somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাকে লেখা ইউরোপ প্রবাসি এক তরুনের চিঠি।

১৫ ই এপ্রিল, ২০১১ বিকাল ৫:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মা,
আমার সালাম নিও। আশা করি অনেক ভাল আছ মা। তোমার আদরের এই রিপনও ভাল আছে। জানো মা,আজকে আমাদের এখানে মা দিবস...সবাই কেক, অনেক অনেক উপহার নিয়ে যাচ্ছে তার মায়ের কাছে ।এক সাদা আমার কাছ থেকে ফুল কিনতে কিনতে বলল, ‘তোমার মা নেই?’ উত্তরে হ্যাঁ শুনে আমাকে এক ইউরো এমনি দিয়ে বলল... ‘মা এর জন্যে চকলেট কিনে নিয়ে যেও’...আমি সেটা আমার মানিব্যাগের গোপন জায়গায় রেখে দিছি...বাংলাদেশে গেলে তোমাকে দিব।

মা, জান তো...যেই স্বপ্ন নিয়ে আমি এখানে আসছি...তার ছিটেফোটাও আমরা পাইনি।আমাদের দিন রাত কেটে যায় কখন পুলিশ ধরে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবে এই ভয়ে। তোমার এই রিপনকে তুমি কত যত্নে রাখতা...সব সময় পরিস্কার কাপড়,বিছানার চাদর...বালিশ,কাঁথা। আমরা ঠিক গরীব হয়ত ছিলাম না...কিন্তু যেই আসত বাড়ি ঘর দেখে ভাবত বেসরকারী স্কুলের শিক্ষক হলে কি হবে আমার বাপের অনেক টাকা!! মা গো, আমি চিঠি লেখছি একটা চার্চের আলোয় বসে...মাঝে মাঝে আমি আব্বার দৈন্য দশা কে গালাগালি করতাম...একতা চার্যার কিনে দিতে পারনা...কয় টাকা বেতন পাও? আর তুমি আমাকে শাসন করে বলে উঠতা ‘বিদ্যাসাগর পড়ে নাই রাস্তার আলোয়?পরিস্কার শুনতাম শ্বাস কষ্টের রুগী আব্বার রাগে বুকের ঘড় ঘড় শব্দ।আজকে তোমার ছেলে বিদ্যাসাগর হয়ে গেছে মা; সবাই যখন যিশু কে বলছেন... ‘প্রভু...আমি খুব ব্যাস্ত থাকি...তাই মা কে দেখতে পারি না ঠিক মত...এজন্যে বৃদ্ধাশ্রমে রাখছি...প্রভু তুমি ওকে সুস্থ রেখ...ভাল রেখ’...আর আমি এই সুযোগে তোমাকে চিঠি লিখছি; প্রার্থনার এই সময়টা পুলিশে সাহস করে না ধরার। আরও বড় ব্যাপার আলো পাব কোথায়?

