধ করে। চেয়ারম্যান সুষ্ঠু বিচারের প্রতিশ্রুতি দিলে ছাত্রীরা অবরোধ তুলে নেয়। এ অবস্থায় চেয়ারম্যান ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আজ সকাল ১০টায় একাডেমিক কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. কেএম সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ছাত্রীর অভিযোগটি আমি পেয়েছি। বিভাগের চেয়ারম্যান একাডেমিক কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ছাত্রীর অভিযোগ: চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগে ছাত্রী জানায় ‘বিনীত নিবেদন এই যে, গত ২৮শে মার্চ সোমবার সকাল সাড়ে নয়টায় আমি ও আমার বান্ধবী মো. আরিফ বিল্লাহ স্যারের রুমের সামনে তার সঙ্গে কথা বলছিলাম। একপর্যায়ে তিনি হঠাৎ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে ও আমার গালে চুমো দেন। এই ঘটনায় আমি ভেঙে পড়ি ও মানসিকভাবে খুবই মর্মাহত হই। অতএব, বিনীত নিবেদন এই যে, একজন শিক্ষকের এরূপ আচরণের প্রতিকার ও বিচার প্রার্থনা করছি।
আরিফ বিল্লাহর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ: আরিফ বিল্লাহ বিভাগের চেয়ারম্যান থাকাকালে দুই ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেন। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে তাকে বিভাগের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। ২০০১ সালের দিকে বিভাগের একজন বিবাহিত ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়েন আরিফ বিল্লাহ। ওই ছাত্রী তার স্বামীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল হলে থাকতেন। একদিন ইন্টারন্যাশনাল হলে ওই ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন ওই ছাত্রীর স্বামী। এ নিয়ে তখন তুমুল হৈচৈ হয়। চেয়ারম্যান থাকাকালে অফিসেই আরেক ছাত্রীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান বিভাগের শিক্ষক-কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে বিষয়টি পুরো বিভাগে ছড়িয়ে পড়ে। তার পদত্যাগের দাবিতে বিভাগে আন্দোলন গড়ে তুলেন বিভাগের ছাত্র-শিক্ষকরা। অবস্থা বেগতিক দেখে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ছেড়ে শিক্ষা ছুটি নিয়ে লন্ডন চলে যান আরিফ বিল্লাহ। দীর্ঘ সাত বছর লন্ডন থাকার পর গত বছর বিভাগে তিনি যোগ দেন। এ ছাড়া ড. আরিফ বিল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ছাত্রীদের ফোনে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করেন। তার উত্ত্যক্তের কারণে অনেক ছাত্রীকে নম্বর পরিবর্তন করতে হয়েছে।
একাডেমিক কমিটির জরুরি বৈঠক: বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মুহসীন উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত একপত্রে বলা হয়, প্রিয় সহকর্মী শনিবার সকাল ১০টায় বিভাগীয় চেয়ারম্যান কক্ষে তার সভাপতিত্বে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে। একাডেমকি কমিটির একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে আপনার উপস্থিতি আন্তরিকভাবে কামনা করছি। সভায় একটিমাত্র আলোচ্য সূচি রাখা হয়েছে। তাহলো বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু মুসা মো. আরিফ বিল্লাহর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ছাত্রীর যৌন হয়রানির আনীত অভিযোগ পর্যালোচনা।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আআমস আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু মুসা মো. আরিফ বিল্লাহ বলেন, আমার বিরুদ্ধে কি ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে তা আমি এখনও জানি না। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান শুধু আমাকে বলেছেন, আজ একটি জরুরি বৈঠক রয়েছে। বিভাগে যাওয়ার পর হয়তো জানতে পারবো। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ছাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ নিয়ে আমি লন্ডন গিয়েছি। লন্ডন যাওয়ার কারণেই মূলত দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে। চেয়ারম্যান থাকাকালে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ধরনের অভিযোগের কোন সত্যতা নেই। কেউ আমার সুনাম ক্ষুণ্ন করতেই এসব অভিযোগ করাচ্ছে।
মানব জমিন সুত্রে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




