
সেনাপ্রধানের বরখাস্তের নির্দেশ প্রেসিডেন্ট না মান্য করায় অধ্যাপক প্রচণ্ড টেলিভিশন ভাষণে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। খবরটা দিয়েছে রয়টার
আপডেট সহ বিস্তারিত কথা হবে, কিন্তু এটা যে নতুন অশনী সংকেত, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। ভারতের চারপাশটা অস্থির হচ্ছে। আর আগুনের মধ্যে বসিয়া পুষ্পের হাসি যারা হাসছে, তারাও জানে না, উপমহাদেশের এই রক্ত-হোম খেলা, কাউকেই শেষ অবধি নিস্তার দেবে না।
আপাতত এই লেখাটা দেখতে পারেন। যারা নেপালের রাজনৈতিক বিকাশ ও সংকটের গতিসূত্র বুঝতে চান, তাঁদের কাজে লাগবে। সংকটের পাটাতন ও টানাপড়েনটি স্পষ্ট করেছেন ভারতের দি হিন্দু পত্রিকার সাংবাদিক সিদ্ধার্থ ভারাদারাজন
রাজা নেই কিন্তু রাজতন্ত্রের পুরোনো দিন ফিরে আসছে!
২০০৮ এর গোড়ায় এপ্রিল মাসে নেপালের জনগণ কেবল রাজতন্ত্রের অবসানের জন্যই ভোট দেয়নি, তারা কায়েমি স্বার্থবাদীদের গণতন্ত্রেরও অবসান চেয়েছিল। তারা সেই রাজনীতির বিদায় চেয়েছে, যে রাজনীতি মতার জন্য একবার এদিকে একবার ওদিকে দৌড়ায়। সে কারণেই তারা প্রতিষ্ঠিত দুটি দল, নেপালি কংগ্রেস ও ঐক্যবদ্ধ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টিকে (ইউএমএল) উচিত শিা দিতে দলে দলে মাওবাদীদের ভোট দিয়েছে। ওদের তারা এত দিন দেখেছে। জনগণ কেবল রাজতন্ত্রের পতনের থেকে বেশি কিছু চেয়েছে। তার প্রমাণ, নেপালি রাজতন্ত্রের ছোট তরফের অংশিদার কৈরালা বংশকেও পরিত্যাগ করা। কংগ্রেস নেতা গোষ্ঠীপতি গিরিজা প্রসাদ কৈরালা ছাড়া তাঁর কন্যাসহ কৈরালাদের আর কেউ ভোটে জিতে আসতে পারেননি। আর লোকদেখানো বামপন্থী ইউএমএলকেও তাদের গত কয়েক বছরের সুবিধাবাদী আচরণের জন্য শাস্তি দিয়েছে ভোটাররা। দলটির প্রধান মাধব কুমার নেপাল দুটি আসনে দাঁড়িয়েছিলেন। দুটিতেই তিনি পরাজিত হয়েছেন।
এককভাবে মাওবাদীদের ভোট দিয়ে, তাদের একক বৃহত্তম দলে পরিণত করে সংবিধান সভায় পাঠানোর মধ্য দিয়ে জনগণ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা নতুনদের পক্ষে। কিন্তু সাবেক বিদ্রোহীদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না দিয়ে জনগণ তাদেরও সতর্ক করে দিয়েছে। নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান অনুযায়ী মৌলিক বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। তবে এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি আসনে মাওবাদীদের বিজয়ী করে নেপালি জনগণ চেয়েছে, রাজতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামে জনগণ যে চেতনায় রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা করেছে, সেই চেতনাকে তারা যেন সংবিধান সভায় জাগ্রত রাখে। জনগণ এমনকি মাওবাদীদের রাজনৈতিক ঘোষণার প্রতি একাত্মতা জানিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, অন্য দলগুলোর জোট বেঁধে সংবিধান সভায় এর বরখেলাপ করতে যাওয়া তাদের পছন্দ নয়।
কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য দুঃখ যে কংগ্রেস ও ইউএমএল মিলে এত চমৎকার ভারসাম্যকে কুটিল ষড়যন্ত্রের পথে ধ্বংস করতে বসেছে। মাধেসি দল জনঅধিকার এবং বিপথগামী ইউএমএলের সঙ্গে অনৈতিক জোট বেঁধে কংগ্রেস তার নিজের লোককে প্রেসিডেন্টের পদে বসিয়েছে। একই কৌশলে তারা ভাইস প্রেসিডেন্টের পদটিও নিয়ে নিয়েছে। দুটি েেত্রই মাওবাদীদের মনোনীত প্রার্থীরা নির্দল মাধেসি সংগ্রামী এবং বুদ্ধিজীবী রামা রাজা প্রসাদ সিং এবং স্বতন্ত্র সদস্য শান্ত শ্রেষ্ঠকে হারিয়ে দিয়েছেন।
