পাই না খুঁজে কোথায় আছে পাহাড়ি বোন কল্পনা।'
মাত্র ষোল বছর বয়সে কল্পনা চাকমা হারিয়ে গেছে। তার সম্পর্কে সরকারি ভাষ্যে বলা হয়, 'নিখোঁজ'। মানুষ অনেক ভাবেই হারিয়ে যায়, কত মানুষই তো হারিয়ে যায়! কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন স্বাধিকারকামী তরুণ-তরুণীরা হারিয়ে যায়, তখন আর একটি বিশেষ অর্থ থাকে। তখন তারা আর কোথাও নয় বিশেষ একটি জায়গাতেই হারিয়ে যেতে বাধ্য হয়। যেমন একাত্তরেও হারিয়ে যাওয়াদের বিশেষ কিছু জায়গায় পাওয়া যেত। সেই স্থানটি কোথায়? কারা তাদের নিয়ে যায়? কেন নিয়ে যায়? নিয়ে গিয়ে কী করে? বালকের মতো এইরকম অনেক প্রশ্ন মনে জাগে। উত্তরহীন প্রশ্নে প্রশ্নে আমাদের আকাশ কালো হয়ে আসে। কিন্তু কে দেবে উত্তর? কিংবা কে চাইবে এত এত ভয়ঙ্কর সব প্রশ্নের জবাব?
একটা উত্তর দিয়েছে সুইডেন বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের রোজালিন ডি কস্তা। তিনি বলেছেন, ''কল্পনা চাকমা (১৬), এক উপজাতীয় এসএসসি পরীক্ষার্থী কিশোরী বান্দরবানের আলিকদম থেকে অপহৃত হয়। অপহরণটি চালায় স্থানীয় বিএনপি ক্যাডারেরা এবং তাদের সহযোগিতা করে বিএনপির জোটভুক্ত অন্য কর্মীরা। আজো তার খোঁজ মেলেনি। (সুইডেন বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিষদের প্রতিবেদন, ২০০২)
ভাসুরের নাম তারা যে মুখে আনতে পারেনি তা-ই নয়, সন্দেহের তীরকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
সেসময় এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ে। সেই চাপ সামাল দেওয়ার জন্য সরকার বিচারপতি আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তার রিপোর্ট কল্পনার মতোই কোনো গোপন গর্তে চাপা পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেমা খ্যাত ড. নাজমুল ইসলাম কলিমুল্লাহ-র নেতৃত্বে একটি দল সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে চড়ে কল্পনা-সন্ধান পিকনিক সেরে ঢাকা প্রেসক্লাবে (৮ আগস্ট, ১৯৯৬) ঘোষণা করে যে, কল্পনা ভারতের গণ্ডাছড়া নামের এক গ্রামে ভালই আছে এবং তার মায়ের সঙ্গে নাকি তার দুবার যোগাযোগও হয়েছে। অথচ কল্পনার মা বাঁধুনী চাকমা ঢাকা প্রেস ক্লাবে এসে এই মিথ্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে মেয়েকে ফেরত চান। (১৯ আগস্ট, ১৯৯৬, ভোরের কাগজ)
কোনো কোনো পত্রিকায় রটানো হয়েছিল, কল্পনা চাকমা সীমান্তের ওপারে আরাম-আয়েশেই আছে। যেদিন কল্পনা অপহৃত হয়, সেদিন ছিল ১৯৯৬ সালের ১১ জুন। ঐদিন দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনী ডামাডোলে হারিয়ে গিয়েছিল কল্পনা অপহৃত হওয়ার সংবাদ। শোনা কথা যে, আমরা গণতন্ত্র পেয়েছি কিন্তু কল্পনাকে হারিয়েছি। কিন্তু পাহাড়ের মানুষ জানে, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, পাহাড়ে চলে সামরিক শাসন। কল্পনার অপহরণকারী হিসাবে জনৈক লেফটেনান্ট ফেরদৌসের নাম আসে। হিল উইমেনস ফেডারেশনও একইরকম অভিযোগই তুলেছিল। কল্পনা ছিল এ সংগঠনটির সাংগাঠনিক সম্পাদক। ওদিকে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সামরিক দায়িত্বে ছিলেন, এমন একজন এখন গণতন্ত্রের মহান পূজারি। তাঁকে নিয়মিত দেখা যায় টিভি টক শোতে এবং হালে তিনি একটি রাজনৈতিক দলও গঠন করেছেন। এখন হয়তো সেই ফেরদৌস আরো বড় পদে আসীন হয়ে 'দেশসেবা' করে যাচ্ছে! যখন শুনেছিলাম ঐ বীরপুঙ্গব আমার জেলাশহরের লোক, তখন ক্রোধ আরো বেড়েছিল, সঙ্কল্পও জন্ম হয়েছিল একটা। ওয়ার্ডসওয়ার্থ লিখেছিলেন, 'এ বয়েজ উইল ইজ উইন্ডস উইল'। আমার বায়বীয় সঙ্কল্প বায়ুতেই উড়ে গেছে। কিন্তু কল্পনার নাম আজো জ্বলজ্বল করছে নিখোঁজ তালিকায়।
