ওপরের ছবিটা '০৭-এর ফ্রেন্ডশিপ ডে-তে পেয়েছিলাম সম্ভবতঃ আমার facebook বা tagged -এর profile-এ। বেশ interesting ! এখন ব্লগ-এর সব বন্ধুদের দিচ্ছি, বের করে ফেলেন অর্থটা !
আজকে আমার একটা বন্ধুর গল্প শোনাবো। আমি বাবা-মা'র বড় মেয়ে, আমার বাবা-মা দু'জনই ডাক্তার। আমি আমার জীবনের প্রথম প্রায় ৬-৭ বছর বেশ নিঃসঙ্গ সময় কাটিয়েছি। বাবা-মা দু'জনেই খুব ব্যস্ত থাকতো, আমি বাসায় থাকতাম দাদুর সাথে। আমার বাবা-মা দু'জন-ই খুব চেষ্টা করতো সময় দিতে কিন্তু কাজের চাপের জন্য সবসময় তা হয়ে উঠতো না। আর মা-বাবা-র ফিল্ড প্রোগ্রাম থাকলে (সাধারনতঃ ঢাকার বাইরে হয় ফিল্ড প্রোগ্রাম) নানুর বাসায় থাকতাম। আমার নানুর বাসা-ও ঢাকায়। যখনকার কথা বলছি তখন আমার বয়স ৫ এর বেশি হবে না। আমার মা-বাবা অনেকদিনের জন্য টাঙ্গাইল-এর একটা জায়গা (নাগরপুর) যাবে। আমি তখন আমার বাবা-মা কে বললাম আমাকে নিয়ে যেতেই হবে, আমার ভ্যাকেশন চলছিল স্কুলে। মা-বাবা ভাবলো নিয়েই যাই মেয়েটাকে। সেটা আমার প্রথম গ্রামে যাওয়া। রাস্তায় গরু দেখলেও মুগ্ধ, গাছ দেখলেও মুগ্ধ ...এমন হলো আমার অবস্থা!
উপজেলাটা বেশ ছোটখাট, ছিমছাম। আমরা ওখানকার গভর্ণমেন্ট কোয়ার্টার্স -এ থাকতাম। মা-বাবার প্রায় কয়েক মাসের মতো থাকতে হবে। আমার জায়গাটা খুব পছন্দ হলো। বাসার সামনে বিশাল মাঠ, যতদূর চোখ যায় খালি সবুজ রং আর আকাশ। মাঠটা পাড় হলেই গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ওখানে বাবা-মা-র কাজের জায়গা। ওখানে আমাকে দেখার মতো কেউ না থাকায় মা আমাকে ওপর তলার আন্টির কাছে রেখে যেত। আন্টি প্রথম দিন জিজ্ঞেস করলেন,"তোমরা কয় ভাইবোন?" আমি নিষ্পাপ মুখে বললাম," একটু গুনে বলি তোমাকে?" তারপর হিসাব-নিকাশ করে বললাম, "আমরা সাত ভাই-বোন" ( আমি নানু-দাদু দুই সাইডের সব কাজিনদের গুনে বলে দিয়েছি ! )। মা কে ঐদিন আন্টি বেশ অবাক হয়ে বলেছিলেন, "আপনার এতোগুলা বাচ্চা! দেখলে বোঝাই যায় না! " মা তো চরম অপ্রস্তুত! যাই হোক! আমার খেলার সঙ্গি হলো আন্টির ছোট ছেলে, ইমণ (কাল্পনিক নাম ব্যবহার করছি) যে আমার চে এক বছরের বড়। সে আমাকে নিয়ে বিকাল বেলা মাঠে গেল আর বাকি ছেলেদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, "শুনো সবাই, এই মেয়ে ঢাকা থেকে আসছে। কিছুই চিনে না। আমরা ওকে ঘুরিয়ে দেখাবো গ্রাম। কেউ ওকে মারতে পারবা না, খেলায় ভুল করলেও মারা যাবে না। মেয়েরা মারলে ব্যথা বেশি পায়। মা তাই মারতে না করে দিয়েছে।" আমি এমন সব অভিভাবক পেয়ে খুব খুশি। সে আমাকে দীঘি দেখাতে নিয়ে গেলো, শিমুল ফুল দিয়ে মালা বানানো শিখলাম, বৌ-ছি, গোল্লা-কুমির সহ নানা ধরনের খেলা শিখলাম। আমি চরম খুশি! মা-বাবা সন্ধ্যায় আসলে তাদের নতুন জ্ঞান এর কাহিনী শুনাই। তারা আতঙ্কিত! মেয়ে কিসব ছেলেদের সাথে ঘুরে বেরাচ্ছে! দীঘি-তে ডুবে গেলে! আন্টি আস্বস্ত করলেন যে কিছুই হবে না। বাবা বললো, থাক মেয়েটা একটু নিজের মতো। কালকে থেকে একটা পিয়ন থাকবে ওদের সাথে। তারপর আবার আমাদের ঘুরাঘুরি চলতেই থাকলো। ইমনের সাইকেল করে ঘুরে বেরাই, চরম ব্যতিক্রমি জীবন! ঢাকার সাথে তুলনাও করতে পারি না। এরপর ইমন বিশেষ কিছু কাজের পার্টনার বানালো আমাকে। যেমন, আমি আন্টিকে পাহাড়া দিতাম অথবা কথা বলে ব্যস্ত রাখতাম আর ও আন্টির লুকিয়ে রাখা চকলেট খুজে বের করতো অথবা যা খেতে দেয়া হয়নি ঐটা চুরি করে আনতো। আনার পর ভাগাভাগি করে খেয়ে ফেলতাম। বেশ নিষ্পাপ আর অসাধারণ বন্ধুত্ব হয়েছিল। ইমন আমাকে অনেক উপদেশ-ও দিত আবার খুব বড়বড় ভাব ধরে থাকতো সারাক্ষণ... " বুঝলা, ঢাকায় থাকো ভাল কিন্তু মা বলেছে ঢাকা ভাল না, ছেলেধরা আছে। তারা মেয়েদের-ও ধরে। এজন্য ঢাকায় খুব সাবধানে থাকবা। ঢাকায় খারাপ পুলিশ বেশি। এজন্য-ই ঢাকার পুলিশরা নীল রং-এর ড্রেস পড়ে।" আমি নানা ধরনের জ্ঞান পেয়ে শংকিত থাকতাম আর ভাবতাম ..."ইশ্! এখানেই থাকতে পারতাম!"।
প্রায় একমাস শেষ হলে আমার ঢাকা আসার সময় চলে আসে। আমি আসার সময় ইমন-কে বলেছিলাম, তুমি অবশ্যই ঢাকায় আসবা, আমার বাসায়। আমরা ঘুরবো। অনেক মজা করবো দেখো। ইমন-ও খুব মাথা নেড়ে বলেছিল...হুমম, পূজার বন্ধেই আসবো দেখো! আমার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়েছিল অনেকক্ষন! কখনোই আর ঘুরা হয় নি ওকে নিয়ে। কোন পূজার বন্ধেই আসে নি আমার বন্ধুটা। তারপর আমি বড় হয়ে গেলাম আর ইমন আস্তে আস্তে হারিয়ে গেলো। শুধু আমার মনের ভেতরে গেঁথে থাকলো আমার প্রথম শুদ্ধ বন্ধুত্বের অনুভূতিটা !!!
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৩:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