মা গো, কত দিন ভাত খাই না...তোমার হাতের রান্না খেতে যে ইচ্ছাটাই না করে মা। মাঝে মাঝে স্বপ্নে তোমার হাতের লাউ শাক ভাজি,পটল এর ঝোল আর ইলিশ মাছ খাই...আর ঘুম ভাংলেই বার্গার আর স্বাদহীন শব্জি। আমি বোধহয় মা তোমার কাছে গেলে একবারে পাঁচ কেজি চালের ভাত খাব...এই কি খাওয়া যায় বল মা?ভাতের ক্ষিধা কি বার্গারে মিটে?তবু খেতে হবেই...এখানে তোমাকে কেউ দেখবে না...কাজ কর খাও না করলে না খেয়ে পরে থাক। মা জানো, একবার আমার খুব জ্বর আসল...সাথের ওরা খুব সাহায্য করল...দিনের বিভিন্ন সময় সুযোগ পাইলেই আমার কাছে আসত...খাবার দিয়ে যেত। হঠাৎ ওরা আসা বন্ধ করে দিল...রাতেও আসেনা ঘুমের জন্যে...এদিকে আমার অবস্থা খুবই খারাপ...কাছে টাকা নাই...ক্ষিধায় আমি পাগলের মত হয়ে গেছি...শেষে না পেরে রাস্তায় দাঁড়ালাম;বাইরে তখন কি ঠান্ডা জানো মা? আমরা যেখানে সামান্য শীতে ঘর থেকে বের হইনা সেখানে এখানকার তাপমাত্রা -৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস...তো যাই হোক একটা গাড়ি আমার সামনে থামতেই আমি পাগলের মত বললাম, ‘স্যার, আমি আপনার গাড়িটা মুছে দেই?...আমাকে কিছু টাকা দিয়েন...গাড়ি থেকে এক বাংলাদেশি বড় ভাই বের হয়ে বললেন... ‘তুমি বাংলাদেশি না?’ আমি উনাকে উত্তর দেবার আগেই মাথা ঘুরে পরে গেলাম। উনি আমার চিকিৎসা করালেন...তিন দিন কাছে রেখে সুস্থ করলেন...শেষে আসার দিন হাতে কিছু ইউরো দিয়ে বললেন, ‘কেন আসো এভাবে?...এত কষ্ট করে বাঁচা খুব কঠিন ভাই...পারলে দেশে যাও’

মা, ২০০৮-০৯ সালের কথা...সবে ইণ্টারমিডিয়েটের রেজাল্ট দিছে...সারা দেশে হৈ হৈ পরে গেল বৃটেনে লোক নিচ্ছে। যারাই লাইনে দাঁড়াচ্ছে তাদেরি ভিসা দিয়ে দিচ্ছে...।আমি অবাকও হলাম সাথে খুশিও হলাম...এইবার একটা সুযোগ আসছে দেশের বাইরে যাবার। খুবই সোজা ব্যাপার বিএসবি নামক প্রতিষ্ঠান এর অফিসে যাও এবং কাগজ পত্র জমা দিলেই সাতদিনের মাথায় জানায় দিল আপনি ভর্তি হতে পারবেন বৃটেনের অমুক কলেজে...তো কি করতে হবে?১০লক্ষ টাকা জমা দেন ভিসা হয়ে যাবে।আব্বা শুনে খুব বকা দিলেন...এত টাকা তিনি কোথায় পাবেন? তার সম্পত্তি বলতে মাঠের জমি আর বাড়ির জায়গাটা।আমি নাছোড় বান্দা...টাকা দিতেই হবে নাহলে খাব না।শেষে তোমার অনুরোধে আব্বা মাঠের জমি বিক্রি করে দিলেন আর সুদে লোন নিলেন... হয়ে গেল টাকা জোগাড়। আমার এক বড় ভাই বললেন বৃটেন যাওয়া যখন বরিশালে যাওয়া থেকেও সোজা হয়ে গেছে তাহলে কোথাও কোন গ্যাঞ্জাম আছে...আমি যেন ভেবে দেখি টাকা দেবার আগে। আমার মাথায় তখন বেকহ্যামের দেশে যাবার ভুত। তবুও এক বার জিজ্ঞাসা করে নিলাম ভাই কোন ঝামেলায় পরবো না তো?মা জান তো, আল্লাহ্ পাক শয়তানের মুখের ভাষা মিষ্টি করেছেন...সে সহজেই লোভের ফাঁদে ফেলতে পারে। লোকটা আমার কথাকে একটা হাসি দিয়ে উড়ায় দিল। মেডিকেল চেক আপ করাতে হবে...মেডিনোভা ছাড়া হবে না...তো চেক আপ করালাম...মিলে গেল ছাড়পত্র...হাতে এসে গেল স্বপ্নের ভিসা।

