এক ভার্চুয়াল বন্ধু ফেসবুকে লিখেছেন, 'যারা বলে হরতাল তাদের মাথায় পানি ঢাল।' অন্যদিকে সহযোদ্ধা বন্ধু মনজুরুল হক মনে করেন, ''হরতাল "সফল" হবে কি হবে না তার চেয়েও জরুরী হরতাল কেন ডাকা হয়েছে সেটি দেশের মানুষ অন্তত জেনেছেন। এবার তাদেরই কর্তব্য তারা ঠিক করবেন। তারা রুখে দাঁড়াবেন না মাথা নত করে মেনে নেবেন সেই ভার তাদের উপরই রইল।''
গতকালের হরতাল বিষয়ে মনজুরুল হকের এই মূল্যায়নই ঘটনার নির্যাস হিসেবে মনে করি। বাধ্য না হলে করার দরকার নাই। হরতাল ডাকলেও মানুষকে বাধ্য করা চলবে না এটা আমি সর্বাংশে মানি। তারপরও এবারের:
হরতাল ডাকাই মোক্ষম ছিল, কারণ, সরকার চুক্তি করে ফেলেছে গোপনে। জেনেভা থেকে ফিরে গত আট তারিখে হাসিনা চুক্তি সই করেছেন। তার মানে আলোচানর প্রয়োজন বা সুযোগ তিনি খোলা রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। তাঁর ওপর নিশ্চয়ই প্রবল চাপ ছিল এবং তাঁর দলের মেরুদণ্ড ছিল ইলাস্টিকের মতো কোমল।
কিন্তু যারা জনস্বার্থ রক্ষার রাজনীতি করে, এটা তাদের কাছে দেশের বুকে ছুরিকাঘাত। এতে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হবে, কিন্তু মরবে না। এখন ঘাতককে ঝটকা ধাক্কা দেওয়াই একমাত্র করণীয় আরেকবার ছুরি খাওয়া থেকে বাঁচতে চাইলে। হরতালটা ছিল সেই চেষ্টা। অনেকে অপেক্ষা করতে বলেন, তাদের ধৈর্য অসীম কারণ তাদের হারাবার কিছু নাই। অথবা তারা এ মুহূর্তে ব্ড় সংগ্রামে যাবার সাহস রাখেন না।
সফল বলবার কারণ:
১. জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্নকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় করা গেছে। জাতীয় কমিটি জনস্বার্থের বলকে সরকারের কোর্টে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের সাফল্য এটাই যে, গত ক'দিনে জাতীয় গণমাধ্যমে এবং মানুষের মনেও একটাই, প্রশ্ন এটাই গ্যাস নিয়ে কী হচ্ছে? সরকারের ভূমিকা কি সঠিক? সরকার এত রাখঢাক করছে কেন? মানুষের এই আগ্রহ জাগানো মিটিং-মিছিল করে বা প্রচারপত্র বিলিয়ে সম্ভব ছিল না।
২. সরকারকে এখন ডিফেন্সিভ অবস্থানে গিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হচ্ছে। হরতাল ঘোষণা এবং তার আংশিক পালনের এটাই নৈতিক বিজয়। হরতাল এক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ না হয়ে নৈতিক চাপ ও প্রচারকৌশল হিসেবে অনেকটাই সফল। বলাবাহুল্য সরকারের ব্যাখ্যা ইতিমধ্যেই তোতলা ভাষাভঙ্গিমা অর্জন করেছে।
বিপদ একটাই ছিল, সেটা হলো সরকার বা অন্য কোনো অপশক্তির স্যাবোটাজ, আগুন ও খুনের সম্ভাবনা। সেটা হয় নি বলে রক্ষা।
৩. জনস্বার্থে হরতাল ডাকা যায়, সেই হরতাল পালনে কাউকে বাধ্য না করেও আবেদন জানানো যায়, পথের মানুষের কাছে কীসের বিরুদ্ধে হরতাল সেটা ব্যাখ্যা করার এই বিনয়ী কিন্তু সবল ধরন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন দৃষ্ঠান্ত। জাতীয় কমিটির সংযম এবং সরকারের বাধা না দেওয়ার মনোভাব এবং বিএনটিকে স্যাবোটাজ না করার জন্য ধন্যবাদ।
পরোক্ষ লাভ
*দক্ষিণ এশিয় ও মার্কিন-চীন ইত্যাদি কারণে পানি অনেক দূর গড়াবে। ট্রানজিট-বন্দর-সেনা ঘাঁটি ইত্যাদির ঢেউও এতে যোগ হবে। এই আন্দোলনে বামপন্থি সেকুলার ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের জোট জাতীয় কমিটি এক ধাপ এগিয়ে থাকলো পথ দেখানোয়।
*বামপন্থি অনৈক্যের মধ্যে আশা ও উদ্দীপনা দিয়ে ঐক্য আরো বাড়লো।
*বামের যারা সংগ্রাম করবে আর যারা সাইনবোর্ড বেচে এমপি হবে/হয়েছে তাদের পার্থক্য করা গেল।
দোদুল্য মান, সুবিধাবাদী ও পাতি-আমলীগারদের মুখোশও খসলো কিছুটা। বিদেশি বিনিয়োগের মৌলবাদের জসমে জলুসে কিছুটা গোচনাও পড়লো।
পরিশেষে বিপদের দিনে মানুষকে বাঁচাতে না পারলেও, তাদের হুশিয়ারি জানানো, তাদের হয়ে লড়াই করার মানুষের যে একেবারে অভাব পড়ে নাই, সেই জানান দেওয়াটা দেওয়া হল। পরের বার আর এবিসিডি বুঝিয়ে কাজ শুরু করতে আর হবে না। নানান জায়গায় অনেক ছোটো ছোটো গ্রুপ, ব্যক্তি, গোষ্ঠী জানতে জানাতে ও লড়তে তৈরি হচ্ছে সেই খবর লুটেরাদের গদিবালিশে বসত করা ছারপোকারা টের পেয়েছে। এদের নাচটাও আমরা দেখলাম, সেটাই বা মন্দ কী! আবার অনেক মিত্রও যাঁর যাঁর অবস্থান থেকে হরতাল বিরোধিতা করেও আন্দোলনের ইস্যুকে সমর্থন করেছেন। এদের শত্রু বানানো বা সেটা ভাবা আহাম্মকি। কিন্তু কাক ও কোকিলের পার্থক্য ভোলা চলবে না।
তাদের জানিয়ে দেওয়া চাই, এদেশটা গোলটেবিল মিটিং করে প্রতিষ্ঠা পায় নাই, বাপের তালুকের উত্তরাধিকারও কেউ নয়। এর প্রতিষ্ঠা হয়েছে রাজনৈতিক সংগ্রাম ও রাজনৈতিক জাতীয় যুদ্ধের মাধ্যমে। হরতাল কোনোভাবেই করা যাবে না এমন বিরাজনীতিকরণের চিন্তা সিভিল-মিলিটারি-কর্পোরেট চিন্তা। পুতুপুতু মুখোশের আড়ালে নৃশংস দখল ও যুদ্ধ এদের কমূসূচি। লিবারেলিজম এদের নতুন রাজনৈতিক ধর্ম। একে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এরা সবকিছু বণিক আর বিশ্বব্যাংকীয় আমলা এবং মার্কিন-ভারতের প্রভুদের কথাতেই হবে বলে বিশ্বাস করে। পার্থক্য যে, আমরা তা করি না।
আগের লেখা : কন্সপিরেসি অব সাইলেন্সের মধ্যে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় একটি মরিয়া হরতাল : Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