ষড়যন্ত্রের একেকটি ধাপ
মাওবাদীরা একক বৃহত্তম দল হিসেবে হাজির হওয়ার পর কংগ্রেস ও ইউএমএল প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেয় যে মাওবাদীদেরই সরকার গঠন করা উচিত। কিন্তু এই বলেও তারা এমন কিছু কৌশলগত ও নীতিগত বাধা সৃষ্টি করে, যাতে মাওবাদী নেতা প্রচণ্ডের প্রধানমন্ত্রী হওয়া কঠিন হয়। তারা দাবি করে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের বিধানের জায়গায় যদি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান না আনা হয়, তাহলে মাওবাদীরা চিরকাল ক্ষমতায় থেকে যাবে। এর জবাবে প্রচণ্ড হুঁশিয়ারি জানান, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলনের সুযোগ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং গণতন্ত্র বড় দল আর ছোট দলের মতার খেলায় পর্যবসিত হবে। তাঁর কথা উড়িয়ে দেওয়া হয়।
এমনকি অন্তর্বর্তী সংবিধান প্রণয়নের সময় প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীকে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে অপসারণ বা নিযুক্ত করার বিধি প্রণয়নের বেলায়ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। গত দুই মাসই ছিল সরকার গঠনের সুবর্ণ সময়। কিন্তু এ সময়েও কোন্দল চলতে থাকে কেবল কে প্রেসিডেন্ট আর প্রধানমন্ত্রী হবেন তা নিয়ে। প্রথমে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর দুটি পদ দাবি করে মাওবাদীরা বোকার মতো আচরণ করলেও খুবই দ্রুত তারা যেকোনো অরাজনৈতিক খ্যাতিমান সৎ ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নিতে রাজি হয়। কিন্তু কংগ্রেস তৎণাৎ এ প্রস্তাবটিও বাতিল করে দেয়। তারা চায়, কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান তাদের দলের নেতা গিরিজা প্রসাদ কৈরালাকেই প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত করতে হবে; আর কেউ নন। যদিও কৈরালা বয়স ও স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে অনুকূল নন, যদিও অনেকের মধ্যে এ ভয় রয়েছে যে প্রেসিডেন্ট হয়ে তিনি সরকারের বিকল্প এক ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারেন। মাওবাদীরা এটা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
এ রকম অচলাবস্থায় মাওবাদীরা ইউএমএলকে প্রস্তাব করে, মাধব কুমার নেপাল ছাড়া_ কেননা তিনি দুটি আসনেই পরাজিত হয়েছেন। অন্য কাউকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দিলে তারা সমর্থন করবে। মাওবাদীরা এও বলে যে ইউএমএলের যেকোনো প্রবীণ নেতা অথবা কোনো নারী অথবা কোনো দলিত শ্রেণীর নেতাই এ পদের যোগ্য হবেন। কিন্তু ইউএমএল জনগণের দ্বারা পরিত্যক্ত মাধব কুমারকেই প্রেসিডেন্ট পদে দেখতে চায়, অন্য কাউকে নয়।
এ রকম অবস্থায় মাওবাদীরা চতুর্থ বৃহত্তম দল এমজেএফ-একে যে প্রস্তাব দেয়, তা কোনো আÍসম্মানসম্পন্ন মাধেসি গোষ্ঠী ফেলে দিতে পারবে না। তারা নিরপে মাধেসি সংগঠক ও বুদ্ধিজীবী রামা রাজা প্রসাদকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন দেবে বলে জানায়। এমজেএফ প্রকাশ্যে অস্বীকার না করলেও ভেতরে ভেতরে অখুশিই থাকল। এর মধ্যেই তারা দাবি করল, তাদের দলের কাউকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে আসীন করতে। অথচ মাওবাদীদের প্রস্তাব ছিল জনগণের চারটি প্রধান অংশ, যথা মাধেসি, নারী, পাহাড়ি ও জনজাতির মধ্যে রাষ্ট্রের শীর্ষ চারটি পদ বণ্টিত হোক। এটা হলে সবাই ভাবতে পারত যে নতুন ব্যবস্থায় তাদের সবার অংশীদারি রয়েছে।