আব্বা আমাকে শেষ বারের মত বুঝতে বললেন...এই পড়ালেখার যোগ্যতায় আমার যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে কিনা? বেসরকারী স্কুলের বাবার কথা কে তখন মুর্খের মত লাগল...মনে মনে বলেই ফেললাম সারাটা জিবন এত বেশি না বুঝলে আজকে আমাদের এত কষ্ট হতো না।তোমাদের চোখের পানিকে দাম না দিয়ে পাড়ি জমালাম ভিনদেশে।এখানে নেমেই চোখে অন্ধকার দেখালাম...যারা লোভ দেখায়ছিল চাকরি আর টাকার কোন সমস্যা নাই...তাদের কথা ছিল সম্পুর্ন মিথ্যা।এখানে প্রথমত সেই সব কলেজ আমাদের দেশের নিম্ন মানের কলেজের থেকেও নিম্ন মানের...আর চাকরি নেই কোথাও। যেখানেই যাই ‘নো ভ্যাকেন্সি’র বোর্ড ঝুলছে। যা টাকা নিয়ে আসছিলাম সব শেষ হয়ে গেল...আমার মাথায় হাত...খাব কি আর থাকব কোথায়? কিছুদিন পর এদেশের সরকার এর খেয়াল হল আমরা বেআইনি কায়দায় আসছি তাই আমদের দেশে পাঠায় দেয়া হবে আর সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল ধরপাকড় আর দেশে ফেরতের পালা। আমরা পালায় পালায় দিন কাটান শুরু করলাম...এখনও এমনি আছি।

মা, আমার আর ভাল লাগেনা।কত দিন এভাবে মসজিদ, মন্দির আর চার্চে দিন কাটাব? আমার খুব ঘুম পায় মা...আমি ঘুমাতে পারিনা পুলিশের ভয়ে...যদি একটু ঘুমের ভুলে ধরে দেশে পাঠায় দেয়? মা গো, যে দেশে তুষারে মানুষ ঘরে হিটার জ্বালায় রাখে...বাসার গরম পানি দিয়ে গোসল করে সেখানে আমরা পেটের ধান্দায় জমে যাওয়া ঠান্ডায় গাড়ি ধুই, রাস্তায় ফুল বা অন্যান্য জিনিষ ফেরি করি। আমরা বড় কষ্টে আছি মা...আমাদের কথা দেশের মিডিয়াতে আসেনা...আসেনা বড় বড় পেপারে...আমরাও যে মা ক্ষুদ্র অংকের রেমিটেন্স দিচ্ছি মা। মা গো, আমি কিভাবে দেশে ফেরত যাব মা?আমার যে দেখতে ইচ্ছা হয় তোমাকে...কি জবাব দেব আব্বাকে?কিভাবে শোধ দেবেন তিনি লোনের টাকা?আমি যে মা কিছুই দিতে পারলাম না। আমাদের দেখার কেউ নাই মা...মাঝেমাঝে দেশের বড় ভাই আপারা আমাদের দুঃখের কথা শুনেন...কিছু সাহায্য দেন...মাঝেমাঝে বকাও দেন কেন আসছো এভাবে?...কিন্তু সাময়িক এই সাহায্যই আমাদের মাঝেমাঝে বাঁচায় রাখে।

মা গো, আমি ফিরে আসতে পারি যেকোন দিন...আমাকে তুমি বুকে টেনে নিবানা? আমি যে খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি মা...আমার পেটে ক্ষিধা আর চোখে সব হারানোর পানি। দেশের থেকে আসার সময় খুব গান শুনতাম মা...কনার গাওয়া সেই গানটাই শুনি এখন...,

আমার সামনেও নেই পিছেও নেই...
সঙ্গীও নেই কেউ...
কেন নিজের সাথে নিজে রইলাম...
জানে নদীর ঢেউ
আমার কথাও নেই...কাছেও নেই...
স্বপ্নে নেইতো কেউ...
আমার মনের কথা মনে রইল...
বইল নদীর ঢেউ...

ভাল থেক মা। আমি আব্বার সব স্বপ্ন পুরন করে দেব…আমার জন্যে দোয়া করো।

ইতি,
তোমার রিপন,
০৩-০৪-২০১১ ইং।

মাকে লেখা ইউরোপ প্রবাসি এক তরুনের চিঠি।
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×