না আমি তাকে দেখিনি। কিংবা হয়তো দেখেছি, পার্বত্য ইস্যুতে ঢাকার কোনো যৌথ মিছিলে। হয়তো হেঁটেছি তার পাশে, একসঙ্গে গলা তুলেছি। কিন্তু খেয়াল করিনি, কে কল্পনা। ছোট্ট একটি মেয়ে, কিন্তু কী বিরাট ছিল তার সাহস ও প্রতিজ্ঞা; তা শ্রাবণ থেকে প্রকাশিত কল্পনা চাকমার ডায়রি পড়লে বোঝা যায়। না, আমি শোক করতে বসিনি। জানি, এদেশে কল্পনারা হারায়। পাহাড়ি বিপ্লবী কল্পনা চাকমা কিংবা ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী কল্পনা দত্তরা থাকতে আসেন না। তারা আসেন আমাদের মুমূর্ষ সংকল্পকে জাগাতে। কিন্তু হায়! এদেশের জলীয় আবহাওয়ায় রাগ-সংকল্পও জলো হয়ে যায়। আর্দ্র বাতাসে স্মৃতির রং দ্রুত বিবর্ণ হয়। আরামের নোনা বাষ্পঘামে ফেঁসে যায় তার বুনট। কল্পনা হারিয়ে যাওয়ার এক যুগ পরে তাই মনে আর কোনো তাপ-জ্বালা নাই। কিন্তু গ্লানির ঘুণপোকা অক্ষয়-অমর-অজর। সেটা কুট কুট করে দাঁত ফুটিয়েই চলেছে আত্মার গহীনে, ইতিহাসে আর পার্বত্য জনপদে।
জাবিতে পড়বার দ্বিতীয় বর্ষের কোনো এক সন্ধ্যায় আমরা তিনজন তিনটি কাকের মতো বসেছিলাম লেকপাড়ের কালভার্টের ওপর। আমি, জাঈদ আজিজ আর সঞ্চয় চাকমা। তিনি তখন ছাত্র ফেডারেশনের সহসভাপতি আর ইউপিডিএফের দ্বিতীয় নেতা। ইউপিডিএফ শান্তি চুক্তির প্রতারণার বিরুদ্ধে সন্তু লারমাদের সঙ্গে দ্বিমত করে সদ্য আলাদা দল গঠন করেছে। সঞ্চয়দার মতো এর নেতারাও সবাই তরুণ। সেদিন সন্ধ্যায় সঞ্চয়দা-ই কল্পনা-কাহিনী শুনিয়েছিলেন। শুনে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম তিনজনই। তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। লেকে লেকে অজস্র পাখি সান্ধ্য আরতি করছে। আর কালো পানিতে তাদের ডানার একেকটা ঝাপট যেন আগুনের তরঙ্গ হয়ে আছড়ে পড়ছিল আমাদের গায়ে। আমরা তিনজন অন্ধকারে বসে সেই আগুনে পোকার মতো পুড়ছিলাম।
কল্পনা নিখোঁজ হওয়ার পরপরই প্রেসকাবের সামনে আমাদের এক যৌথ প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছিল। সেই সমাবেশে আমার উদ্বাস্তু জীবনের বন্ধু রবিন আহসান পাঠ করেছিল এই প্রতিবাদপত্রটি।
'ঐ পাহাড়ে জুলুম চলে এই কথা আর গল্প না
পাই না খুঁজে কোথায় আছে পাহাড়ি বোন কল্পনা
যে স্বাধিকার চাইতে গিয়ে কল্পনারা হারায়
প্রতিবাদে স্লোগানে রুখে ওরা দাঁড়ায়।
সেই পাহাড়ি জনগণের বন্ধু আমি ভাই
কল্পনা বোন হারালো কই, রাষ্ট্র জবাব চাই!'
রাষ্ট্র জবাব দেয় নাই। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে খবর পাই, আমাদের জাবি'র বন্ধু, আরেক পাহাড়ি নেতা রূপক চাকমা অপহৃত ও নিহত হন, নিখোঁজ হন আরো তিন ছাত্র ।
কল্পনার অপহরণের বিরুদ্ধের আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন আজকের মন্ত্রী দীপু মণি, দিলীপ বড়ুয়া, দীপঙ্কর তালুকদার। আজ কল্পনা অপহরণের ১৩ বছর পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দীপু মণি সেই দাবি কাকে জানাবেন? নিজের আসনকে নাকি খোদার আরশকে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

