আমার প্রিয় পোস্ট

হাঁটা পথে আমরা এসেছি তোমার কিনারে হে সভ্যতা। আমরা সাত ভাই চম্পা মাতৃকাচিহ্ন কপালে দঁড়িয়েছি এসে _এই বিপাকে, পরিণামে। আমরা কথা বলি আর আমাদের মা আজো লতাপাতা খায়।

তাহলে স্যাম মানেকশ-ই বাংলাদেশের স্রষ্টা?

০৬ ই জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:২৩

শেয়ারঃ
0 1 0

Manekshaw: A soldier who created a nation ভারতের সুপ্রচারিত অনলাইন জার্নাল রেডিফ এভাবেই এই বীর সেনানীর প্রতি শেষ অভিবাদন জানায়। তাহলে তিনিই বাংলাদেশের জন্মদাতা? এর প্রতিধ্বনি ওঠে ভারত তো বটেই এমনকি বাংলাদেশেরও বেশ কিছু পত্রিকার ভাষ্যে ও লেখায়। দেখি এবং চুপ করে থাকি।
একটা সময় শোক ছাপিয়ে মনে সমালোচনা বাজতে থাকলো চড়া সুরে। অস্বস্তির কাঁটা খোঁচাতেই থাকে। এই লেখার তাড়না সেই কাঁটা।
বাংলাদশে রাষ্ট্ররে জন্ম কি সত্যেই ভারতের এক সেনাপতির কৃতিত্বের ফসল? তিনি না থাকলে বা তাঁর জয় না হলে কি ইতিহাস অন্যরকম হতো? ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা কি এতই মোক্ষম? এসব প্রশ্ন মাথায় আসছে।
মানকেশ যা করছেনে, সটো তাঁর দায়িত্ব ছিল। তাঁর সরকারের হয়ে যুদ্ধ করা তাঁর চাকরির শর্ত। বাংলাদেশের অগণিত মুক্তিযোদ্ধার কাছে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া চাকরির শর্ত ছিল না। বিদ্রোহী হয়েই তাঁরা যুদ্ধে নেমেছিলেন। এ দুইকে এক করে দেখা সম্ভব নয়। তবে মানেকশ এখানেই অনন্য যে, তিনি দক্ষ সমরবিদ।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ছিল ভারত সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত। তিনি সেই সিদ্ধান্তের সফল ও সুচারু বাস্তবায়ক। আর আমরা জানি যে, যুদ্ধ হচ্ছে রাজনীতিরই সম্প্রসারণ। ভারত তার রাজনীতি করেছে এবং তার সুফল বাংলাদশে বিপুলভাবে পেয়েছে। এখানে বলা দরকার যে, ভারত গঠনগতভাবে এমন রাষ্ট্র নয় যে, যে কোনো স্বাধীনচেতা জাতির পক্ষে অবস্থান নিতে তা সাংবিধানিক বা আদর্শগতভাবে বাধ্য। তা হলে আসাম, নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাব বা কাষ্মীরে তাকে দীর্ঘমেয়াদে দমন-পীড়ন ও সামরিক শাসন চালাতে হতো না। এবং বাঙালির 'কথিত মুক্তিদাতা' স্যাম মানেকশ-কেও আসাম-নাগাল্যান্ড বা কাশ্মীরে বিদ্রোহ দমনে নিয়োজিত থাকতে হতো না। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের যিনি বন্ধু তিনি আবার অন্য জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের শত্রু হন কীভাবে, যদি না যুদ্ধ কেবল তার পেশাগত বিষয় হয়? তিনি পেশাদার যোদ্ধা এবং সেই পেশায় তিনি উৎকৃষ্টদের একজন।

১৯৭১-এ ভারতের বাংলাদেশকে সর্বোতভাবে সাহায্য করা নিশ্চয়ই ভারতের মহিমাকে বাড়িয়েছে, কিন্তু সেই মহিমা থেকে বাংলাদেশের জন্ম বা বিজয় কোনোটাই হয় নাই। আমাদের জন্ম আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিকাশের মধ্যে এবং এই জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেয়া মানে হয় ঐ রাজনৈতিক ইতিহাসকে ভুল বলে বাতিল করা নতুবা তাকে ঠিক মতো বুঝতে না পারা।

বাঙালিরা স্বাধীনতার ইচ্ছা করেছে এবং তার জন্য যুদ্ধ করার প্রস্তুতিও নিয়েছে। এই সংকল্প না থাকলে কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না বাংলাদেশকে মুক্ত করা। এই সংকল্প তিনটা ধারায় দিনে দিনে দানা বেঁধেছিল। প্রথমটিসাংস্কৃতিক: জাতীয়তাবোধের জায়গা থেকেই বাংলার মানুষ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পরিচয় এবং তার সাংস্কৃতিক রাজনীতির সঙ্গে দূরত্ব বোধ করছে। বাস্তবের পাকিস্তানের আগেই মনের পাকিস্তানকে তারা ধ্বংস করেছে। এ থেকেই জন্ম নিয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের দ্বিতীয় ধারা জাতীয়তাবাদের রাজনীত। জাতির মুক্তিকে এই রাজনীতি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আধারে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। ৪৮-৭১ পর্যন্ত এরই বিকাশ আমরা বহুধারায় বহু ঘটনার মধ্যে দেখি। এরই চরম পর্যায়ে জন্ম নেয় স্বাধীনতার পথে তৃতীয় ধরনের সংগ্রাম: সামরিক সংগ্রাম। ৫২ সাল থেকে শুরু করে আগরতলা মামলা র্পযন্ত এর প্রথম ধাপ এবং দ্বিতীয় ধাপ দেখা দেয় একাত্তরের র্মাচ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে। সংস্কৃতি-রাজনীতি এবং জাতিতে সশস্ত্র করে তোলা এই তিন হচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রামের বলবান পর্বত। যুদ্ধ হচ্ছে এর শিখর। ভিত্তি হচ্ছে সংস্কৃতি আর রাজনীতি হচ্ছে এর সৌধ। এই শিখর পর্বেই ভারত-সহ আন্তর্জাতিক নানান শক্তির ভূমিকা দেখতে পাই। কিন্তু কেবল শিখরকেই স্বাধীনতার মূল দেহ ভাবলে পর্বতটাকে কেবল একটা টিলা মনে হতে বাধ্য।

১৯৭১ সালে উপমহাদেশে দুটি যুদ্ধ হয়েছিল। একটি বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ। অন্যটি ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ। পাক-ভারত যুদ্ধ হচ্ছে সেই টিলা বিজয়ের যুদ্ধ। ভারত রাষ্ট্রের ইতিহাসে এটা এক গৌরবজনক অধ্যায় মাত্র। ভারত রাষ্ট্রের সমগ্র অস্তিত্বের প্রতীক বা তার সমমূল্য কিন্তু এই বিজয় পায় না। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা তার জাতীয় অস্তিত্বের সমতুল এবং পরিণতি। ভারতীয় পক্ষ থেকে তাদের মিডিয়ায় এবং বাংলাদেশেও কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধকে প্রকারান্তরে ভারতেরই বিজয় হিসাবে দেখতে চান এবং মূল যুদ্ধকে_যেটা বাঙালির জাতীয় যুদ্ধ_ খাটো করে দেখেন। মানেকশ'র বিজয় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা সম্ভব করেছে বা সেই বিজয়ের ফল বাংলাদেশের জন্ম, এমন মনোভাবের মধ্যে যে অধিপতি সুলভ দৃষ্টিভঙ্গি বা তাকে মেনে নেয়ার মধ্যে সমর্পিত মনোভাব থাকে তা আপত্তিকর। একজন কেন লক্ষ সৈনিকেরও কাজ নয়, কোনো দেশ স্বাধীন করা। সেটা তাদের ক্ষমতার বাইরের ব্যাপার। পরাধীন দেশের বেলায় তা আরো সত্য। সমগ্র জনগণের গভীর সাংষ্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামরকি প্রস্তুতি ও সংকল্প না থাকলে জাতীয় যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া যায় না। এই জিনিষ সেনা কমান্ডে গঠিত হয় না।

