somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার পতনের গল্প

০৫ ই জুন, ২০০৯ রাত ৮:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার ছোটবোনটার খুব জ্বর কয়েকদিন ধরে। থার্মোমিটার হারিয়ে গেছে। নতুন একটা কিনে আনা হল। সেটাতে জ্বর মেপে দেখি একশ ছয় আর সাতে ঘুরাঘুরি করছে। গায়ে হাত দিলে বোঝা যায় বেশ জ্বর। তাই বলে এত বেশি হতেই পারে না। আমরা ধরেই নিলাম থার্মোমিটারে সমস্যা। বাসার দুইজন ইঞ্জিনীয়ারের মাথায় একবারও এই কথাটা আসল না, ফারেনহাইটের ১০৪ আর ১০৭ এর ভিতর যা পার্থক্য তা আসলে সেলসিয়াসে দেড় ডিগ্রীর মত। এই সামান্য পার্থক্য হাতে বুঝতে পারা সম্ভব না।
ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার ব্লাডের টিপিক্যাল টেস্ট দিল। সেখানে ESR এর মান অনেক বেশি আসছে। আমরা জানি না ESR এর মান বেশি আসলে কি হয়। ডাক্তার শুক্রবার রোগী দেখে না। তাই গুগলে সার্চ মেরে দেখলাম ESR বস্তুটা কি। যা পড়লাম তাতে আক্কেল গুড়ুম। ESR এর মান বেশি আসলে যেসব রোগ হবার সম্ভাবনা তার ভিতর আছে ক্যান্সার, রিমুটিক ফিভার... ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজেই রিপোর্টে ব্লাড সেলের সংখ্যা দেখে বুঝলাম আর যাই হোক ক্যান্সার না। ইন্টারনাল ব্লিডিংও হচ্ছে না। ্কিছুটা হাফ ছেড়ে বাচলাম আর কি। পরের দিন আমি আর আমার বাবা অফিস থেকে ছুটি নিলাম। বুঝতে পারছি ঘটনা সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে।
ডাক্তারের পরামর্শে পিজিতে নিয়ে anti CCP টেস্ট করে নিয়ে আসলাম। গুগলে ESR এর সার্চ দেয়ার পর নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর যাই হোক কিছুতেই গুগলে সার্চ দিবনা। হেভি ভয় খাইছিলাম সেইবার। কিন্তু নয়া রিপোর্ট হাতে পেয়ে তর সইলো না। PDA তেই গুগল সার্চ দিলাম। ইয়াপ! পজেটিভ আসছে। শুধু পজিটিভ না, অস্বাভাবিক বেশি আসছে। মোটামুটি শিওর হয়ে গেলাম হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
তবু একবার ডাক্তারকে দেখিয়ে নিলাম। ডাক্তার ইসলামী হাসপাতালে বসেন, সেখানে ভর্তি হতে বলে দিলেন। আমরা রিসেপশনে গিয়ে জানলাম আপাতত কিছু খালি নাই, সকালে খালি হবে। সকাল মানে হোটেলের মত বারোটায় চেক আউট।
পরদিন সকালে মায়ের চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গল। আমার ছোটবোনের শরীর অস্বাভাবিক রকমের শীতল হয়ে পড়েছে। সে কথা বলতে পারছে না। কেউ ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না। শুধু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকছে। অতি ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। আমার পড়িমরি করে একটা সিনএনজি ডেকে ইসলামী ব্যাঙ্ক হাসপাতালেই নিয়ে আসলাম। যে ডাক্তার তাকে দেখছে, সে ত এখানে ভর্তির কথা বলেছে।
