"বিশেষ এক ধরনের জটিল ব্যাধি আছে যা শুধুমাত্র লেখকদের আক্রমন করে। লেখকরা তাদের লেখালিখি জীবনে কয়েকবার এই ব্যাধিতে ধরাশায়ী হন। পৃথিবীতে এমন কোন লেখক পাওয়া যাবে না- যিনি জীবনে একবারও এই জটিল অসুখের শিকার হন নি। মেটিরিয়া মেডিকায় এই অসুখের বিবরণ থাকা উচিত ছিল কিন্তু নেই! লেখকদের নিয়ে কে ভাবে?
যাই হোক, অসুখটার ইংরেজী নাম "Writers' Block” বাংলায় " লেখক বন্ধ্যা রোগ" বলা যেতে পারে। এই রোগের লক্ষণ এরকম- হঠাৎ কোনো একদিন লেখকের মাথা শূন্য হয়ে যায়। তিনি লিখতে পারেন না। গল্প-কবিতা, লুল, টেকি তো দুরে থাকুক স্বরে 'অ'-ও না। তিনি অভ্যাসমত রোজ কাগজ-কলম নিয়ে বসেন এবং কাগজের ধবধবে শাদা পাতার কোনায় কোনায় ফুল-লতাপাতা আঁকার চেষ্টা করেন। কাপের পর কাপ চা ও সিগারেট খান। একসময় উঠে পড়েন। এটা হচ্ছে রোগের প্রাথমিক পর্যায়।
রোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে লেখক ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত হন। সারা রাত জোগে থাকেন মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। অকারণে রাগারাগি করতে থাকেন-যেমন, “চা এত গরম কেন?” (চা গরম হবারই কথা। লেখক আইসটি খেতে চাইলে ভিন্ন কথা) “সবাই এত উঁচু গলায় কথা বলছৈ কেন?” (সবাই স্বাভাবিক গলাতেই কথা বলছে। এরচে' নিচু গলায় বললে কানাকানি করতে হয়।) “এই গ্লাসে করে আমাকে পানি কেন দেয়া হল?” (লেখক জীবনে কখনো কোন গ্লাসে পানি দেয়া হয়েছে তা নিয়ে মাথা ঘামান নি। ব্যাধিগ্রস্থ হবার পর গ্লাস নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। কী রকম গ্লাসে পানি দেয়া হলে তিনি খুশি হবেন তাও তিনি খোলাসা করে বলছেন না।)
কোনো কোনো পাঠক হয়তো ভাবছেন আমি "Writers' Block” নামক রোগটা নিয়ে রসিকতা করছি। তাঁদের জ্ঞ্যাতার্থে জানাচ্ছি, এই পৃথিবীর অনেক লেখক (খ্যাত এবং অখ্যাত) এই ভয়াবহ অসুখের শেষ পর্যায়ে এসে আত্নহত্যা করেছেন। এই মুহূর্তে যাঁদের নাম মনে পড়ছে তাঁরা হলেন-
কবি মায়াকোভক্সি (রাশিয়া)
ঔপন্যাসিক হেমিংওয়ে (নোবেল প্রাইজ বিজয়ী, আমেরিকা)
ঔপন্যাসিক কাওয়াবাতা (নোবেল প্রাইজ বিজয়ী, জাপানি)
কবি জীবনানন্দ দাশ (বাংলাদেশ)
জীবন সংহারক রাইটার্স ব্লকের কোনো ওষুধ নেই। এন্টিবায়োটিক বা সালফা ড্রাগ কাজ করে না, তবে সিমটোমেটিক চিকিৎসার বিধান আছে। সিমটোমেটিক চিকিৎসায় লেখককে অতি দ্রুত তিনি যে পরিবেশে বাস করেন সেখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তাঁর প্রিয়জনরা সবাই তাঁর আশেপাশে থাকবেন, তবে লেখালেখি বিষয়ে কেউ তাঁর সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারবেন না। লেখকের সঙ্গে কোনো বিষয়েই কেউ তর্কে যাবেন না। তিনি যা বলবেন সবাই 'গোপাল বড়ই সুবোধ বালকে'র মতো তাতে সায় দেবে।
আমার লেখক ব্লক দূর করার ব্যবস্থা হলো। প্রধান উদ্যোগী অন্যপ্রকাশের মাজহার। আমার অসুখে সে-ই সবচে' ক্ষতিগ্রস্থ। আমি বই না লিখলে সে ছাপবে কী? সামনেই একুশের বইমেলা!
মাজাহার এক সকালবেলায় অনেক ভনিতার শেষে বলল, আমি জানি আপনি দেশের বাইরে যেতে চান না। চলুন না ঘুরে আসি। আপনি লেখালেখি করতে পারছেন না। এটা কোনো ব্যাপার না। সারা জীবন লেখালেখি করতে হবে এমন তাও না। এক জীবনে যা লিখেছেন যথেষ্ট। এমনি একটু ঘুরে আসা। আপনি হ্যাঁ বললে খুশি হব।
আমি বললাম, হ্যাঁ।
আনন্দে মাজহারের কালো মুখ বেগুনী হয়ে গেল। হিসাব মতো তার মুখে বত্রিশটা দাঁত থাকার কথা, সে কীভাবে যেন চল্লিশটা দাঁত বের করে হেসে ফেলল।
হুমায়ূন ভাই, কোথায় যেতে চান বলুন- ইন্দোনেশিয়ার বালি, মালেশিয়ার জেনটিং, থাইল্যান্ডের পাতায়া/ফুকেট, মরিশাস, মালদ্বীপ।
আমি বললাম ড্রাগন দেখতে ইচ্ছা করছে। চীনে যাব।
মাজহারের মুখের ঔজ্জ্বল্য সামান্য কমল। সে আমতা আমতা করে বলল, চীনে এখন ভয়ংকর ঠান্ডা। টেম্পারেচার শূন্যেরও নিচে....
আমি আগের চেয়েও গম্ভীর গলায় বললাম, চীন।
মাজহারের মনে পড়ল রাইটার্স ব্লকের রোগীর সব কথায় সায় দিতে হয়। সে বলল, অবশ্যই চীন। আমরা গরম দেশের মানুষ। ঠান্ডার কী জানি না। হাতে কলমে ঠান্ডা শেখার মধ্যেও মজা আছে।"
উঠোন পেরিয়ে দুই পা- হুমায়ূন আহমেদ।
রাইটার্স ব্লকের মত ব্লগারস ব্লক নামেও একটা রোগ আছে। যার আক্রমনে অসংখ্য জনপ্রিয়- শক্তিমান ব্লগার হারিয়ে গেছেন। আমি শক্তিমানও নই, জনপ্রিয়ও নই। কিন্তু যেহেতু রোগ ব্যাধি সবার জন্যই সমান তাই আমিও ব্লগারস ব্লকে আক্রান্ত। গত একমাসে আমার মাথায় একটা পোস্টের আইডিয়া সামান্য সময়ের জন্যও আসে নি। অদূর ভবিষ্যতে আসবে এমন কোন সম্ভাবনাও দেখছি না। তাই, সামু কর্তৃপক্ষের কাছে আকূল আবেদন (নিজেরই চাওয়া লাগছে, তারা তো আর নিজে থেকে আমাকে বলবে না। আমি কোথাকার কে!!!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