আগে যে দুটি যুদ্ধের কথা বলেছি, তার মিলিত রূপটি ছিল মিত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠা। সেই বাহিনী যৌথ কমান্ডে চলতো, কিন্তু কার্যত প্রধান ছিলেন মানেকশ। এর গঠন এবং ভারতীয় বাহিনীর একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। আগামি দিনের কোনো ইতিহাসবিদ হয়তো তা করবেন। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যেই বাংলাদেশকে নানানভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়। মুজিবনগর সরকারের বিবরণীতে তার অনেক নজির আছে। যুদ্ধ পরিচালনার ব্যাপারেও এ কথা খাটে। নভেম্বরে শুরু হওয়া ভারতীয় অভিযান থেকে শুরু করে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান পর্যণ্ত এর অনেক প্রমাণ মিলবে। বাংলাদেশের জনগণের বিরাট-বিপুল প্রতিরোধ সংগ্রামকে পাশ কাটিয়ে তার সুফল নিয়ে পাকিস্তানকে এক হাত দেখে নেয়ার প্রবণতা ভারতীয়দের মধ্যে ছিল। তারই প্রমাণ ঢাকা অভিযানে বাংলাদেশি বাহিনীকে সঙ্গে না রাখা, যদিও তারা তখন কর্ণেল শফিইল্লাহর নেতৃত্বে তিন দিক থেকে ঢাকাকে ঘিরে রেখেছিল। তাদের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে জেনারেল অরোরা পাকিস্তানীদের বলেন, বাঙালিরা এসে তোমাদের শেষ করে দেবে। তার চাইতে আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করো আমরা তোমোদের নিরাপত্তা দেব। ভারত এ প্রতিশ্রুতি রাখে এবং শিমলা চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়। ভারতের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ কিন্তু এরকম অনেক জটিলতার জন্ম তাদের কারণেই হয়েছে।

যাহোক আমি একাত্তরে বাঙালি সমাজরে সর্বাত্মক প্রতিরোধের ব্যাপকতার দিকেই মনোযোগ কাড়তে চাই। এ যুদ্ধে কৃষক-সন্তান ও শহুরে তরুণরা লড়াইয়ে নেমেছেল। গোটা সমাজও সেই যুদ্ধের সঙ্গি হয়েছিল। ভারতীয় অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়ে এরাই কিন্তু পাকিস্তানীদের কোনঠাসা করে ফেলেছিল। নভেম্বরের দিকে সবখানেই পাকিস্তানীদের দাপট নিজ নিজ ঘাঁটির মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছিল। তাও কেবল শহুরে এলাকায়। তারা তখন সপ্তম নৌবহররে আর চিনা অস্ত্রের চালানের অপেক্ষায় দিন গুণছিল। দরকার ছলি একটা ফাইনাল ব্লো। ভারতীয় বাহিনী চকিতে একতরফা ভাবে সেই কাজটাই করে। তখন বাংলাদেশ বাহিনী এর জন্যই তখন ঢাকার দোরগোড়ায় এসে অপেক্ষা করছে চূড়ান্ত নির্দেশের। তার আগেই ভারতীয়রা কৌশলে আত্মসর্মপণ নাটক মঞ্চস্থ কর। এ ঘটনার নাটকীয় বিবরণ পাবেন মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার হেলাল মোর্শেদ খানের জবানীতে। পরের আরেকটি ব্লগে তা দিলাম। রিপোর্টটা আমার ছিল। এটা ছাপা হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৩-১৪ তারিখের সমকাল পত্রিকায়।
আমার এত কহন কওয়ার উদ্দেশ্য আর কিছু না। মুক্তিযুদ্ধ ও এর রাজনীতিকে একদল ভারতের পক্ষপুটে বসে দেখেন, আরেকদল মৃত পাকিস্তানের ভুতের আছরলাগা ঘোর থেকে দেখেন। বাংলাদেশের স্বতন্ত্র জায়গা থেকে দেখার লোক কমই আছে।
১৯৭১ সালে আমরা কেবল গোলামির জিঞ্জির ছিন্ন করেই বেরিয়ে আসিনি, ইতিহাসের দিগন্তে নতুন একটি রাষ্ট্রেরও জš§ দিয়েছিলাম। যে জনগোষ্ঠীর জেদে এই মহাকর্তব্য হাসিল হলো, স্বাধীনতার মতায় কী সে অর্জন করতে পারে, সে জ্ঞান আজো তার হয়নি। এ না জানলে স্বাধীনতার সামর্থ্যটাই মাটি হয়ে যায়। দুর্ভাগ্য যে আজ তা হতে বসেছে।
এ বাপারে বাংলাদেশের ঘরের রাজনীতিতে কোনো সমঝোতা না থাক, বোঝাপড়াটুকুও নাই। ফলে উপমহাদেশের রাজনৈতিক পাটাতনে আমাদের ভূমিকার স্পষ্টতা ও নিজস্ব কার্যকারিতাও নাই। আমরা দুলছি বড় রাষ্ট্রের ঢেউয়ের ধাক্কায়_ কাণ্ডারিহীন। সবরকম দীনতার মাফ আছে, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব নিয়ে এরকম বেহুশ যে, তার দীনতার মাফ নাই। ইতিহাসে বেশুমার প্রমাণ আছে এর। বাংলা ভূখণ্ডে বসতকারি নানা জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও সম্প্রদায়ে লোকেরা যতদিন নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে চিনতে না পেরেছে, ততদিন নিজেদের দেশ ও সমাজের কর্তৃত্বের দাবিদার তারা হতে পারবে না।