হাসপাতালে এনে হুইল চেয়ারে বসিয়ে রেখে ভর্তির ব্যাপারে খোজ নিতে গেলাম। কেবিন নাই। ওয়ার্ড চাইলাম- সেইটাও নাই। ইমার্জেন্সীর ডাক্তার চাইলাম। আছে। নিয়ে গেলাম তার কাছে। মধ্যত্রিশের এই ডাক্তার আমাকে অবাক করে দিল। তার নাম কি আমি জানি না। তাই ব্লগে তাকে শুয়োরের বাচ্চা-১ বলেই উল্লেখ করছি।( বাকি নম্বরের গুলাও আসছে) শুয়োরের বাচ্চা-১ আমার ছোটবোনটার শরীরের অস্বাভাবিক কম তাপমাত্রা দেখল। এরপর বলল, ভর্তি সেকশনে যোগাযোগ করেন। আমরা যতবারই বলি ভর্তি হবার মত সীট খালি নাই। বারোটার দিকে খালি হতে পারে –কাউন্টার থেকে এমনই জানিয়েছে। সে ততবারই বলে যোগাযোগ করেন। এরপর শুয়োরের বাচ্চা জাস্ট হাত গুটিয়ে বসে রইল। আমরা যদি ভর্তি না হই তাহলে এখনকার চিকিৎসার কোন বিল সে নাও পেতে পারে, এই ভয়ে সে হাত দিবে না। আগে আমাদের ভর্তি হতে হবে। টাকা জমা দিতে হবে- এরপর চিকিৎসা। আমরা কাউন্টারে গেলাম। তারা জানাল খালি হতে পারে। তার চেক করে বলবে। এই ফাকে তারা জেনে নিল আমার ছোটবোন কি অপারশনের রূগী না মেডিসিনের।
পরে জানাল সীট নাই। বারোটার পর ওয়ার্ডে ভর্তি হলেও হতে পারে। আমি আর আমার বাবা তখন মাথায় আর কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। টাকা ত সমস্যা না। চিকিৎসা ত শুরু করুক। বোনের যে অবস্থা তাকে আবার গাড়িতে করে কোথাও নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা সেটাও বুঝতে পারছি না। ডাক্তাররা কেউ ত কিছুই বলছে না। ফিরেও দেখছে না। যদি কারো পায়ে ধরলে কিছু হত, আমি মনে হয় তখন পায়েও ধরতাম। কিন্তু কেউ ত পাত্তাই দিচ্ছে না। একজন মানুষ ভয়াবহ অসুস্থ, সে কারো বোন-কারো কন্যা, কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না।
একজন রূগীর দর্শনার্থী আসল কথা ফাস করল। অপারেশনের রূগী না হলে এরা ভর্তি করবে না। খালি মেডিসিন দিলে কত টাকা আর বিল হবে? তিনিই বুদ্ধি দিলেন আশেপাশের কোন একটা হাসপাতালে আপাতত নিয়ে যেতে।
আমি বের হয়ে আসলাম। কাছেই আল বারাকাহ হাসপাতাল। সেখানে গিয়ে খোজ নিলাম সীট খালি আছে? ডাক্তার আছে? তারা জানালো আছে। ছোটবোনকে নিয়ে আসলাম।
আল বারাকাহ এর রিসেপশনিষ্ট এরপর আমাকে জানাল ইমারজেন্সীতে নিয়ে যান। আমি যতই বলি কোন একজন ডাক্তারকে ডাকেন। তার চিকিৎসা শুরু হোক। তারা ততই বলে অপেক্ষা করেন। এরা দুইজনেই তখন মোবাইলে কথা বলছে মিষ্টি করে কার সাথে জানি না। সকাল নয়টা তখনো বাজে না। মোবাইল কোম্পানীগুলার বিশেষ অফার তখনো চলমান। এরা ফোনের ফাকে ফাকে বলল ডাক্তার আসবে। দেখবে। ঠিক করবে রোগী ভর্তি করা যাবে কিনা। এরপর চিকিৎসা শুরু হবে।
এই পর্যায়ে আমার গলার স্বরে রাগ চলে আসছিলো। একটু গলা চড়াইছি । দুইজনেই মোবাইলে কথা বন্ধ করল। এরপর শুরু করল আমাকে জ্ঞান দান। এইভাবে কেনো কথা বলি আমি? সবকিছুর একটা সিস্টেম আছে। সিস্টেমের বাইরে যাওয়া যাবে না। এইটা হাসপাতাল। ধমক ধামকে কাজ হবে না।
আমার বাবা আর মা ছোটবোনকে নিয়ে অসহায় মুখে বসে আছে ইমার্জেন্সীতে। আমি বুঝলাম এইভাবে কাজ হবে না। I HAVE TO SUCK LIKE I NEVER HAD SUCKED BEFORE. আমি তাই করলাম। শুয়োরের বাচ্চা-২ আর শুয়োরের বাচ্চা-৩ কে ভজাইলাম। এরপর হারামজাদা ফোন করল। ডাক্তার আসল।


(পরে লিখব বাকিটুকু)
২১টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×