আহা কি অদ্ভুত ব্যাপার ! একই যায়গায় এক মাসের মধ্যে তার সঙ্গে দুই বার দেখা। অবশ্য দেখেছি শুধু আমি। সে চোখ তুলে তাকায় নি। নিজ মনে হেঁটে চলে গেছে। দেখলেও চিনতো না নিশ্চিত। আমাকে কি আর মনে রেখেছে ? দরকার কি তার !
সেই অর্থে আনন্দ পাগলের সঙ্গে আমার ঘনিষ্টতা কখনোই ছিল না। যতটা কিছু ঘনিষ্ট বন্ধুর সঙ্গে ছিল। সব সময়ই তাকে সন্দেহ আর ভয় মিশ্রিত কৌতুহলের সঙ্গে দেখেছি। এলাকায় কিভাবে কিভাবে তার নাম আনন্দ পাগল হলো জানি না। কখনো কাউকে নিজের নাম বলেছে এমন শোনা যায় নি।এলাকায় তার হঠাৎ আগমনে বেশ রহস্যের জন্ম হয়েছিল।
ছোট বেলায় কখনো লোকজনকে দেখতাম তাকে খাবার দেয়ার ছুঁতো করে কথা বের করার চেষ্টা করতো। কিন্তু সে চিঁহি চিঁহি মসৃন গলায় হিন্দি উর্দু ধরনের কি কি শব্দে কি বলতো কারো সাধ্য ছিলনা। তখন সন্দেহ আরো গাঢ় হতো সবার। বেটা গোয়েন্দা না হয়ে যায় না। তথ্য পাচার করছে। কোন বড় ঘটনা ঘটলে দেখা যাবে কাঁধের ঝোলা থেকে পিস্তল বের করে পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে গুলি করছে ।
এক রাতে বাস স্ট্যাণ্ড ঘুমিয়ে থাকার সময় তার ময়লা ঝোলাটি চুরির ঘটনাও ঘটেছিল। পরের কয়েক দিন আনন্দ পাগলাকে খুব মন খারাপ করে ছিল। উধাও ছিল মাস খানেক । অনেকে বলাবলি করেছিল , কারো আবার কোন ক্ষতি হয় কিনা! এমন মানুষদের অনেক আধ্যাতিক ক্ষমতা থাকে।
ন‘টার কিছু আগে আগে এই রাস্তা ধরে যাই। শেরাটন হোটেলের উল্টো দিকের বাঁকে। যে রাস্তাটা মন্ত্রী পাড়ার দিকে ঢুকলো ; তার মাথায় আজো দেখলাম আনন্দ পাগল হেঁটে সব্জিবাগানের রাস্তার দিকে যাচ্ছে। খুব দ্রুত,ব্যস্ত সমস্ত। মুখ ভরা হাসি চিকমিক করছে। যেন যেতে খুব ভালো লাগছে । বা যেখানে যাবে , পৌঁছলে খুব ভালো লাগবে। মাস খানেক আগে কাকতালীয় ভাবে একই যায়গায় দেখেছিলাম। তার চির-পরিচিত নিশ্চিন্ত মুখভরা হাসি আমাকে একটা ভুলে থাকা সুখের সময় ফেরত দিয়ে গেল !
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দৌঁড়ে উপর দিকে একটা লাফ মেরে মেরে রাস্তা এগিয়ে নিচ্ছিল আনন্দ। আমার চিনতে মোটেও দেরি হয়নি। সম্বিৎ ফিরে চালককে থামাতে বলতে বলতে অনেক পেছনে চলে যায়। যেই দ্রুত হাঁটছে তাকে পেতে দৌঁড়াতে হতো। এই মোড়ে হঠাৎ করে থামাও যায়না। মোড় এড়িয়ে অনেক সামনে থামতে হয়। আজও এমনটিই ঘটলো। কালো গলা কাটা গেঞ্জি , নিচের দিকে গুটানো প্যান্ট। খালি পা । মুখে সব সময়ের মতো লম্বা দাড়ি। একই রকম দেখতে। ছোট বেলায় যেমন দেখেছি। শুধু ঝোলাটা সঙ্গে নেই।
আনন্দকে এর আগে কবে দেখেছি মনে করতে পারছি না। বারো বছরতো বটেই,পনের? কুড়ি ? হতে পারে! এর মাঝে একটি দিনের জন্যও তাকে মনে না করে থাকলাম কি করে !
ছয়-সাত বছর আগে বন্ধু ইমরান মাঝি একটা ছোট কাগজ দিয়েছিল। নাম, ঘাসফড়িং। অন্য বন্ধু মহিবুল্লাহ শাওয়াল’র সম্পাদনায় একটা ছোট কাগজ। সঙ্গে রোদের মতো চিকচিকে কয়েকজন,মঞ্জু,রিপন,সুমন। চমকে উঠেছিলাম প্রচ্ছদ দেখে। আনন্দ পাগলের হাতের লেখা দিয়ে প্রচ্ছদ করেছে ওরা।
প্রথম বার দেখা হওয়ার পর আনন্দকে চেনে এমন বন্ধুদের ফোন করে জানিয়েছিলাম।অল্প খুঁজে কাগজটাও পেয়ে গেলাম।
সে মনে হয় কিছু নির্দিষ্ট রাস্তায় বার বার ঘুরছে। শাহবাগ- বাংলামোটর- ফার্ম গেইট-মহাখালী-মগবাজার-মৎস্য ভবন শাহবাগ বা এমন কিছু। আগেও এমন করতো । বিভিন্ন এলাকা ঘুরে থানা শহরে এসে কিছু দিন থাকতো।
আনন্দ পাগল ঢাকা এসেছে কেন ! যতবারই মনে পড়ছে সে এখন ঢাকায় খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে অনাত্মীয় এই রুক্ষ্ম শহরে প্রিয় একজন বন্ধু আছে কাছাকাছি। আবার কবে দেখা
হবে ? এবার দেখা হলে কথা বলবো। কি কথা বলবো !
কি পরিচয় দেব নিজের ? কি সাধ্য ও শক্তিতে তাকে কাছে রাখা যায় ...
আর কোন দিন দেখা না হলেও আনন্দকে যাতে ভুলে না যাই নিজের প্রানের শশ্রুষার স্বার্থে এজন্য তাকে ঘিরে থাকা কিছু স্মৃতি লিখে রাখলাম।
২৬/০৬/১০ ইং

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




