আমার ভোটারদের সত্যাগ্রহ লেখাটি কিছু বিতর্ক ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবনাকে উস্কে দিয়েছে। বিশেষ করে বন্ধু এম হাসান হীরা ফেসবুকে আমার আগের লেখার লিংকে যে প্রশ্ন তুলেছেন তার প্রেক্ষিতে চিন্তাটাকে আরেকটু খোলাসা করা জরুরি মনে করলাম। গত তিন বছরে যা ঘটেছে তার দাগগুলো পাঠ করা এবং ভবিষ্যত রাজনীতির মানচিত্র ধরাই ছিল আমার ইচ্ছা। একইসঙ্গে সত্যিকার দিনবদলের সনদের ভূমিকা কী হতে পারে সেদিকেও চোখ রেখেছি। শুরু করেছিলাম মন্তব্য দিয়ে। পরে দেখি বড় হয়ে গেল।
জনগণ কি আছেন?
আমাদের এখানে শিক্ষিত বাবুদের একটা কালচার হচ্ছে, সবকিছুর জন্য জনতাকে দোষারোপ করা। কেউ তাদের রাজনীতি-সচেতন দেখতে চায়, কেউ তাদের হেদায়েত করবার চায়, আর কর্পোরেট সিভিল সোসাইটি ও এনজিওরা চায় তাদের আলোয় ভরিয়ে দিতে। এঁরা সবাই জনগণকে করতে সর্বদা উত্তেজিত থাকেন। কিন্তু জনগণও (আপাতদ শব্দটাকে হিসেবের সুবিধার জন্য অখন্ড রাশি হিসেবে ধরে নিচ্ছি ) যে নীরব অ্যাকশনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিনাই কিছু কিছু কাজ করে, যাকে আমলে নিতে হয়, সেটা দেখানোই আমার মূল প্রতিপাদ্য ছিল।
এদেশে জাতি নেই জনতা আছে
আমাদের কলোনিয়ালিজম ও বর্ণপ্রথার সংক্রমণ ঘটা এই দেশে অখন্ড জাতি বলে কিছু নেই। আধুনিক জাতিগঠনও ইউরোপের মতো এখানে হয়নি। এখানে ব্রাহ্মন-মুঘল-পাঠান এবং ইংরেজি বা আরবি-উর্দু শিক্ষিত বাঙালি আর বৃহত্তর কৃষক-কারিগর-ব্রাত্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমাজ ও জাত এক নয়। ফলে উপনিবেশিত বাস্তবতা রয়ে যাওয়া এই রাষ্ট্রের ভেতরে একদিকে উচ্চবর্গীয় জাতীয় প্রকল্প অন্যদিকে নিম্নবর্গীয় শ্রেণীপুঞ্জকে এক দাগে রাখা সম্ভব না। কেবল শ্রেণী দিয়েও বা শ্রমিক বলেও পুরাপুরি চেনা যাবে না, ধরা যাবে না।
বিশিষ্ট মার্কসবাদী স্লাভোস জিজেক যেমন বলছেন, 'কমনস', যারা সব অর্থে তলার বাসিন্দা। এদের মধ্যে মধ্যবিত্তের একটা অংশও আছে। আছেন নারীরা, সমগ্র কৃষক জনগোষ্ঠী, কওমি মাদ্রাসা পড়ুয়ারা, আছে বিহারি শরণার্থী, উত্তর-দক্ষিণের পরিবেশ উদ্বাস্তু, ঢাকা-চট্টগ্রামের বস্তিবাসী, হিজড়া, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, মান্দি-সাঁওতাল প্রভৃতিরা। এই তলার অংশকেই মোটাদাগে জনগণ বলছি। এটাকে একটা পিছল প্রত্যয় হিসেবে ব্যবহার করেছি। বৈশিষ্ঠ্যের ও রাজনৈতিক কর্মসূচিভিত্তিক তত্ত্বের ছাই দিয়ে একে পরে শ্রেণী-বর্গ-সম্প্রদায় ও স্বার্থ দিয়ে আলাদা আলাদা করে বুঝতে হবে একথা ঠিক, কিন্তু উচ্চবর্গের বিপরীতে তারা চিরন্তন জনগণ, এবং তাদের জীবন চলে চিরন্তন জরুরি অবস্থার মধ্যে। তার ভেতরেই তারা নড়াচড়া করে, ফাল দেয় ও মানিয়ে নেয়। তাদের জীবন বয়ে যায়। তাদের দিনবদল হয় না, যদি না বিপ্লবীরা সেই দিনবদলের সনদ তৈরি করে, জনপ্রিয় করে এবং তার জন্য লড়াই করে। এই লড়াই আজকের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব সৃষ্টির পথে, একটু একটু করে ট্রেন্চ দখলের সাংষ্কৃতিক পথে এবং চূড়ান্তভাবে নির্বাচন ও গণঅভ্যুত্থান পরিচালনার তাকদ অর্জনে সফল হবে। এর জন্য প্রয়োজন নতুন শুরু, নতুন আবির্ভাব।
