আজ বিকাল ৫.৫০মিনিট সময়টা অন্যদের কাছে যে কারণেই স্মরণীয় হোক না কেন, আমি এই সময়টিকে দেখছি তিনদিনব্যাপী এক স্বপ্নযাত্রার গন্তব্যে পৌছানোর মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে- ঠিক এই সময়েই আমার প্রথম টেলিফিল্ম @মনীষী সিনড্রোম এর শুটিংয়ের শেষ আনুষ্ঠানিকতাটা ক্যামেরাবন্দী হল। এখন আমি অনেক নির্ভার, কিছুটা চিন্তিত, তবুও সবকিছুর যোজন-বিয়োজনে মনজুড়ে অফুরান প্রশান্তি।
৭ই সেপ্টেম্বর: ১ম দিনের শুটিং
আগের দিন রাতেই ক্যামেরাম্যান ও অন্যান্য যন্ত্রীদের সঙ্গের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল সকাল আটটায় আমরা ক্যামেরা চালু করবো। বাঙালির আটটা মানে হেসেখেলে ১০টা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু আমাদের সম্ভাব্যতাকে ভুল প্রমাণিত করে সেই আটটা যে দুপুর ১২টা হয়ে গেল, এর পেছনে কলাকুশলী বা যন্ত্রী, কারোরই বিন্দুমাত্র দায় নেই, পুরো দায়টাই বুয়েটের প্রশাসনিক জটিলতার। লাইব্রেরী যেহেতু স্পর্শকাতর জায়গা, তাই এখানে শুটিং করার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়া ছিল, কিন্তু শহীদ মিনারের মত উন্মুক্ত জায়গায় কাজ করতেও যে অনুমতি প্রয়োজন এই বোধটি আমাদের ছিলনা। সব সেটআপ শেষে কাজ করার পূর্বমুহূর্তে দারোয়ান এসে উপস্থিত; অনুমতিপত্র ছাড়া কোন কাজ করা চলবেনা। বাধ্য হয়ে তৎক্ষণাৎ অনুমতি নিতে ছুটতে হয় ডিএসডব্লিউ অফিসে; সেখানে গিয়ে জুনিয়র ফারুক ঝামেলা আরও বাড়িয়ে দেয় কথার ভুল প্যাচে। ডিএসডব্লিউ স্যারের প্রশ্নের জবাবে সে উত্তর দেয়- আমাদের একটা সাংস্কৃতিক দল আছে, সেই দল থেকেই নাটকটা করছি। কিন্তু বুয়েটের কোন রেজিস্টার্ড সাংস্কৃতিক দলের সাথে আমাদের সংস্রব দেখাতে না পারায় কোন অনুমতি পাওয়া যায়না। নানান ছোটাছুটি করতে গিয়ে বেলা বারোটা বেজে গেলে বুঝতে পারি, আজ অন্তত ক্যাম্পাসে কাজ করা সম্ভব নয়, তাই লোকেশন ও স্ক্রিপ্ট বদলে ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ শুরু করি।
আমার ইউনিটের কেউই এর আগে টিভি ক্যামেরার সামনে অভিনয় করেনি, এই অনভিজ্ঞতাটা ধরা পড়ে প্রথম দৃশ্যের শুটিংয়ের সময়ই। দৃশ্যটা ছিল ৩বন্ধু আড্ডা দিচ্ছে, একটুপর ৪র্থ জন এসে যোগ দেবে, তার খানিকবাদে চাওয়ালা আসবে, এরকম। শুধুমাত্র এই এন্ট্রিটা ঠিক করতেই অনেকগুলো শট চলে গেছে, আর অভিনয়ে ভুলভাল কাটছিলই না, ২ মিনিটের একটা দৃশ্যকে পারফেক্ট করতে প্রায় ৫০ মিনিট অতিবাহিত হয়েছে, এরপর সবার ক্লোজড শট তো ছিলই। এই প্রথম দৃশ্যটাতেই যা একটু সমস্যা ছিল, ধীরে ধীরে অভ্যস্ততা গড়ে উঠে।
ক্যামেরা জিনিসটার প্রতি বোধহয় মানুষের একটা অযৌক্তিক কৌতূহল আছে; নিজেদের এলাকাতে শুটিং করছি, অথচ মানুষের ভীড় দেখে মনে হচ্ছিল আমরা বোধহয় বাইরে থেকে শুটিং করতে এসেছি। বিশেষ করে, সঙ্গীতা আপুর একটা সিঙ্গেল দৃশ্য ছিল সনি স্মৃতিফলকের সামনে; আবালবৃদ্ধবনিতা বলতে যা বোঝায়, মোটামুটি সেরকমই একটা ভীড় জমে গিয়েছিল। আর, আমি নিজে বুয়েটে ততটা পরিচিত মুখ না হওয়ায় অনেকেই ভাবছিল আমি বোধহয় কোন প্রতিষ্ঠিত পরিচালক। কেউ কেউ উৎসাহের আতিশয্যে এসে নিজেদের অভিনয প্রতিভার কথা জানাচ্ছিল, যাতে আমার পরের নাটকে তাদের অনন্ত ছোট্ট একটা চরিত্র হলেও দেই। এধরনের কথা-বার্তায় আমার গম্ভীর মুখেও এক পশলা বৃষ্টির মধ্যে হাসি চলে এসেছিল।
