সেখানে সবুজ ছিল, টলটলে জলের উৎস ছিল, নির্জনতা আর চঞ্চলতা ছিল। পাহাড়ের উপরে দাঁড়ালে সবুজ ধানক্ষেত ছিল। এসবের মাঝে বহুজনের মধ্যে সাহসী এক যুবক ছিল। ঘরে আলতা রাঙা যুগল পা আর ফুটফুটে এক মুখ ছিল। স্বপ্ন ছিল অবারিত, কষ্টি পাথরে যাচাই করা শুদ্ধ শ্রম ছিল।
পাহাড়ের পাদদেশের জমিগুলোতে আগে তেমন ফসল ফলত না। জমিগুলো খালি পড়ে থাকতে দেখতাম বছরের বেশীর ভাগ সময়। আধুনিকতা আর শ্রমের বিনিময়ে এখন চোখ ধাঁধাঁনো ধান ফলে। বেশীর ভাগ জমিতে মাতৃ প্রধান গারো সম্প্রদায়ের মেয়েরা জমির সব কাজ করে। এখন অবশ্য অনেকেই সমতল ছেড়ে এসে এদের পাশাপাশি জীবন শুরু করেছে। এদের মাঝেই রাঙা নামের এক যুবকের সংসার ও একখন্ড জমিন আছে। সেখানে এবার খুব ভাল ধানগাছ হয়েছে, ভারে নুয়ে পড়েছে ধানশীষ।
ধান পাকার মৌসুমে যাদের জমি আছে সবাই মিলে পালাক্রমে পাহারা দেয় ঐ জমিনগুলো। হাতে থাকে কেরোসিনের মশাল, দেশীয় রামদা ও লাঠি। এত আয়োজন চুরের জন্য না, বন্য হাতির জন্য। সন্ধ্যে নামার আগে একসাথে ৬০-৮০ টা হাতি দল বেঁধে ঝাপিয়ে পড়ে এসব ধানক্ষেতে। সারা রাত ধরে চলে তাণ্ডব লীলা। এদের হাত থেকে ধান বাঁচানোর একমাত্র উপায় কাছে যেয়ে এদের তাড়ানো। আগুন এরা ভয় পায়, তবে দেখে মনে হল আগুন দেখে হাতিরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আগে পটকা ফুটালেও দৌড়ে পালাত, এখন বন্দুকের গুলির শব্দ লাগে এদের তাড়াতে। হাতিকে মারাও যায় না শাস্তির ভয়ে, আইনে ১২ বছরের কারাদণ্ডের সাথে ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডেরও বিধান আছে। অপর দিকে আছে কিছু মানুষের কান্না, স্বপ্নভঙ্গ ও হতাশা।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতিতে নতুন ব্যায়ভার এই কেরোসিনের মশাল প্রতিদিনের খরচের তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাঙার জীবনে। সাথে আছে নির্ঘুম রাত ও কিছুটা বিরহ ব্যথা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও হাতির পাল এলো, গুগ্রাসে গিলতে শুরু করলো কাঁচা পাকা ধান। আকাশে তখন আবছা চাঁদের আলো ছিলো, বাতাসে স্বপ্ন পোড়ার গন্ধ ছিলো। একহাতে রামদা অন্যহাতে মশালটা নিয়ে চিৎকার করতে করতে খুব কাছে চলে গেল রাঙা। পেছনে তার স্বপ্নের সংসার, বাতাসে স্বপ্ন পোড়ার গন্ধ, সামনে মৃত্যু অথবা বিজয়!
হিংস্র হাতির দলের একটা হাতি প্রথমে রাঙাকে শুর দিয়ে ধরে একটা আছার দিল, তারপর ফুটবলের মতো খেললো কিছুক্ষন। সবশেষে পায়ের নিচে দিল। অন্য মানুষের চিৎকারে ততক্ষনে হাতির পাল বিদায় নিলো। মাটি নরম ছিলো, রাঙাকে মাটির ভেতর থেকে বের করা হয়। সে এখনো জীবিত আছে। এরকম ঘটনা প্রতি বছর ঘটে। আমাদের ঐ ছোট এলাকাতে এভাবে গত বছর চারজন মারা গেছে। তারা ধান বাঁচাবে নাকি প্রাণ - উত্তরটা বোধকরি তারা নিজেরাও ঠিকভাবে জানে না! ধান কাটা শেষ হলে হাতিরা বাড়ি ঘর ভাঙচুর করে। পাহাড়ে বন্য হাতি এক আতঙ্কের নাম।
সীমান্তে হত্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, আমরা প্রতিবাদ করছি। কিন্তু এই পরোক্ষ হত্যা সম্পর্কে আমরা কমই জানি। ধানের মৌসুমে ইন্ডিয়ানরা এই হাতির পালগুলোকে কাঁটা তাদের বেড়া খুলে বাংলাদেশের ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। এতে করে তাদের ফসলগুলো রক্ষা পায়। ধান খেয়ে, মানুষ মেরে, বাড়িঘর ভেঙে এই হাতিগুলো আবার ফিরে যায়। ইন্ডিয়ান মানুষগুলোর মত এই হাতিগুলোও আগ্রাসী ও স্বার্থপর। আমাদের পাহাড়ে যে হাতিগুলো আছে সেসব ভারতীয় দাদা। খাবে দাবে আর ল্যাদায়ে যাবে। কষ্টের ধানের বিনিময়ে আমরা সে ল্যাদা নিয়ে খুশি হব। নদী ভরাট করে রাস্তা দিবো, বিনিময়ে পাবো শুধু কালো ধোয়া। নদীগুলো শুকিয়ে কাঠ হবে একে একে, তৃষ্ণার্ত বাঙালী চৌচির মাঠে মথায় হাত রেখে প্রহর গুনবে বর্ষনের।
ভারতীয় আগ্রাসন ও শোষন বন্ধ হোক আজই। বন্ধ করতেই হবে। সোচ্চার হও বাঙালী প্রত্যেকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