লেনিন একদা লিখেছিলেন, পর্বতারোহণের মাঝখানে গিয়ে দেখলেন যে আর ওঠা যাবে না এ পথে। তখন আপনাকে আবার নেমে গিয়ে অন্য পথে যাত্রা শুরু করতে হবে, যদি আপনি শিখর ছুঁতে চান। বাংলাদেশের বামপন্থিদের অবদান অনেক। তাদের বড় অংশই সৎ ও নিষ্ঠাবান বলে মনে করি। কিন্তু বৈরী অভিজ্ঞতার চাপ, ক্রমাগত ভুল ও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, অসফলতার পাহাড় থেকে নেমে বিপ্লবের পর্বতমুখে আবার যাত্রা শুরু করতে। লেনিনই তো বলেছিলেন, যে উত্তরাধিকার আমরা অস্বীকার করি। আমাদের এখন দুর্বল-নাজুক-আত্মতৃপ্ত আপসের উত্তরাধিকার ত্যাগ করে সংগ্রামের ও বিচক্ষণতার উত্তরাধিকারকে তুলে ধরবার প্রয়োজন রয়েছে।
রাষ্ট্র যখন সমাজের বিরুদ্ধে
আমার দ্বিতীয় উপপাদ্য ছিল যে, জনগণ যেমন সরকার তেমন নাও হতে পারে। হেগেলের দেশ জর্মনে কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোতে যেখানে এরকম উপনিবেশিক ভেদ বা জাতপ্রথা ছিল না, ছিল না আশরাফ-আতরাফ, (একদা ইহুদি, জিপসি ও মুসলিমদের দাবিয়ে রাখা হয়েছে কিংবা আজকে মুসলিমরা ইউরোপের সংখ্যালঘু হিসেবে সেসময়কার ইহুদিবিদ্বেষের মতো জাতবিদ্বেষের শিকার একথা আমরা মনে রাখছি অবশ্য। বর্তমান আলোচনায় এই বিশেষ অবস্থার আলোচনা জরুরি নয়।) এবং সেখানে শিল্পবিপ্লব ও রিফর্মেশন ইত্যাদির মাধ্যমে আধুনিক জাতিগঠন প্রকল্পে একধরনের বানানো রাজনৈতিক ঐক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে সেখানে কমবেশি জাতীয় রাষ্ট্র নির্মাণ হয়েছে এবং জাতীয় সরকারও প্রতিষ্ঠিত আছে। হেগেলের কথা সেসব দেশে সত্য হতে পারে। কিন্তু আমাদের এখানে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে উপনিবেশিক বৈষম্য, শাসক ও শাসিতের মধ্যে প্রভু ও অধীন সম্পর্ক, জাতীয় ও আঞ্চলিকের মধ্যে কেন্দ্র ও প্রান্তিক বিভাজন। ইউরোপীয় পুঁজিবাদে ক্যাপিটাল আর লেবারের মধ্যে থাকে কেবল ম্যানেজার। পুঁজি ও শ্রমিকের মধ্যে এখানে জমিদার-মহাজন-মধ্যস্বত্বভোগী বসে থাকে। সুতরাং এখানে সবসময় জনগণ ও জাতি এক নয়, জনগণের বড় অংশের সম্মতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র এখানে কাজ করে না।
'ডমিন্যান্স উইদাউট হেজিমনি'
ফলে এই রাষ্ট্রের শাসন হেজিমনি বা আদর্শিক বুঝ দিয়ে হয় না, হয় সরাসরি বলপ্রয়োগে। ঠিক যেমনটা ইংরেজ আমলেও হতো। এ অর্থেই আমি বলি, এখানে জনগণ যেমন সরকার তেমন নয়। উভয় পদার্থ এখানে বিক্রিয়া করে না, মেশে না। (একইকারণে মধ্যবিত্ত-বুর্জোয়া থেকে আসা বিপ্লবের প্রতিনিধিরাও পায়ের তলায় মাটি পান না।) এবং কোনো আইন বা আদর্শের বন্ধন এদের মধ্যে তেমন জোরদার নয়। এখানে চলে, 'ডমিন্যান্স উইদাউট হেজিমনি'।
এর ফলে বহিরাগত বা স্থানীয় শাসকরা এখানে তাদের শেকড় জনগণের ভেতর তেমন চারিয়ে দিতে পারে না। তাহলেও সেভিয়েত পতনের পরের এক দশকে (এনজিও-মিডিয়া-মিভিল সোসাইটির জয়জয়কারের এ যুগ মুক্তবাজারেরও প্রধান্য বিস্তারের যুগ) বাজারের সঙ্গে সঙ্গে বিরাট মধ্যবিত্ত গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে সরাসরি সাম্রাজ্যবাদ তাদের প্রতিষ্ঠান এবং তাদের জীবনাদর্শের প্রতি সমর্পিত হবার আকাংখা তীব্র হয়েছে। দেশীয় শাসক-বিত্তবানদের নব্বইভাগই পরিণত হয়েছে দালাল শ্রেণীতে। একইসঙ্গে নগর প্রসারিত হয়েছে এবং