১৫০০ কোটি টাকার ঋণ প্রস্তাব
ভারতের চেয়েও বেশি সুদ চাইল চীন
ট্রানজিটের অবকাঠামো নির্মাণে ভারত সরকার ১০০ কোটি ডলার ঋণের যে সুদ চেয়েছিল, এবার মাত্র ২১ কোটি ডলার ঋণ দিতে এর চেয়েও বেশি সুদ চেয়েছে চীন। পাশাপাশি ভারতের ঋণে কোনো ব্যবস্থাপনা ফি না থাকলেও চীন এই ফি দাবি করেছে। ভারত ও চীনের কমিটমেন্ট ফি কাছাকাছি হলেও প্রকল্পের আওতায় প্রায় সব পণ্যই চীন থেকে কেনার প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। এ ছাড়া সময়মতো ঋণ পরিশোধ নিয়ে রয়েছে বেশ কড়াকড়ি। আর এই ঋণের চুক্তি হবে বাংলাদেশ সরকার ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে। চীন বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে থ্রি জি প্রযুক্তি চালু এবং বর্তমানে টু পয়েন্ট ফাইভ জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য এসব শর্তযুক্ত ঋণের খসড়া চুক্তিপত্র বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ ধরনের চড়া সুদের ঋণ প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. কে এস মুরশিদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যদিও এটা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট নয়, এর পরও আমার কাছে এটা সে রকমই মনে হচ্ছে। ২ শতাংশ সুদে বন্ধুপ্রতিম দেশের এ ঋণ প্রস্তাবটি আমার কাছে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন (টাইট) মনে হচ্ছে। কোনোভাবেই তা সহজ (সফট) ঋণ নয়। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ আমাদের ঋণ দেয়
সর্বোচ্চ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে।’ তিনি জানান, টেলিযোগাযোগ খাতে প্রযুক্তি সংযোজন প্রয়োজন। তবে ঋণ নেওয়ার আগে দেখতে হবে এর বোঝা নেওয়া অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু লাভজনক।
টেলিযোগাযোগ খাতের উদ্যোক্তা ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেনও একে অসম প্রতিযোগিতার ঋণ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এটা নামে সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট না হলেও চরিত্রে সে রকমই। এসব ঋণ চড়া সুদের হয় এবং ঋণদানকারী দেশ থেকেই পণ্য কিনতে হয়। ফলে কোনো প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকে না।
এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মোশারফ হোসেন ভুইয়ার মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে চীনের খসড়া ঋণ চুক্তিপত্রের কথা স্বীকার করে বলেন, চীন প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট নামে টেলিযোগাযোগ খাতে যে ঋণ প্রস্তাব দিয়েছে তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। খসড়া চুক্তিপত্রটি গত ১৭ জানুয়ারি অর্থ সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হয়েছে মতামতের জন্য। তাঁদের মতামত পেলেই এ সম্পর্কে সরকারের অবস্থান চূড়ান্ত করা যাবে।
গত বছর ভারত বাংলাদেশকে পৌনে দুই শতাংশ সুদে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়ে কঠোর সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিরোধী দল বিএনপি ভারতের ঋণের শর্তকে দেশের স্বার্থবিরোধী অভিহিত করে এর প্রতিবাদে সোচ্চার ছিল। তবে সম্প্রতি টেলিযোগাযোগ খাতে উন্নত প্রযুক্তি সংযোজনের জন্য চীন বাংলাদেশকে যে ‘প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট’ নামে ২১ কোটি ১০ লাখ ডলার বা এক হাজার ৪৭৭ কোটি টাকার ঋণ প্রস্তাব দিয়েছে তা টাকার অঙ্কে ভারতের ঋণের চেয়ে পাঁচগুণ ছোট হলেও সুদের হারে বেশ কঠিন। এই ঋণ পেতে হলে বাংলাদেশকে দুই শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার শর্ত দিয়েছে দেশটি।
চীনের পাঠানো খসড়া ঋণ চুক্তিপত্র থেকে আরো জানা গেছে, ভারতের মতো এই ঋণ চুক্তিও চীন সরকারের সঙ্গে হবে না। চুক্তি হবে বাংলাদেশ সরকার ও এক্সিম ব্যাংক অব চীনের মধ্যে। এই ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ১৬ বছর। তবে বাংলাদেশ চাইলে আরো চার বছর গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হবে। ঋণের পুরোটাই প্রকল্প কাজে খরচ করতে হবে। বাংলাদেশকে অবশ্যই প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশ খরচ করতে হবে চীনের পণ্য ও সেবা কেনার খাতে।
বাংলাদেশ ঋণের ব্যবস্থাপনা ফি হিসাবে চীনকে চার লাখ ২২ হাজার ডলার দেবে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে এবং তা অবশ্যই ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় করার আগেই। ব্যবস্থাপনা ফি ছাড়াও বাংলাদেশকে বছরে দুইবার ২০ শতাংশ হারে কমিটমেন্ট ফি দিতে হবে। এই ফি চুক্তি কার্যকরের ৩০ দিনের মধ্যেই প্রযোজ্য হবে এবং ৩৬০ দিনে বছর ধরে দৈনিক ভিত্তিতে হিসাব করা হবে। ঋণের সুদ পরিশোধের দিনই কমিটমেন্ট ফিও পরিশোধ করতে হবে। প্রকল্প কাজে ব্যবহার করার জন্য চীন থেকে যেসব পণ্য ও সেবা আমদানি করা হবে, তা সব ধরনের শুল্কমুক্ত হতে হবে অথবা তা বাংলাদেশকেই পরিশোধ করতে হবে।
ঋণের প্রথম কিস্তি পরিশোধের পর বাংলাদেশ যদি চীনের শর্তগুলো সঠিকভাবে পালন করেছে মনে হয়, তখনই কেবল পরের কিস্তি ছাড় করা হবে। ঋণের কিস্তি পরিশোধে কিছুটা বিলম্ব হলে তা আগেই লিখিতভাবে জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে চীন রাজি হওয়া সাপেক্ষে মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। তবে ঋণের গ্রেস পিরিয়ড কোনোভাবেই বাড়ানো হবে না। বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় দলিলাদি যথাসময়ে সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে বা দলিলপত্রে কোনো ধরনে ত্রুটি থাকলে চীন ঋণ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারবে। কিস্তি পরিশোধের নির্ধারিত তারিখ কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যাবে না। নির্ধারিত তারিখে যদি ব্যাংক বন্ধ থাকে তবে অবশ্যই পরবর্তী ব্যাংক খোলার দিন তা পরিশোধ করতে হবে। পুরো ঋণ পরিশোধ করতে হবে ৩২টি সমান কিস্তিতে।
Click This Link
dailykalerkantho

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