বাংলাদেশ মানে তাই পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসা রাষ্ট্র নয়, নয় কেবল ভারত রাষ্ট্রের প্রতিবেশী ও সেই রাষ্ট্রের বাঙালিদের ‘অপর’ অংশের দেশ। কেবল মুসলমান বাঙালি বা সরাসরি বললে মুসলিম পরিচয়ের মধ্যে ভারত থেকে আমাদের আলাদা থাকার যুক্তি তৈরি হয় না, কেননা ভারতেও বিপুলসংখ্যক মুসলমান বাস করেন। যুক্তি হিসাবে এটা দুর্বল। বাংলাদেশ নামক ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার খোঁজ এতে মেলে না। সেই খোঁজ নাই বলেই এদেশের শাসকশ্রেণী, বিদ্বৎ সমাজ ও রাজনৈতিক
সংস্কৃতিতে আজগুবি দুই ‘বাংলাদেশ’ আবিষ্কৃত হয়। খামাখাই এক সাংস্কৃতিক গৃহযুদ্ধ চলে। এ দুই বাংলাদেশের একটা পাকিস্তানের কোটরে আস্তানা গেড়ে ভারতের প্রতি খবরদারের আঙুল তোলে। আরেকটা খেয়ে না খেয়ে ভারতের কাঁধে ভর দিয়ে পাকিস্তানের প্রেত তাড়ানোর বায়বীয় লড়াইয়ের কোশেশ করে যায়। ওদিকে দেশ ঠিকই দখল হয়ে যায়। এ দুটোই প্রতিক্রিয়াজাত। ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু কর্তারূপ বাংলাদেশের ক্রিয়া কই? সেও কি একাত্তরের শহীদদের মতোই বেওয়ারিশ লাশ হয়ে সতকারহীনভাবে পড়ে আছে ইতিহাসের কোনো অন্ধকার আবর্তে। তাই বারবারই তার বিজয় হাতছাড়া হয়, আর তার যুদ্ধ হয়ে যায় অপরের যুদ্ধ। তাকে জন্ম দেয় অপরে! হা, বিষ্ময়! এরা এতই বেহুশ যে, জনগণ এবং জাতিই যে একমাত্র অলৌকিক, সে নিজের গর্ভে নিজেকে জন্ম দেয়, সেই হুঁশ আসে না। জাতির কোনো স্রষ্টা নাই। সে নিজেই নিজের স্রষ্টা। এই জন্যই ঈশ্বর বনাম জনগণ পরস্পরকে কখনো সার্বভৌম বলে স্বীকার করতে পারে না।

 

সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১১:১২ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:৩৫
মাইক্রোস্টেপ বলেছেন: এই জন্যই ঈশ্বর বনাম জনগণ পরস্পরকে কখনো সার্বভৌম বলে স্বীকার করতে পারে না।

কথাটা একটু বুঝিয়ে বলবেন?
০৬ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৫৬

লেখক বলেছেন: জনগণ এবং জাতিই যে একমাত্র অলৌকিক, সে নিজের গর্ভে নিজেকে জন্ম দেয়, সেই হুঁশ আসে না। জাতির কোনো স্রষ্টা নাই। সে নিজেই নিজের স্রষ্টা। এই জন্যই ঈশ্বর বনাম জনগণ পরস্পরকে কখনো সার্বভৌম বলে স্বীকার করতে পারে না।
এটা কথা প্রসঙ্গে এসেছে। যদিও এই লেখায় তা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক নয়। জাতি বা জনগণ ইতিহাস-ভূগোল-ভাষা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে দিনে দিনে পরিগঠিত হয়। এই অর্থেই তা স্বয়ম্ভু। এবং এই স্বয়ম্ভু ক্ষমতা যখন নিজেকে চিনতে পারে, তার অস্তিত্বকে আরো বিকশিত করার স্বার্থে সে তখন রাজনৈতিক সত্তা তথা রাষ্ট্র গঠন করে। এবং সেই রাষ্ট্রে যদি জাতি তথা জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারি হয়, তাহলে সে নিজের নামেই শাসন চালায়। আবার জাতি বা জনতা নিজেকে স্রষ্টার প্রতিনিধি মনে করে স্রষ্টার নামে সেই সার্বভৌমত্বই বজায় রাখে যা সে চায়। কিন্তু এই প্রতিনিধিত্বের নামে সে যখন একটা এলিট শ্রেণী মোল্লা-যাজক-পার্টি ইত্যাদির হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, তখন আর জনগণের সার্বভৌমত্ব কার্যকর থাকে না।
এ কারণেই সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নিজেকে ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করতে পারে না। সে কেবলই রাষ্ট্র, একটা দুনিয়াবি সংস্থা। নিজের ওপর জোব্বা বা রং চড়িয়ে সে আসলে রাষ্ট্র হিসাবে তার দায়িত্বকেই ফাঁকি দিতে চায়। সে তখন জনগণের প্রতি তার দায়ের নিরিখে নয়, ঈশ্বরের প্রতি তার দায়ের নিরিখে তার বৈধতা দাবি করে। এভাবে আসলে যারা সেই ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে প্রতিষ্ঠিত থাকে, তাদের হাতেই রাষ্ট্রটা চলে যায়। এবং জনগণের ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্ব খোয়া যায়।
এ কারণেই যারা ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা বলেন, গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র নাফরমানি, কারণ তা খোদার জায়গায় জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু তারা এ প্রশ্নের উত্তর দেয় না যে, কোনটি খোদার সার্বভৌত্ব এবং কীসে তা সম্ভব সে বিষয়ে সকল মানুষের মধ্যে ঐকমত্য কীভাবে আসবে? কিংবা সকল মুসলিম কীভাবে তা চর্চা করবে বা মেনে নেবে যে, অমুক খলিফা খোদার সত্যিকার প্রতিনিধি আর অমুক নেতা তা নন? এই ব্যাখ্যা এবং তার রায় দেবার অধিকার তারা সকল মুসলিম ভাইকে_ধর্ম যাদের আল্লাহর চোখে সমান বলে প্রতিষ্ঠা করেছে_দেয় না। এভাবে তা শেষপর্যন্ত মুষ্ঠিমেয়র সার্বভৌম ক্ষমতায় পরিণত হয় জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে রদ করে।

৩. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:৪৩
শেখ জলিল বলেছেন: আমার এত কহন কওয়ার উদ্দেশ্য আর কিছু না। মুক্তিযুদ্ধ ও এর রাজনীতিকে একদল ভারতের পক্ষপুটে বসে দেখেন, আরেকদল মৃত পাকিস্তানের ভুতের আছরলাগা ঘোর থেকে দেখেন। বাংলাদেশের স্বতন্ত্র জায়গা থেকে দেখার লোক কমই আছে।
...সহমত।
৫. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৮
আঁধার রাতের মুসাফির বলেছেন: খুব ভালো লেখা। ধণ্যবাদ।
৬. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৯
আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন: সময়ের সবচেয়ে বস্তুনিষ্ট এবং সাহসী বিশ্লষন।আমি বিশ্বাস করি, ভারত কিংবা পাকিস্তানের রাজনৈতিক,সামাজিক,ধর্মীয় প্রভাব কাটিয়ে নিজস্ব জাতি হিসেবে দাড়ানোর সময় আমাদের এসেছে। নতুবা সারাবিশ্বে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীনতাকে উগ্র জাতীয়তাবোধ সম্পন্ন ভারতীয় মিডিয়ার অপপ্রচারে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ফল হিসেবে জানবে।
৭. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৩২
প্রান্তজাকির বলেছেন: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের নবম মাস। মানেকশ কিন্তু ঐ সময়ের ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ইচ্ছে সত্ত্বেও প্রথমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আর অস্বীকারের ফলও তিনি জানতেন। তাই তিনি বলেছিলেন-পদত্যাগ পত্রে শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করবো না মানসিক .........!
কারণ তিনি জানতেন যুদ্ধে যোগ না দিলে তার চাকুরী থাকবে না।আর যুদ্ধে যোগ দিতে চাননি এজন্য যে যদি এ যুদ্ধে মার্কিনীদের সাথে যদি চীন যোগ দেয়....! তাতে স্বল্প যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়ে যুদ্ধে হারার সম্ভাবনাই বেশি।

