রাত ১০টায় পৌঁছে দেখি বাসার দরোজায় এক বৃদ্ধ ভিখিরি টিনের বাটি এগিয়ে ধরে দাড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতর দিকে সবাই ভিড় করে আছে। আমি ভিখিরি এবং বাসার লোকজনের ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে শুনলাম,বুড়ো বলছে-মুরগি,গরুর মাংশ সে খেতে পারে না।ইলিশ,চিংড়ি মাছও না। ভেতর থেকে একজন বলছেন,আপনি ১০ মিনিট পাশের মসজিদে গিয়ে আল্লা-বিল্লা করে আসেন,এর মধ্যে ভাত হয়ে যাবে । তখন ডিম আর ডাল দিয়ে খেতে পারবেন। শার্ট খুলতে খুলতে বুড়োকে বলতে শুনলাম,আজ ইফতারিতে বুট খাইছি। পেটের মইধ্যে লড়ে-অজম অয় নাই।
মহা মুসিবত!এরা সবাই ভিখিরিটি খাবে না তারপরও জোর করছে কেন!?পরক্ষণে মনে হলো ,যা ইচ্ছে করুক। রোজার মাসে খাওয়ালে সোয়াব হবে এই আশায় হয়তো সাধছে এমন। তবু ইচ্ছে হলো সাহেব সাহেব ভিখিরিটিকে একটু দেখি!মুরগির মাংশ,গরুর মাংশ,ইলিশ মাছ,চিংড়ি মাছ খায় না!তাহলে তিনি কি খান!চাইনিজ নাকি!?মুখ বাড়িয়ে দেখি বাটিটা নিচু হয়ে মেঝেতে রেখে হাত উচিয়ে দেখাচ্ছেন,সন্ধ্যায় কতগুলো বুট খেয়েছেন তিনি। একটা বুদ্ধি পেলাম লোকটাকে ভাগানোর। দশ টাকা বের করে এগিয়ে দিলে বুড়ো চট জলদি হাতে নিয়েই লুঙ্গির খুচিতে লুকিয়ে ফেলে চলে যেতে উদ্যত হলো। বাসার এক পুন্নি লোভি বললেন,তাহলে কাল এসে খেয়ে যান।
ভিখিরি সাহেবের পাল্টা প্রশ্ন: কোনসুম?
পুন্নিলোভি:ইফতারির পর এসে খেয়ে যাইয়েন।
ভিখিরি সাহেব: না,কাল পারুম না।পরশু আমু।
বুড়োর ত্যাদরামিতে বিরক্তি কমাতে,ভীড়ের ফোকড় দিয়ে একটা ছবি তুললাম ফোন সেটের ক্যামেরা দিয়ে। লাইটের ক্যাচালের কারণে,ঝাপসা আসছে। ভুয়া ফোন।ভাল ফোনে কত সুন্দর ছবি ওঠে!
আমার মনে হলো,একেক দিন একেক এলাকায় যায় বলে কাল এখানে আসতে রাজি হলো না ব্যাটা। কাল যেখানে যাবে সেখানেও তো কেউ না কেউ খেতে দিবে!অহেতুক এখানে খেতে এসে নগদ কামাই গচ্ছা দিবে নাকে ভিখিরি সাহেব! সন্দেহ জাগছে,পরশুও আসবে না।পরে এসে বলবে,সেনি আসতে পারিনি...পার্মানেন্ট ডোনার বানিয়ে ফেলার সম্ভাবনাই বেশি।যাউগ্গা,এতো চিন্তা কেন করছি খামোখা। যত অকল্যাণ চিন্তা।একটা ভিখিরির বিরুদ্ধে চিন্তা করতে লজ্জা করে না!? নিজেকে নিজে ধমক লাগিয়ে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করি। ভিখিরি আমার দুচোখের যম। মনে মায়া মমতা কম বলে নয়। ওদের দুর্ব্যবহারের জন্য। সার্ক ফোয়ারার কাছে জ্যামের মধ্যে এক ভিখিরি মহিলা হাত বাড়ালে , মাফ করুন বলার সঙ্গে সঙ্গে সে চিৎকার করে গলা ফুলিয়ে অভিশাপ দেয়ার মতো করে বেশ কয়েক বার বললো তোর উপর আল্লার গজব পড়ুক!আশে পাশের ট্যাক্সি- গাড়িতে বসে থাকা কয়েক জন শব্দ করেই হেসে ফেলল। ভিক্ষুকটি আমাকে অভিষাপ দেয়ার সময় হাত নেড়েছে হাত ঢিল ছোড়ার মতো করে।খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। এমন হলে কে না ভয় পেয়ে যাবে। আসলেই যদি গজব মানে অলৌকিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই । ভিক্ষুকদের মধ্যে কারো কারো নাকি আধ্যাতিক ক্ষমতা থাকে। ভিখারিনি আমাকে গালিগালাজ করে সামনের সিএনজির যাত্রীর সামনে দাড়ানো মাত্রই সে দুই টাকা দিয়ে দিল। আমার সন্দেহ আমাকে ধমক দিয়েছে বলে সে ইজ্জত বাঁচাতে টাকা দিয়েছে। পান্থপথ দিয়ে যাওয়ার সময় এক সিগনালে পড়লে ১০/১২ জন ভিখিড়ির মুখোমুখি হতে হয়। সে দিন এক ভিখিরিকে টাকা নেই বলে বিদায় করার পর আমার সিএনজি চালক তাকে ডেকে উদাস ভঙ্গিতে ২ টাকা দিয়ে দিল। অফিসের সামনে ভিক্ষা করে এক ভিখিরিকে এক সন্ধ্যায় নিজ চোখে দেখেছি রিক্সায় চেপে বিড়ি ফুকতে ফুকতে যাচ্ছে। কাওরান বাজার এলাকায় ভিক্ষা করে রফিক ও তার মা।রফিক তখন অনেক ছোট ,৮/১০ বছর আগে। আমি আর আমার বন্ধু চা খাচ্ছিলাম বাংলামোটর ,তখনকার ভোরের কাগজ অফিসের পাশের একটা রেস্টুরেন্টে।পাশের টেবিল থেকে রফিকের খাইলাম!স্যূপ খেয়ে এই তৃপ্তির ঢেকুরে ফিরে তাকালে বন্ধুটি আঁতলামি আলোচনা শুরু করেছিল,দেখ আমাদের চেয়ে ওদের জীবনীশক্তি অনেক বেশি।ইত্যাদি।এখন কখনো দেখি রফিক ও তার মা দুজন দুই যাত্রীর কাছে পৃথক ভিক্ষা চায়।যাক এক সাথে হয়ে দুজন চাইলে পৃথক পৃথক দুজনকেতো কেউ ভিক্ষা দেয় না।এটা ওদের বিজনেস পলিসি। একদম অমানুষতো হয়ে যাইনি,ভিক্ষা যে দেই না তাও না।কিন্তু,দুর থেকে ভিক্ষুক দেখলেই মনের উপর একটা চাপ তৈরি হয়। কি বলবো,ঠিক করে রাখি।ভিখিরিরা সবচে জব্দ হয় দেখলাম,যদি বলি, এই মাত্র একজনকে দিয়ে দিলাম- বললে।
না হবে না। আমার অবস্থাও ভিখিরি সাহেবের মতো। রোজা না রেখেও সন্ধ্যায় পাল্লা দিয়ে ইফতারির নামে আবোল তাবোল খেয়ে খুব হাসফাঁস লাগছে এখন। এর মধ্যে ভিখিরি সাহেবের বলা বুটও ছিল।!মনে হচ্ছে পেটের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। যেমন গিলেছি ওরকমই ভেতরে ঢুকে ঘুমিয়ে আছে।ইটের কনার মতো।একটা নিমো খেতে পারলে হতো। বিজ্ঞাপনে বলে শুনি,নিমো দেয় ঝটপট আরাম!আচ্ছা, বুড়োটা মাছ-মাংস খায় না কেন!?ওমা,মিলটা কোথায়!?লোকটার সঙ্গে আমার কোথায় যেন মিল আছে!কোথায়?সন্ধ্যায় বুট খাওয়া? না... না...না...চোখের সামনে রোদের ঢেউ নাচতে শুরু করেছে। লোকটা আছে না চলে গেছে এতোক্ষণে!উপরের তলাগুলোতে ভিক্ষার জন্য যাবে নিশ্চয়ই!বাসার একজনকে বললাম বুড়োটাকে ডেকে আনতো আরো দুটো টাকা দেই! সে,‘নাই ,চলে গেছে’...নয় ছয় বলে যেতে না চাইলেও কিছুক্ষণ পর ডেকে নিয়ে আসলো।
তাকে ভেতরে ডেকে বসালাম।
:চা খাবেন?