তা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও গণশত্রুদের দুর্গ। এসবের মাধ্যমেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার অধীন জনগণের ওপর মতাদর্শিক প্রভাব তথা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, সন্ত্রাসদমন, গণতন্ত্র, মুক্তবাজার, নারীর পণ্যায়ন, ভোগবাদ, প্রকৃতিদখল ইত্যাদি বিষয়ে শাসকগোষ্ঠীর চিন্তা ও ভাবাদর্শকে কিছুটা গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছে, অর্থাৎ অধিপতিদের মতাদর্শের হেজিমনি জনগণের মধ্যে কিছুটা সংক্রমণ ঘটিয়েছে।
গত নির্বাচনে সেকারণে জনমতের প্রবাহিত হওয়ার খাত তারাই ঠিক করে দিতে পেরেছে বলে মনে হয়। এ নির্বাচনকে তাই শাসক মতাদর্শের সাময়িক আধিপত্য কায়েমের লগ্ন বলেও চিহ্নিত করা যায়। সাময়িক কারণ, স্বার্থের চরম শত্রুতার কারণে এ দুইয়ের এক হওয়ার কোনো সুযোগ বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় নেই। কারণ, এই রাষ্ট্র সরাসরি সমাজের বিরুদ্ধে এবং জনগণের অস্তিত্বের বিপরীত কোণে বেড়ে উঠেছে।
গণশত্রুদের সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট গণতন্ত্র
''উপনিবেশিক যুগেও গণতন্ত্র ছিল। সেখানে কেবল অভিজাত-বাবু ও লাটসাহেবদের হাতেই ক্ষমতা থাকতো। আজকের পরিস্থিতি তার থেকে ভিন্ন কী? ১৯৩০ এর দশকের শেষে ৪৮ শতাংশ কৃষকের হাতে দুই একর করে জমি ছিল। আশিভাগ মানুষই ভূমির অধিকারি ছিলেন। আজ প্রায় আশিভাগ মানুষ ভূমিহীন, সত্তর ভাগ দারিদ্র্য সীমার নীচে। এই ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। রাজধানী ঢাকায় দাসোপম দারিদ্র্য আর দাসমালিকসম সম্পদের কেন্দ্রীভবন বিষম চেহারা পাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি যা হয় তার সমস্ত সুফলভোগী মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরা। তারা দেখছে, সম্প্রতি তাদের জীবনে যে বিলাস ও স্বাচ্ছ্যন্দ এসেছে, তার বিরুদ্ধে তলার লোকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধছে। এরকম অবস্থায় যে সরকারই দমনমূলক কার্যক্রম নেবে, এলিট বাহিনী গঠন করে এই ক্ষমতাবান শ্রেণীগুলোকে নিরাপত্তা দেবে, তাদেরই এরা সমর্থন করবে। জঙ্গি বা মাওবাদী দমন কাজে তাই এদের এত উৎসাহ।
এভাবে সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট উন্নয়ন রূপ নিচ্ছে ফ্যাসিবাদের। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অধিকার রক্ষা কিংবা দারিদ্র্য বিমোচন তো দূরের কথা তারা নিজেরাই ঐসব আকাংখার ধামার ওপর চেপে বসে ইংরেজ আমলের মতো নতুন উপনিবেশিক দখলদারির সহযোগী হয়ে উঠেছে। গত এক শতকের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ফল যদি এই হয়, তাহলে আজ একে চ্যালেঞ্জ জানাবার সময় এসেছে। দরকার হয়ে পড়েছে এর ঘোর থেকে বেরিয়ে আসার। মুক্তির পথযাত্রী বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের সহস্র বছরের বঞ্চনা, অপমান, দাসত্বের ঘেরাটোপ থেকে বেরুনোর সংশপ্তকীয় সংগ্রামে সামিল হবার। তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনীতির ইস্যুকে রাজনীতি দিয়ে বুঝে নেবার। দরকার রয়েছে হারানো দাবিগুলোর পক্ষে আবার দাঁড়াবার।'' ('জরুরি অবস্থার আমলনামা'/শুদ্ধশ্বর/ শাহবাগ)