কিন্তু বাংলাদেশী যোদ্ধারা যখন শুধু সাহস আর দা, কাচিরমত মেঠো অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে লড়ে যান। শহীদ হন। ৩০ লাখ বাঙ্গালীর রক্তের দাগ নিয়ে যখন বাংলাদেশ নামের একটি বদ্বীপ বিশ্বের বুকে স্বীয় অস্তিত্ব নিয়ে জেগে ওঠে। তখন সেই রক্তমাখা স্বদেশে সন্তান হারা বাবার আর্তনাদ, মায়ের কান্না ...............আরো অসংখ্য বেদনায় চিহ্নকে কেবলই প্রহসন মনে হয়।

কিন্তু এইসব বীরত্বগাথা যখন ছিনতাই হয়ে যায় একজন সেনানায়ক মানেকশ এর নামে তখন আমার খুব বেশি খারাপ লাগে না।(?)
একাত্তরের ঐ নয়মাস আর ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে বাণিজ্যতো আর কম হলো না।
যে দেশে .............
স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সমাধীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।
রাজাকাররা মুক্তিযাদ্ধা হয়ে যায়!
স্বাধীন দেশের পতাকা গাড়িতে পতপত করে উড়িয়ে রাজাকার আলবদররা ৭১ কে বুড়ো আঙ্গুলি দেখায়!
মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকাররা আঁতাত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে!

আর কিছুদিন পরেই যখন দূর্ণীতির দায়ে অভিযুক্ত দেশ দরদীরা(!?) ফুলের মালা পরে আবার দেশ সেবায় আত্ননিয়োগ করবে.........
তখন আমার মনে হয় এ দেশে সবই সম্ভব।
আমাদেরকে যে কেউ তার ইচ্ছেমত দিগম্বর করতে পারে। কিন্তু আমরা লজ্জা পাই না।
এই সব সম্ভবের দেশকে কিছুক্ষেত্রে অসম্ভবে রুপান্তর করতেই হবে। যে করেই হোক। না হলে .........
স্যাম মানেকশরা বাংলাদেশের স্রষ্টা হবে..........!
এবং রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে দেশ সেবার মহান ব্রত মাথায় তুলে নেবে................................!!!!!!!!!

পুনশ্চ : ফারুখ ভাইকে ধন্যবাদ ব্লগে এমন অসাধারণ একটি পোষ্ট দেওয়ার জন্য
৯. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:০৩
মারুফ হায়দার নিপু বলেছেন:
ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানাই।
কে কিভাবে ইতিহাসকে দেখলো কুছ পরোয়া নেহি।
আমি ফীল করি এই লোকটা আমার দেশের জন্মে যুদ্ধ করেছে।
কোনো পলিটিকস দেখতে চাইনা।
উনার আতমা শান্তি পাক।

সেলিউট টু হিম...
সেলিউট টু "ইনডিয়া অফ ৭১"

লেখাটার ইনটেনশান ভালো না লাগার কারণে মাইনাস দিলাম ...
০৬ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১১:০৩

লেখক বলেছেন: ইন্টেনশান কী তা না বলেই চলে গেলেন বন্ধু? একটি যথার্থ মাইনাস পাওয়ার জন্য. একটি সত্যিকার সমালোচনা পাওয়ার জন্য সব প্লাস আমি আপনার কাছে সমর্পণ করতে রাজি আছি। কিন্ত কেন, তা বলতে দ্বিধা কী বন্ধু, আপনার ইন্টেনশান খোলাসা করেন। কৃতার্থ হই।

১১. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২৪
তানিম হুমায়ুন বলেছেন: আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর ভুমিকা নিয়ে আমরা জাতিগত ভাবে সবসময় একটা 'ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে' ভুগি বলে আমার মনে হয়েছে। আমাদের বুদ্ধিজীবীরাও সব সময় এ ব্যাপারে একটা ধোঁয়াশা তৈরি করতে পছন্দ করেছেন। ভারতীয় বাহিনীর যেসব যোদ্ধা ৭১-এ নিহত হয়েছেন তাদেরকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাতেও আমরা কেমন কুণ্ঠাবোধ করি।...তারপরও, ৭১ আমাদের অস্তিত্বের যুদ্ধ ছিল। 'একজন ফিল্ড মার্শাল আমাদের অস্তিত্বের নির্মাতা' - এই কথা শুনলে গা জ্বালা করে।
১২. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১১:১০
আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন: @তা,হু।" ভারতীয় বাহিনীর যেসব যোদ্ধা ৭১-এ নিহত হয়েছেন তাদেরকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাতেও আমরা কেমন কুণ্ঠাবোধ করি"।

তাদের'কে আপনি কি উপায়ে সম্মান জানাইতে চান?

মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠলেই ভারতীয়'দের(আপনাকে বলছি না) একঘেয়ে সূর, বাংলাদেশ যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা দেখায় নি।আমি নিশ্চিত না, ঠিক কি উপায়ে তাদের কৃতজ্ঞতা জানাইতে হবে।
১৩. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১১:৩৮
ফাহমিদুল হক বলেছেন: আপনার বিশ্লেষণ যথারীতি কনভিন্সিং।
১৪. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১১:৪৪
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: থ্যাংকস। বিষয়টা নিয়ে আর চুপ থাকা গেল না ভারতীয় মিডিয়ার জন্য না, আমাদের অনেকের দাস্যভাবের জন্য।
১৫. ০৬ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১১:৫০
দ্বিধা বলেছেন: অসাধারণ লেখা...মন্তব্যেও বিপ্লব ।
১৭. ০৭ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ৩:৩৪
আহমাদ মোস্তফা কামাল বলেছেন: প্রিয় ফারুক, আপনার এই অসাধারণ লেখাটির জন্য প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই। আরো কিছু তথ্য যুক্ত করার জন্য এই মন্তব্য :