:না।চা খাই না।
ওহ,আচ্ছা!খচখচানিটা দুর হয়েছে!আমিও কব্জি আর কনুইর মাঝা মাঝি শার্টের হাতা গুটিয়ে রাখি এই ভিক্ষুক সাহেবের হাতা মুড়ানোর সঙ্গে আমার মুড়ানোর খুব মিল।এটা লক্ষ্য করে,নিজের বিশ্লেষনি ক্ষমতার ক্রমহ্রাসের উদ্বেগজনক হার লক্ষ হরে মেজাজ খিচড়ে গেল।
`তুমি জানো না আমার বেস্ট ফ্রেন্ড অসুস্থ্য হয়ে বিছানায় পড়ে আছে !আমি এক বিন্দু শান্তিতে নাই কতো দিন! আমার অবস্থা পাগলের মতো,এ সময় অন্তত একটু সহমর্মী হও!'...পাল্টা ধমক খেলাম নিজের ভেতর থেকে।
জিঙ্গেস করলাম চাচা নাম কি?কই থাকেন?আপনি মাছ-মাংস খান না কেন?
বুড়োর মুখটায় কেমন যেন একটা ভাব আছে।ঠিক ভিক্ষুকদের মতো নয়।একবার মনে হলো গোয়েন্দা নাকি?ওরা তো বিভিন্ন বেশ ধরে ঘুরে বেড়ায়! নাকি ডাকাত দলের সদস্য। নাকি মলম পার্টির লোক। আরে ধ্যাত! মলম পার্টি থাকবে রাস্তায়,হঠাৎ চোখে ওসব মেখে লাইফের বারোটা বাজিয়ে দেবে। অজ্ঞান পার্টি হলে ওদের ডাকাত হিসেবেই ধরা উচিত।নিষ্ঠুরতায় আর কাজের ধরনে প্রায় কাছাকাছি দু পক্ষই। মাথাতো পুরা গেছে!এই অবস্থা কেন!? লোকটাকে আবার কেন ডেকে আনলাম? আমার মতো দেখতে কি যেন,আচ্ছা সেটা হলো এক রকম হাতা গুটাই আর?আর হলো, লোকটা ভিখারি হয়েও মাছ –মাংস খায় না কেন?এসব ভাবতে ভাবতে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় কটা ছবি তুললাম লোকটার। নিজের উপর সাময়িক অনাস্থা চলে আসলো যখন খেয়াল করলাম লোকটা এক নাগারে কথা বলে যাচ্ছে আমি প্রথম প্রশ্ন করার পর থেকে।সন্ধ্যায় এতোগুলি বুট দিছে।কইছি অজম হয় না।মাতা চক্কর মারে।জন্ডিজের লাইগ্গা কিছু খাইতে পারি না।বাইত যাই না দুই বছর।একটা পোলা আছে।মাঝে মাঝে আইয়ে।যা পারে দেই।
মনে হয় লোকটা আমার মন গলানোর চেষ্টা করছে।এক নাগারে কথা বলেই যাচ্ছে। ভিক্ষুকদের এই জিনিসটার জন্যই খুব মায়া লাগে নিজের দুঃখগুলোর কথা বার বার বলতে হয় তাদের।
:চাচা পানি খাবেন?
বুড়োকে থামানোর চেষ্টা করি। আর মনে হয় তার পানি খাওয়া দরকার।মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে।
:ঠান্ডা পানি হইলে একটু খাওয়া যায়।
আব্দুর রশিদ তার বাড়ির নাম বলতে চায় না। ‘
‘গফরগাঁও থেকেও বিশ টাকা ভাড়া।অনেক দুর । আগে সিধাইল আছিলাম।কিশোরগঞ্জের।
:এখন কই থাকেন?