হারানো দাবিগুলোর সপক্ষে
''মার্কিন নিওলিবারেলিজমের বাহন সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট গণতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ঠ্য বিরাজনীতিকরণ। তিরিশের দশক থেকে ভূমি সংস্কার, জাতীয় মুক্তি, সার্বভৌমত্ব, সাম্য, জাতীয়তাবাদ, শিল্পায়ন, মেহনতির মুক্তি ইত্যাদি প্রত্যয় রাজনীতির আবেগ ও নির্দেশনা হিসেবে হাজির ছিল। আজ তারা নিপীড়িত শ্রেণী ও জনগোষ্ঠীর বিকাশের এ দাবিগুলোকে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছে। শিক্ষিত সমাজের বৃহত অংশের ওপর তাদের এসব চিন্তার আধিপত্যও প্রতিষ্ঠা হয়েছে। মিডিয়া ও এনজিও এরই এমবেডেড বাহিনী। সমাজের জায়গায় তারা প্রতিষ্ঠা করেছে ক্যালিবান সিভিল সোসাইটি, আর বুদ্ধিজীবীরা হলো রবিনসন ক্রুশোর অর্ধসভ্য-অর্ধবন্য ফ্রাইডে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বদলে গেছে পুঁজি ও কর্পোরেটের একচ্ছত্র ক্ষমতায়। রাজনৈতিক সমাজ, সিভিল সোসাইটি ও মিলিটারির অসবর্ণ বিবাহ হয়ে যাচ্ছে তাদের হাতে। সাবেকি বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার ভিত টলে গেছে। সমাজকে লুণ্ঠিত ও ক্ষমতাহীন করার ফলে সমাজ আর তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না, সেই শক্তিও সমাজের নেই_ যেটা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের যুগে ছিল।
আবার যেহেতু দক্ষ প্রশাসনিকতা ও ব্যবস্থাপনা দেওয়ার মুরদও এরা রাখে না, সেহেতু বিশ্বের চালক অর্থনৈতিক ও সামরিক সংস্থাগুলোর আস্থাও তারা হারিয়েছে। উপরন্তু তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ নিয়ে দাঁড়ানো সিভিল সোসাইটি। এদের আন্তর্জাতিক যোগ পোক্ত, তারা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের অধিকারী সুতরাং তাদের প্রশাসনিকতা ও ব্যবস্থাপনা মজবুত (গুড গভর্নেন্স ও গুড ম্যানেজমেন্ট)। অতএব তারাই ফিট।
সব শাসনের ভিতে থাকে আইন ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা। এক্ষেত্রেও সিভিল সোসাইটির ভিত দুর্বল হওয়ার জো নাই। রাষ্ট্রের স্থায়ী দুই খুঁটি আমলাতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে তদের মিলন তো সোনায় সোহাগা। সোনা আর সোহাগার এই মিলনে মুক্তির রাজনীতি কি তবে কর্পূরের মতো উবে যাবে? হ্যাঁ, এক ধরনের রাজনীতির দিন শেষ। আবার এরকম পরিস্থিতিতেই নতুন রাজনীতির উদয় হয়।
তার জন্য আবার আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে বুনিয়াদী রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো_ যে প্রশ্নগুলোকে তারা নিওলিবারেল শব্দবন্ধ দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন বিকেন্দ্রীকরণ জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথ বন্ধ করারই কৌশল। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিদানের নামে ক্ষমতাকে সমাজের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কৃষকের প্রাণের দাবি ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে জমির মালিকানা ফেরত পাওয়া। এটা দমাতে ও বিভ্রান্ত করতে ক্ষুদ্রঋণের কর্মসূচি আনা হয়েছে। নারীকে পুরুষতন্ত্রমুক্ত করার কর্মসূচিকে নারীর ক্ষমতায়নের নামে একদিকে অধিকতর শ্রমশোষণ অন্যদিকে তার যৌনতাকে বাজারের ভোগ ও চোষণের টানেলে ঢোকানো হচ্ছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নকে 'ওয়ার অন টেররের' পরিভাষায় ব্যক্তির নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মৌলবাদ প্রতিরোধের নামে জাতীয় রাষ্ট্র আজ করদ রাজ্যে পরিণত হয়েছে। দেশ চলছে কাশিমবাজার কুঠির নির্দেশে।