জুলাই'র মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারত আশা করেছিলো যে, আমেরিকার 'যাদুদণ্ডে' পাকিস্তানের "অভ্যন্তরিন" সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধান হবে [সূত্র : মূলধারা' ৭১]। কিন্তু ওই সময়ের পরপরই তারা বুঝে যায়-- এটি আদৌ সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া তাদের জন্য ভিন্ন কোনো পথ খোলা ছিলো না। কারণ এক কোটি শরণার্থীর চাপ কোনো দেশের পক্ষে দীর্ঘকাল ধরে সামাল দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সক্রিয় সহযোগিতা করার অন্য বিপদও ছিলো। মুক্তিযুদ্ধে চীন পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ায়, ভারত যদি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তাহলে চীনের পক্ষ থেকেও আক্রমণের আশংকা ছিলো। ফলে তাদের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো একটি বৃহৎ শক্তির সমর্থন। আমেরিকা আগে থেকেই জেনারেল ইয়াহিয়া তথা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বসেছিলো-- তারা ইয়াহিয়াকে ব্যবহার করেছিলো চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কোন্নয়নের দূত হিসেবে। বাকি থাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন, কিন্তু সোভিয়েট ইউনিয়ন সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে প্রথম দিকে আগ্রহ পোষণ করেনি। তার পেছনে কারণও ছিলো। সময়টি ছিলো ঠান্ডা যুদ্ধের এবং পারমানবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমেরিকা ও সোভিয়েট ইউনিয়নের দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিলো ওই সময়। ফলে সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ওই আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করতে তারা রাজি ছিলো না। কিন্তু ভারতের অব্যাহত চেষ্টায় তারা পাকিস্তানের নিপীড়ন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ভারতের শরনার্থী সমস্যার ব্যাপারে মনোযোগ দেয়। বাংলাদেশের নেতৃত্বও এই সুযোগে সোভিয়েত সহানুভূতি লাভের উদ্দেশ্যে প্রধানত বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়। বলা প্রয়োজন যে, সোভিয়েত সমর্থন লাভের জন্য ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অনস্বীকার্য, কিন্তু ভারত যতোটা না বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য সমর্থন চেয়েছে তারচেয়ে বেশি চেয়েছে 'শরণার্থী সমস্যা" সমাধানের সমর্থন। যাহোক, সোভিয়েতের এই সমর্থন এত তীব্র ছিলো যে, নভেম্বর-ডিসেম্বরে আমেরিকার চাপে নিরাপত্তা পরিষদে মোট তিনবার সীমান্ত থেকে সৈন্য প্রত্যাহার প্রশ্নে প্রস্তাব উত্থাপিত হলে তিনবারই সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোতে তা বাতিল হয়ে যায়। সোভিয়েতের এই সমর্থনে ভারত যেমন সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সাহস ফিরে পায় তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও অবিশ্বাস্যভাবে গতি লাভ করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত প্রথম থেকেই নানাভাবে সহায়তা করলেও-- (শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেয়া, প্রবাসী সরকারের কার্যক্রম চালানোর জন্য ভারতীয় ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া, এমনকি সামরিক কর্মকাণ্ড চালানোর অনুমতি দেয়া, আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভের জন্য সহায়তা করা, আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার নিসদ্ধান্ত নেয়া ইত্যাদি)-- ভারতীয় স্থলবাহিনী বাংলাদেশে অভিযান শুরু করে ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, এবং আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয় ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। ভারতের এইসব সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এত দ্রুত জয়লাভ করা কঠিন হতো এ কথা অনস্বীকার্য, কিন্তু এ-ও মনে রাখা দরকার যে, ২৬ মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারই পাকিস্তানীদের ব্যতিব্যস্ত রেখেছিলো, নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলো, ওদের মনোবলকে নিয়ে এসেছিলো শূন্যের কোঠায়। এবং এটা না করতে পারলে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাত্র ১২ দিনের মাথায় পাকিস্তানীদের পরাজিত করা ভারতীয়দের পক্ষে কোনোক্রমেই সম্ভব ছিলো না। মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক অভিযানে পাকিস্তানীরা যখন পলায়নপর এবং মানসিক ভাবে প্রায় পরাজিত, তখন ভারতীয় বাহিনীর অংশগ্রহণ তাদের এই পরাজয়কে কেবল তরান্বিত ও অনিবার্য করে তুলেছিলো।

আপনার এই পোস্টের প্রতিটি বাক্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করছি। এবং বলছি-- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের নয় মাসের প্রতিরোধ যুদ্ধ যারা আমলে না নিয়ে ইতিহাস নির্মাণ করতে চান, তারা হয় গণ্ডমুর্খ অথবা জ্ঞানপাপী।
১৮. ০৭ ই জুলাই, ২০০৮ সকাল ৯:৫৫
সবুজ সাথী বলেছেন:
খুব চমৎকার বিশ্লেষণ। পুরাপুরি একমত।

মাইক্রোস্টেপ -এর মন্তব্যের জবাবটার সাথেও একমত।

প্রিয়তে থাকল।
২০. ১৬ ই জুলাই, ২০০৮ রাত ১০:০৫
অনার্য তাপস বলেছেন: ফারুক ভাই আমি তাপস। লেখাটা আগে একবার পড়েছিলাম ব্লগেই। ভালতো লেগেছেই...

আপনার লেখাগুলো বেশ কঠিন মনে হয় আমার কাছে। আমার দায়বদ্ধতা বলতে পারেন। তবে বোঝা যায়, লেখাগুলো কোন দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে লেখা।

পত্রিকা এবং ব্লগে লেখার জন্য ধন্যবাদ।
২৩. ১৮ ই জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৩:৪১
মেহরাব শাহরিয়ার বলেছেন: চমৎকার সাহসী লেখা ।প্রিয় পোস্টে +

একটা কথা শেয়ার করি । ছোটবেলায় আমার বাবা যে হসপিটালে ছিলেন সেখানে দু'জন ভারতীয় সহকর্মী ছিলেন ডাঃ শ্রীধর এবং ডাঃ গাউস । মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের ধারণাটা ছিল যে ৭১ এ বাংলাদেশে একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল । এমতাবস্থায় ডিসেম্বর মাসে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলে যুদ্ধের সূচনা হয় ।
তাদের জানামতে যুদ্ধটা ছিল ১০/১২ দিনের ।
ভারতের বুদ্ধিজীবিরা ঘটনাপঞ্জীগুলো অবশ্যই বিশদভাবে জানেন , কিন্তু সাধারণ মানুষগুলোর অবস্থা ডাঃ গাউস দের মত না তো ? হলে সেটার পেছনের কারণটাও বা কি ?
২৪. ১৯ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১২:৩৪
লুকার বলেছেন:
যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন গেরিলা বাহিনীরা ঢাকা অবরোধ করেছে, পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয়ের দিনক্ষণের কাউন্ট ডাউন শুরু হয়েছে, তখন ভারতীয়রা উড়ে এসে তাদের চিরশত্রু পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধজয়ের কৃতিত্ব ছিনতাই করে নেয়। আত্মসমর্পণ ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এদিকেই ইংগিত করে। তবে ভারতীয়রা শুরু থেকেই এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে, সেজন্য তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা আছে। গণহত্যাকারী পাকিস্তানীদের ভারতীয়রা নিরাপদে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে দেয়, একাজটিও ঠিক হয়নি।
২৫. ১৯ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ৩:২৯
হ্যারি সেলডন বলেছেন: পোস্টটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে ধন্যবাদ। প্রিয় পোস্ট।
২৬. ১৯ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ৩:৫৩
নির্বাসিত বলেছেন: "দুই বাংলাদেশের একটা পাকিস্তানের কোটরে আস্তানা গেড়ে ভারতের প্রতি খবরদারের আঙুল তোলে। আরেকটা খেয়ে না খেয়ে ভারতের কাঁধে ভর দিয়ে পাকিস্তানের প্রেত তাড়ানোর বায়বীয় লড়াইয়ের কোশেশ করে যায়।"

একদম সত্যি কথা! বিদেশে বসেও দেখি কেউ প্রো-পাকিস্তানী (মুখে বলেন প্রো-ইসলামিক), আবার কেউ প্রো-ইন্ডিয়ান। প্রো-বাংলাদেশী খুব কম।
২৭. ১৯ শে জুলাই, ২০০৮ ভোর ৪:৪২
বন্ধনহীন বলেছেন:
সত্যিই তো। এতদিন জানতাম না। তিনি মরে গিয়ে জানান দিলেন, ১৯৭১ এর সব অবদান স্যাম মানেকশের। বাংলাদেশের স্রস্টা।
আরেকটা জাতির পিতা পাওয়া গেল।