কাওরান বাজার মজ্জিদের সামনের রাস্তায়। এই যে গামছা।
হাতের প্লাস্টিকের ব্যগটা খুলে একটা গামছা বের করে দেখায় আব্দুর রশিদ।
:গামছা পাইততা শুই।আড়তের মইধ্যে গোছল করি।কিছু খাইতে পারি না।জন্ডিজ।মাথা ঘোরে।মজ্জিদের সামনের কবিরাজ কইছে মাছ,মাংস,ইলিশ মাছ খাইতো না। খুব খারাপ দিকে মোড় নিছে।মাথা ঘোরে।
:তার মানে ডেইলি স্টারের উল্টা পাশের মসজিদের সামনে থাকেন?চাচা,ঠিকাছে।আপনি যান।পরশু আসবেন সন্ধ্যায়।
আরো কয় টাকা দেই আব্দুর রশিদকে। রশিদ মিয়ার বয়স কতো হবে?৪৫?৫০?না .বুঝা যায় না। গোঁফ কামিয়ে ফেলেছেন।দাড়ি-চুলও বোধ হয় নিজেই কাটেন। কোন ছাট নেই ওগুলোর।শার্টের বুতাম ওপর নিচ লাগিয়েছেন একটা।ছোট বেলায় এরকম হতো আমারও।
আব্দুর রশিদ চলে যাওয়ার পর,খালি মনে হচ্ছে জন্ডিজ হলে অনেক রেস্টে থাকতে হয়। বিষুদ্ধ পানি খেতে হয়।ঠান্ডা তরল...আব্দুর রশিদ লোকটা কি মারা যাবে? সে কিছু খেতে পারে না।
আগামী পরশু সে যদি আসে কি করা যায়?এক বন্ধু ছিল,টোকাইদের ২০/৫০ টাকা দিয়ে শেয়ারে ফুল ব্যবসা করতো।ধানমন্ডি লেক পাড়।কয়েকটা বিপনি বিতান। সে বলছিল অনেক লাভ হতো নাকি!ফিফটি-ফিফটি।গরিবরা নাকি খুব বিশ্বস্ত হয়!আর মেরে নিলেতো ২০/৫০ টাকাই!এমন একটা ব্যবসার প্রস্তাব দিব নাকি?নাহ,ফার্ম গেটে এক ভিখারির কথা পত্রিকায় ছেপেছিল,দৈনিক ৫/৭শটাকা পায়।আব্দুর রশিদ ২শ টাকাওকি পায় না?নিশ্চয়ই পায়।না হয় ভিক্ষা হরে পোষায়!২০/৫০ এর যায়গায় ২শ/৫শ বা ১ দুই হাজার হলে?একটা ব্যবসা করবে না আব্দুর রশিদ?না পোষাবে না!১হাজার টাকা পুজিতে ব্যবসা হয়?আচ্ছা ভাই মাফ করোতো মাফ করো।
নিজেকে নিজে মাফ করার সময় আসে। আমি পুরাতন সিটিসেল লাইনটা দিতে পারি। ফিরে আসে আব্দুর রশিদ। সে ভিক্ষা করার সময় গলায়,‘ ফোন করা যায় ’-লেখা ঝুলিয়ে রাখলে কেউ ফোন করতে চাইতেও পারে। লজ্জার কি আছে?ঢাকায় কত জন কত ঘাপ খোঁজে জীবীকার। ভিখারিদের আবার লজ্জা কি?দেখি আব্দুর রশিদকে জিঙ্গেস করে।ফোনটা একবারেই দিয়ে দেব!আমাকে ফেরত দেয়ার দরকার নেই।লাভের ভাগও চাই না। সে যদি ওটা বেঁচেও দেয় দু পয়সা সেখান থেকেও পেতে পারে।
এখন আসলেই বিরক্ত লাগছে।সকাল থেকে রাজ্যের কাজ।ওগুলো কি আব্দুর রশিদ করে দিবে!!এখন বাজে ৪টা ৭। তার মানে জাগতে দেরি,যেতে দেরি,না কাল মোটা মুটি আমাকেও রশিদ সাহেবের সঙ্গে নামতে হবে! আরেকটা করা যায়, ফোনটা রশিদ ফকিরকে যদি আসলেই দেই পরিচিতদের মধ্যে নাম্ভারটা দিয়ে দেয়া যায়। কেউ চাইলে হেল্প করবে।
আসলেই এই ফকিরের মোহ থেকে মুক্তি দরকার এখন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