বিকেলের দিকে চুন্নু ভাইয়ের একটা দৃশ্য ছিল, নাটকে তার প্রেয়সীর সঙ্গে। শুটিং দেখতে তার হবু স্ত্রীও চলে এসেছিলেন; সেই অস্বস্তি থেকেই কিনা জানিনা, তিনি চরিত্রের ভেতর ঢুকতেই পারছিলেননা, বারবার দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল ক্যামেরার দিকে। ওদিকে দৃশ্যটা হচ্ছিল বুয়েট ওভারব্রীজে, প্রখর রোদে সিলভি দরদর করে ঘামছিল, যদিও এর নিজের অভিনয় হচ্ছিল আপ টু দ্য মার্ক। অনেকবার করার পরেও ঠিকমত হচ্ছিল না বলে বাধ্য হয়ে এই দৃশ্যটা দায়সারাভাবেই নেয়া হল, সারা নাটকে এই দৃশ্যটা নিয়ে তাই আমার খচখচানি রয়েই গেছে।
প্রথম দিনে নানা ঝামেলায় সেভাবে ছবি তোলা হয়নি, তাই কোন ছবি শেয়ার করতে পারছিনা।
৮ই সেপ্টেম্বর: ২য় দিনের শুটিং
দিনটা শুরুই হযেছে ঝামেলা দিয়ে। এদিনটা সব ইনডোর শুটিংয়ের জন্য নির্ধারিত ছিল; লোকেমন ছিল মিরপুর, চুন্নুভাইয়ের আত্মীয়ের বাসা।সে উদ্দেশ্যে সবাই প্রথমে যাই লালমাটিয়া, চুন্নুভাইয়ের অফিসে, সেখানে একটা দৃশ্য টেক করে, মিরপুরে যাব। কিন্তু রাতারাতি সবকিছু বদলে গেছে, এটা জানলাম সেখানে গিয়ে। সেই বাসাটা পাওয়া যাবেনা, এমনকি নাটকে মা-বাবার চরিত্রে অভিনয়ে সম্মত হওয়া তার খালা-খালুও মত পাল্টেছেন। চরম হতাশায় মেজাজ আরও চরম খারাপ হল; এতদিনের প্রচেষ্টার নাটকটাই ভন্ডুল হযে যা্ছে, এমন একটা প্রস্তুতি নেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলনা সেসময়। তখনই বন্ধু অমিত এগিয়ে আসে, ওর বাসাটা রাত বারোটা পর্যন্ত আমাদের জন্য ছেড়ে দেয় এককথাতেই। নাটকে ওর চরিত্রটা খুবই ছোট, কিন্তু নাটকটা করতে ও যা করর, তা নাটকের চেয়েও অনেক বড়। ওর বাসা শান্তিবাগে। লালমাটিয়া থেকে সেই শান্তিবাগে রওয়ানা হলাম এত্তসব যন্ত্রপাতি নিয়ে। ফলাফলস্বরূপ আমাদের কাজ শুরুই হল দুপুর আড়ইটায়। মা-বাবা না পাওয়ায় স্ক্রিপ্টেও বিশাল পরিবর্তন আনতে হল্ সেটা অনেকটা সিএনজিতে বসেই করে ফেললাম; মা-বাবার স্থলে বড়ভাই।
বাসার দৃশ্যগুলো বেশ আয়েশেই নেয়া সম্ভব হযেছে। এর মধ্যে ছাদের একটা দৃশ্যের কথা না বললেই নয়। দৃশ্যটার এক জায়গায় সঙ্গীতা আপু নাটকে তার ভাই ইমুকে কান ধরে হ্যাচকা টান দেয়; ক্যামেরাম্যানসহ উপস্থিত সবার দাবি এই দৃশ্যটা আরও কয়েকবার নিতে হবে,একদমই রিয়েল হচ্ছেনা!! ওদিকে বেচারা ইমুর কান যায় যায় অবস্থা।
জুনিয়র মেহেদীর ত্যাগস্বীকারের কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। ঐদিন বিকেলে এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে রাখা ছিল। নাটকের কারণে, সেই এপোয়েন্টমেন্ট বাতিল করে সে ইউনিটেই রয়ে যায়। সঙ্গীতা আপুর বাসা কাছাকাছি হওয়ায় তার মা-বাবাও শুটিং দেখতে চলে এসেছিলেন। উনার চাচা ঐদিন ভারতে যাচ্ছিলেন, অথচ নাটকের কারণে দেখাটাও করতে পারেননি। সবার কমিটমেন্টে আমি যারপরনাই মুগ্ধ।
রাত ১০টায় ইলেকট্রিসিটি চলে যাওয়ায় ইনডোরের দুটো দৃশ্য বাদ রেখেই কাজ শেষ করতে হয়, পরবর্তীতে সে দুটিকে আউটডোরে রূপ দিতে গিয়ে আবারো স্ক্রিপ্টে কাটাছেড়া। সমগ্র নাটকজুড়েই এই কাটাছেড়াটা এতবেশিসংখ্যকবার করতে হয়েছে যে, নাটকে যা করতে চাচ্ছিলাম, আর যা করেছি, দুইয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তবে সেটা নাটকের প্রবাহের উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি বলেই ধারণা।