এভাবে এমজেএফও যখন মাওবাদীদের মেনে নিল না, তখন কংগ্রেস ও ইউএমএল তড়িঘড়ি করে তাদের নিজস্ব মাধেসি প্রার্থীদের দিয়ে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ পূরণ করে নিল। এর আগের কয়েক মাস এ দলগুলোই নিজেদের নেতাদের ছাড়া কাউকেই প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মেনে নিতে রাজি ছিল না। অথচ ঘোঁট পাকিয়ে মাওবাদীদের হারানোর জন্য তারাই আবার এমন এক লোককে প্রেসিডেন্ট করল, যাঁর মাধেসিদের চলমান সংগ্রামে কোনো ভূমিকাই ছিল না। এখন এমজেএফও সুযোগ বুঝে তাদের প্রার্থীকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করিয়ে নিল আর ইউএমএল পেল স্পিকারের পদ। নির্বাচনে বিজয়ী দল মাওবাদীরা সর্বক্ষেত্রেই অপদস্থ হলো।
কোনো গণতন্ত্রে কখনোই এমন অনৈতিক রাজনীতির ঠাঁই হওয়া উচিত নয়। অথচ সেটাই ঘটছে এমন একটি দেশে, যে দেশ সদ্য রাজতন্ত্রের জোয়াল কাঁধ থেকে ফেলে দিয়ে এমন এক গণতন্ত্রের জন্য চেষ্টা করেছে, যেখানে সত্যিকার অর্থেই নাগরিকদের মতায়নের জন্য সাংবিধানিক পদ্ধতি তৈরি হচ্ছিল।
কায়েমি স্বার্থবাদী দলগুলোর অশুভ জোটের অশুভ মতাপ্রদর্শনের পর এখন তারা বলছে, এখন মাওবাদীদের সরকার গঠনে তাদের কোনো আপত্তি নেই। এটা পরিষ্কার যে এ অবস্থায় মাওবাদীরা সরকারে বসলে তাদের নিরন্তর সাবেকি মতাবানদের ছলচাতুরীর শিকার হতে হবে। এ কারণেই মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড বলেছেন, তাঁরা সরকার গঠন করতে রাজি, তবে তার আগে সব পকে বৃহত্তর নীতিগত বিষয়ে একমত হতে হবে এবং কথা দিতে হবে যে নতুন ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলা হবে না।
এই অচলাবস্থায় মাওবাদীদের জন্য একই সঙ্গে নতুন সম্ভাবনা ও দোলাচল উপস্থিত হয়েছে। তারা যদি বিরোধী দলে বসে, তাহলে জাতি দেখবে যে পুরোনো লোকেরাই পুরোনো কায়দায় দেশ চালাচ্ছে। এর ফলে আগামী নির্বাচনে আরও বিরাট আকারের ভোটের সমর্থন নিশ্চিতভাবেই পাবে। আবার তারা মতার বাইরে থাকলে নতুন সংবিধান প্রণয়ন ভেস্তে যেতে পারে বা তা দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিপথে চালিত হতে পারে। অন্যদিকে সুবিধাবাদীদের ঐক্যে জাতীয় রাজনীতিতে বহুতর বিচ্যুতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মাওবাদীদের সব অধিকার ছিল নিজেদের বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণার শিকার ভাবার। ভালো হোক বা মন্দ হোক, এখন একমাত্র এই সাবেক বিদ্রোহীদেরই সামর্থ্য রয়েছে নেপালি সমাজের নানারকম আঞ্চলিক ও জাতিগত সংকটকে সামাল দেওয়ার। তারা ছাড়া অন্য কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের আগামী ২০ মাসে জনগণের আকাক্সাকে সংবিধানের মধ্যে ধারণ করে, বিভিন্ন অংশের বিভিন্নমুখী প্রবণতাকে এক সূত্রে গাঁথতে সম নয়। তা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী পদে অধ্যাপক প্রচণ্ডই হচ্ছেন যোগ্যতর ব্যক্তি।
ভারতের দ্য হিন্দু থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