২৮. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:২৮
অশোক দেব বলেছেন: আমি খুব ক্ষুদ্র এক কলমচি। বাংলাদেশের জন্মের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ভারতীয় বলে ভারতীয় প্রচার মাধ্যমের এরকম নিলাজ কথায় কুণ্ঠিতবোধ করছি।
আমার ক্ষমা চাওয়াতে কিছু হবার নয়। তাই...
বাংলাদেশের জন্মের আগেও বাংলাদেশের প্রস্তুতির ইতিহাস আছে। তা থেকে একটি গেরিলা মুক্তিযুদ্ধের পরিণাম তৈরি করা যায় না। ভারত যা করেছে তা বাংলাদেশ স্বীকার করে দেখে ভালো লাগলো।
কিন্তু @'তা হলে আসাম, নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাব বা কাষ্মীরে তাকে দীর্ঘমেয়াদে দমন-পীড়ন ও সামরিক শাসন চালাতে হতো না।' এগুলো কী? উল্লেখিত প্রতিটি রাজ্যে নির্বাচিত সরকার আছে সামরিক শাসক নয়। নাগাল্যান্ড ছাড়া কোথাও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জনসমর্থন পায় না। আর নাগাল্যান্ড ভারতের বাইরে যেতে চায় না, চায় বৃহত্তর নাগাল্যান্ড যা অন্য রাজ্যের সীমানার ভেতর চলে যায় বলে সমস্যা। বৃহৎ, বিবিধসংস্কৃতির দেশে উন্নয়নবৈষম্যের ফলে এ ধরণের বিবাদ কিছুটা স্বভাবিক। আপনার বক্তব্য তাই অর্ধসত্য। অন্যান্য রাজ্যের প্রশ্নে বলি পঞ্জাব এখন শান্ত এবং তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন পাকমদতের ফাঁদে পড়ে তারা ভুল করেছিলেন। এইখানে এসে আমরা সমস্যার মূলের কাছাকাছি আসি। পাক বিদেশনীতির একটি সাধারণ মাণদন্ড হল পূর্বপাকিস্তান হারানোর বদলা নেওয়া। তাই তারা ভারতের ৭১-এর আদলে ছায়াযুদ্ধ চালায় রাজ্যগুলিতে। কিন্তু ৭১ বাংলার জনগণ স্বাধীনতার প্রশ্নে ছিল সৎ আর একনিষ্ঠ আর আমাদের বিচ্ছিনতাবাদীরা হল নিজেরা জনবিচ্ছিন্ন স্বার্থপর গোষ্ঠী। তাই বাংলা বিজয় দেখেছে আর এদের কাছে আছে আত্মসমর্পণ করার সোজা রাস্তা। কিন্তু আমাদের তাজা জওয়ানদের রক্ত, অর্থ, সময় ও শান্তিকে দিতে হচ্ছে বলি। তাই মনে হয় ভারতের ৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জড়ানোটাই ঠিক হয়নি বলে এ প্রজন্মের ভারতীয়রা যে মনে করে, তকে ঠিক বলেই মনে হয়। পাকিস্তান তাদের নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে পারলে পারত, নয় চুলোয় যেত। আমাদের চিনের মত স্বার্থপর উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়াই ভালো ছিল। আর আজও পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত না হয়ে অশান্তিতে ডুবে থাকলে আমরা চিরহুমকির ভেতর থাকতাম না হয়তো_ এমনতর স্বার্থপর চিন্তাসম্বলিত লেখাও আজকালের ভারতীয় ছেলেমেয়েরা লেখে দেখতে পাই। হয়তো ঠিকই লেখে তারা। কারণ ৭১-এর আগেতো কোনো ভারতের কোনো রাজ্যে বিচ্ছিন্নতা ছিল না!ভাষার কারণেও তারা ঠিক আমাদের মত আবেগপ্রবণ নয়, বরং তারা সকলে বহুভাষাকেই প্রায় মাতৃভাষা করে নিয়েছে। ভারতের মত দেশে তা দরকারিও।
২৯. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ১:৫৫
মেহরাব শাহরিয়ার বলেছেন: অশোক দেব ,
কাশ্মীর কি করে ভারতের সাথে একীভূত সে বিষয়ে আপনার ধারণাটা যদি একটু বলতেন ।

আমি যখন ছোট(দেশের বাইরে) , আমাদের এলাকায় ১০/১২ জন বাংলাদেশি , ৪/৫ জন ভারতীয় , ২/৩ জন পাকিস্তানী ডাক্তার ছিলেন । আরও ছিলেন ১১ জন কাশ্মীরি ডাক্তার (ভারতীয়দের সাথেই তাদের যোগ করবার কথা ছিল , কেন করলাম না জানেন ?)

কাশ্মিরী ডাক্তারদের যদি কেউ ভারতীয় বলতো তারা প্রচন্ডভাবে আঘাত পেত , সাথে সাথে জানিয়ে দিতো , "আই অ্যাম নট এন ইন্ডিয়ান , আম অ্যাম অ্যা কাশ্মিরী" । কে জানে , কত কি কাকতাল ঘটে , বিদেশের সেই মেধাবী ডাক্তারগুলোর সবাই ছিল মুজাহিদ !!!

এত দূরে যাই কেন , কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে বাজিতপুর মেডিকাল কলেজে ঘুরে আসলাম । আবারও সেই কাকতাল , এত বছর পরেও । ওখানকার কাশ্মিরীরা নিজেদের ভারতীয় স্বীকার করে না(মেয়েগুলোও না) , অদ্ভূত ব্যাপার , সবাই মুজাহিদ , তাইনা ?

১৯৮৫ সালে শ্রীনগরে ভারত-অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট ম্যাচে শতভাগ দর্শক অস্ট্রেলিয়াকে সমর্থন করেছিলেন , সেটা কি জানেন ? ওহ , ভুল হয়ে গেলো ,গ্যালারি ভরা সবাই ছিল মুজাহিদ

নির্বাচিত সরকার !!!! দারুণ হাসি পেলো । ১৯৭১ সালে একটা প্রহসনমূলক সংসদ আর মন্ত্রীসভা হয়েছিল রাজাকার জামায়াত ইসলামীদের নিয়ে । পাকিস্তান সরকারও তখন উচ্চস্বরে বলতো , পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত সরকার !!!!!