৮ তারিখ ছবি তোলা হয়েছে অসংখ্য। কয়েকটা শেয়ার করছি
১১ই সেপ্টেম্বর: এইবার তোমার আপন দেশে চল
আগের দুদিনের নানা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতায়, নিশ্চিত ছিলাম এদিনও কিছু একটা ঘটবে। ইতিমধ্যে নানা দেন-দরবার করে ক্যাম্পাসে কাজ করার অনুমতিটা পাওয়া গেছে। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত বিশেষ কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই কাজ শুরু করতে পেরেছিলাম। তবে, এবার একটু ভিন্নধরনের কিছু অভিজ্ঞতা হল: একটা দৃশ্য ছিল চুন্নুভাই তার শিষ্য কবিদের সঙ্গে নেশা করছে, এসময় তার বড়ভাই এসে তাকে বাড়িতে নিয়ে যাবে টেনে-হিচড়ে। তার অভিনয়টা এতই ন্যাচারাল হচ্ছিল যে, এই টানা হেচড়ার ঘোরে আর্কিটেকচার বিল্ডিঙয়ের একটা জানলায় ধাক্কা লেগে কাঁচ ভেঙ্গে ফেলেন, তার হাতও কেটে যায় বেশ খানিকটা। এদিন আর কোন বিপত্তি ঘটেনি, নির্বিঘ্নেই কাজ শেষ হল। সম্পূর্ণ নাটকের দৈর্ঘ্য ৪৫ মিনিট।
বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই আমাদের ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র লেকচারার মাহবুবুল হাসান (পলাশ ভাই) এর প্রতি, কারণ ক্যাম্পাসে কাজের অনুমতি পেতে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সেইসাথে জুনিয়র ফারুকের কথাও উল্লেখ করতে হবে; প্রোডাকশন ম্যানেজারের কঠিন দাযিত্বটি সে অত্যন্ত সুচারুভাবে পালন করেছে।
এদিনের কিছু ছবি শেয়ার করছি;
তবুও কথারা অব্যক্ত হাসির আড়ালে ভেঙচি কাটে:
প্রথম দুদিনের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার সিংহভাগই সামাল দিতে হযেছে অর্থনৈতিকভাবে, যার প্রভাব পড়েছে শেষদিনে সবার বিল মেটাতে গিয়ে। দেখা গেল, যন্ত্রী ও অন্যান্যদের যাবতীয় পাওনা মেটানোর পরও ক্যামেরাম্যানের অর্ধেক বিরই বকেয়া থেকে যাচ্ছে। এই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে স্বয়ং ক্যামেরাম্যানই আমাদের কিছুটা স্বস্তি দেন- এই ঈদের মৌসুমেও অর্ধেক বিল নিয়ে কালকের মত চলে যান। এ কয়দিন অনেক মজা করলেও শেষের দিনের ব্যাপারটায় লজ্জাই পেলাম, এমনকি গত ২দিনের অভিজ্ঞতাও তার কাছে ম্লান। যাইহোক, হয়ত এই সমস্যাও ঘুচে যাবে সহসাই।
নানাভাবে সংগৃহীত অর্থের পুরোটাই খরচ করে কাল ছিলাম সম্পূর্ণ নিঃস্ব- একদম শাব্দিক অর্থেই নিঃস্ব বলে যাকে। আজ অবশ্য অবস্থার কিছুটা উন্নতি হযেছে বাসা থেকে ছোটভাই আসায়। বাজেট সংকটের কারণে আপাতত নাটকের এডিটিংটা বাকি থাকছে; হয়তবা ঈদের পরে আবার নানাভাবে বাজেট সংগ্রহ করে এডিটিংয়ের কাজটা শেষ করতে হবে; এই কাজটা করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা তো কম হলনা, আরেকটা নাহয যুক্ত হোক অভিজ্ঞতার পাল্লায়।
নাটক করার পরিক্পনাটা হঠাৎ চলে এসেছিল, ৩দিন কাজ করার পর এখনও সেই হঠাৎ এর আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছি, মাঝের সময়গুলোতে যা কিছু সঞ্চিত ও অর্জিত হল, স্মৃতিচারণের উপকরণ হিসেবে তা ব্রায়ান লারা অথবা টেন্ডুলকারের খেলা দেখার মতই অতুলনীয়।
ধন্যবাদ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


