ভেসে ভেসে সময় ধরছি... মাথার ভার রেখে ভাসতে হচ্ছে... বাকি অংশ বেশ হালকা...মাথা নিয়ে ঝামেলা; বৌলিং প্যানেলে ছুড়ে দেয়া বলগুলোর মতো শক্ত ভার এলোমেলো চুল মোড়ানো মাথাটা বার বার মাধ্যাকর্ষনের ডাকে শো শো করে নিচে নামছে... জড়াচ্ছে... গীটারের তারে পেঁচিয়ে থাকা আঙুলের মতো পেঁচিয়ে যাচ্ছে তাতে কেমন অস্বচ্ছ্ব টুংটাং-ও টের পাচ্ছি! সেই গীটারের জলতরঙ্গের সুরে গতি ছুঁতে চেষ্টা করছি...
ভাসতে ভাসতে চায়ের স্টপটার সামনে থামি... "ঐ নেহা! পা কেটেছে নাকি?" ধূসর ধূলো মাখা দশ-বারোর নেহা ফ্যাকাশে হাসে..."স্যান্ডেলটা হারামির পুত রাজু বেইচ্যা দিসে আপু। হটেলের দাড়োয়ানে তাড়া দিসে, খালি পায়ে ছুট দিসি, টিন লাইগ্যা পাও কাটসে" ..."কাছে আয়, হকে গিয়ে ব্যান্ডেজ লাগাই"... "লাভ নাই আপু, আবার তাড়াইলে আবারো কাটবো, লান্চ করান আপু... দিস পুওর চাইল্ড ইজ ভেরি হাংরি...গিভ হার থার্টি বাকস্"... "পা ঠিক করে লান্চ করাবো চল"... " আপু, পাও তো আরো কাটবো, সবসময় আপনারেও পাবো না, একসময় আমাগো সবেই ভুইলা যায়, আর হারামি গুলার জইন্য হাত-পাও-শরীল কাইট্যা শেষ...ফাকঅফ দোজ এলিট এ্যাসেস!"... "গালি শিখসিস ভাল-ই"... "এলিট এ্যাসরা শিখাইসে আপু... লেট'স হ্যাভ আ লান্চ!"
এরপর এবার এক কাল ঝকঝকে পুকুরবন্দী জল মায়ামায়া চোখে তাকায়, ডাকে, তার প্রাসাদ খুলে ভেতরে নেয়... রাস্তা পার হই... মায়াবৃক্ষের কোলে ছেড়ে দেই নিজেকে একটু... ভাসমান ক্লান্তি আসে... আবসাদ আসে... অভিমান আসে। হারিয়ে ফেলা হাহাকার আর একটা অস্তিত্ব আসে। অস্তিত্বটার ওপর খুব রাগ হয়... সাথে নেই কেনো ? একা একা কেন আমি এই ভাসমান পৃথিবীতে ? সব ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে... ব্যস্ততার চাদর খুলে দীঘির গহীনে টেনে আনতে ইচ্ছা করে অস্তিত্বটাকে... রাগ বা হতাশায় মুড়ে ছুড়ে দেই ওকে...
আরেকটু এগোই... আবার ভাসি... একটা ছোট্ট কুকুর ভেসে আসে পাতাল থেকে... কুঁইকুঁই করে নিষেধ করে সামনে যেতে... আমি জেদ চেপে এগোই... হাতের স্পর্শে সরাই ছোট্ট ভয়ার্ত কুকুরটাকে... ওর মাথায় হাত বুলাই... পাশের বাসার আন্টির ছোট্ট পালক নেয়া ছেলেটার ফোঁপানো চিৎকার ভেসে আসে... "ভয় পাচ্ছো অয়ন ??" ... "মা! আমাকে বের হতে দাও, আর করবো না বললাম" ... "মা না অয়ন! আমি আপু" ... "আপি! মাকে বুঝাও, বলো আর করবো না! আমাকে অন্ধকারে আটকে দিয়েছে আপি... ভয় পাই আপি! অনেক ভয় পাই"... নকল-হীন মা-টার জন্য ঘৃণা ছুড়ে দেই, অয়নকে খুলে দিয়ে বলি... "আর কেঁদো না! চলো আলোতে যাই, কক্ষণো অন্ধকার বন্দী করতে পারবে না"... আমাকে জড়িয়ে প্রবল আনন্দে ফোঁপায় অয়ন! বুকে চেপে ধরি ছোট্ট আত্মাটাকে!!!
এবার দীঘির শেষ প্রান্তে আসি...হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে থাকা আরিয়ানাকে দেখি ... আমার সাথে ভাসতে চায় ও! কিন্তু কে যেন পাখা বা শরীরের অনেক জায়গা কেটে দিয়েছে ওর... ক্ষত থেকে ঝড়ে যাচ্ছে ফোয়ারার মতো রক্ত! ... "কিভাবে হলো!?!" ... ওরা আমার বাবা-মা-ভাইকে মেরে ফেলেছে দিদি... "ওরা তো আমার নিজের অংশ ছিল... দেখো না আমার সারা শরীর রক্তাক্ত! একটা একটা অংশ শেষ হয়ে গেছে... কি অসহ্য ব্যথা!!! এখন বাঁচি কি করে দিদি?"
নাঃ! এবার দৌড়ে দীঘি পাড় হয়ে সেই দরজায় আসি... হাঁপাতে হাঁপাতে পাখা মেলি... ভাসমান সত্য মুছে দেই... একটু শ্বাস নেই... বের হয়ে যাই পাতালপ্রাসাদ থেকে...
মাথার যন্ত্রণা বাড়ছে... গরম ভাপে মুড়ে যাচ্ছে চারপাশ... শরীর অবশ হয়ে গেছে ... কিছুতেই আর ভাসতে পারছি না... ভারী ধোঁয়ায় আটকে গেছে পাখা, নাকি আরিয়ানার মতও ছিড়ে গেছে আমার পাখাটাও!... অসম্ভব প্রিয় স্পর্শে ধরমর করে পরে গেলাম বাস্তবে... "এতোক্ষণে ঘাম ছাড়ছে! কমে যাচ্ছে জ্বর! খাইয়ে দেই এখন ?" ... বিহ্বল আমি একটু ঘোরতপ্ত হই ..."মা! আবার জ্বর এনে দাও!"... প্রিয় হাতটা সরে গেল..."আরেকটু পর আসছি! এখনো প্রলাপ বকছো!" পাগলের মতো হাতড়ে বেড়াই টুকরো টুকরো সময়গুলো... গলে যাওয়া শিশিরের মতো উধাও হয় নেহা... অয়ন... আরিয়ানা... শুধু সময়ের সাথে মিশে থাকে সেই অস্তিত্বটা!!!
[ছবিসূত্র : surreal arts ]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৪:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