কি চমৎকার পুনরাবৃত্তি
৩০. ২০ শে জুলাই, ২০০৮ রাত ২:১৮
আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন: @মেহরাব,চমত্‌কার বলেছেন।আমি একবার শিলংয়ে গিয়েছিলাম বেড়াতে।ওইখানে,এখন প্রচুর হিন্দিভাষী লোকজন,ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা।তো আমাদের ড্রাইভার ছিলো এক আদিবাসী খাসী।জিজ্ঞেস করলাম,তোমার ছেলেমেয়ে কয়জন,বলে ৫জন;সে আরো সন্তান চায় কারণ হিন্দি ভাষীদের দাপটে আদিবাসী খাসিরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে।খাসি'রা সংখ্যায় কম হওয়ায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষনে(যেমনটা করেছিলেন জেনারেল জিয়া পা,চট্টগ্রামে) নিজেদের সংখ্যালঘু হয়া এইভাবে রোধ করার চেষ্টা করছে।এরপর আসামে
গেলাম,সেখানে হিন্দি বলা বিপদজনক।কারণ আসামিজ'রা রাষ্ট্রীয় মদদে হিন্দিভাষীদের সেটলমেন্ট'কে ষসত্র উপায়ে প্রতিরোধ করে।হিন্দিভাষীদের প্রতি তারা তাই ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ।
আমার প্রিয়পোষ্টে একটা ডকুমেন্টারী এড্‌ করা আছে।স্বাধীনতাকামী কাশ্মিরীদের প্রতি ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ কতটা নৃশংস,না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।পুরা ডকুমেন্টারী বি,বি,সি, সি,এন,এন,ভারতীয় মিডিয়ার ভিডিও ফুটেজ দিয়ে বানানো।
৩৩. ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:৫৩
কামাল উদ্দিন ফারুকী জুয়েল বলেছেন: রামপুরা টিভি কেন্দ্রের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা বনশ্রীতে ঢুকেছে, হাতের ডাইনে প্রথম বাড়ীটিতে দেখবেন সাইন বোর্ড লাগানো আছে 'জেনারেল অরোরা ফাউন্ডেশন'-তাহলে ইনি কে? বাংলাদেশের আর একজন স্রষ্টা নিশ্চয়। মুখচেনাদের অশ্রুবর্ষণ দেখে তো তাই মনে হয়।


(জেনারেল ওসমানীর নামে তারা কিছূ প্রতিষ্টা করেছেন কিনা, আমার জানা নেই, কেউ জানালে বাধিত হব।)
৩৬. ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৪:২৯
আবদুর রাজ্জাক শিপন বলেছেন:

জুলাই ২০০৮ এর পোস্ট । চোখে পড়লো আজ ।
প্রায় একবছর হলেও, শেষ পর্যন্ত যে চোখ এড়িয়ে যায়নি এই দুর্দান্ত লেখা, তা ভেবে ভালো লাগছে ।


আমরা বাংলাদেশীদের 'প্রভূভক্তি বা প্রভূপ্রীতির' বিষয়টা নিয়ে যদি একটু আলোচনা করতেন । সেটা এজন্য বলছি যে, আমার প্রায়শই মনে হয়, আমরা নিজেরাই প্রভূ তৈরী করি কাওকে প্রভূর আসন দেই,তাদের সমালোচনা বা মন্দ দিক না দেখে পূজা করতেই ভালোবাসি ।

এই কাজটায় সবচে' এগিয়ে থাকবে বোধকরি এক শ্রেণীর দৈনিক... ।

আন্তরিক ধন্যবাদ আপনাকে ।
৩৭. ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৫:৩৭
দিগন্ত বলেছেন: রেডিফ- এ এরকম অনেক হাস্যকর লেখা আসে। সোজা প্রশ্ন করা যায়, মানেকশ যদি রাষ্ট্রের সৃষ্টিকর্তা হন তাহলে মানেকশ'র বস কি দোষ করলেন?

@অশোক দেব - আমার মনে হয় আপনি কাশ্মীর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানেন না। কাশ্মীর (ভ্যালি) অধিবাসী প্রায় সবাই স্বাধীনতা চায়। তবে রাষ্ট্রপুঞ্জ যেহেতু কাশ্মীরের স্বাধীনতা প্রস্তাব একবার খারিজ করেছে ও কাশ্মীরকে ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে নির্দেশ দিয়েছে তাই আমার ব্যক্তিগত মত একটা গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা উচিত। এর ফলে হয়ত কাশ্মীর ভ্যালি পাকিস্তানে চলে যাবে কিন্তু শান্তিকামী ভারতীয় জনগণ অনেক নিশ্চিন্তে থাকবে।

মজার কথা কাশ্মীরের কিছু অংশ পাকিস্তানের দখলে ও পাকিস্তান তার মধ্যে একটা বড় অংশে কোনো গণভোট করানোর বিরোধী। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত মেনে গণভোটের আয়োজন করতে হলে পাকিস্তানকে তার অধীনস্ত কাশ্মীরকেও কিছুদিনের জন্য হলেও ভারতের হাতে ছেড়ে দিতে হবে, যেটা পাকিস্তান রাজী হয় নি। এই দুই অজুহাত দেখিয়ে ভারত সরকার গত ষাট বছর ধরে কাশ্মীরী গণভোটের অধিকার দমিয়ে রেখেছে। দাবীটা অদ্ভূত, পাকিস্তান রাষ্ট্রপুঞ্জের রায় না মানলে আমরাও মানব না - যেন আইন মেনে চলার দায় রাষ্ট্রের নয়।

কাশ্মীর গণভোটে ভারতে যোগ দিলে তবেই একমাত্র কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হতে পারে, আর কোনোভাবে নয়। তাই গণভোটই কাশ্মীর সমস্যার একমাত্র সমাধান।

তবে একই সাথে আমি কাশ্মীর প্রসঙ্গের সাথে সাম্প্রতিক ভারতের জঙ্গি হামলার কোনো যোগসাজেশ দেখি না। জঙ্গি হামলা ছিল, আছে, থাকবে। তা বলে আইন ও আন্তর্জাতিক সনদ অগ্রাহ্য করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

তবে ওপরের কমেন্টগুলোতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে অনেক মতামত এসেছে যার সাথে আমি স্পষ্ট দ্বিমত পোষণ করি। উত্তর-পূর্ব ভারতে অসংখ্য ভাষাভাষি মানুষ বসবাস করেন। ভারতে অন্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে জাতি-বৈচিত্র্য অনেক বেশী। সারা পৃথিবীর মধ্যেই এরকম অঞ্চল বিরল। দুই জাতি পাশাপাশি থাকলে (আর এর সাথে মূল ভূখন্ডের মানুষ ও বাঙালী উদ্বাস্তুদের ধরলে সমীকরণ আরো জটিল হবে) সমস্যা হবেই। ভারতের মানবাধিকারের রেকর্ড খুব একটা ভাল নয়, তাই সমস্যা সমাধানে মানবাধিকার লঙ্ঘনও ভারতে নতুন কিছু নয়। এই অঞ্চলে অনেক জাতিগোষ্ঠীই আলাদা দেশ গঠনে উৎসুক - কিন্তু এদের নিজেদের সংক্ষিপ্ত জাতিগোষ্ঠীর বাইরে এদের কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। উলফার অসমীয়াদের বাইরে কোনো অস্তিত্ত্ব নেই (অথচ আসামের ২০% জনগণ বাঙালী, ৫% বোড়ো), যেমন এন-এস-সি-এন-এর কোনো অস্তিত্ত্ব নেই নাগাদের (অথচ নাগাল্যান্ডে প্রায় ২০টি ভাষাভাষি উপজাতি বাস করে) বাইরে। তাই এদের কোনো গোষ্ঠীকেই সুনির্দিষ্ট সীমারেখা দিয়ে বাঁধা কোনো অঞ্চলের প্রতিনিধি বলে ধরা যায় না। তাই এদের স্বাধীনতার দাবী নিয়েও আমি সন্দিহান। এদের সমস্যাগুলো বরং আমি এক বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার "আইডেনটিটি ক্রাইসিস" হিসাবে দেখতেই পছন্দ করি - যা এই মুহূর্তে উত্তর-পূর্ব ছাড়াও ভারতের অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর (সাঁওতাল থেকে সিন্ধ্রি বা লাদাখি থেকে লোধা) মধ্যেই আছে। এই সমস্যা বিভিন্ন ভাষাভাষির দেশে খুব স্বাভাবিক - তবে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন।
৪০. ০২ রা নভেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৩৬
ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন: দিগন্তের বক্তব্য অনেক দেরিতে দেখার জন্য দু:খই শুধু প্রকাশ করতে হচ্ছে। অনেকদিন ব্লগে ছিলাম না, এটাই কারণ।

