
বাঘের জন্য মায়া লাগবে এটা আজ সকালের আগে জীবনে কোন দিন টের পাইনি। ছোট বেলা থেকে নানী-দাদীরা ভয় ধরানোসব গল্প শুনিয়ে, বদনাম করে বাঘের নামে স্থায়ী একটা সমীহ ভাব তৈরী করে রেখেছে। পরে পচাব্দী গাঁজি আর জিম করবেটসহ কার কার শিকার কাহিনী শুনে-টুনে বাঘের উপর শ্রদ্ধা-ভীতি বেড়েছে বইতো কমেনি। তাই এর আগে বাঘের নাম শুনলে ভয়ই লেগেছে সব সময়। সঙ্গে মেজাজ খারাপ যোগ হয়েছে খুলনা বাঘেরহাট, সাতক্ষীরায় বিভিন্ন সময় বাঘের আঘাতে নাক মুখ নাই লোকজন দেখে। মামা, তুমি সুন্দরবনে চড়ে বেড়াচ্ছো ভালো কথা ,হরিণ ইত্যাদি সাবার করছো তা লোকালয়ে উৎপাত কেনো!এটা প্রচণ্ড প্রতাপশালী বনের রাজার ফাৎড়ামি মনে হয়েছে।
কিন্তু আজ সকালে কিছু ভিডিও-ফটোক দেখে বাঘের প্রতি মনোভাব আমুল পরিবর্তন হয়ে গেছে।


ছবিগুলো গত বেস্পতিবার মানে গত ২ জুলাই সাতক্ষীরায় পিটিয়ে ও কুপিয়ে মারা বাঘ ও তার খুনিদের।
ছবিতে দেখা যায়, একটা কুড়েঘরের মধ্যে আটকা পড়েছে মিঞাসাব। দাঁত খিচিয়ে দু একবার ভয় দেখানোর চেষ্টা করলেও তার নিজের আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব নিষ্প্রভ চোখের

দিশেহারা দৃষ্টিতে। অনেকটা বিপদে পড়া বুড়োদের মতো। চিন্তিত। ইতোমধ্যে কি এক উপায়ে তার গলায় মোটা রশি গলিয়ে শ্বাস রোধ করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রশির অপর প্রান্ত গাছের উপর দিয়ে টানিয়ে কপিকলের মতো টানছে ২০/৩০ জন। আর তাই ঘিরে কয়েকশো গ্রামবাসী গগন বিদারী উল্লসিত চিৎকার করছে। তাদের হাতে লাঠি সোটা,দা,বল্লম,কুড়াল। দড়ির টানে বাঘটি মাঝে মাঝে শূন্যে ঝুলে যাচ্ছে। এক সময় মুখে লাল গামছা বেঁধে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় ছটফটানো বাঘটির কাছাকাছি এগিয়ে গেল এক যুবক।


তার দৃঢ় মুষ্ঠিতে উদ্যত ধারালো কুড়াল। নিজেকে ধারালো নখড়ের বাইরে রেখে ওটির কণ্ঠনালি বরাবর পর পর তিনটি আঘাত। আঘাতে নিষ্ঠুর আদিম ক্ষিপ্রতা !

হঠাৎ করেই নিথর হয়ে যায় হলদেটে ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
গ্রামবাসীর বিজয় উল্লাস আরো তীব্র হয়।

জীবিত অবস্থায় এগিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছিল যারা তাদের কেউ কেউ মৃত বাঘটির উপর লাঠি বল্লমের আঘাতে বীরত্ব প্রকাশ করলো।


এরপর কাদার ভেতর মৃত বাঘের দেহ টেনে উল্লাস হলো আরো কিছুক্ষণ। মন খারাপ হয়ে গেল। বন বিভাগের লোকজন অষুধ মাখা তীর ছুড়ে বাঘটা সরিয়ে নিতে পারতো না। গ্রামবাসীর না হয় হিসেব সোজা, তাদের মারে বাঘ তারাও মেরেছে। এতোদিনে বন বিভাগ এই সচেতনতা গ্রামবাসীর মধ্যে গড়ে তুলতে পারলো না? এর আগে একটা বাঘ মারা হয়েছে প্রায় ১৬ ঘন্টা পর। বন বিভাগের লোকজন কাঠচুরির ব্যস্ততা ভুলে এসব নিয়ে একটুও সময় দিবে না? কেউ দেখার নেই!
২০০৪ সালের বাঘ শুমারীর তথ্যে অনেকে আঁতকে উঠেছিলেন। এই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ থেকে চালানো এই শুমারীর ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছিল একই বছরের ৯ অক্টোবর । এতে বলা হয়েছিল, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘ আছে মাত্র ৪শ ১৯ টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ। আর বাচ্চা বাঘের সংখ্যা ২১ টি। মেরে ধরে এখন কয়টা আছে কে জানে!
যা হোক বাঘের বংশ নির্বংশ হওয়া নিয়ে আমার উদ্বেগ কখনো ছিল না,চিন্তিত ও ছিলাম না । কিন্তু যারা বাঘ , পশু - পক্ষী নিয়ে কাজ করেন তাদের আরো ক্যাচাল, গ্যাঞ্জাম করা দরকার অনুভব হয়।
বাঘটার করুণ মৃত্যুর ছবি দেখে আজ দিন ভর মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। আর সব সমস্যা , দুঃখ ইত্যাদি ভুলে খালি নিহত বাঘটার মুখ আর ভয় দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা মনে পরছে!

বাধ্য হয়ে পরাজিত বাঘের জন্য এই লেখাটা লেখলাম বসে বসে। দুঃখ কষ্ট ভাগাভাগির জন্য, কোন নালিশ জানানোর জন্য ব্লগের কথাই দেখি মনে পরে সবার আগে! পুরা ডিজিটাল ব্যপার!!!!
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০১০ রাত ৩:১২