এই সিভিকো-মিলিটারিতন্ত্রের মডেল সবচে ভাল দেখা যায় মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রমতার কেন্দ্র থেকে জনগণকে সেখানে ‘চিরতরে’ সরিয়ে রাখা হয়েছে। আমেরিকার নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার এই-ই হলো তরিকা। এখন আলোকিত বিশেষজ্ঞরা মগজ বেচে এরই খয়েরখাঁগিরি করে। সিভিকো-মিলিটারি জোট পুঁজির পথের কাঁটা সরায় বলপ্রয়োগের হস্তে। সাম্রাজ্যবাদের ঢালাইমেশিনে এরা এখন এক ছাঁচে গড়া হচ্ছে। ষাট থেকে আশির দশকে ল্যাটিন আমেরিকায় যে কায়দায় গণআন্দোলন দমন করা হয়েছিল, এখানেও সেই একই কায়দায় এলিট বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্রের শঙ্কা নাশ করা হচ্ছে। ভারতে মাওবাদী উত্থান আর মুসলিম মিলিট্যান্সি সামাল দিতে এবং নেপালের মাওবাদী জোয়ার এদিকে যাতে না ছড়ায় তার জন্য তৈরি করা হচ্ছে অটুট নিরাপত্তাজাল।'' ('জরুরি অবস্থার আমলনামা'/শুদ্ধশ্বর/ শাহবাগ)
'প্রগতি ও গণতন্ত্র'কে নতুন করে সংজ্ঞা দিতে হবে
আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, নির্বাচন, সুশাসন ও প্রগতির সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। ষাট-সত্তর দশকে জাতীয়বাদী আন্দোলনের যুগে এগুলো জনগণের রাজনৈতিক মুক্তিকে বোঝাতো। রাজনৈতিক মুক্তির প্রশ্নকে আজ কর্পোরেট ক্যাপিটাল, সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের রংবেরংয়ের সহযোগিরা হঠিয়ে এনেছেন ছদ্ম-মুক্তির নানান এজেন্ডা। ইরাকে গণতন্ত্র ও শান্তির নামেই হামলা হয়েছিল, আফগানিস্তানে নারী মুক্তির নামেই আগ্রাসন চলেছে, ফিলিস্তিন বা কাশ্মীরে সন্ত্রাস দমনের নামেই জাতিগত গণহত্যা চলে আসছে। আধুনিকতার দোহাই দিয়েই কর্পোরেট-মিডিয়া ভোগবাদী কামজর্জর তারুণ্যের নির্মাণ ঘটাতে চায়। উন্নয়নের নাম করেই তৃতীয় দুনিয়ার নিঃস্বকরণ চলছে। বিশ্বের চারশো কোটি কৃষিজীবীর অস্তিত্ব আজ উন্নয়নের নামেই হুমকির মুখে, অন্যদিকে যুদ্ধ পরিণত হয়েছে স্থায়ি ব্যাপারে। গণতন্ত্রের বটিকা গেলানোর পথেই আমাদের মতো দেশের পরজীবী শাসকদের কেনাবেচা সহজ হয়ে গিয়েছে। এই শব্দগুলো তাই কোনো নিরীহ টার্ম নয়, এগুলো তীব্রভাবে রাজনৈতিক বাগধারা। এসবের খপ্পর থেকে বেরিয়ে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জনগণতন্ত্র কায়েমের শর্ত।
সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেট গণতন্ত্র আর জনগণের সত্যিকার গণতন্ত্রের বিরোধই হবে আগামী দিনের বাংলাদেশের মূল রাজনৈতিক বিরোধ। বাকিসব একে আড়াল করবারই রংঢং মাত্র। এইসব রংয়ে রঞ্জিত হতে দেওয়া কেবল রাজনৈতিক সুবিধাবাদই নয় আজ, বিপন্ন মানবজাতি তথা বিপন্ন স্বদেশের মানুষের সঙ্গে বেইমানির সামিল।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