সাধারণভাবে দিগন্তের বিশ্লেষণ ও বক্তব্যের সঙ্গে একমত। এটা বুনিয়াদি অবস্থান। তবে নিকটে যে নৈকট্যে দূরে গিয়ে দুই মতের রেখাগুলো হয়তো ফারাকেই অবস্থান করবে।

আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিচারে দিগন্তের বক্তব্য যুক্তিযুক্ত। তবে, যে উপায়েই হোক, ভারতের কাশ্মীরকে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ভাবার অবস্থান ত্যাগ করাই সঠিক কৌশল হবে। নইলে একদিন যখন কাশ্মীর আলাদা হলে ঘটনাটিকে দ্বিতীয় ভারতবিভক্তি হিসেবে গণ্য করা হবে।

কিন্তু কাশ্মীরের বিচ্ছেদ ভারত বিভক্তি হবে না, ভারতীয় দখলদারির অবসান হিসেবেই অভিনন্দিত হওয়ার যোগ্য।

দ্বিতীয়ত, কাশ্মীর ভারতের কাছে একটি এলাকামাত্র নয়, মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। উপমহাদেশের মুসলিম ডেমোগ্রাফি, অঞ্চলটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব, মুসলিম প্রধান আরেকটি স্বাধীন দেশ বা পাকিস্তানে যোগদান, রাজনৈতিকভাবে ভারতের জন্য বৃহত ভারত প্রকল্প বা বিজেপি'র হিন্দু ভারত প্রকল্পের জন্য মারাত্মক আঘাত হিসেবে দেখা দেব। পূর্ব ভারত স্বাধীন হলে সেটির অভিঘাত ভারতের বাকি অঞ্চলে ততটা পড়বে না, যতটা পড়বে কাশ্মীর আজাদি অর্জন করলে।

তৃতীয়ত, কাশ্মীরকে দমন করে, জঙ্গি আখ্যা দিয়ে অভ্যন্তরের মুসলমানদের যেমন হীনম্মন্য ও কোণঠাসা এবং একইসঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার পথে ঠেলে দেওয়া যায়, স্বাধীন কাশ্মীর হলে সেটি হবে না। তাতে করে তারা যে রাজনীতির দিকে আগ্রহী হবে তা অসাম্প্রদায়িক হবে, সেটাই ভারতের শাসকদের ভয়।

অভ্যন্তরীণভাবে ভারতের সর্বভারতীয়তার কোনো ভিত্তি নেই। অতীতে নেই, বর্তমানে নেই, অর্থনীতিতে নেই, রাজনীতিতে নেই। এর ভিত্তি হিন্দু মিথে আর হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পে। কংগ্রেস বোঝাতে চাইছে যে, পরাশক্তি অবস্থানই ভারত এক থাকার যুক্তি। নেহেরু বোঝাতেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এক থাকার জরুরত। অর্থনৈতিক উন্নয়ন চরম অসম হয়ে যাওয়ায়, বাকি রইল কেবল পরাশক্তি গরবের ভুয়া জাতীয়তাবাদী আফিম। প্রশ্নটা তাই, হোয়াই ভারত একসিস্টস? ভারতের এই একজিসটেনসিয়াল ক্রাইসিস উপনেবেশবাদের ফল, কিন্তু ভারত জন্ম থেকেই একে ভালবাসছে। এই ক্রাইসিস সমান বা আরো বেশিভাবে পাকিস্তানেরও। একমাত্র বাংলাদেশই এ থেকে মুক্ত, তার সমজাতীয়তা, সমধর্মীতা, অভিন্ন সংস্কৃতি, ভূগোল, ইতিহাস ইত্যাদির কারণে। এরসব কিছুই সংহত হয়েছে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তি সংগ্রামের মহাকলরোলের মাধ্যমে। সেই কারণে ভারতে যেমন সবাই পরাশক্তি ভারত বা হিন্দু সভ্যতার দোহাই দেয়, বাংলাদেশে দেয় একাত্তরের দোহাই। ওদেরটা মিথ আমাদেরটা ইতিহাস।

এই অস্তিত্ব সংকটের জন্যই ভারতের শাসকরা কাশ্মীর বা মুসলিম প্রশ্নে হিস্টিরিয়াগ্রস্থ অবস্থান নেয়। মুক্ত বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে বা মুক্ত পাকিস্তানে তাই জঙ্গি, দুর্নীতি, অস্থিতিশীলতা থাকলেই তাদের লাভ বলে তারা মনে করে। কিন্তু অপরের ঘরের আগুন তো তার ঘরেই শেষপর্যণ্ত ছড়াচ্ছে। এ দিক থেকে ভারতের এই ক্রাইসিসই তাকে আমেরিকার শক্তি আর ইসরায়েলের সহিংস রাষ্ট্রের মডেল ও বর্ণবাদী মতাদর্শের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।

হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা বাঙলা ভাগ করেছে, নেহেরুর কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের ধারণার মধ্যেও এই সাম্প্রদায়িকতা ছিল, এবং তা ভারত ভাগ করিয়ে ছেড়েছে। কাশ্মীর প্রশ্নেও সাম্প্রদায়িকতায় আচ্ছন্ন থাকলে, তা অন্য সব সমস্যার সঙ্গে যোগ হয়ে ভারতবাসীর জন্য ভোগান্তিই বাড়াবে শুধু।

সবাইকে এটা বুঝতে হবে, হিন্দু বা মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা আধুনিক রাষ্ট্রবাদী রাজনীতিরই প্রকাশ। উপমহাদেশের রাষ্ট্রীয় মুক্তির বিপত্তি যেমন এ থেকেই শুরু হয়েছিল, এর কারণেই তা এখনো সারছে না। অথচ আগের মতো এখনো ভারতের ওপরই উপমহাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণের বেশি নির্ভরশীল এবং সেকারণেই তাদের দিক থেকেই বাধা বেশি।

স্যাম মানেকশ-রা সমাধানকেই সমস্যা করেন আর সমস্যাকেই ভাবেন সমাধান। ঠিক যেমন বিজেপি-র বাংলাদেশ বিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদ বাদবাকি হিন্দুদের সেই গড়নই দিতে চাইছে, যার নাম হিন্দুত্ব। ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, হিন্দুত্ব আর ভারত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র ক্রমশ একাকার হয়ে যাচ্ছে।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৯৮১ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই